শিরোনাম
জামায়াতের সঙ্গে জোটের সুযোগ নেই, এনসিপির জন্য দরজা খোলা : সালাহউদ্দিন
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচনি জোট গঠনের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তবে নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে আলোচনার দরজা খোলা রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
ইউএনবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচন ঘিরে যে দাবিদাওয়া তুলছে, তা তাদের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনাকে দ্রুত শেষ করার তাগিদ দিয়ে বিএনপির এ স্থায়ী কমিটির সদস্য সতর্ক করেছেন, অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
সালাহউদ্দিন বলেন, ‘জামায়াত ইসলামীকে নিয়ে নির্বাচনি জোটের কোনো সম্ভাবনা আমি দেখছি না। অতীতে কৌশলগত কারণে আমরা জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছি, কিন্তু এবার তাদের সঙ্গে জোট গঠনের প্রয়োজন অনুভব করছি না।’ তিনি জানান, বিএনপি এখন মূলত সেই দলগুলোর সঙ্গে জোট ও জাতীয় সরকার গঠনে মনোযোগী, যারা একযোগে আন্দোলনে এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশ নিয়েছে। তার কথায়, ‘এখন এর বাইরে কিছু ভাবা হচ্ছে না।’
এনসিপির সঙ্গে সম্ভাব্য জোট গঠন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত রাজনৈতিক জোট নিয়ে আলোচনা চলবে। কী হয় তা সময়ই বলে দেবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সব গণতান্ত্রিক দলই নির্বাচনের আগে নানা কৌশল গ্রহণ করবে। বিএনপি শেষ পর্যন্ত কী কৌশল অবলম্বন করে, কার সঙ্গে জোট করে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনার প্রতি অসন্তোষ জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমার মনে হয়, এই আলোচনা অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘায়িত হচ্ছে। যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যেই আলোচনা শেষ হওয়া উচিত ছিল। ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক পরিচালনায় কিছু ঘাটতি রয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে সময়সাপেক্ষ করে তুলছে। আশা করি, এই আলোচনা আর বেশি দিন চলবে না। এখন একটা সারসংক্ষেপ ও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দরকার।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যত পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন কেবল সুপ্রিম কোর্টের রিভিউ রায়ের অপেক্ষা। আমরা আশা করি, আপিল বিভাগ রিভিউ আবেদনে ইতিবাচক রায় দেবে।
বাংলাদেশের জনগণ নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন চায় জানিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘এই কাঠামোর রূপ কিংবা সাবেক প্রধান বিচারপতিকেই প্রধান উপদেষ্টা রাখার বিষয়টি নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। এই বিষয়ে বিকল্প নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। বিএনপিসহ অন্যান্য দল ও সংস্কার কমিশন তাদের প্রস্তাব দেবে। যদি আরও ভালো কোনো বিকল্পে একমত না হওয়া যায়, তবে বর্তমান কাঠামোই বহাল থাকবে।’
আসন্ন নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এই রাজনীতিক বলেন, বাংলাদেশে এই ব্যবস্থার জন্য উপযোগী রাজনৈতিক, সামাজিক ও নির্বাচন সংস্কৃতি নেই। বিষয়টির তিনি ব্যাখ্যা করেন এভাবে, ‘পিআর ব্যবস্থায় ভোটাররা সরাসরি তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, ভোটদানে নিরুৎসাহিত হন। সংসদে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’
‘আমাদের ভোটাররা তাদের পরিচিত ও স্থানীয় প্রার্থীকে ভোট দিতে পছন্দ করেন। কিন্তু পিআর ব্যবস্থায় এমনও হতে পারে যে, একটি এলাকায় কোনো দল বেশি ভোট পেলেও অন্য এলাকার কাউকে নির্বাচিত করা হয়। এটি জনগণের রায়কে প্রতিফলিত করে না, বরং গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দেয়,’ যোগ করেন সালাহউদ্দিন আহমেদ।
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘যেসব দেশে পিআর ব্যবস্থা কার্যকর, সেখানে স্থানীয় সরকারগুলোও শক্তিশালী। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। এখানে সংসদ সদস্যরা সরাসরি উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত থাকেন। তাই এখানে পিআর কার্যকর হবে না।’
সালাহউদ্দিন আহমেদের মতে, বাংলাদেশে এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো দরকার, যেখানে জনগণ সরাসরি প্রার্থীকে ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে। বাংলাদেশ পিআর ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত নয়। এটি কখনো এখানে প্রয়োগ হয়নি, জনগণও এই পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত নয়।
এই নির্বাচন পদ্ধতির আরেকটি সমস্যা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘পিআর ব্যবস্থায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনের সুযোগ হারাবেন। কেউ যদি খুব জনপ্রিয়ও হন, কিন্তু কোনো দলে না থাকেন, তাহলে তিনি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন না। এটি অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক।’ তার মতে, ছোট দলগুলো পিআর চায়, কারণ এতে তারা কম ভোট পেয়েও বেশি আসন পেতে পারে। কিন্তু এর ফলে দুর্বল জোট সরকার গঠিত হয় ও দেশে শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে ওঠে না।’
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করা এই নেতা বলেন, ‘পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন কোনো অবস্থাতেই বিএনপি মেনে নেবে না।’
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কিছু দল বিভিন্ন দাবি করছে। কেউ সংস্কার চায়, কেউ বলছে বিচার ছাড়া নির্বাচন নয়, কেউ পিআর চায়। এসব বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে। তবে আমরা আত্মবিশ্বাসী, সংবিধান অনুযায়ী আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নির্বাচন হবে। কথা বলার অধিকার সবাই রাখে, তবে সেসব বক্তব্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও হতে পারে।’
সালাহউদ্দিন আরও বলেন, ‘আমরা নতুন রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্মান করি ও তাদের জন্য শুভ কামনা রাখি। কিন্তু প্রকৃত রাজনৈতিক ওজন আসে জনসমর্থন থেকে। ছোট ছোট কিছু দল বড় বড় কথা বললেও তারা খুব অল্পসংখ্যক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। রাজনীতিতে জনমতের মূল্য সবচেয়ে বেশি।’
বিএনপির জোটসঙ্গী দলগুলোর মধ্যেও মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এটি আসলে দর কষাকষির কৌশলেরই অংশ হতে পারে, যেমন ধরুন আসন ভাগাভাগি।’
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমার মতে, আওয়ামী লীগ আর কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তারা বহু আগেই তাদের আদর্শ ও চরিত্র হারিয়েছে। তারা এখন একটি অগণতান্ত্রিক, ফ্যাসিবাদী শক্তিতে, এক ধরনের মাফিয়া সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ১৯৭৫ সালের আগ থেকে আজ পর্যন্ত তাদের ইতিহাসে কখনো গণতন্ত্র চর্চা হয়নি। গণতন্ত্র তাদের রক্তে নেই।’
‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ সাংবিধানিক নয়, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পক্ষে বিএনপি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রতি পূর্ণ সহযোগিতা করছে বিএনপি। দলটি সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত খসড়ার প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে নিজস্ব সুপারিশপত্র তৈরি করেছে, যা ইতোমধ্যে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
বুধবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল বৈঠকে এই খসড়া চূড়ান্ত করা হয়, যেখানে লন্ডন থেকে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে আমরা খাটো করে দেখতে চাই না। বরং এর যথাযথ মূল্যায়ন করেই সুপারিশপত্র সরকারের কাছে জমা দিয়েছি।”
বিএনপি ঘোষণাপত্রকে সাংবিধানিক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে। একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধকে বাংলাদেশের মূল ভিত্তি ও প্রধান অর্জন হিসেবে ঘোষণাপত্রে শুরুতে তুলে ধরার সুপারিশ করেছে দলটি।
বিএনপির সংশোধিত খসড়ায় বলা হয়েছে, ঘোষণাপত্রটি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে তা সংরক্ষণের উপযোগী হবে। দলটির নেতারা মনে করেন, সংবিধানে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান অন্তর্ভুক্ত করলে ভবিষ্যতে বিতর্ক ও জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই এটি সংবিধানে নয়, রাজনৈতিক দলিল হিসেবে রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে সংরক্ষণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বিএনপি।
স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য জানান, খসড়ার প্রথম অংশে পাকিস্তান আন্দোলন ও ১৯৪৭ সালের ‘স্বাধীনতা অর্জন’ সম্পর্কিত বক্তব্য অপ্রয়োজনীয় মনে করে বাদ দিয়েছে বিএনপি। দলটির মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা একমাত্র ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই অর্জিত।
ঘোষণাপত্রে ‘বিভিন্ন শাসনামলে গণতান্ত্রিক ব্যর্থতা’র পরিবর্তে বিএনপি ‘আওয়ামী শাসনামলে’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করেছে। একইভাবে এক-এগারো পরিস্থিতি ব্যাখ্যায় ‘ক্ষমতার সুষ্ঠু রদবদলের রাজনৈতিক ব্যর্থতা’র পরিবর্তে ‘দেশি-বিদেশি চক্রান্তের সুযোগে’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছে।
তারা ১৯৭২ সালের সংবিধানকে বাতিল বা পুনর্লিখনের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে ‘উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় সংশোধনের’ কথা বলেছে। পাশাপাশি, খসড়া থেকে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ শব্দটিও বাদ দেওয়া হয়েছে, যা আগের সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সরকারি ও রাজনৈতিক সূত্র মতে, জুলাই ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করার কাজ শেষ করার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে। এই কাজের দায়িত্বে রয়েছেন সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
শাকিল/রাইজিং ক্যাম্পাস
মুক্তিযুদ্ধকে সবার ওপরে রেখে ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ চায় বিএনপি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করে ঘোষণা করার ব্যাপারে সরকারকে সব ধরণের সহযোগিতা করছে বিএনপি। তাই সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এসংক্রান্ত নতুন খসড়াটি প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন করে এক উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএনপি।
তবে জুলাই ঘোষণাপত্র সাংবিধানিক নয়, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পক্ষে মত দিয়েছে দলটি। একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধকেই প্রধান অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে ঘোষণাপত্র শুরু হওয়া উচিত বলেও বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া চূড়ান্ত খসড়ায় বলা হয়েছে। বুধবার স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব মত দিয়ে শীর্ষ নেতারা বলেছেন, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র প্রণীত হওয়ার পর রাষ্ট্র যথাযথ প্রসিডিউর অনুযায়ী এটিকে আর্কাইভ (সংরক্ষণ) করবে।
জানা গেছে, বুধবারের বৈঠকে বিএনপি নেতারা বলেছেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান সংবিধানে স্থান দেওয়া হলে তাতে ভবিষ্যতে জটিলতা বাড়তে পারে। কেউ কেউ আবার স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানকেও সংবিধানে রাখার দাবি তুলতে পারে। এজন্য তারা রাজনৈতিক দলিল হিসাবে রাষ্ট্রের আর্কাইভে ২০২৪ সালের ঘোষণাপত্র সংরক্ষণের পক্ষে মত দিয়েছেন।
স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য যুগান্তরকে বলেন, খসড়ার প্রথম পয়েন্টে উল্লেখিত ‘বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের এ ভূখণ্ডের মানুষ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুগের পর যুগ সংগ্রাম করেছিল এবং এর ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ১৯৪৭ সাল থেকে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল’ এই অংশ অপ্রয়োজনীয় বিবেচনা করে তা বিএনপি বাদ দিয়েছে। দলটির নেতারা বলেছেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে গৌরবময় বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সেই স্বাধীনতাযুদ্ধকেই প্রধান অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে ঘোষণাপত্র শুরু হওয়া উচিত। খসড়া ঘোষণাপত্রের একটি পয়েন্টে আছে- ‘যেহেতু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শাসনামলের রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিনির্মাণের ব্যর্থতা ও অপর্যাপ্ত ছিল এবং এ কারণে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও শাসকগোষ্ঠীর জবাদিহি প্রতিষ্ঠা করা যায়নি’। বিএনপি এক্ষেত্রে ‘বিভিন্ন শাসনামলের জায়গায়’ ‘আওয়ামী শাসনামলের’ কথা উল্লেখ করেছে।
খসড়ায় এক-এগারোসংশ্লিষ্ট একটি পয়েন্টে উল্লেখিত ‘ক্ষমতার সুষ্ঠু রদবদলের রাজনৈতিক ব্যর্থতার সুযোগে’ কথাগুলো পরিবর্তন করে ‘দেশি-বিদেশি চক্রান্তের সুযোগে’ লেখার সুপারিশ করেছে বিএনপি। এ ছাড়া দলটি ১৯৭২ সালের ‘সংবিধান পুনর্লিখন বা প্রয়োজনে বাতিল করার অভিপ্রায়’ বাদ দিয়ে ‘সংবিধানের বিদ্যমান সংস্কার উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় সংশোধন’ করার পক্ষে মত দিয়েছে। জানা গেছে, ঘোষণাপত্রের খসড়া থেকে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রসঙ্গটি বাদ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত জানুয়ারি মাসে প্রস্তুত করা ঘোষণাপত্রের খসড়ার শেষ অংশে ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ কথাটি উল্লেখ ছিল। এর বাইরেও খসড়ায় আরও কিছু শব্দগত সংযোজন-বিয়োজন করেছে বিএনপি।
সরকার ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহের মধ্যেই জুলাই ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করতে চায় অন্তর্র্বর্তী সরকার। আর এটি চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে।
অচল রাকসু নয়, দরকার সক্রিয় প্রতিনিধি পরিষদ’—নেতাদের কণ্ঠে প্রত্যাশা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে অধ্যাপক ড.সালেহ্ হাসান নকীব গত সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, পাঁচ মাসের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) নির্বাচন আয়োজন করবেন। সেই ঘোষনার সময়সীমার নয়মাস পার হয়ে গেলেও দেখা যায়নি কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ। সর্বশেষ, ৩০ জুন রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার কথা থাকলেই তা বাস্তবায়িত হয়নি।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাকসু নির্বাচন নিয়ে গরম হাওয়া বইছে ক্যাম্পাসে। রাকসুর রোডম্যাপ, রাকসুর নির্বাচন কমিশন, তফসিল, নির্বাচনের তারিখ সর্বোপরি রাকসু নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ, অবস্থান কর্মসূচিতে সরগরম রয়েছে ক্যাম্পাস।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাকসুর টাইমলাইন ঘোষণা করলে সে অনুযায়ী শুরু হয় রাকসু চেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর নানা কর্মসূচি। সেই থেকে হলে খাবারের ফাঁকে কিংবা টুকিটাকির চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠা আলাপে একটাই প্রশ্ন, ‘রাকসু কবে’? অবশেষে ১৬ এপ্রিল রাকসুর গঠনতন্ত্র অনুমোদন ও ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক মো. আমজাদ হোসেনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে জানানো হয়, জুন মাসের ৩য় বা ৪র্থ সপ্তাহে রাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠন, রাকসু নির্বাচনের জন্য গঠিত নির্বাচন কমিশন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক সংগঠনের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা করেছে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো বাকি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা ও ভোটার তালিকা প্রণয়নসহ ইত্যাদি কার্যক্রম করতে দেখা যায়নি।
পেছনে ফেলে আসা রাকসুর অচলাবস্থার ইতিহাস
সর্বশেষ রাকসু নির্বাচন হয়েছিলো ১৯৮৯ সালে। এর পর ৩৬ বছর ধরে রাকসু নির্বাচন হয়নি। পরিসংখ্যান বলছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৬ বার রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে পাকিস্তান আমলে হয়েছে ১০ বার আর স্বাধীন বাংলাদেশে মাত্র ৬ বার। অথচ ১৯৭৩ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রতিবছর রাকসু ও হল সংসদের নির্বাচন হওয়ার কথা। প্রথম রাকসু ভিপি নির্বাচিত হন ছাত্র ইউনিয়নের মনিরুজ্জামান মিয়া। সর্বশেষ ভিপি ছিলেন ছাত্রদলের রিজভী আহমেদ।
কেমন রাকসু চান ছাত্রনেতারা ?
কেমন রাকসু চান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা। এমন প্রশ্নে যৌক্তিক কিছু মতামত উঠে এসেছে তাদের বক্তব্যে। চলুন দেখা যাক রাজনৈতিক নেতাদের ভাবনায় রাকসু।
একটা সুস্থ ক্যাম্পাসের জন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন অপরিহার্য বলে মন্তব্য করে রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, একটা সুস্থ ক্যাম্পাসের জন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন অপরিহার্য। কিন্তু বিভিন্ন মহল গত ৩ দশকেরও বেশি সময় ধরে এটি বন্ধ করে রেখেছে। যা কখনোই কাম্য নয়। জুলাই বিপ্লবের পর রাকসু হওয়ার যখন প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তখনো সেই মহলগুলো পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। আমি যেটা দেখলাম রাকসু বিরোধী মহলগুলো ক্যাম্পাসে 'ডরম্যান্ট কন্ডিশনে' স্হায়ীভাবে থেকে যায়। যত ঝড় ঝঞ্ঝা বিপ্লব হোক এদের কেউ তাড়াতে পারে না।রাকসু নিয়ে কথাবার্তা চললেই এরা তা বন্ধ করতে পূর্ণোদ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এই ডরম্যান্ট কন্ডিশনের কীটগুলোর বিপরীতে বিপ্লবী প্রশাসনকে 'অ্যান্টিবায়োটিকের' ভূমিকা পালন জরুরী ছিলো। কিন্তু তাদের ভূমিকা 'গোবেচারা প্যারাসিটামলের' মতো।
দখলদারিত্বমুক্ত ও ভয়ের রাজনীতি থেকে মুক্ত একটি রাকসু চান ছাত্রদলের আহবায়ক সুলতান আহমেদ রাহী। যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না। তিনি বলেন, 'আমি চাই এমন রাকসু যেখানে ছাত্রসমাজ নিজের প্রতিনিধি নিজেই বেছে নিতে পারবে। দখলদারিত্বমুক্ত ও ভয়ের রাজনীতি থেকে মুক্ত একটি রাকসু, যেখানে ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না। ছাত্রদল এমন একটি গণতান্ত্রিক, প্রতিনিধিত্বমূলক ও সক্রিয় রাকসু চায়, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রছাত্রীর অধিকার, মতামত ও প্রয়োজনকে মর্যাদা দিয়ে কাজ করবে'।
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজীব বলেন, ‘রাকসু নিয়ে বর্তমান অবস্থা হলো, রাকসুর তফসিল ঘোষণা করা হয়নি এখনও পর্যন্ত। বিভিন্ন কারণে রাকসুর তফসিল ঘোষণা আটকে আছে। তফসিলের সবকিছুই রেডি কিন্তু কোনো এক কারণে তফসিল ঘোষণা করছে না। তাই নির্বাচন তফসিল দ্রুত ঘোষণা করা দরকার এবং গঠনতন্ত্র নিয়ে যে সংশোধনীগুলো দেওয়া হয়েছে সেগুলা সংশোধন করে পূর্ণাঙ্গ একটা গঠনতন্ত্র বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। রাকসু হলে শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার ফিরে পাবে'।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হলে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক ধারাটি থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন ছাত্র ইউনিয়ন একাংশের সভাপতি রাকিব হোসেন। তিনি বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়কে লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতির বেড়াজাল থেকে মুক্তি এবং শিক্ষার্থীদের যথাযথ অধিকার আদায়ের মাধ্যম রাকসু। দীর্ঘদিন ধরেই রাকসু নির্বাচনের দাবী জানিয়ে আসছি। রাকসু নির্বাচন হলে ছাত্রদের কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো ভালোভাবে উঠে আসবে৷ আগের প্রশাসন গুলো সরকারের ইশারা ইঙ্গিতে চলতো। কিন্তু, আমার মনে হয় বিপ্লবের পরে যে প্রশাসন এসেছে তারা রাকসু নির্বাচন দেওয়ার জন্য বসে আছে'।
শাপলা দলীয় প্রতীক না হলে ধানের শীষও প্রতীক হতে পারবে না: সারজিস
শাপলা যদি রাজনৈতিক দলের প্রতীক না হতে পারে, তাহলে ধানের শীষও প্রতীক হতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। তিনি বলেছেন, জাতীয় ফুল হিসেবে শাপলার প্রতীক হতে আইনগত বাধা নেই। কারণ, জাতীয় ফল কাঁঠাল ইতিমধ্যে মার্কা হিসেবে আছে।
বুধবার মধ্যরাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে সারজিস আলম এসব কথা বলেন। শাপলাকে নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে বিধিমালার তফসিলভুক্ত না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর ফলে কোনো রাজনৈতিক দল তাদের দলীয় প্রতীক হিসেবে শাপলা পাবে না। এনসিপি নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন চেয়ে যে আবেদন করেছে, সেখানে দলীয় প্রতীক হিসেবে শাপলাসহ তিনটি প্রতীকের নাম উল্লেখ করেছিল তারা।
ফেসবুক পোস্টে সারজিস আলম লিখেছেন, ‘শাপলা জাতীয় প্রতীক নয়। জাতীয় প্রতীকের একটি অংশ। একইভাবে ধানের শীষ, পাটপাতা এবং তারকাও জাতীয় প্রতীকের অংশ। শাপলা যদি রাজনৈতিক দলের প্রতীক না হতে পারে, তাহলে ধানের শীষও প্রতীক হতে পারবে না। আর যদি জাতীয় প্রতীকের যেকোনো একটি অংশ রাজনৈতিক দলের প্রতীক হতে পারে, তাহলে শাপলাও হতে পারবে।’
সারজিস আলম আরও লিখেছেন, ‘জাতীয় ফুল হিসেবে শাপলার প্রতীক হতে আইনগত বাধা নেই। কারণ, জাতীয় ফল কাঁঠাল অলরেডি মার্কা হিসেবে আছে। আর যদি মার্কা দেখেই ভয় পান, তাহলে সেটা আগে থেকেই বলেন!’
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


মন্তব্য