শিরোনাম
জুলাই ঘোষণাপত্রে’ চূড়ান্ত মতামত দিয়েছে বিএনপি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র দ্রুত চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে অন্যতম স্টেকহোল্ডার ও দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির কাছে সম্প্রতি পুনরায় এর খসড়া পাঠানো হয়েছে। গত মঙ্গল এবং গতকাল বুধবার রাতে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ খসড়া ঘোষণাপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ করে কিছুটা সংযোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত করেছে দলটি। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে এটির একটি কপি সরকারকে পৌঁছে দেবে বিএনপি। জানা গেছে, এ দায়িত্বে আছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উভয় বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জানা গেছে, বৈঠকে বিএনপি নেতারা বলেছেন, ছাত্রদের মতো বিএনপিও চায় দ্রুত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ চূড়ান্ত করে ঘোষণা করা হোক। এ জন্য তারা আন্তরিকতার সঙ্গে বিষয়টি মূল্যায়ন করছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করতে চেয়েছিল। এ ঘোষণাপত্র নিয়ে তখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা তৈরি হয়। হঠাৎ ঘোষণাপত্রের বিষয়টি কেন সামনে আনা হলো, এর প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইং তখন এ উদ্যোগের সঙ্গে সরকার সম্পৃক্ত নয় বলে উল্লেখ করেছিল। অবশ্য পরে ৩০ ডিসেম্বর রাতে জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি ঘোষণাপত্র তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ওই রাতে বৈঠক করে ৩১ ডিসেম্বর শহীদ মিনারে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ (ঐক্যের জন্য যাত্রা) কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি। ওই কর্মসূচি থেকে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়।
এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই ঘোষণাপত্রের খসড়া রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়। বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো তখন ওই খসড়ার ওপর তাদের মতামত দেয়। পরবর্তী সময়ে ছাত্রদের দেওয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার পরদিন গত ১৬ জানুয়ারি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এ ইস্যুতে সরকারের কার্যক্রম ধীরগতিতে চলতে থাকে। একপর্যায়ে এই দাবিতে গত ৩০ জুন প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন জুলাই আন্দোলনে আহতরা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সম্প্রতি সরকারকে আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় তাদের পক্ষ থেকে ওইদিনই ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘোষণাপত্র’ দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, গণতন্ত্রে উত্তরণের পাশাপাশি জুলাই ঘোষণাপত্রের খসড়ায় বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুগের পর যুগ সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। পাকিস্তান আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জন, এই ভূখণ্ডের মানুষের ওপর দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তান শাসকদের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালে লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কথা তুলে ধরা হয়। এর পরের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ২০২৪ সালে কীভাবে
ছাত্র-জনতার উত্তাল গণবিক্ষোভ গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান, সে প্রসঙ্গও রয়েছে জুলাই ঘোষণাপত্রের খসড়ায়। এ ছাড়া খসড়ায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুটপাটের অপরাধগুলোর উপযুক্ত বিচার করার অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করা হয়েছে। জানা গেছে, আগের ওই খসড়ার সঙ্গে নতুন করে আরও বেশ কিছু ইস্যু যুক্ত করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপ, নারী আসন, নির্বাচনের পিআর পদ্ধতিসহ সংস্কারের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর আগের গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে নতুন করে আরও ৩৫ শতাংশ মার্কিন শুল্ক আরোপের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিএনপি। একই সঙ্গে এই শুল্কনীতি পুনর্বিবেচনার জন্য আমেরিকা সরকারের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
বৈঠকে সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপের রিপোর্ট তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। এর পর সংস্কারের বিভিন্ন ইস্যুতে মতামত দেন বিএনপি নেতারা। ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে এরই মধ্যে সংসদে নারীদের আসন ৫০ থেকে ১০০-তে উন্নীত করার ব্যাপারে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে। তবে তারা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, সে ব্যাপারে এখনো ঐকমত্য হয়নি। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, তারা প্রচলিত পদ্ধতিতে (সংসদে প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে) সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব নির্বাচিত করার পক্ষে অবস্থান নেবেন। পাশাপাশি পিআর পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচনের পক্ষে নন তারা।
স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য বৈঠকে বলেন, ঐকমত্য কমিশনে সংস্কারের অনেক বিষয়ে এরই মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সরকার সেগুলো কেন বাস্তবায়ন করছে না। সরকারের উচিত অবিলম্বে এটা বাস্তবায়ন করা।
বিএসএফ বর্তমানে খুনি বাহিনীতে পরিণত হয়েছে : নাহিদ ইসলাম
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ভারত যদি বাংলাদেশের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তাহলে তা সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে হতে হবে। বাংলাদেশ কেবল ভারতের ওপর নির্ভরশীল নয়, ভারত সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল। এটা যাতে ভারত কোনোভাবেই ভুলে না যায়। বাংলাদেশের মাটি ও মানচিত্র রক্ষা করা বাংলাদেশের ছাত্র ও যুবাদের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব আমরা নিয়েছি। জাতীয় নাগরিক পার্টি সেই লক্ষ্যে কাজ করবে।
বুধবার (৯ জুলাই) দুপুরে ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি উপলক্ষ্যে চুয়াডাঙ্গা শহরের প্রাণকেন্দ্র শহীদ হাসান চত্বরে আয়োজিত পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি কৃষকের নিহত হওয়ার বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, চুয়াডাঙ্গাসহ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় গত ৫৪ বছরে ধরে সীমান্তে মানুষ হত্যা হচ্ছে। নিরপরাধ বাংলাদেশি মানুষদেরকে, কৃষকদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। আমরা এক কৃষকের কথা শুনতে পেলাম, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্তে (ঝাঁঝাডাঙা সীমান্ত) সাতদিন আগে সীমান্তে তাকে হত্যা করা হয়েছিল, সাতদিন পর তার লাশ ফেরত দিয়েছে। বিএসএফ কোনো সীমান্তরক্ষী বাহিনী নয়, এটি একটি খুনি বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষকে খুন করা তার একমাত্র দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার সরকার ১৬ বছর ধরে টিকে ছিল গুম-খুন মানুষকে হত্যা করে, এই ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সমর্থনে। আমরা স্পষ্টভাবে বলছি, সীমান্তে হত্যা কোনোভাবেই মেনে নেব না। বাংলাদেশের জনগণকে, বাংলাদেশের সীমান্তকে, বাংলাদেশের মাটি ও মানচিত্রকে রক্ষা করা বাংলাদেশের ছাত্র-তরুণ-যুবকদের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব আমরা নিয়েছি এবং সেই দায়িত্বের ভিত্তিতেই জাতীয় নাগরিক পার্টি কাজ করবে। মানুষকে রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আজকে আমরা চুয়াডাঙ্গা থেকে বলতে চাই- গত ৫৪ বছরে হাজারের ওপর মানুষ বাংলাদেশের সীমান্তে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব মোল্লা মোহাম্মদ ফারুক এহসান বললেন- এই চুয়াডাঙ্গা সীমান্তেই ২০০ এর বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। সীমান্তে গরুচালানকারী বলে, পাচারকারী বলে আবার গরিব কৃষকদেরকেও হত্যা করা হচ্ছে। অথচ গত কোনো সরকার এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে বলব, আপনাদেরকে কঠোর হতে হবে। এমন কোনো সরকারের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকব না, বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশের ছাত্র-তরুণরা অবশ্যই তার সীমান্তকে, মানচিত্রকে, মানুষকে রক্ষা করার পবিত্র দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, গত ৫৪ বছর বাংলাদেশের মানুষকে গোলামির জীবনযাপন করতে হয়েছিল ভারতের আধিপত্যের কাছে। এ দেশের মানুষের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বারবার ক্ষুণ্ন হয়েছে ভারতীয় আধিপত্য দ্বারা। চব্বিশের আন্দোলনে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছিল। সেই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর শেখ হাসিনা নিজেই গুলি চালানোর অর্ডার দিয়েছিলেন। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গণঅভ্যুত্থানে যে মারণাস্ত্র ব্যবহার হয়েছে তা চালানোর অর্ডার দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এ সকল হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী খুনি হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাকে আমার পানির ন্যায্য হিস্যা দেওয়া হয়নি। বরং রাজিনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে বারবার অবদমন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ১৬ বছর ক্ষমতায় টিকেছিল এই ভারতের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সমর্থনে।
তিনি বলেন, চাঁদাবাজ, দুর্নীতি আর দখলদারিত্ব পুরো বাংলাদেশে ছেয়ে গেছে। চুয়াডাঙ্গাবাসীকে আজ আমরা বলতে এসেছি- আপনারা ভয় পাবেন না। আপনাদের সন্তানেরা, ছোট ছোট বাচ্চারা রাজপথে নেমেছিল ফ্যাসিবাদী হাসিনার বিরুদ্ধে, তারা ভয় পাই নাই। বাংলাদেশকে নতুন করে স্বাধীনতা দিয়েছিল, মুক্তি দিয়েছিল আপনাদের সন্তানেরা, আমাদের দেশের নারীরা, আমাদের দেশের আলেম সমাজ, আমাদের দেশের হিন্দু-মুসলমান সবাই একত্রে। নতুন করে কোনো ভয়ের সংস্কৃতি আমরা বাংলাদেশে দেখতে চাই না। এলাকার দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব নিয়ে কথা বলুন। যে প্রতিবাদের জোয়ার বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে, সেই জোয়ার বন্ধ করবেন না।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সার্জিস আলমের পরিচালনায় পথসভায় এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব মোল্লা মো. ফারুক এহসান, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারাসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা বক্তব্য দেন।
শেখ হাসিনার সঙ্গে আ.লীগেরও বিচার হওয়া উচিত: মির্জা ফখরুল
গণহত্যা ও ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যুক্ত থাকায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগেরও বিচার হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বুধবার (০৯ জুলাই) সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। ফখরুলের কাছে প্রশ্ন ছিল, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলন দমাতে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এখন এমন একটি দলের বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী?
এর আগে, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ও জিয়া পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. আব্দুল কদ্দুস এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডা. সিরাজউদ্দিনকে রাজধানীর নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে দেখতে যান মির্জা ফখরুল। তাদের চিকিৎসার সার্বিক খোঁজখবর নেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা সবসময়ই মনে করি, যে সমস্ত রাজনৈতিক দল ফ্যাসিবাদের পক্ষে থাকবে, যারা ফ্যাসিবাদের পক্ষে কাজ করবে, যেটা আওয়ামী লীগ করেছে- তাদের প্রতিটি ব্যক্তির শাস্তি হওয়ার প্রয়োজন। বিশেষ করে দলের প্রধান শেখ হাসিনার। তার বিচার কিন্তু শুরু হয়েছে। আমরা আশা করছি, তার সঙ্গে যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে, গণহত্যার সঙ্গে এবং এই ফ্যাসিবাদের আক্রমণের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকেরই বিচার হবে। সেই হিসেবে আমরা দেখতে চাই, দলকেও (আওয়ামী লীগ) যদি আইনের আওতায় নিয়ে এসে দলগত হিসেবে বিচার করা হয়, তাহলে অবশ্যই তাদের বিচার হওয়া উচিত বলে মনে করি।
তিনি বলেন, খুব ভালো করে জানেন, এই আওয়ামী লীগের নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, গুম খুনের সবচেয়ে বড় ভিক্টিম আমাদের দল বিএনপি। আমি নিজেও ১১২টা মামলার আসামি এবং ১৩ বার জেলে যেতে হয়েছে।
সংস্কারের সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, যারা মনে করেন যে নির্বাচন প্রয়োজন নেই আমার মনে হয় তারা আবার চিন্তা করবেন নির্বাচন প্রয়োজন জনগণের জন্য। একটা নির্বাচিত সরকার দরকার। যে নির্বাচনে জনগণের সম্পর্ক থাকবে। সে কারণেই আমরা বলেছি যে সংস্কারগুলো হচ্ছে প্রত্যেকটি সংস্কারের দাবি আমরাই তুলেছি সবার আগে। সংস্কার এবং নির্বাচন এর মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। দুটো একসাথেই চলতে পারে।
তিনি বলেন, দেশটাকে সকলে মিলে বাঁচাতে হবে এবং প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব হচ্ছে দেশকে সঠিক ট্র্যাকে উঠানো। যত দ্রুত সেটা উঠানো যাবে ততই মঙ্গল।
এরপরে তিনি রাজধানীর আয়শা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বরেণ্য লালল সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভিনকে দেখতে যান। এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে তাকে আর্থিক সহযোগিতা করেন।
পরে উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, এই উপমহাদেশের অন্যতম সঙ্গীতশিল্পী। বিশেষ করে তিনি লালন সঙ্গীতে অদ্বিতীয়। গোটা বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। দীর্ঘকাল ধরে সঙ্গীত জগতে একচত্র প্রভাব অক্ষত রেখেছেন। তিনি অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি কিডনির সমস্যায় আছেন। আমার সরকারের আছে আহবান এইরকম গুণী শিল্পী তার চিকিৎসার জন্য বোর্ড করা প্রয়োজন। তার সর্বোচ্চ চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা যেন ব্যক্তিগতভাবে উদ্যেগ নিয়ে যেন তার সর্বোচ্চ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
এ সময় মির্জা ফখরুলের সাথে ছিলেন বিএনপির সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন উজ্জ্বল, সহসাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক সাঈদ সোহরাব, জাসাস সভাপতি হেলাল খান ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন রোকন।
কার নেতৃত্বে আ.লীগের পুনর্বাসন হতে যাচ্ছে, জানালেন রাশেদ খান
ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন হতে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন।
মঙ্গলবার (৮ জুলাই) নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া এক পোস্টে এমন মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টে রাশেদ খান লিখেছেন, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন হতে যাচ্ছে। ইতোপূর্বে সাবের-মান্নানদের কাঁধে সওয়ার হয়ে আওয়ামী লীগকে ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই প্রজেক্ট ভণ্ডুল হওয়ায় এখন পাটোয়ারী শেষ ভরসা।
রাশেদ লেখেন, আপা এখন জাতীয় পার্টিতে ভর করেছে। জাতীয় পার্টিতে যে অন্তঃকোন্দল দেখতে পাচ্ছেন, এটা স্রেফ মেকি। ভারতের নতুন ছক অনুযায়ী জাতীয় পার্টি সংস্কারের নামে একটা ধোঁকাবাজি চলছে।
অন্তর্বর্তী সরকারও জাপাকে সুযোগ দিচ্ছে অভিযোগ করে তিনি লেখেন, উপদেষ্টাদের মধ্যে যেহেতু আপা ও জাপা ভক্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে আপা সরাসরি ফিরে আসতে না পারলেও জাপার ঘাড়ে চড়ে আপাকে ফেরানোর বিষয়ে তারা ইতিবাচক। আর তারই অংশ হিসেবে ভারত ও আপার নতুন খেলোয়াড় শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে মাঠে নামিয়েছে। যেখানে এসব পাটোয়ারীকে জেলে থাকার কথা। সেখানে তারা হতে যাচ্ছে আপা রক্ষার মূল খেলোয়াড়।
অন্তর্বর্তী সরকারের নখদর্পণে সবকিছু আছে দাবি করেছেন রাশেদ খান। তিনি বলেন, কিন্তু তারা ভারতের ভয়ে কাবু হয়ে জাপা দিয়ে আপা ফিরে আসার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে না। ইতোপূর্বে সাবের-মান্নানদের কাঁধে সওয়ার হয়ে আওয়ামী লীগকে ফেরানোর চেষ্টা করেছিল। সেই প্রজেক্ট ভণ্ডুল হওয়ায়, এখন পাটোয়ারী শেষ ভরসা।
উল্লেখ্য, মজিবুল হক চুন্নুকে বাদ দিয়ে জাতীয় পার্টির (জাপা) মহাসচিব করা হয়েছে ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীকে। সোমবার (৭ জুলাই) পার্টির চেয়ারম্যানের প্রেস সেক্রেটারি খন্দকার দেলোয়ার জালালী বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
সূত্র: আরটিভি
ক্রসফায়ার থেকে ফিরে আসা জামায়াত নেতা এখন এমপি প্রার্থী
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ক্রসফায়ারের মুখ থেকে ফিরে আসা জামায়াত নেতা অধ্যাপক মাওলানা আলী আছগর এখন দলের এমপি প্রার্থী। তিনি আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পাবনা-৩ (ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুর) আসন থেকে নির্বাচন করবেন। দলীয় মনোনয়ন লাভের পর থেকেই তিনি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে এলাকায় ব্যাপক সংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এলাকায় সজ্জন হিসেবে পরিচিত
মাওলানা আলী আছগর পাবনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী তরবিয়ত সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার বাড়ি উপজেলার কলকতি গ্রামে। তিনি স্থানীয় শরৎনগর ফাজিল মাদ্রাসায় আরবি বিষয়ের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
১৯৮৫ সালে দলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। এরপর নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার নগর ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি হন। ১৯৯৯ সালে জামায়াতের রুকন হন। পরে ২০০০ সালে তিনি ভাঙ্গুড়া উপজেলা জামায়াতের আমির নির্বাচিত হন।
জানা গেছে, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাকে বহু জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তাকে মিথ্যা ও গায়েবি মামলায় সাতবার কারাবরণ করতে হয়েছে। এসময় তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় ৯টি মামলা। এসব মামলায় তিনি প্রায় দুই বছর জেলজীবন কাটান তিনি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে বিশেষ আইনে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। তিন মাস কারাভোগের পর জামিন নিয়ে বের হতেই ডিবি পুলিশ পরিচয়ে জেলগেট থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় পাবনা শহরের আয়নাঘরে সাতদিন তাকে বন্দি করে রাখা হয়। পরে পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে ক্রসফায়ারে হত্যার উদ্দেশে নেয়া হয় পাবনার পদ্মার চরে।
জামায়াত নেতা অধ্যাপক মাওলানা আলী আছগর আমার দেশকে জানান, অন্ধকার আয়নাঘরে তাকে সাত দিন আটকে রাখা হয়। এসময় তার দু'হাত পেছন দিক থেকে বাঁধা ছিল। সবসময় পায়ে পরিয়ে রাখা হতো ডান্ডাবেরি। অজু, গোসল কিছুই করতে দেওয়া হয়নি তাকে। নামাজের সময় তিনি তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করতেন। মাঝে মধ্যে সামান্য খাবার খেতে দেওয়া হতো। কিন্তু তা ছিল খাবারের অনুপযোগী ।
তিনি জানান, আয়নাঘরের শেষ দিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ তাকে সাদা একটি মাইক্রোবাসে তোলেন। সবার হাতেই ছিল কাটা বন্দুক। এরপর ক্রসফায়ারের উদ্দেশ্যে তাকে নেয়া হয় পাবনার পদ্মার চরে। সেখানে চলে তাকে ক্রসফায়ারে হত্যার প্রস্তুতি।
তিনি যখন বুঝতে পারলেন আজকের রাতটাই তার জীবনের শেষ দিন, তাই বিচলিত না হয়ে বারবার স্মরণ করতে থাকেন মহান আল্লাহকে। এ অবস্থায় নিজেকে প্রস্তুত করলেন শাহাদাতের মৃত্যুর জন্য, আর মুখে জপতে থাকেন দোয়া-দরুদ।
অন্যদিকে সামান্য দূরে পুলিশ সদস্যরা দীর্ঘক্ষণ কারো সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। কথা শেষ করে ক্রসফায়ার না দিয়েই তাকে ফিরে নিয়ে যায় সেই আয়নাঘরে। এর পরদিন তাকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে পাঠানো হয় পাবনা কারাগারে।
উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মহির উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, আলী আছগর একজন মজলুম আলেম। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় তিনি অনেক জুলুমের শিকার হয়েছেন। বহুবার জেল খেটেছেন। শুধু দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করার কারণে একজন নিরপরাধ আলেমকে ক্রসফায়ারে হত্যা চেষ্টা একটি জঘন্য অপরাধ। জড়িতদের বিচার হওয়া উচিত।
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


মন্তব্য