শিরোনাম
আজ মৌলভীবাজার হানাদার মুক্ত দিবস
মোঃ আয়নুল ইসলামঃ আজ ৮ ডিসেম্বর। একাত্তরের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কালো থাবা থেকে চিরতরে মুক্ত হয় সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলা।মৌলভীবাজারের আকাশে উড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস আর তুমুল প্রতিরোধের মুখে হানাদাররা সিলেটের দিকে পালিয়ে যায়।
১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর কমলগঞ্জ, রাজনগর, শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলা হানাদারমুক্ত হওয়ার পর মুক্তিবাহিনী তিনদিক থেকে মৌলভীবাজার শহর ঘিরে ফেলে। ৬ ডিসেম্বর বর্ষিজোড়া, সালামিটিলা ও শমশেরনগর সড়কে শুরু হয় প্রচণ্ড যুদ্ধ। গোলা-গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। এক পর্যায়ে পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে ৭ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনী সিলেটের দিকে ছুটে পালায়। পরদিন ৮ ডিসেম্বর ভোরে মৌলভীবাজারের মাটি পূর্ণরূপে হানাদারমুক্ত হয়।
সেদিন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। স্বজন হারানোর বেদনা ভুলে রাস্তায় নেমে আসে মুক্তিপাগল মানুষ। উল্লাসে মুখরিত হয় পুরো শহর। জেলায় নির্মম নির্যাতনের জ্বলন্ত সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে ১৭টি বধ্যভূমি।
প্রতি বছর এইদিনে মৌলভীবাজারে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালন করা হয়। শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র্যালির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করা হয়।
লেখক: শিক্ষার্থী, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
গার্মেন্টস শিল্পে টেকসই উন্নয়ন: বাংলাদেশের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে গার্মেন্টস শিল্পের অবদান অনন্য। স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্পনির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে যাত্রা শুরু হয়, আর এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পোশাক শিল্প। ১৯৮০-এর দশকে কয়েকটি ছোট উদ্যোগ দিয়ে শুরু হওয়া এই খাত আজ দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় পঁচাশি ভাগই আসে তৈরি পোশাক থেকে, যেখানে প্রায় সাড়ে চার মিলিয়ন শ্রমিক কর্মরত এদের অধিকাংশই নারী। এই শিল্প তাই শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক বিপ্লবেরও জন্ম দিয়েছে।
শুরুতে লক্ষ্য ছিল কেবল উৎপাদন বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নেওয়া। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসেছে কঠিন বাস্তবতা যা শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশ দূষণ, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধস সেই বাস্তবতাকে কঠোরভাবে সামনে নিয়ে আসে। বিশ্বের বিবেক যেন জেগে ওঠে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত বুঝতে পারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেবল তখনই অর্থবহ, যখন তা টেকসই হয়। সেই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর থেকে শুরু হয় নতুন অধ্যায়-টেকসই উন্নয়ন ও দায়বদ্ধ উৎপাদনের যুগ।
টেকসই উন্নয়ন মানে এমন এক উন্নয়ন, যা বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন মেটায় কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুযোগকে ক্ষুণ্ণ করে না। গার্মেন্টস শিল্পের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো এমন উৎপাদন ব্যবস্থা, যা পরিবেশবান্ধব, সামাজিকভাবে ন্যায্য এবং অর্থনৈতিকভাবে দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। আজ বাংলাদেশের পোশাক খাত সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে চলছে।
বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এখন সবুজ কারখানায় (Green factory) এগিয়ে। ইতোমধ্যে দেশে দুই শতাধিক কারখানা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক LEED সনদ পেয়েছে, যার মধ্যে অর্ধশতাধিক ‘প্লাটিনাম’ মানের। এসব কারখানায় ব্যবহৃত হচ্ছে পানি সাশ্রয়ী যন্ত্র, বর্জ্য পুনঃব্যবহার ব্যবস্থা, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং কার্বন নির্গমন হ্রাস উদ্যোগ। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ কমছে, তেমনি পরিবেশও থাকছে নিরাপদ। Envoy Textiles বিশ্বের প্রথম LEED Platinum সার্টিফায়েড ডেনিম ফ্যাক্টরি হিসেবে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। একইভাবে Viyellatex Group, DBL Group ও Epic Group এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো টেকসই উৎপাদনের বাস্তব উদাহরণ স্থাপন করেছে।
শুধু পরিবেশ নয়, গার্মেন্টস শিল্প এখন সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। লক্ষ লক্ষ নারী আজ এই শিল্পের মাধ্যমে আত্মনির্ভর হয়েছেন। তারা শুধু পরিবারের অভিভাবক নন, সমাজের অর্থনৈতিক চাকা ঘোরানোর শক্তিও। অনেক কারখানায় এখন রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন ছুটি, শিশু যত্নকেন্দ্র ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিল। ২০১৩ সালের পর থেকে দেশজুড়ে ভবন নিরাপত্তা ও অগ্নিনিরাপত্তার যে রূপান্তর ঘটেছে, তা এ খাতের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থা ফিরিয়ে এনেছে। Accord ও Alliance–এর মতো উদ্যোগ শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে।
টেকসই উন্নয়নের আরেকটি দিক হলো উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি। আজ বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ম্যানুফ্যাকচারিং, অটোমেশন এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য ফ্যাব্রিক ব্যবহারে এগিয়ে যাচ্ছে। কিছু প্রতিষ্ঠান রিসাইকেল করা পলিয়েস্টার বা সাসটেইনেবল কটন দিয়ে নতুন ধরণের পোশাক তৈরি করছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্ত করছে। বিশ্বব্যাপী ক্রেতারা এখন ESG (Environmental, Social, Governance) মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠান যাচাই করছে। বাংলাদেশ যদি টেকসই উৎপাদন ও মানবিক শ্রমনীতি বজায় রাখতে পারে, তাহলে এটি চীন ও ভিয়েতনামের পর বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পোশাক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান নিতে পারবে। সরকার, মালিক, শ্রমিক এবং আন্তর্জাতিক অংশীদার সবাই মিলে একটি সমন্বিত রোডম্যাপ বাস্তবায়ন করতে পারলে গার্মেন্টস শিল্প শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের বৈশ্বিক উদাহরণ হয়ে উঠবে।
তবে চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। দক্ষ জনবল ঘাটতি, জ্বালানি সংকট, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এই বিষয়গুলো টেকসই উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধক। আন্তর্জাতিক বাজারেও এখন প্রতিযোগিতা কেবল দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ক্রেতারা চায় টেকসই, স্বচ্ছ ও ন্যায্য উৎপাদনের নিশ্চয়তা। ফলে প্রতিটি ব্র্যান্ড এখন তাদের সরবরাহকারীর সামাজিক ও পরিবেশগত মান যাচাই করছে। তবুও আশা হারানোর কারণ নেই। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের অভিযোজন ক্ষমতা অসাধারণ। এক সময় যেভাবে আমরা রপ্তানির বাজার দখল করেছি, ঠিক তেমনভাবেই আমরা টেকসই উন্নয়নেও বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারি। সরকার, উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদাররা যদি সম্মিলিতভাবে এই খাতের পরিবেশবান্ধব, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে কাজ করে, তাহলে গার্মেন্টস শিল্প হবে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।
গার্মেন্টস শিল্প আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ। এই শিল্প শুধু পোশাক তৈরি করছে না, এটি তৈরি করছে বাংলাদেশের নতুন পরিচয়। সেই পরিচয় হলো দায়িত্বশীল উৎপাদনের, নারী শক্তির, এবং একটি সবুজ ভবিষ্যতের। টেকসই উন্নয়ন এখন আর কেবল একটি লক্ষ্য নয়, এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের আত্মা, যা দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশকে একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প তাই এখন শুধু কাপড় তৈরি করছে না এটি তৈরি করছে স্বপ্ন, মর্যাদা, এবং একটি সবুজ ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি।
পরিবেশবিদ রাসেদ হাসান সজিব
পরিবেশ বিজ্ঞান (এম এস)
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস: যাদের হাত ধরে আমরা গড়ে উঠি
ভাবুন তো, আমাদের জীবনের প্রতিটি অর্জনের পেছনে কার হাত সবচেয়ে বড়? বাবা-মায়ের পরেই যদি কেউ আমাদের গড়ে তোলে, তবে তিনি হলেন শিক্ষক। আজ সেই মহান মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর দিন—বিশ্ব শিক্ষক দিবস।
১৯৯৪ সাল থেকে প্রতিবছর ৫ই অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এর উদ্দেশ্য হলো শিক্ষক সমাজের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের সম্মান প্রদর্শন।
✅ শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই শেখান না—
তারা শিখিয়ে দেন মানবিকতা, শৃঙ্খলা আর মূল্যবোধ।
প্রতিটি সফল মানুষের জীবনের পেছনে একজন প্রেরণাদায়ী শিক্ষকের অবদান থাকে।
সমাজ গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো শিক্ষক।
তবুও অনেক দেশে শিক্ষকেরা প্রাপ্য সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা পান না। অথচ মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে আগে শিক্ষকের মর্যাদা ও অবস্থানকে শক্তিশালী করতে হবে।
আজকের এই দিনে আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি—শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি তাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায়ও আমরা সচেতন থাকব।
আপনার জীবনে কোন শিক্ষক সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছেন? কমেন্টে লিখে জানাতে ভুলবেন না।
শিশুদের স্ক্রিন আসক্তি: শিক্ষামূলক খেলনা হতে পারে কার্যকর বিকল্প
বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিশুদের স্ক্রিন আসক্তি একটি উদ্বেগজনক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং কম্পিউটার, টিভি স্ক্রিনে শিশুদের সময় কাটানো দিনে দিনে বাড়ছে, যা তাদের মানসিক ও শারীরিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। শিশুদের প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব বলয়ের বাহিরে রাখতে 'শিক্ষামূলক খেলনা' একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আশার কথা হলো প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে শিক্ষামূলক খেলনাগুলি নতুন আঙ্গিকে হাজির হয়েছে।
শিক্ষামূলক খেলনা শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ এবং কার্যকর বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। এই ধরনের খেলনা বিনোদনের পাশাপাশি, শিশুদের সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, ব্লক নির্মাণ, ধাঁধা, বিজ্ঞান ও গণিতের খেলনা শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং তাদের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ায়।

শিক্ষামূলক খেলনার মাধ্যমে শিশুরা মননশীলতা, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বাড়াতে পারে। বিভিন্ন বয়সের জন্য উপযুক্ত খেলনাগুলি শিশুর চিন্তাভাবনাকে উন্মোচন করে এবং শেখার প্রক্রিয়ায় আনন্দ নিয়ে আসে।
বাংলাদেশের বাজারে এই ধরনের খেলনা উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন দেশি ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড তাদের পণ্য নিয়ে এসেছে, যা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। এসব খেলনা শিশুদের অঙ্কন, গণনা, ভাষা শিক্ষা এবং সামাজিক দক্ষতার উন্নয়নে সহায়তা করে।
অভিভাবকদের করার আছে অনেক কিছু। প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকের কথা ভেবে তারা সন্তানের সঠিক বিকাশের জন্য শিক্ষামূলক খেলনা বেছে নিতে পারেন। সঠিক শিক্ষামূলক খেলনা নির্বাচন শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং শেখার আগ্রহকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
আসুন, আমরা সবাই মিলিত হয়ে বাংলাদেশে শিক্ষামূলক খেলনাগুলোর গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক উন্নয়নে সাহায্য করি।
মেডিকেল ভর্তিতে অটোমেশন : বেসরকারি স্বাস্থ্য শিক্ষা সেক্টর ধ্বংসের ষড়যন্ত্র
অটোমেশনের কারণে সিট খালি থাকছে দেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে। সে কারণে এ পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বেসরকারি মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকরা। তারা বলছেন, এটি খুবই জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে বেসরকারি মেডিকেলে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যন্ত আর ভর্তি হন না। শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে এই দুশ্চিন্তায় অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকার পরও তারা অন্যত্র ভর্তি হয়। ফলে সিট খালি থাকে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে। অটোমেশনের নামে বেসরকারি মেডিকেল খাতকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে দাবি করেছেন সচেতন অভিভাবক ও বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন। ফলে অটোমেশন পদ্ধতিতে ভর্তি পক্রিয়া বাতিল করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
চলতি ২০২৪-২৫ শিক্ষা বর্ষে সব মিলিয়ে ৪৬৭টি আসন ফাঁকা রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন। শিক্ষার্থী না পেয়ে অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজকে লোকসান গুনতে গুনতে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। তারা বলছে, অটোমেশনের কারণে বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি হতে চার থেকে ছয় মাস লেগে যাচ্ছে। ২০২২-২৩ শিক্ষা বর্ষে অটোমেশন পদ্ধতি চালু করলেও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ কিংবা চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের কোনো মতামত নেয়া হয়নি। অটোমেশন চালু হওয়ার পর ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ২১৭ টি, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ১৪২ টি আসন ফাঁকা ছিল। অটোমেশন পদ্ধতি চালুর আগে দেশের কোন বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আসন ফাঁকা থাকতো না।
বেসরকারি মেডিকেলে শিক্ষার্থীরা নিজস্ব অর্থায়নে লেখাপড়া করেন, কিন্তু সেই শিক্ষার্থীদেরই পছন্দের মূল্যায়ন হয় না। এ কারণেও বেসরকারি মেডিকেলে কলেজে পড়ার আগ্রহ হারাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। শুধু দেশীয় শিক্ষার্থী নন, বিদেশী শিক্ষার্থীরাও অটোমেশন জটিলতায় বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃপক্ষ। অভিভাবকদের দাবি, অটোমেশনের নামে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে।
অন্য দিকে অভিভাবকরা বলছেন, অর্থ খরচ করেন তারা, পছন্দ ঠিক করে দেয় সরকার- এটি হতে পারে না। অটোমেশনের কারণে অর্থ থাকলেও পছন্দের কলেজে অনেকেই ভর্তি হতে পারছেন না। অটোমেশন পদ্ধতি বাতিল করে আগের ব্যবস্থায় ফিরে গেলে শিক্ষার্থী ও কলেজ কর্তৃপক্ষের সুবিধা হবে।
প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে, এসব ছাড়াও বেসকারি মেডিকেল কলেজ রিকগনিশন কমিটি (বিএমএন্ডডিসি, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতর, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়) পৃথকভাবে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ পরিদর্শনের নামে ঝামেলা করে। তাদেরকে উৎকোচ না দিলে ঝামেলা মেটানো যায় না, শেষ পর্যন্ত উৎকোচ দিতেই হয়।
বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো আরো অভিযোগ করছে, অটোমেশনের কারণে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৈরি ‘ভর্তি হতে ইচ্ছুক’ তালিকায় শিক্ষার্থীদের পছন্দকে গুরুত্ব না দেয়ায় অনেকে শেষ পর্যন্ত এমবিবিএস কোর্স শেষ করতে পারেন না, ঝরে পড়েন। যেমন রাজধানীতে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা রাজধানীতেই থাকতে পছন্দ করেন। কিন্তু যারা ঢাকার বাইরে গ্রামের দিকে চলে যেতে বাধ্য হন তারা অনেক সময় ঝরে পড়েন। তা ছাড়া নিজেদের পছন্দ উপেক্ষিত হয় বলেও শেষ পর্যন্ত মানিয়ে নিতে পারেন না বলে ঝরে পড়েন অনেকে।
এছাড়া বেসরকারি মেডিকেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, চিকিৎসা শিক্ষা খাতে এক দেশে দুই নীতি। আর্মি মেডিকেল কলেজ গুলো অটোমেশনের বাইরে রয়েছে। তারা সরকারী নীতিমালার বাইরে থেকে মেডিকেল কলেজ পরিচালনা করছেন। সুতরাং অটোমেশনরে নামে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ গুলো বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে। আর বেসরকারি মেডিকেল কলেজ গুলো ব্যক্তিগত বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত হলেও সরকার এই খাতে পৃষ্ঠপোষকতা না করে উল্টো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে সরকার। হঠাৎ হঠাৎ সরকারী নীতিমালায় উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত বেসরকারি মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ। অটোমেশনের নামে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ সেক্টর ধ্বংস করার নীলনকশা করা হয়েছে। এতে বেসরকারি স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে বিনিয়োগকারীরা নিরুত্সাহিত হচ্ছে।
বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ সেক্টর ধ্বংস করার নীলনকশা করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে প্রতিষ্ঠান গড়া কঠিন, ধ্বংস করা সহজ। প্রাইভেট সেক্টরে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীরা নিজের চয়েজমতো ভর্তি হবেন। কিন্তু অটোমেশনের কারণে তারা তা পারছেন না। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সবাই হতাশ। হাত-পা বেঁধে পানিতে সাঁতার কাটতে দেয়ার মতো অবস্থায় অটোমেশন। যার জন্য এই পেশায় আসতে শিক্ষার্থীরা নিরুত্সাহিত হচ্ছেন। অটোমেশনের নামে এই সেক্টরকে ধ্বংস করার অপপ্রয়াস চলছে।
বেসরকারি মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছেন, আসন শূন্য থাকায় ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ শিক্ষা বর্ষে অটোমেশনে ৪ থেকে ৬ বার মেধা তালিকা পাঠানো হলেও অনেকেই তাদের পছন্দের কলেজ না পেয়ে ভর্তি হয়নি। এ ছাড়া প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী মেডিকেল না পড়ে অন্যত্র চলে গেছে। এমনকি বিনা খরচে দরিদ্র ও মেধাবী কোটায় থাকার পরও পছন্দমতো কলেজ না পেয়ে লেখাপড়া শেষ করেননি অনেকে। অটোমেশন চালু হওয়ায় ক্লাসও বিলম্বে শুরু করতে হয়। কয়েকবার মেধা তালিকা প্রকাশের পরও আসন খালিই থাকছে। আবার এই বার বার মেধা তালিকা প্রকাশের কারণে ভর্তি হওয়া অনেক শিক্ষার্থী অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। বিদেশী শিক্ষার্থীরাও আগের মতো ভর্তি হচ্ছে না বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজে। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত বিদেশী শিক্ষার্থীদের আসন ৪৫ শতাংশ পূরণ হয়েছিল। কিন্তু ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ২৫ শতাংশ, ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ২২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষাবর্ষে ২৩ শতাংশ বিদেশী শিক্ষার্থীদের আসন ফাঁকা রয়েছে। ফলে বেসরকারি মেডিকেল শিক্ষাখাতে সরকার কাঙিখত বৈদেশিক মুদ্রা পাচ্ছে না।
বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. শেখ মহিউদ্দীন বলেন, দেশের স্বাস্থ্য শিক্ষায় বেসরকারি খাতের অবদান অপরিসীম। কিন্তু সরকার বেসরকারি স্বাস্থ্য শিক্ষার সহজীকরণে নজর না দিয়ে নতুন নতুন নীতিমালা তৈরি করে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বেসরকারি স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতে বিনিয়োগকারী ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতামতকে উপেক্ষা করে সরকার বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তিতে অটোমেশন চালু করেছে।
তিনি আরো বলেন, অটোমেশন একটি জটিল প্রক্রিয়া। যা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী বান্ধব না। এ কারণে শিক্ষার্থীরা মেডিকেল কলেজে ভর্তিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। যেমন চট্টগ্রামের শিক্ষার্থী বরিশালে গিয়ে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে চায় না। বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তিচ্ছুরা অধিকাংশ ধনী পরিবারের। তারা নিজেদের পছন্দ মতো মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে চায়। অটোমেশনের নামে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। সুতরাং বেসরকারি মেডিকেল কলেজ গুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এখনই অটোমেশন প্রক্রিয়া বন্ধ করা প্রয়োজন।
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


মন্তব্য