শিরোনাম
‘৮ দিন পর পর্তুগালের ফ্লাইট, আমি ফাইসা গেছি’
পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ও কংক্রিটের টুকরা দিয়ে মাথা থেঁতলে হত্যার ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুই আসামি তারেক রহমান রবিন ও টিটন গাজী। তবে দুজনেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন।
শনিবার (১২ জুলাই) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ গিয়াসের আদালতে তারা জবানবন্দি দেন।
আদালতে জবানবন্দি দেওয়া অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার রবিন বলেছেন, তিনি ফেঁসে গেছেন। আর টিটন বলেছেন, ব্যবসায়ী মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে তিনি কোনো ‘আঘাত’ করেননি বা অন্য কাউকে মারধরের নির্দেশও দেননি।
দুই দিনের রিমান্ড শেষে রবিন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় তা রেকর্ড করার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মনির হোসেন জীবন। রবিন এ ঘটনায় পুলিশের করা অস্ত্র মামলার আসামি।
ঢাকার মহানগর হাকিম হাসিব উল্লাহ গিয়াস রবিনের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আদালত থেকে বেরিয়ে আসার সময় রবিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত না। আমি দোষী, সারা বাংলাদেশের মানুষ মানুষ জেনে গেছে। আর আট দিন পর আমার পর্তুগালের ফ্লাইট। বিদেশ যাওয়ার জন্য ২২ লাখ টাকা এ বাবদ খরচ হয়েছে।
তার কাছ থেকে একটি একে-৪৭ রাইফেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রবিন।
ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের কারও সঙ্গে ‘সম্পর্ক নেই’ জানিয়ে রবিন বলেন, ‘আমি ফাইসা গেছি। ঘটনাস্থলে ছিলাম না। সন্দেহের কারণে আমাকে গ্রেপ্তার করেছে। আমার জীবনটা শেষ। আম্মু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। আর কিছু বলতে চাই না।’
এদিন আদালতে রিমান্ডের শুনানির সময় টিটন গাজী বলেছেন, ‘আমি ওই ঘটনার সময় কেবল দাঁড়িয়ে ছিলাম। একজনের ফোন পেয়ে সেখানে যাই। আমি আঘাত করিনি।’
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা টিটন গাজীকে সামনে ডেকে আনেন বিচারক। তার আইনজীবী আছেন কি না, তা জানতে চান। টিটন জানান, তার কোনো আইনজীবী নেই।
এরপর তার কোনো বক্তব্য আছে কি না জানতে চাইলে টিটন গাজী আদালতকে বলেন, ‘যে ভিডিওটা ভাইরাল হয়েছে, মনোযোগ সহকারে দেখবেন। আমি কোনো আঘাত বা মারধর করিনি।
ভিডিওতে দেখবেন, আমি পেস্ট কালারের গেঞ্জি পরা। আমার এ ঘটনায় কোনো ভূমিকা ছিল না। আমি কাউকে মারার হুকুম দিইনি। শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম।’
পরে আদালত টিটনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দেন।
গত ৯ জুলাই বিকালে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের সামনে প্রকাশ্যে কংক্রিটের টুকরা দিয়ে শরীর ও মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয় ভাঙারি ও পুরনো তারের ব্যবসায়ী মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে। পরে লাশের ওপর উঠে কয়েকজন লাফায়।
এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার শুরু হয়। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের পাঁচজনকে বহিষ্কারের কথা জানিয়েছে বিএনপি।
এ ঘটনায় চাঁদ সোহাগের বড় বোন বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। আর পুলিশ বাদী হয়ে করেছে অস্ত্র মামলা।
ঘটনার পর এখন পর্যন্ত পুলিশ ও র্যাব অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে পাঠিয়েছিলেন আদালত। তারা হলেন, মাহমুদুল হাসান মহিন ও তারেক রহমান রবিন। রিমান্ড শেষে রবিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
চাঁদাবাজি নয়, ভাঙারি দোকান দখল দ্বন্দ্বেই মিটফোর্ড হত্যাকাণ্ড: ডিএমপি
রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় প্রকাশ্যে ব্যবসায়ী লাল চাঁদ সোহাগকে (৩৯) নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার তদন্তে নতুন তথ্য উঠে এসেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, এ হত্যাকাণ্ড চাঁদাবাজির কারণে নয়, বরং ভাঙারির একটি দোকানের মালিকানা ও আয়-ব্যয় নিয়ে বিরোধের ফলাফল।
শনিবার (১২ জুলাই) লালবাগ বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন এক ব্রিফিংয়ে বলেন, দোকানের দখল ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বই এই হত্যার মূল কারণ। এখনও পর্যন্ত চাঁদাবাজির কোনো প্রমাণ মেলেনি।
তিনি জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পাঁচ সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। মামলার ১ নম্বর আসামি মাহিনসহ অন্যান্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ডিসি জসীম উদ্দিন যোগ করেন, প্রাথমিকভাবে এটি একটি ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব। তবে অন্য কোনো প্ররোচনা বা রাজনৈতিক যোগসূত্র আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে কোনো পক্ষপাত করা হবে না।
উল্লেখ্য, ৯ জুলাই মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে সোহাগকে নৃসংশভাবে হত্যা করা হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ফেসবুক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
নিহতের বোন কোতোয়ালি থানায় হত্যার মামলা করেছেন। এতে ১৯ জনের নাম উল্লেখ রয়েছে এবং ১০-১৫ অজ্ঞাত ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, হত্যাকারীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে সোহাগকে টার্গেট করেছিল। আটককৃতদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। শীঘ্রই আদালতে আটককৃতদের রিমান্ডের আবেদন করা হবে।
বিবিসি অনুসন্ধান
বিক্ষোভ দমনে নির্বিচারে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা
জুলাই অভ্যুত্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতি অস্ত্র ব্যবহার ও নির্বিচারে গুলি চালাতে নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা—এমনটাই উঠে এসেছে তার একটি ফাঁস হওয়া ফোনালাপে। এর সত্যতা নিশ্চিত করেছে বিবিসি আই।
গত মার্চে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এই অডিও রেকর্ডিংয়ে হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, গত ১৮ জুলাই তিনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের’ নির্দেশ দেন এবং বলেন, ‘যেখানেই পাবে, গুলি করবে’।
এই ফোনালাপটি ২০২৫ সালের মার্চ মাসে অনলাইনে ফাঁস হয় এবং পরে তা যাচাই করে বিবিসি ও বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
তদন্তকারীরা বলছেন, এই রেকর্ডিং-ই এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ, যা তাকে সরাসরি গণহত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে তুলে ধরে।
ইতোমধ্যেই এই রেকর্ডিংকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারকার্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তুতি নিচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
১৮ জুলাই ২০২৪ সালে ঢাকা গণভবনে অবস্থানকালে একজন অজ্ঞাত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে শেখ হাসিনার ফোনালাপটি হয় বলে নিশ্চিত করেছে বিবিসি।
সেই সময়টিতে রাজধানীজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছিল এবং পুলিশ বাহিনীর হাতে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছিল।
ফোনালাপে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঘটনাস্থলে যারা যাবে, lethal weapon (প্রাণঘাতী অস্ত্র) নিয়ে যাবে। যেখানেই পাবে, shoot (গুলি) করবে।’
অডিও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইয়ারশট’ এবং বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানায়, এতে কোনো ধরনের সম্পাদনা বা কৃত্রিমতা পাওয়া যায়নি এবং এটি খুব সম্ভবত কোনো কক্ষে ফোনালাপটি স্পিকারে চালিয়ে রেকর্ড করা হয়েছিল।
ব্রিটিশ মানবাধিকার আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান বিবিসিকে বলেন, ‘এই রেকর্ডিংগুলো শেখ হাসিনার ভূমিকা প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ। এটি পরিষ্কার, নির্ভরযোগ্য ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’ তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করছেন।
বিপরীতে আওয়ামী লীগ দলীয় এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, ‘বিবিসি যে রেকর্ডিংয়ের কথা বলছে, তার সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। এমনকি যদি তা সত্যিও হয়, সেটি ছিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একটি বৈধ প্রচেষ্টা।’
দলটি দাবি করেছে, ‘আমাদের নেতারা ইচ্ছাকৃতভাবে কোন হত্যা নির্দেশ দেননি। সরকারি সিদ্ধান্তগুলো ছিল অনুপাতিক, সৎ ও জানমালের ক্ষতি রোধে নেওয়া পদক্ষেপ।’
বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, গত বছরের জুলাই-আগস্টের ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ মুখপাত্র বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে কিছু সদস্য অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে জড়িয়ে পড়েছিল। এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে।’
শেখ হাসিনার বিচার শুরু হয়েছে গত মাসে। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যার নির্দেশ, বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার তার প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানালেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। আন্তর্জাতিক আইনজীবী ক্যাডম্যানের মতে, হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা কম।
আওয়ামী লীগ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘প্রধানমন্ত্রী বা দলের কোনো ঊর্ধ্বতন নেতাই বিক্ষোভ দমনে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ দেননি।’ দলটি জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনও প্রত্যাখ্যান করেছে।
বিবিসি সেনাবাহিনীর কাছে মন্তব্যের জন্য অনুরোধ জানালেও কোনো সাড়া মেলেনি।
শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ এখন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে রয়েছে, যার নেতৃত্বে আছেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার সরকার আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগ ওই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
চাঁদা দাবির অডিও ফাঁস, বৈষম্যবিরোধী সেই ২ নেতাকে শোকজ
খুলনায় একটি মেলা কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অডিও ফাঁসের ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ২ নেতাকে শোকজ করেছে কেন্দ্রীয় কমিটি।
সোমবার (৭ জুলাই) রাতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মুঈনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি নোটিশে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
অভিযুক্তরা হলেন- বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন খুলনা মহানগর কমিটির সদস্যসচিব জহুরুল ইসলাম তানভীর ও মুখ্য সংগঠক সাজ্জাদুল ইসলাম আজাদ। তারা দুজনেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
এর আগে, গত রোববার (৬ জুলাই) মেলার আয়োজক বগুড়ার মন্টু ইভেন ম্যানেজমেন্টের স্বত্বাধিকারী মন্টুর কাছে ১০ রাখ টাকা চাঁদা দাবির ১ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের একটি কল রেকর্ড ফাঁস হয়।
শোকজের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সংগঠনের শৃঙ্খলা ও নীতিমালার পরিপন্থি কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড একজন দায়িত্বশীল হিসেবে আপনার অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সংগঠনের ভাবমূর্তির জন্য হানিকর। কেন আপনার বিরুদ্ধে স্থায়ীভাবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না-তা এই নোটিশ প্রাপ্তির ৩ (তিন) কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পাওয়া গেলে সংগঠন আপনার বিরুদ্ধে একতরফা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য থাকবে।’
গত বছরের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তারা নানা কর্মসূচিতেও সক্রিয় অংশ নিয়েছেন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিংয়ের আতঙ্কে ক্যাম্পাস ছাড়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীর
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) নৃবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের কয়েকজন নবীন শিক্ষার্থী সিনিয়রদের র্যাগিং ও মানসিক হয়রানির অভিযোগ তুলে আতঙ্কে ক্যাম্পাস ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাস শুরুর প্রথম দিন থেকেই পরিচয় পর্বের আড়ালে শুরু হয় মানসিক নির্যাতন। এক পর্যায়ে একজন নবীন শিক্ষার্থী কান্নায় ভেঙে পড়েন। এছাড়াও, টানা তিনদিন নবীন শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে ডেকে নিয়ে র্যাগ দেয়া হয় বলে জানা যায়। যারমধ্যে, বেঞ্চে তুলে দাঁড় করানো, হলে নিয়ে সিগারেট খেতে দেয়া, সিনিয়র আপুকে প্রপোজ করানো, নির্জন স্থানে নিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বাবা-মায়ের নামে অশালীন ভাষায় গালমন্দ করা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী নবীন শিক্ষার্থী জানান, "২ জুলাই রাতে ওই বিভাগের ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ (সিআর) তাকে সিনিয়রদের সঙ্গে দেখা করাতে ‘তালতলা’ নামক নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে সিনিয়ররা মো. ওয়ালি উল্লাহ, রাফিও হাসান, অরবিন্দু সরকার তাকে ও তার বন্ধুদেরকে অশ্লীল গালিগালাজ করে এবং মায়ের নামে কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেন। মোবাইল রেখে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার পর রাত ১টায় ছাড়া হয়। পরদিন (৩ জুলাই) আবার ডেকে নেয়া হয় একই স্থানে এবং ছবি তুলে রাখাসহ নানা অপমানজনক আচরণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন।
ভুক্তভোগী আরও জানান, তাকে জোর করে সিগারেট খেতে বলা হয়। এমনকি বলা হয়, "তোরে দেখতে গাঁজাখোরের মতো লাগে।" পাশাপাশি এক সিনিয়র আপুকে কল দিয়ে প্রপোজ করতে বাধ্য করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, "সিনিয়র ভাই আমার মাকে নিয়েও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালিগালাজ করেছেন।"
আরেক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বিল্লাল হোসেন বলেন, “ওরিয়েন্টেশনের দিন আমি সিনিয়রদের বলি নতুন বাংলাদেশে আপনারা চাইলে নিজেদের সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারতেন। আপনাদের আচরণের কারণে একজন মেয়ে কান্না করেছে, এটা ঠিক হয়নি।’ এই প্রতিবাদের কারণে আমাকে টার্গেট করা হয়। পরবর্তীতে প্রথম ক্লাসের দিন ওনারা আমাকে এবং আমার মাকে নিয়ে গালিগালাজ করেন। পাশাপাশি ১০ বার সালাম দিতে বাধ্য করেন। এরপর আবার বেঞ্চের ওপরও দাঁড় করে রাখেন।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী নারায়ণগঞ্জে নিজ বাড়িতে চলে যান। দুইদিন পর শুক্রবার (৪ জুলাই) সন্ধ্যায় মেসে ফিরে ক্যাম্পাসে হাঁটতে গেলে ব্যাচের সিআর এক সিনিয়র ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে বলেন বলে জানান। তাকে ডেকে নেওয়া হয় নজরুল হলের ১০৯ নং কক্ষে, সেখানে বলা হয় "তুই নাকি র্যাগিং কালচার পরিবর্তন করতে চাস!" এরপর পুনরায় তাকে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ছাড়া পান। এসময় তাকে আবার র্যাগিং দেয় রাফিও হাসান ও মো. ওয়ালি উল্লাহ।
অভিযুক্তদের মধ্যে অরবিন্দু সরকার, মো. অলি উল্লাহ, রাফিও হাসান, নজরুল হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। এছাড়া মোনতাসীর বিল্লাহ পাটোয়ারী বিজয় ২৪ হল এবং বাকি দুইজন তিশা মনি হৃদ, সাদিয়া সরকার মেসে থাকেন বলে জানা গেছে।
র্যাগিংয়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে অভিযুক্ত মো. অলি উল্লাহ বলেন, "আমি র্যাগিংয়ের সঙ্গে জড়িত না। আমি শুধু ওদেরকে দক্ষিণ মোড়ে চা খাওয়ানোর জন্য ডেকেছিলাম।" তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অলি উল্লাহ এবং তার বন্ধু রাফিও হাসান নবীন শিক্ষার্থীদের দিয়ে সিনিয়রদের আপুকে কল দিয়ে প্রপোজ করতে বলেন এবং নজরুল হলের ১০৯ নম্বর রুমে ডেকে নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। 'তালতলা' নামক স্থানে র্যাগ দেওয়ার সময়ও অলি উল্লাহ ও অরবিন্দু সরকার উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অরবিন্দু সরকার বলেন, "ওদের সাথে গেইটে দেখা হলে আমরা শুধু চা খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমরা কাউকে র্যাগ দিইনি, এমন কিছু ঘটেনি।" তবে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, "সিআর এর মাধ্যমে আমাকে ডেকে নিয়ে র্যাগ দেওয়া হয় এবং অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা হয়।"
রাফিও হাসান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমি অভিযুক্তকে সাথে নিয়ে আপনার সাথে দেখা করতে চাই। আমার সাথে দুইজন জুনিয়র হলে গেছে তবে র্যাগিংয়ের অভিযোগটা মিথ্যা।" তবে প্রতিবেদকের হাতে থাকা ১৩ মিনিটের একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।
তিশা মনি হৃদ বলেন, "এই ধরনের কিছু করা হয়নি। সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। কেউ একজন আপনাকে কিছু বলেছে, আর আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন। আমি কিছু করিনি।"
এছাড়াও অরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামের পর একই ব্যাচের আরও দুইজন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে জুনিয়রদের সাথে উচ্চবাচ্য করার অভিযোগ রয়েছে। তারা হলেন, সাদিয়া সরকার ও মোন্তাসির বিল্লাহ।
এবিষয়ে সাদিয়া সরকার বলেন, "আমরা শুধু আড্ডা দিচ্ছিলাম। এরকম কিছুই হয়নি। ওরিয়েন্টেশনের দিন শুধু একটু জোরে কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু সেটা র্যাগিং নয়।"
মোন্তাসির বিল্লাহ পাটোয়ারী র্যাগিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমরা কাউকে র্যাগ দেইনি। তবে, ওরিয়েন্টেশনের দিন আমার এক নারী বন্ধু হয়তো জুনিয়রদের কিছু বলেছিলেন, যার ফলে এক মেয়ে কেঁদে ফেলেছিল। তবে সে ঠিক কী বলেছিল, তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।"
এ বিষয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট সহযোগী অধ্যাপক শামীমা নাসরিন বলেন, "প্রশাসন র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, আমরা সে পথেই এগোব। আমাদের প্রতিষ্ঠানে র্যাগিং প্রতিরোধে প্রশাসনিক যে নীতিমালা ও ব্যবস্থা রয়েছে, তার মাধ্যমেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল হাকিম বলেন, "আমি বিষয়টি এইমাত্র জানলাম। আমি বিভাগীয় প্রধানের সাথে কথা বলবো এবং পরবর্তী একাডেমিক মিটিংয়ে বিষয়টি উত্থাপন করবো।"
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


মন্তব্য