শিরোনাম
‘একা’ হয়ে যাচ্ছেন জিএম কাদের, রওশনসহ বাকিদের নেতৃত্বে আসছে নতুন জাপা
সপ্তমবারের মতো ভাঙনের মুখে প্রয়াত স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টি (জাপা)। দলের গঠনতন্ত্রের ‘বিতর্কিত’ ২০(ক) ধারাকে কেন্দ্র করে ফের ভাঙতে যাচ্ছে জাপা। একইসঙ্গে দলের বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদেরকে শীর্ষপদ থেকে সরাতে জোট বেঁধেছে বর্তমান কমিটির শীর্ষ নেতাদের একাংশ। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন দল থেকে ২০(ক) ধারার ক্ষমতাবলে ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বহিষ্কার হওয়া নেতারা। তবে জিএম কাদেরপন্থি নেতাদের অভিযোগ, আবারও ভাঙনের পেছনে অতীতের মতো সরকার পক্ষের ইন্ধন রয়েছে।
জাতীয় পার্টির নেতারা বলছেন, দলের গঠনতন্ত্রের ২০(ক) ধারা অনুযায়ী জাপা চেয়ারম্যান কারণ দর্শানো ছাড়াই দলের যে কাউকে পদ থেকে সরাতে পারেন, বহিষ্কার করতে পারেন। যে কাউকে যেকোনো পদ দিতে পারেন। এজন্য তাকে জবাবদিহিতা করতে হয় না। যে কারণে দলের বর্তমান কমিটির সিনিয়র নেতাদের বড় একটি অংশ বর্তমান চেয়ারম্যানকে এই ধারা সংশোধন করার অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি তা পরিবর্তন করতে আগ্রহী নন। তাই এই অংশটি যেকোনো সময় পদ হারানোর ভয়ে এখন জিএম কাদেরকে একঘরে করে ২৮ জুন সম্মেলন করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন জাতীয় পার্টি থেকে বিভিন্ন সময় পদ হারানো নেতারা।
গত ২০ মে জাপার প্রেসিডিয়াম সভায় সিদ্ধান্ত হয় ২৮ জুন দলের সম্মেলন হবে। এজন্য জাপা চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র ভাড়া করে। কিন্তু গত ১৬ জুন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জিএম কাদের বলেন, চীন মৈত্রী কর্তৃপক্ষ হল বরাদ্দ বাতিল করায় ২৮ তারিখের সম্মেলন হচ্ছে না। হল পাওয়া গেলে সম্মেলনের পরবর্তী তারিখ জানিয়ে দেওয়া হবে।
তার এই বিবৃতির পর পাল্টা বিবৃতি দিয়ে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এবং রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, সম্মেলন স্থগিতের সিদ্ধান্ত অগণতান্ত্রিক ও অনভিপ্রেত। সম্মেলনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান, মহাসচিবসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, প্রেসিডিয়াম সভায় সর্বসম্মতিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল কোনো কারণবশত সম্মেলনের জন্য মাঠ বা হল পাওয়া না গেলে রাজধানীর কাকরাইলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সম্মেলন হবে। এ সিদ্ধান্ত এখনো বহাল আছে। এ সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে দলের চেয়ারম্যান ২৮ জুন দলীয় কার্যালয়ের সামনেই সম্মেলনের আয়োজন নিশ্চিত করবেন বলে আশা করি।
জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আগামী ২৮ জুন কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দলের কাউন্সিল হবে।
দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের তো ২৮ তারিখের সম্মেলন স্থগিত করেছেন– এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উনি একক সিদ্ধান্তে এটা স্থগিত করতে পারেন না। কারণ প্রেসিডিয়ামের সভায় এই তারিখ ঠিক হয়েছিল। উনাকে স্থগিত করতে হলে প্রেসিডিয়ামের মিটিংয়ে করতে হবে। সুতরাং ওইদিন দলের কাউন্সিল হবে।
তাহলে কী জাতীয় পার্টি আবার ভাঙতে যাচ্ছে– এমন প্রশ্নের জবাবে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, আমরা তো আগের মতো দল ভেঙে বেরিয়ে এসে কাউন্সিল করছি না। চেয়ারম্যানের ঘোষণা দেওয়া তারিখে দলের কাউন্সিল হচ্ছে। সেই কাউন্সিলে দলের কাউন্সিলর-ডেলিগেটরা ভোট দিয়ে পরবর্তী চেয়ারম্যান ঠিক করবেন। কাউন্সিলে উপস্থিত নেতাদের মধ্য থেকে দলের পরবর্তী চেয়ারম্যান-মহাসচিবের জন্য প্রার্থী হবেন।
জিএম কাদেরকে বাদ দিয়েই কি জাতীয় পার্টি হচ্ছে– জানতে চাইলে এ নেতা বলেন, তিনি সম্মেলনে না এলে তো দলের চেয়ারম্যান পদ থেকে বাদ পড়বেন। কারণ উপস্থিত না থাকলে প্রার্থী হতে পারবেন না। তবে দল থেকে বাদ পড়ছেন না।
জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান বলেন, আমরা আসলে জিএম কাদেরকে বলেছিলাম ২০(ক) ধারা পরিবর্তন করার জন্য। কিন্তু উনি এটা করবেন না। সেজন্য আমরা বলেছি তাহলে এটা নিয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে। সেখানে আমরা চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পদে আমাদের প্রার্থিতা দেব।
কারা চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পদে প্রার্থী হবেন সেটা কাউন্সিলের আগে ঠিক করা হবে বলেও জানান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। যেহেতু আমি দলে আছি নিশ্চয়ই একটা পদে প্রার্থী হব– উল্লেখ করেন তিনি।
সরকারের ইন্ধনের সন্দেহ কেন জিএম কাদেরপন্থিদের
এবার জাতীয় পার্টি ভাঙনের পেছনে সরকারের ইন্ধন রয়েছে বলে মনে করছেন জিএম কাদেরের অনুসারীরা। তারা বলেন, জাতীয় পার্টির সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। তিন বছর পরপর সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। সেই হিসেবে বর্তমান কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ। নির্বাচন কমিশন আমাদেরকে নতুন করে কাউন্সিল করে কমিটি হালনাগাদ করার জন্য তাগিদ দিচ্ছে। অথচ বিগত ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে বিএনপির কাউন্সিল হয় না, তাদেরকে তো কোনো চাপ দিচ্ছে না ইসি। এ কারণেই সরকারের প্রতি আমাদের সন্দেহ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জিএম কাদেরপন্থি জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য বলেন, পার্টির কাউন্সিল করার তো একটা বাধ্যবাধকতা আছে। আমরাও দ্রুত কাউন্সিল করতে চাইছি। কিন্তু হল রুম পাচ্ছি না। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় আমাদের মিটিংয়ে হামলা হওয়ার কারণে কেউ জায়গা দিতেও চাইছে না। অথচ নির্বাচন কমিশন মৌখিকভাবে আমাদেরকে কাউন্সিল করার জন্য চাপ দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি ১৭ বছর কোনো কাউন্সিল করেনি কিন্তু তাদেরকে কিছু বলছে না। এ কারণে সরকারের ওপর আমাদের সন্দেহ।
এই নেতা আরও বলেন, অতীতেও দেখা গেছে জাতীয় পার্টি যতবারই ভেঙেছে, তৎকালীন সরকারের ইশারাতে হয়েছে। তবে, এটাও মনে রাখতে হবে যতবার পার্টি ভেঙেছে সেটা এক কিংবা দুইজন এমপির দল হয়েছে। বড় কোনো পার্টি হতে পারেনি।

সরকারের ইন্ধন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, এটা কোনোক্রমেই সত্য নয়। উনাকে (জিএম কাদের) বলেছি, আমরা আপনার সঙ্গে আছি। ২০(ক) ধারাটা পরিবর্তন করুন। আপনি তো মানুষকে ভয় দেখিয়ে কিছু করতে পারবেন না। ২০(ক) হচ্ছে এমন– তিনি আমাকেও বহিষ্কার করতে পারবেন। যদিও এখন সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার কারণে পারবেন না। আমি ৪৫ বছর এই পার্টি করছি। একটা দলে তো এরকম অগণতান্ত্রিক ধারা থাকতে পারে না।
জাতীয় পার্টির এই ২০(ক) ধারা দীর্ঘসময় ধরে আছে, তাহলে এতদিন কেন এটা পরিবর্তন করতে বলেননি– জানতে চাইলে তিনি বলেন, দীর্ঘসময় ধরে আছে বলে কি এখনো থাকতে হবে। আজ দেশের সংবিধান পরিবর্তন হচ্ছে। তাহলে আগে ছিল দেখে এখন রাখতে হবে, এটা কি যুক্তি হতে পারে?
অন্যদিকে কাউন্সিল স্থগিত করতে হলে দলের চেয়ারম্যানকে প্রেসিডিয়ামের মিটিং ডেকে অনুমতি নিতে হবে এমনটি জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রের কোথাও নেই উল্লেখ করে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, এখানে যেটা ব্যাখ্যা আসতে পারে যে, নতুন করে আবার কোনো তারিখ ঘোষণা করতে হলে আবার প্রেসিডিয়ামের মিটিং ডাকতে হবে। এটা হতে পারে। আবার এখানে বাস্তবতা হচ্ছে কোনো হলরুম পাওয়া যাচ্ছিল না। রাস্তায় তো একটা দলের কাউন্সিল হতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, উনাদের যে ২০(ক) ধারা নিয়ে আপত্তি সেটার তো সমাধান আছে। আমাদের গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটি এখানে কোনো সংশোধন আনার প্রয়োজন মনে করলে বিষয়টি তুলে ধরবে। তারপর পার্টিতে আলোচনার মাধ্যমে একটা সমাধান করা যাবে। তবে আমি মনে করি এরকম মুখোমুখি কাউন্সিল করে কোনো সমাধান হবে না।
হঠাৎ বিদ্রোহে স্তম্ভিত জিএম কাদেরপন্থিরা
দলের সিনিয়র নেতাদের হঠাৎ করে বিদ্রোহের কারণে হতবাক হয়ে পড়েছেন জিএম কাদেরপন্থি জাতীয় পার্টির নেতারা। তারা বলছেন, এবারের বিদ্রোহী গ্রুপে জাতীয় পার্টির বড় বড় নেতারা যুক্ত আছেন। দলের বর্তমান মহাসচিবও এই বিদ্রোহী গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাছাড়া আগে জাতীয় পার্টি যতবার বিদ্রোহ সৃষ্টি হয়ে ভাঙনের মুখে পড়েছে, ততবারই দীর্ঘদিন আগে থেকে তার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এবার যেটা হয়েছে সেটা ঝড়ের গতিতে হয়েছে। তাই শুধু আমরা নয়, দলের চেয়ারম্যান নিজেও কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়েছেন।
জিএম কাদেরের ঘনিষ্ঠ জাতীয় পার্টির নেতারা বলছেন, সাবেক মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাকে দলের গঠনতন্ত্র ২০(ক) ধারা অনুযায়ী দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এরপর আজকের বর্তমান মহাসচিব চুন্নু কিন্তু ২০(ক) ধারা দিয়েই মহাসচিব হয়েছিলেন। অথচ এখন তিনি এ ধারা নিয়ে কথা বলছেন। এখানে চুন্নু কোনো পক্ষ না নিলে ভালো হতো।
জিএম কাদের অনুসারী জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, এবারের বিদ্রোহী অংশে জাতীয় পার্টির অনেক বড় বড় নেতা আছেন। এটা হঠাৎ করে হওয়ায় আমরা স্তম্ভিত হয়ে গেছি। বিদ্রোহী কাউন্সিল হবে, এ ধরনের ভাবনা আমাদের মধ্যে ছিল না। সেটাতে আসলে আমরা কিছুটা নার্ভাস। চেয়ারম্যান নিজেও এবারের বিদ্রোহের বিষয়টি আগে থেকে অনুমান করতে পারেননি।
জিএম কাদেরের ঘনিষ্ঠ এক আরেক নেতার দাবি, বর্তমান মহাসচিব চুন্নু আগে থেকেই আনিসুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ। তাছাড়া এখন বাতাসে একটা কথা ভাসছে যে, ওই গ্রুপকে (আনিসুল ইসলামদের) সরকার সাপোর্ট দিচ্ছে। তাই এখন তিনি (চুন্নু) মনে করছেন যে, ওখানে থাকাই ভালো। ওখানে থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা হবে না, বিদেশ যাওয়া যাবে।
জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু ঢাকা পোস্টকে বলেন, দলের প্রেসিডিয়াম মিটিং করে ২৮ জুন দলের সম্মেলন তারিখ ঘোষণা করেছি। কিন্তু চেয়ারম্যান জিএম কাদের একটা অজুহাত তুলে তা স্থগিত করেছেন। কিন্তু তিনি এককভাবে সম্মেলন স্থগিত করতে পারেন না দলের প্রেসিডিয়ামের বৈঠক ছাড়া। আনিসুল ইসলাম ও রুহুল আমিন হাওলাদার আহ্বান জানিয়েছেন যে, আপনি (জিএম কাদের) এককভাবে এটা স্থগিত করতে পারেন না। ২৮ তারিখে যেন সম্মেলন করা হয়, সে ব্যাপারে তারা অনুরোধ জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রেসিডিয়ামের মিটিংয়ে আমিসহ অনেকে দলের গঠনতন্ত্রের ২০(ক) ধারা সংশোধন করার প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু কাদের সাহেব গণতন্ত্রের কথা বললেও গঠনতন্ত্রের ২০(ক) স্বৈরতন্ত্র। সেটা গণতন্ত্র বা আধুনিকায়ন করার প্রস্তাব দিলেও তিনি মানছেন না। তিনি এটাও বলেছেন যে, সব (নেতা) চলে গেলেও কিছু আসে যায় না।
মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ৩-৪ দিন আগে আমার সঙ্গে চেয়ারম্যানের কথা হয়েছে। আমি উনাকে বলে এসেছি, সবাইকে নিয়ে আমরা থাকি। আর ২০(ক) ধারা– এই সামান্য জিনিসটা পরিবর্তন করেন। দলের নেতৃত্ব দিলে তো অনেক সময় অনেক কিছু পরিবর্তন করতে হয়।
২৮ তারিখের সম্মেলনে যোগদানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিইনি। তবে কাদের সাহেব ২০(ক) ধারা যদি পরিবর্তন না করেন তাহলে আমি সিদ্ধান্ত নেব কি করব।
রওশন এরশাদসহ সাবেক নেতাদের একজোট করার চেষ্টা
জিএম কাদের-বিরোধী রওশন এরশাদসহ দলটির সাবেক নেতাদের এবং খণ্ডিত জাতীয় পার্টির কয়েকটি অংশকে আগামী ২৮ জুনের সম্মেলনে এক ছাতার নিয়ে আসার চেষ্টা করছে বিদ্রোহী গ্রুপটি। তারা বলছেন, বিভিন্ন সময় জাতীয় পার্টি ভেঙে যেসব নেতারা বেরিয়ে গেছেন, এখন জাতীয় পার্টির নামে যেসব দল আছে সবগুলোকে একসঙ্গে এনে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত রওশন এরশাদের নেতৃত্ব থাকা জাতীয় পার্টি, সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি, শেখ শহীদুল ইসলামের জাতীয় পার্টি এবং সাবেক মন্ত্রী এম এ মতিনের বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা আগামী সম্মেলনে থাকতে রাজি হয়েছে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, আমি যতটুকু জানি আনিসুল ভাই (আনিসুল ইসলাম) ও হাওলাদার সাহেব (রুহুল আমিন হাওলাদার) এই সম্মেলনে যারা আগে জাতীয় পার্টি ছেড়ে চলে গেছেন সবাইকে নিয়ে আসছেন। বেগম রওশন এরশাদও পার্টির একটা অংশের চেয়ারম্যান আছেন। তার সঙ্গে আছেন সৈয়দ আবুল হোসেন বাবলা, কাজী ফিরোজ রশীদ, শফিকুল ইসলাম সেন্টুসহ অন্যরা। এর বাইরে বিভিন্ন সময় যারা জাতীয় পার্টি ছেড়ে গিয়ে নিজেরা দল গঠন করেছেন সেই রকম আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, শেখ শহীদুল ইসলামসহ যারা আছেন, সবাই এই কাউন্সিলে আসছে। তাদেরকে নিয়ে একটা ঐক্য করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু কাদের সাহেব (জিএম কাদের) এই ঐক্যটা চান না।
রওশন এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো চেয়ারম্যান সৈয়দ আবুল বাবলা ঢাকা পোস্টকে বলেন, আনিস ভাই আমাদেরকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তখন বলেছি, আমরা বৃহত্তর ঐক্য চাই, আপনাদের কাউন্সিলে যাব। আমরা যদি মনে করি, এটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হচ্ছে, তাহলে আমরা বৃহত্তর ঐক্যের মধ্যে থাকব।
তাহলে কী রওশন এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বিলুপ্ত হচ্ছে– জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে পার্টিকে ভাগ করার তো প্রশ্নই ওঠে না। আমরা বৃহত্তর ঐক্যের মধ্য থাকব। আমাদের এখানে আগের আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, শেখ শহিদুল ইসলাম এবং আগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম এ মতিনের ছেলেসহ অনেকে আসবেন। সবাই মার্চ করে একসঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য হচ্ছে।
রওশন এরশাদ সম্মেলনে আসবেন কি না জানতে চাইলে আবুল হোসেন বাবলা বলেন, উনার শারীরিক অবস্থা ভালো থাকলে আসবেন। না হয় বার্তা দিতে পারেন। না হলে উনার দোয়া থাকবে।
২৮ জুনের সম্মেলনে অংশ না নিতে জেলা-উপজেলায় চিঠি জিএম কাদেরের
দলের কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমদুসহ অন্যদের নেতৃত্বে হওয়া ২৮ জুনের সম্মেলনে তৃণমূলের জাতীয় পার্টির নেতাদের অংশ না নিতে জেলা-উপজেলা কমিটিকে চিঠি দিয়েছেন জিএম কাদের। সেখানে বলা হয়েছে, ২৮ তারিখের সম্মেলনে দলের চেয়ারম্যানের অনুমোদন নেই। এ সম্মেলনে কেউ অংশ নেবেন না। বিশেষ করে জাতীয় পার্টির প্রধান ঘাঁটি বৃহত্তর রংপুর বিভাগের নেতাদের অংশ নেওয়া ঠেকাতে মরিয়া জিএম কাদেরপন্থি জাতীয় পার্টি।
জাপা নেতা শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, একটি জেনারেল চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, পার্টির চেয়ারম্যানের সম্মতিতে ২৮ জুন কোনো কাউন্সিল হচ্ছে না। যাতে কেউ অংশ গ্রহণ না করে। কারণ এ কাউন্সিল তো মূলধারার জাতীয় পার্টিতে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ২৮ তারিখের কাউন্সিলটি হলে একটা বিতর্কের অবস্থা সৃষ্টি হবে। তখন পার্টির প্রেসিডিয়াম সভা বসে করণীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে আমার মতে ২৮ তারিখের কাউন্সিল না হওয়া সবদিক থেকে মঙ্গলজনক। আর জাতীয় পার্টির শক্তি ও সামর্থ্য যদি এক রাখা যায় তাহলে সামনে দিনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একটি পার্টির চেয়ারম্যান তো একজনই হবেন। দুইজন তো চেয়ারম্যান হতে পারেন না।
সবচেয়ে বেশি ভাঙন জাতীয় পার্টিতে
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একই নামে সবচেয়ে বেশি ব্র্যাকেটবন্দি হয়েছে সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতিষ্ঠিত দল জাতীয় পার্টি। বর্তমানে ‘জাতীয় পার্টি’ নামে সাতটি দলের অস্তিত্ব রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন এরশাদের ভাই ও স্ত্রীরা।
এরশাদের জীবদ্দশায় ‘জাতীয় পার্টি’ নামে পাঁচটি দল ছিল। মৃত্যুর পর (১৪ জুলাই, ২০১৯) তার সাবেক স্ত্রী বিদিশার ইচ্ছায় ‘নতুন জাপা’ নামের আরেকটি দল হয়। সবশেষ ২০২৪ সালের ২০ এপ্রিল এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একটি অংশ ভাগ হয়ে যায়।
বর্তমানে ব্র্যাকেটবন্দি জাপার অংশগুলো হলো– জাতীয় পার্টি (জাপা), চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের; নতুন জাপা, এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক; জাতীয় পার্টি (জেপি), সভাপতি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু; বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ; জাতীয় পার্টি, চেয়ারম্যান কাজী জাফর আহমদ; বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, সভাপতি ডা. এম এ মুকিত এবং জাতীয় পার্টি, চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ।
ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের মতো আবারও সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে: মো. শাহজাহান
বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেছেন, রাষ্ট্র সকলের, রাষ্ট্রের মালিক জনগন। ৫ আগস্টের আন্দোলনের পর জনগণ মনে করেছিলো তাদের রাষ্ট্রের মালিকানা তারা ফিরে পেয়েছে। কিন্তু জনগণ তাদের এ আশাটাকে হৃদয়ে ধরে রাখতে পারেনি। আমাদের মধ্যে আজকে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, যা কেউ বড় করে দেখছে কেউ ছোট করে দেখছেন।
বুধবার (২৫ জুন) বিকেলে জেলা শহর মাইজদীর মফিজ প্লাজার সামনে জেলা বিএনপির আয়োজন অনুষ্ঠিত এক পথসভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন,তবে আমি মনে করি এ মতপার্থক্য দূর করে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া খুব একটা কঠিন বিষয় না। তাই ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের মতো আমাদের সবাইকে আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রকে গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে আরও সুসংগঠিত করার জন্য এবং আধিপত্যবাদ থেকে দেশের জনগনকে রক্ষা করার জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার বিকল্প নেই। তখনই এ রাষ্ট্র প্রকৃত পক্ষে জনগনের হবে।
দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে নিজ এলাকায় আসাকে কেন্দ্র করে নোয়াখালীতে বিএনপি আয়োজিত পথসভায় বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান আরও বলেন, আপনাদের আবেগ-ভালোবাসাপূর্ণ আজকের এ উপস্থিতির জন্য সদর সুবর্ণচর উপজেলার নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সুখে দুখে তাদের পাশে থাকবেন বলে জানান। আপনাদের দোয়া ও ভালোবাসার প্রতিদান কখনও দেওয়া সম্ভব না। আমি প্রতিজ্ঞা করছি সারাজীবন আপনাদের পাশে থাকবো।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি কখনও ক্ষমতার রাজনীতি করে না। বিএনপি জনগণের সাথে আছে। আওয়ামী সরকার বিরোধী আন্দোলনে আমাদের দলের নেতাকর্মীরা কম রক্ত দেয়নি। আমরা এ অভ্যূত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের প্রতি আমরা দায়বদ্ধ। আমাদের দল শাসক হতে চায় না, সেবক হতে চাই। তাই আমরা চাই সুষ্ঠু একটা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হোক। যে নির্বাচনে ছোট-বড় সকল দল অংশগ্রহণ করবে। এটা নিয়ে ভুলবুঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই।
এসময় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সাবেক জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আব্দুর রহমানসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
উপদেষ্টা আসিফকে ক্ষমা চাইতে হবে: ইশরাক হোসেন
উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে ক্ষমা চাইতে আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন। তিনি বলেছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে ঘিরে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আপত্তিকর মন্তব্য করায় তাকে নগরবাসীর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
বুধবার (২৫ জুন) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জরুরি সংবাদ সম্মেলন তিনি এ আহ্বান জানান।
ইশরাক হোসেন বলেন, একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বক্তব্য বহুল প্রচারিত হয়েছে। সেখানে তিনি বেশ কয়েকটি আপত্তিকর কথা বলেছেন। আসিফ বলেছেন, বিএনপির এক নেতার ইন্ধনে ইশরাকের আন্দোলন হয়েছে। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ঢাকার হাজার হাজার ভোটারকে চরম অপমান করা হয়েছে। দিনের পর দিন আন্দোলন করা ঢাকার এই জনগোষ্ঠীকে একটি বাক্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে নাগরিক থেকে পশুর মর্যাদায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটার জন্য তাকে অবশ্যই নাগরিকদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আসিফ দাবি করেছে আমাকে মিস গাইড করা হয়েছে। এই বক্তব্যর মধ্য দিয়ে তিনি আমাকে হেয় করেছেন। ঢাকাবাসীর এই আন্দোলনকে এভাবে অপমান করায় তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। এই অবমাননা করার জন্য তাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
বিএনপি এই নেতা বলেন, স্থানীয় সরকার দাবি করেছেন কুমিল্লার এক বিএনপি নেতা আমাকে প্ররোচনা দিয়েছেন। পাশাপাশি আন্দোলনের জন্য আমাকে অর্থ ও লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়েছেন। উপদেষ্টার কাছে তার প্রমাণও রয়েছে নাকি। এই প্রমাণ তাকে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে, তা না পারলে প্রকাশ্যে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এদিকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সোমবার (২৩ জুন) থেকে খুলেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটির নগরভবনের প্রধান ফটক। চালু হয়েছে সেবা কার্যক্রম। পাশাপাশি ইশরাক অনুসারীদের অবস্থান কর্মসূচিও চলমান রয়েছে। গত ১৫ মে থেকে ৩ জুন পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটির নগর ভবন থেকে দেওয়া সব নাগরিক সেবা বন্ধ ছিল। জরুরি প্রয়োজনে এসে এ সময় সেবাপ্রার্থী নাগরিকদের বারবার ঘুরে যেতে হয়েছে।
সে সময় ইশরাকপন্থি কর্মচারীরা নগরভবনের মূল ফটক আটকে রাখার পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগে তালা ঝুলিয়ে সেবা কার্যক্রম বন্ধ করে রাখেন। পরে ঈদের বিরতির পর গত ১৫ জুন থেকে ইশরাকের অনুসারীরা নগরভবনে একত্রিত হয়ে ফের অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে শুরু করে। ফলে গত পরশু পর্যন্ত নগর ভবনের প্রধান ফটকসহ অন্যান্য বিভাগে তালা ঝোলানো ছিল। দীর্ঘদিন পর গতকাল প্রধান ফটকসহ অন্যান্য বিভাগের তালা খুলে দেওয়া হয়।
১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী নয়- প্রস্তাবে রাজি বিএনপি, তবে...
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ১০ বছরের মেয়াদে বিএনপি একমত।
বুধবার (২৫ জুন) ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি।
এ সময় তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না এই প্রস্তাবে একমত হয়েছে বিএনপি। তবে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের (এনসিসি) গঠন গঠনের সঙ্গে দলটি একমত নয়। এটি হলে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতাকে খর্ব করার একটা সুযোগ তৈরি হয়। তাই এধরনের কিছু করা হলে আমরা সেই প্রস্তাবটি মেনে নিতে পারব না।
একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ কতবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন, তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করে সংবিধান সংস্কার কমিশন। প্রস্তাবে বলা হয়, এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
একজন ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না—সংবিধানে এ রকম বিধান যুক্ত করার বিষয়ে একমত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি।
মঙ্গলবার (২৪ জুন) রাতে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে দলটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের (এনসিসি) মতো প্রতিষ্ঠান গঠনের সঙ্গে একমত পোষণ করবে না।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সংস্কার বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে গত কয়েক দিনের আলোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।
দলটির সভাপতি স্বামী, সম্পাদক স্ত্রী, বাসা কেন্দ্রীয় কার্যালয়
রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পেতে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আবেদন করেছে বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টি। ইসিতে জমা দেওয়া আবেদনে দলের কার্যালয়ের ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে ঢাকার মগবাজার ৬৩৯/বি, পেয়ারাবাগ।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এ ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ দেয়ালের ওপরে টিনের ছাউনির এক কক্ষের একটি ছোট্ট ঘর।
ঘরে কেউ আছেন—অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করেও সাড়া পাওয়া গেল না। পরে দলের সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর হাওলাদারের মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করেন সাংবাদিক। ফোন ধরেন এক নারী। তিনি নিজেকে জাহাঙ্গীর হাওলাদারের স্ত্রী মাহমুদা সুলতানা বলে পরিচয় দেন। তাঁর স্বামী বাসায় আছেন বলে জানান। এরপর ঘরের দরজা খুলে গায়ে গামছা জড়িয়ে বেরিয়ে আসেন বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি জাহাঙ্গীর হাওলাদার।
রাজনৈতিক দল হিসেবে ইসিতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করার বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর হাওলাদার বলেন, ‘নিবন্ধনের জন্য আবেদন সাবমিট করছি আরকি। ২০১১ সালে পার্টিটা গঠন করছি। আমি যখন তিতুমীর কলেজে পড়ালেখা করি তখন আরকি। এখানে অফিস নেব চিন্তা করছি আরকি। আগে দলটল ঠিক অইলে এর পরে নেব আরকি।’
দলের কোনো কমিটি আছে কি না, জনতে চাইলে জাহাঙ্গীর হাওলাদার বলেন, ৭৫ সদস্যের কমিটি আছে। এ কমিটিতে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের লোকজন আছে। দলের সাধারণ সম্পাদক এখন কে—জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর হাওলাদার বলেন, তাঁর স্ত্রী মাহমুদা সুলতানা আপাতত দলের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

‘মুক্ত রাজনৈতিক আন্দোলন’-এর কার্যালয় হিসেবে এই আবাসিক ভবনের ঠিকানা দেওয়া হলেও বাসিন্দারা দলটির নাম কখনো শোনেননি বলে জানান
নিজের ভাড়া বাসাকেই আপাতত দলের কার্যালয়ের ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করার কথা জানান বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক পার্টির এই সভাপতি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ-তিসারী-ইনসাফ দল তাদের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করেছে একটি রেস্তোরাঁকে। ইসির নিবন্ধন আবেদনে দলটির ঠিকানা ৫৪ পুরানা পল্টন, বি কে টাওয়ার। গতকাল এ ঠিকানায় গিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। ৫৪ নম্বর বাড়িটি তিনতলা। বেশ কিছু দিন ধরে তৃতীয় তলায় কেউ থাকছে না। দ্বিতীয় তলায় ‘ভোজন রেস্তোরাঁ’ নামে খাবারের হোটেল ছিল। এটিও গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে বন্ধ রয়েছে। আর নিচতলায় ‘মুসলিম হোটেল অ্যান্ড কাবাব ঘর’ নামে একটি হোটেল চালু আছে।
এই দলের চেয়ারম্যান হিসেবে মো. মিনহাজ প্রধানের নাম ইসিতে করা নিবন্ধন আবেদনে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তাঁর মুঠোফোন নম্বরও লেখা আছে। এ নম্বরে যোগাযোগ করে হলে তিনি বলেন, ভবনটির ওপরের তলাগুলোতে সংস্কারকাজ চলমান। অফিসকক্ষেরও সংস্কার চলছে। অফিসকক্ষ কত তলায়—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তৃতীয় তলায়। কিন্তু তৃতীয় তলা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে—এমন প্রশ্ন করার পর তিনি বলেন, ‘আমি নিয়মিত মুসলিম হোটেলে বসি।’
পরে মুসলিম হোটেল অ্যান্ড কাবাব ঘরের ম্যানেজার (ব্যবস্থাপক) মো. সোহাগ বলেন, মিনহাজ প্রধান এখানে প্রায়ই আসেন নাশতা খেতেন। রাজনীতি বিষয়ে কথাবার্তা বলেন। কিন্তু তাঁদের হোটেল কোনো দলের কার্যালয় নয়। মিনহাজ প্রধান কোনো দলের নেতা কি না, সেটি তাঁর জানা নেই। আর ভবনটিতে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ও নেই।
১৪৭ দলের আবেদন
মিনহাজ প্রধানের বাংলাদেশ-তিসারী-ইনসাফসহ মোট ১৪৭টি দল নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত হওয়ার জন্য আবেদন করেছে। গত রোববার শেষ দিনে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারা দলীয় প্রতীক হিসেবে জাতীয় ফুল ‘শাপলা’ চেয়েছে। এ ছাড়া এনসিপির পছন্দের প্রতীকের তালিকায় আরও দুটি প্রতীক রয়েছে। এর একটি ‘কলম’ অন্যটি ‘মোবাইল’। এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয় বাংলামটরের রূপায়ণ টাওয়ারে।
যেসব দল ইসির নিবন্ধন পাবে, তারা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজস্ব প্রতীকে ভোট করতে পারবে। এখন ইসিতে নিবন্ধিত দল আছে ৫১টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে।
নতুন দলের ক্ষেত্রে ইসিতে নিবন্ধন পাওয়ার জন্য দলের সক্রিয় কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং কার্যকর কমিটি থাকতে হয় কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায়। পাশাপাশি সদস্য হিসেবে অন্তত ১০০টি উপজেলা কিংবা মেট্রোপলিটন থানার কমপক্ষে ২০০ ভোটারের সমর্থনের নথিও দেখাতে হয়।
ইসিতে নিবন্ধন পেতে আবেদন করা দলগুলোর মধ্যে ৩৪টির কার্যালয়ের মধ্যে ২৬টি দলের কার্যালয় রাজধানী ঢাকায়। বাকি আটটি দলের কার্যালয় হিসেবে নিবন্ধন আবেদনে খুলনা, ফরিদপুর, দিনাজপুর, বান্দরবান, গাইবান্ধা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সাভারের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি দলের ঠিকানায় গিয়ে কোনো সাইনবোর্ডও দেখা যায়নি। এসব ঠিকানার কোনোটি ছিল বাড়ি, কোনোটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। গাজীপুরে বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) ঠিকানায় গিয়ে অবশ্য সাইনবোর্ড দেখা গেছে। তবে কার্যালয় বন্ধ পাওয়া যায়।
তিনটি দলের নামে ‘বেকার’
ইসিতে যেসব দল নিবন্ধনের আবেদন করেছে, সেগুলোর মধ্যে তিনটি দলের নামে ‘বেকার’ শব্দ রয়েছে। এগুলো হলো বাংলাদেশ বেকার মুক্তি পরিষদ, বাংলাদেশ বেকার সমাজ (বাবেস) ও বাংলাদেশ বেকার সমাজ।
এই তিন দলের মধ্যে ইসিতে নিবন্ধনের জন্য করা আবেদনে বাংলাদেশ বেকার সমাজের (বাবেস) ঠিকানা উল্লেখ করেছে ‘১৩১/১/এ, ক্রিসেন্ট রোড (ধানমন্ডি)। গতকাল দুপুরে ওই ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে চারতলা একটি আবাসিক ভবন রয়েছে। ভবনের প্রবেশপথের বাঁ পাশে বাবেসের সাইনবোর্ড রয়েছে। এ ভবনের তৃতীয় তলায় দলটির কার্যালয়। যেটি একই সঙ্গে দলের সভাপতি মো. হাসানের ছেলের বাসা। দরজায় কড়া নাড়তেই বেরিয়ে এলেন নাদিয়া খানম নামের এক নারী। তিনি নিজেকে মো. হাসানের পূত্রবধু হিসেবে পরিচয় দেন। এ বাসার ড্রয়িংরুম (বসার ঘরে) দলের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করার কথা জানান তিনি।
পরে বাবেসের সভাপতি মো. হাসানের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তিনি বলেন, দলটি ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তিনি কয়েকবার বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেন। তাঁর দল বেকার সমাজের স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করে।
ছেলের বাসায় দলীয় কার্যালয়ের বিষয়ে মো. হাসান বলেন, ‘বড় কয়েকটি দল ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো দলেরই সেভাবে কার্যালয় নেই। বাসাটিতে আমরা অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে কার্যক্রম চালাচ্ছি। পাশের কক্ষে ছেলে ও পূত্রবধু থাকে।’
‘বেস্ট’ আছে, ‘সলুশন’ও আছে
ইসিতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা কয়েকটি দল হলো বাংলাদেশ বেস্ট পলিটিক্যাল পার্টি, নাকফুল বাংলাদেশ, বাংলাদেশ নাগরিক কমান্ড, বাংলাদেশ জনগণের দল, বাংলাদেশ দেশপ্রেমিক প্রজন্ম, বাংলাদেশ সলুশন পার্টি, বাংলাদেশ সংগ্রামী ভোটার পার্টি, বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টি (বিপিপি), বাংলাদেশ জনগণের দল (বাজদ), জনতার কথা বলে, বাংলাদেশ শান্তির দল, বাংলাদেশ মাতৃভূমি দল, বাংলাদেশ পাক পাঞ্জাতন পার্টি (বিপিপি), বাংলাদেশ জনমত পার্টি, বাংলাদেশ সর্ব-স্বেচ্ছা উন্নয়ন দল।
এ ছাড়া চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন ও সাংবাদিক শওকত মাহমুদের নেতৃত্বাধীন জনতা পার্টি বাংলাদেশ, ডেসটিনি গ্রুপের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল আমীনের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আম জনগণ পার্টিও ইসির কাছে নিবন্ধন চেয়ে আবেদন করেছে।
ইসিতে নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা আরেকটি দল হচ্ছে ‘Muslim Save Union’। দলটির কার্যালয়ের ঠিকানা দেওয়া শান্তিনগর বাজারের ২ নম্বর লেনের রমজান ট্রেডিং-৮৩ (তৃতীয়, চতুর্থ তলা)। তবে গতকাল এ ঠিকানায় গিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে দলটির সভাপতি আবদুল মান্নান মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ওই ঠিকানায় আর কার্যালয় নেই। তাহলে এখন কার্যালয় কোথায়—জানতে চাইলে তিনি বলেন, মালিবাগের প্রশান্তি হাসপাতালের পাশে একটি বিল্ডিংয়ে আছে।
জাতীয় ন্যায় বিচার পার্টি নামে আরেকটি দল নয়াপল্টনের ইসলাম টাওয়ারের সপ্তম তলাকে দলীয় কার্যালয় হিসেবে দেখিয়েছে। গতকাল দুপুরে সেখানে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ঠিকানায় ‘আল আমিন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’সহ বেশ কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ইসিতে জমা দেওয়া আবেদনে এই দলের চেয়ারম্যান হিসেবে মো. কামরুজ্জামানের নাম উল্লেখ রয়েছে। আবেদনে উল্লেখ করা মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আগে তো সবকিছু সিস্টেম অনুযায়ী করতে হয়। সে জন্য আল আমিন ট্রাভেলসকে আমরা অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে দেখিয়েছি। নিবন্ধনের আবেদন করতে তাড়াতাড়ি এ ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অফিস নেব।’
পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডের প্রীতম জামান টাওয়ারে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের কার্যালয়। ভবনটির ১৫ তলার ওপরে ছাদের এক পাশে দুটি দলের কার্যালয়। এর একটি ন্যাশনাল লেবার পার্টি, অন্যটি জনতার অধিকার পার্টি। এই অধিকার পার্টির কক্ষকেই কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে দেখিয়েছে ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলন’ নামের আরেকটি দল।
এই দলের চেয়ারম্যান হিসেবে কে এম রকিবুল ইসলামের নাম উল্লেখ রয়েছে ইসির নিবন্ধন আবেদনে। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা অধিকার পার্টির ওখানে একসঙ্গে আছি। আগে রুমের দরজায় দলের নামসহ স্টিকার ছিল। সেটা মনে হয় পড়ে গেছে। আমরা আবার স্টিকার লাগাব।’
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


মন্তব্য