শিরোনাম
সোনারগাঁও: মধ্যযুগের বাংলার বাণিজ্যিক রাজধানীর অজানা ইতিহাস
“কল্পনা করুন একটি শহরের, যেখানে রাস্তাগুলো ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দামি, সূক্ষ্ম মসলিন কাপড়ে মোড়া, বাজারে কান পাতলে শোনা যেত চীন, আরব, এবং ইউরোপের নানা প্রান্তের বণিকদের ভাষা, আর সোনার গহনার ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যেত। এটি কোনো রূপকথার গল্প নয়। এটি ছিল বাংলার বাণিজ্যিক রাজধানী এবং প্রাচ্যের অন্যতম সমৃদ্ধ শহর—সোনারগাঁও। কিন্তু যে শহর একসময় বিশ্ব-বাণিজ্যের হৃৎপিণ্ড ছিল, সেই 'সিটি অব গোল্ড' কীভাবে সময়ের ধুলোয় হারিয়ে গেল? আজ আমরা উন্মোচন করব মধ্যযুগের বাংলার সেই হারানো গরিমার ইতিহাস।”
১. উত্থান ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
মধ্যযুগে, বিশেষ করে ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে সোনারগাঁও ছিল বাংলার ঐতিহাসিক প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং সমৃদ্ধির প্রতীক। বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের প্রতিষ্ঠাতা ফখরউদ্দিন মুবারক শাহের সময় এটি তার গুরুত্বের শিখরে পৌঁছায়।
কৌশলগত অবস্থান: শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এটি ছিল জলপথের এক কৌশলগত কেন্দ্র। এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার মূল প্রবেশদ্বার।
বিশ্ব বাণিজ্য: এটি কেবল রাজধানী ছিল না, এটি ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মালয় উপদ্বীপ, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যুক্ত একটি আন্তর্জাতিক বন্দর নগরী (Port City)। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতাও এই শহরের সমৃদ্ধির প্রশংসা করেছিলেন। এই বন্দরে তৈরি হতো জাহাজের মাস্তুল, আর রপ্তানি হতো বিশ্বমানের চিনি, চাল ও লবণ।
২. মসলিনের মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব
সোনারগাঁওয়ের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল তার মসলিন-এর কারণে। এই বস্ত্রশিল্প ছিল বাংলার গর্ব।
সূক্ষ্মতা ও দাম: বিশেষ ধরনের ফুটি কার্পাস তুলা থেকে তৈরি এই কাপড় এতটাই সূক্ষ্ম ছিল যে, বলা হতো ৪০ হাত লম্বা একটি মসলিন শাড়ি একটি দেশলাই বাক্সে ভরে ফেলা যেত। এই বস্ত্র ছিল তৎকালীন পৃথিবীতে সোনার চেয়েও দামি।
উপাধি: ইউরোপের রানি থেকে শুরু করে মুঘল সম্রাট পর্যন্ত, এই 'বোনা বাতাস' (Woven Wind)-এর চাহিদা ছিল আকাশছোঁয়া। এটি ছিল বাংলার অর্থনৈতিক শক্তির প্রধান স্তম্ভ।
৩. পতন ও ধ্বংসের কারণসমূহ
কিন্তু এই সমৃদ্ধি চিরস্থায়ী হয়নি। মুঘলদের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রকৃতির রোষেই এই শহর তার প্রাণ হারিয়েছিল।
রাজনৈতিক পটভূমি: ষোড়শ শতকের শেষভাগে, মুঘলদের আগ্রাসনের মুখে সোনারগাঁওয়ের স্থানীয় বারো ভূঁইয়াদের প্রধান ঈসা খাঁ দীর্ঘদিন মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মুঘলদের চূড়ান্ত বিজয় এবং ১৬১০ সালে ঢাকাতে (তৎকালীন জাহাঙ্গীরনগর) রাজধানী স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গে সোনারগাঁও তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হারায়।
প্রাকৃতিক পরিবর্তন: এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নদীর গতিপথ পরিবর্তন। শীতলক্ষ্যা ও মেঘনার নাব্যতার দ্রুত হ্রাস পাওয়ায় বড় আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো বন্দরে ভিড়তে পারত না, ফলে বাণিজ্যিক পথ ধীরে ধীরে সরে যায়।
ধ্বংসস্তূপ: আজকের পানাম নগরী—যেখানে মূলত ধনী হিন্দু বণিকরা বাস করতেন—সোনারগাঁওয়ের সেই হারিয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক ঐশ্বর্যের একটি নীরব, ভগ্নপ্রায় সাক্ষী।
উত্তরাধিকার ও দায়িত্ব:
“সোনারগাঁও কেবল ইট-পাথরের গল্প নয়—এটি আমাদের হারানো গরিমার, আমাদের পূর্বপুরুষদের অর্থনৈতিক দক্ষতা ও শৈল্পিক শ্রেষ্ঠত্বের গল্প। এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা কতটা সমৃদ্ধ সভ্যতার উত্তরাধিকারী। আমাদের এই ইতিহাস জানা, গর্ব করা এবং এর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব। আপনার কেমন লাগলো এই অজানা ইতিহাস?
মিশরের পিরামিড — ফেরাউন, ধর্মবিশ্বাস ও স্থাপত্যের মহিমা
“চার হাজার ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমির বুকে দাঁড়িয়ে আছে গিজার পিরামিড—পাথরের সেই পর্বত, যা কেবল সময়ের নয়, মহাকর্ষের নিয়মকেও যেন চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। কিন্তু কী ছিল এর নির্মাণের পেছনে চালিকা শক্তি? কেন একটি সভ্যতা কয়েক দশক ধরে বিপুল শ্রম ও সম্পদ ব্যয় করল মৃত রাজাদের জন্য? পিরামিড কি শুধুই এক বিশাল সমাধি? নাকি এটি প্রাচীন মিশরের ধর্ম, বিজ্ঞান ও অমরত্বের আকাঙ্ক্ষার চূড়ান্ত প্রতীক?”
বিশ্বাসের ভিত্তি: মৃত্যু ও অমরত্ব
প্রাচীন মিশরীয়দের জন্য জীবন ও মৃত্যুর সীমারেখা ছিল অস্পষ্ট; তারা বিশ্বাস করত, মৃত্যু হলো 'অন্য এক জগতে প্রবেশ' বা 'আত্মার পুনর্জন্মের যাত্রা'। ফেরাউন, যাকে দেবতুল্য মনে করা হতো, মৃত্যুর পরও 'সূর্যদেব রা' (Ra)-এর সঙ্গী হয়ে মহাজাগতিক পথে যাত্রা করতেন। এই বিশ্বাসই জন্ম দিয়েছিল পিরামিড নির্মাণ-শৈলীর। পিরামিড ছিল ফেরাউনের আত্মা ('কা') এবং শক্তি ('বা')-এর জন্য তৈরি এক সুউচ্চ মাইলফলক, যা তাঁকে স্বর্গের পথে চালিত করবে।
উত্থান ও স্থাপত্যের বিবর্তন
প্রথম পদক্ষেপ (শুরু): প্রায় ২৬৩০ খ্রিষ্টপূর্বে, পুরোনো রাজ্যের সময়, ফেরাউন জোসার-এর জন্য তাঁর স্থপতি ইমহোটেপ নির্মাণ করেন সাক্কারার 'ধাপ পিরামিড' (Step Pyramid)। এটি ছিল মাস্তাবা (আয়তাকার সমাধি) থেকে পিরামিডে রূপান্তরের প্রথম ধাপ।
স্বর্ণযুগ (গিজা): স্থাপত্যের চূড়ান্ত রূপটি আসে ২৫৮০ থেকে ২৫৪০ খ্রিষ্টপূর্বে গিজা মালভূমিতে। এখানে নির্মিত হয় মানব ইতিহাসের এক বিস্ময়—গিজার মহা পিরামিড (The Great Pyramid of Giza)।
খুফুর পিরামিড: এই তিনটি পিরামিডের মধ্যে এটিই প্রাচীন সপ্ত আশ্চর্যের মধ্যে একমাত্র অবশিষ্ট। এটি মূলত প্রায় ২.৩ মিলিয়ন চুনাপাথরের ব্লক দিয়ে তৈরি, যার গড় ওজন ২.৫ টন।
খাফরের পিরামিড: এর শীর্ষে এখনও মসৃণ চুনাপাথরের আবরণ দেখতে পাওয়া যায়। এই ফেরাউনের সমাধি রক্ষক হিসাবেই বিখ্যাত গ্রেট স্ফিংক্স দাঁড়িয়ে আছে।
গাণিতিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের নিখুঁততা পিরামিডের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক দিক হলো এর জ্যামিতিক নির্ভুলতা।
দিশা জ্ঞান: চারটি দিক প্রায় নিখুঁতভাবে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম বরাবর নির্দেশিত।
মহাজাগতিক সংযোগ: অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, গিজার তিনটি পিরামিড কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলীর (Orion Constellation) বেল্ট স্টার-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বিন্যস্ত।
নির্মাণ কৌশল: প্রতিটি পাথরের মাঝে সামান্যতম ফাঁক না রাখা এবং লক্ষ লক্ষ টন পাথরকে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে এনে এই উচ্চতায় স্থাপন করা—এটাই প্রমাণ করে যে মিশরীয়রা উন্নত গণিত, জরিপ (Surveying) এবং প্রকৌশল বিদ্যার অধিকারী ছিল।
“পিরামিড নিছকই এক বিশাল রাজকীয় কবরখানা নয়; এটি ছিল ফেরাউনের অমরত্বের ভান্ডার, যেখানে তাঁর পার্থিব সম্পদ এবং পরবর্তী জীবনে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা হতো। এটি একই সঙ্গে মানবশ্রমের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ এবং প্রাচীন মিশরীয়দের গভীর ধর্মবিশ্বাস ও উন্নত প্রকৌশল জ্ঞানের নীরব সাক্ষী। পিরামিড আজও ঘোষণা করে চলেছে সেই একই বার্তা: সময় যতই প্রবাহিত হোক না কেন, মানুষের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা তার স্থাপত্যের মধ্য দিয়ে চিরকাল টিকে থাকবে।”
৬১তে পা দিলো ঐতিহ্যের বাঙলা কলেজ
বাঙলা কলেজ প্রতিনিধিঃ ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিকে ধারণ করে বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার্থে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি বাঙলা কলেজ। রাজধানীর মিরপুরে ২৫ একর জায়গা নিয়ে যার অবস্থান।
১৯৬২ সালের ১লা অক্টোবর উচ্চ শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা ভাষাকে পরিচিত করতে পথচলা শুরু হয় বাঙলা কলেজের।
প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম বাঙলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। কলেজটিতে বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। আজ রোববার (১ অক্টোবর) ৬০ পেরিয়ে ৬১ বছরে পদার্পণ করেছে ইতিহাস ঐতিহ্যের এই কলেজটি। কলেজটিতে উচ্চমাধ্যমিকসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৮৫ সালে কলেজটিকে সরকারিকরণ করা হয় এবং ১৯৯৭ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধিভুক্ত করে কলেজটির স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ হতে কলেজটির স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধিভুক্ত করা হয়।
১৯৬৪ সালে কলেজটি মিরপুরে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে প্রতিষ্ঠাকালীন বছরে এর ক্লাস হতো নবকুমার ইনস্টিটিউটে রাতের শিফটে।
সরকারি বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার পিছনে যেসব মনীষীদের অতিগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তাদের মধ্যে প্রথমেই যার নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযোগ্য, তিনি হলেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। তৎকালীন সময়ে তিনি বাংলা একাডেমিতে কাজ করেছিলেন ‘পূর্ব পাকিস্তানি ভাষার আদর্শ অভিধান’ প্রকল্পের সম্পাদক হিসেবে।
১৯৫৯ খ্রিঃ হতে ১৯৬১ খ্রিঃ পর্যন্ত ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কার্জন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানের বক্তা হিসাবে জনাব কাসেম বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন। একটি সভায় তিনি বলেন ‘পশ্চিম পাকিস্তান বহু আগে থেকে উর্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করে উর্দুকে সরকারী ভাষা ও সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যমরূপে গড়ে তোলার সঠিক প্রচেষ্টায় অনেকদূর এগিয়ে গেছে, উর্দু কলেজকে পাকিস্তান সরকার বিপুল অর্থ ও জমি দিয়ে সাহায্য করেছেন। অথচ এত আন্দোলন সত্বেও বাংলাকে সর্বস্তরে চালু করার উদ্দেশ্যে আমরা বাঙলা কলেজ গড়ে তুলতে পারলাম না। সরকারও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে।’
সেই সভাগুলিতে তিনি এও বলেছিলেন : ‘সরকার এগিয়ে না আসলে আমরা নিজেরাই অদূর ভবিষ্যতে বাঙলা প্রচলন করে দেখাবার উদ্দেশে বাঙলা কলেজ স্থাপন করব।’
‘বাঙলা কলেজ’ স্থাপনের উদ্যোগকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য ‘বাঙলা কলেজ প্রস্তুতি কমিটি’ গঠন করা হয়। কমিটির প্রথম সভা হয় ১৯৬১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে। পরবর্তী সভাগুলো ১৯ ফেব্রুয়ারি এবং ১৮ জুন একই স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারির সভায় আবুল কাসেম উত্থাপিত প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
প্রস্তাবটি ছিলঃ ‘বাঙলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে অবিলম্বে ঢাকায় একটি বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হউক’। অবশেষে ১৯৬২ সনের ৪ মার্চ বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অবস্থিত রাইটার্স গিল্ড ভবনে অনুষ্ঠিত সভায় ‘বাঙলা কলেজ’ প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়।
অধিকাংশ সভায় সভাপতিত্ব করেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যাঁরা এসব সভায় উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ, খান বাহাদুর আবদুর রহমান খাঁ, কবি জসীম উদ্দিন, কবি গোলাম মোস্তফা, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, পাকিস্তান অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম, তোফাজ্জল হোসেন, ডক্টর ইন্নাস আলী (পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য), ডক্টর কামালউদ্দীন, টিচার্স ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপাল ওসমান গনি, বাংলা একাডেমির তৎকালীন পরিচালক সৈয়দ আলী আহসান, প্রাক্তন ডিপিআই আবদুল হাকিম, ডক্টর হাসান জামান, অধ্যাপক আবদুস সাত্তার, কবি জাহানারা আরজু, আখতার-উল-আলম (পরবর্তীতে ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক) সহ তমদ্দুন মজলিসের আরো বেশ কিছু নেতা-কর্মী।
বাঙলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ। খান বাহাদুর আবদুর রহমান খাঁ (পরবর্তীতে এডিপিআই ও জগন্নাথ কলেজের প্রিন্সিপাল) সহসভাপতি ও প্রাক্তন ডিপিআই আবদুল হাকিম ট্রেজারার নির্বাচিত হন। অবৈতনিক প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শিক্ষাবিদ আবুল কাসেম।
বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠার শুরুতে শিক্ষিত বাঙালি বিদ্বান ব্যক্তিদের কেউ কেউ বিরোধিতায় নেমেছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিলো, বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়া করলে ছাত্র-ছাত্রীরা চাকরির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বে। এমনকি ‘বাঙলা মৌলবি’ জন্ম হবে বলেও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করতেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও বাঙলা মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ দ্রুতই জনপ্রিয়তা লাভ করে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর অবাঙালি বিহারিরা বাঙলা কলেজ দখল করে নেয়। দীর্ঘ নয় মাস অবরুদ্ধ ছিলো এ কলেজটি। কলেজের সাইনবোর্ড নামিয়ে এ সময় ‘উর্দু কলেজ’ সাইনবোর্ড লাগানো হয়।
মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীরা বাঙলা কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে অজস্র মুক্তিকামী মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।
বর্তমান বিন্যাস অনুযায়ী, কলেজের অভ্যন্তরে বড় গেট ও শহীদ মিনারের মাঝামাঝি প্রাচীর সংলগ্ন স্থানে সেসময় পুকুর ছিলো, যেখানে হানাদার বাহিনী মুক্তিকামী মানুষকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করত। মূল প্রশাসনিক ভবনের অনেক কক্ষই ছিল নির্যাতন কক্ষ। হোস্টেলের পাশের নিচু জমিতে আটককৃতদের লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হত। অধ্যক্ষের বাসভবন সংলগ্ন বাগানে আম গাছের মোটা শিকড়ের গোড়ায় মাথা চেপে ধরে জবাই করা হতো, ফলে হত্যার পর এক পাশে গড়িয়ে পড়তো মাথাগুলো, অন্যপাশে পড়ে থাকত দেহগুলো।
মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় জুড়েই বাঙলা কলেজ ও আশেপাশে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চলেছে, হয়েছে নারী নির্যাতন। কলেজের বর্তমান বিশালায়তন মাঠটি তখন ছিলো জঙ্গলে ভর্তি। বিজয়ের মুহূর্তে তখন এই মাঠসহ পুরো এলাকা ও কলেজ জুড়ে পড়ে ছিলো অজস্র জবাই করা দেহ, নরকংকাল, পচা-গলা লাশ। বিভীষিকাময় গণহত্যার চিহ্ন ফুটে ছিলো সর্বত্র।
জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রশাসনিক ভবনের নিচের রুমগুলোকে টর্চারসেল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এখানে আটকে রেখে মেয়েদের ধর্ষণ করা হতো,ধর্ষণের পরে হত্যা করে সামনে থাকা জলাশয়ে ফেলে দেওয়া হতো।
অধ্যক্ষের বাসভবনের যাওয়ার রাস্তার গাব গাছ ও বাসভবনের আশেপাশে থাকা আমগাছের শিকড়ের উপর মানুষ জবাই করা হতো।
কলেজটিতে ১০টি স্থানে গণকবরের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে এবং চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩টি স্থানে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বের আনুষ্ঠানিক বিজয় লাভ করলেও ঢাকার মিরপুর হানাদার মুক্ত হয় ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি।
ক্যাপ্টেন হিরামকক্স থেকে যেভাবে কক্সবাজারের নামকরণ হয়
তাফহীমুল আনাম, কক্সবাজার: ইংরেজ ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের নামের সাথে 'বাজার ' যুক্ত হয়ে এই কক্সবাজার জেলা। কক্সবাজারের রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের অফিসেরচর গ্রামে অবস্থিত ক্যাপ্টেন ‘হিরাম কক্স’-এর বাংলোবাড়ি। আজ থেকে ২২২ বছর আগে ইংরেজ ক্যাপ্টেন ‘হিরাম কক্স’ নির্মান করেছিলেন বাংলোটি । তখনকার সময়ে এই বাড়িটি তৈরি করা হয়েছিল ইট কংক্রিট ও টিনের ছাউনি দিয়ে। বর্তমানে বাংলোটি অযত্ন -অবহেলায় পড়ে আছে। বাংলোর ছাউনি পরিবর্তন ছাড়া এ পর্যন্ত ঘরের সংস্কার হয়নি। টাঙানো নেই হিরাম কক্সকে নিয়ে কোনো সাইনবোর্ড কিংবা স্মৃতিফলক।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৭৮৪ সালের দিকে আরাকান দখল করে নিয়েছিলেন বার্মার রাজা বোধাপায়া। রাজার আক্রমণ থেকে বাঁচতে প্রায় ১৩ হাজার আরাকানি এদিকে চলে আসে, আশ্রয় নেয় পালংকীতে। কক্সবাজারের প্রাচীন নাম ছিল 'পালংকী'। সমুদ্র ও জঙ্গলঘেরা পালংকীতে আশ্রিত লোকজনকে পুনর্বাসনের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে সেখানে নিয়োগ দিয়েছিল। হিরাম কক্স পালংকী এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন একটি বাজার। প্রথম প্রথম এ বাজার ‘কক্স সাহেবের বাজার’ নামে পরিচিত ছিল। পর্যায়ক্রমে ‘কক্স-বাজার’ এবং ‘কক্সবাজার’ নামের উৎপত্তি ঘটে। আরও আগে জায়গাটি ‘প্যানোয়া’ নামেও পরিচিত ছিল । ‘প্যানোয়া’ শব্দের অর্থ ‘হলুদ ফুল’। তখন কক্সবাজার হলুদ ফুলের রাজ্যে ছেয়ে ছিল।
হিরাম কক্স তো দায়িত্ব নিয়েছিলেন শরণার্থী পুনর্বাসনের। কিন্তু তাঁকে তো রাত যাপন করতে হবে, করতে হবে দাপ্তরিক কাজ। এ জন্যই রামুতে নির্মিত হয় এই বাংলোবাড়ি। ১৭৯৯ সালে বাংলোবাড়িতে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ক্যাপ্টেন কক্সের মৃত্যু হয়। তাঁর মরদেহ নেওয়ার জন্য চকরিয়ার মেধাকচ্ছপিয়া এলাকার বড়খালে জাহাজ নিয়ে এসেছিলেন কক্স সাহেবের স্ত্রী ম্যাডাম কক্স পিয়ার। ‘ম্যাডাম কক্স পিয়ার’ লোকমুখে হয়ে যায় ‘মেধাকচ্ছপিয়া’। এখন মেধাকচ্ছপিয়া দেশের অন্যতম জাতীয় উদ্যান।
কক্সবাজার শহর থেকে রামুর ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের বাংলোবাড়ির দূরত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিটার। এখানে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে বদিউজ্জামান( ৫৬) নামে এক বৃদ্ধ এই বাংলো পাহারা দিচ্ছেন।
বাংলো পাহারাদার বদিউজ্জামানের সাথে কথা বললে তিনি জানান, এই বাড়িটি ২২২ বছর আগে তৈরি করেছিলেন ইংরেজ ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স। যার নামে এখন এই কক্সবাজার জেলা। এই বাড়ির সাথে তৎকালীন ব্রিটিশ আমলের ঐতিহাসিক ঘটনার সংযোগ আছে, তবে সেটা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো স্মৃতিফলক নেই। এবাংলোটি ‘জেলা পরিষদ বাংলো’ নামেও অধিক পরিচিত।
বদিউজ্জামান আরও জানান, দুই ঘরের এই বাংলোতে আছে ব্রিটিশ আমলের একটি খাট, চেয়ার-টেবিল। এই বাংলোয় কেউ রাত যাপন করতে চাইলে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রতি রাতের জন্য ২০০ টাকা, পর্যটকদের জন্য ৪০০ টাকা দিতে হয়।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটিজ ফোরাম এর সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, ২২২ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক বাংলোটি অযত্ন- অবহেলায় পড়ে আছে। বাংলোর ছাউনি পরিবর্তন ছাড়া এ পর্যন্ত ঘরের সংস্কার হয়নি। টাঙানো নেই হিরাম কক্সকে নিয়ে কোনো সাইনবোর্ড কিংবা স্মৃতিফলক। বাংলোটি ‘হিরাম কক্স এর বাংলোবাড়ি’ হিসেবে খ্যাত হলে রামুর পর্যটনে যোগ হবে নতুন মাত্রা।
কক্সবাজার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমেদ চৌধুরী জানান, যার নামে আজকের এই কক্সবাজারের নামকরণ সেই ইংরেজ ক্যাপটেন হিরাম কক্স এই বাংলোতে থাকতেন । বাংলোটি অনেক বছরের পুরনো। এটির দেখবাল জেলা পরিষদ থেকে করা হয়। সম্প্রতি বাংলোর বিভিন্ন অবকাঠামো সংস্কারসহ বাংলোর ভিতর একটি টয়লেট ও খাট - সোফা সংযুক্ত করা হয়েছে । এই বাংলোর ঐতিহ্য ও ইতিহাস ধরে রাখতে এবং পর্যটক আকর্ষণে আরও কিছু সাজসজ্জার প্রয়োজন আছে। ক্রমান্বয়ে এসব কাজ করা হবে।
আমেরিকার যোগদানে যেভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মোড় ঘুরে গিয়েছিল
বিশ্বব্যাপী সংগঠিত হওয়া প্রথম কোন যুদ্ধ ছিল এটি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিশ্বের প্রতিটি দেশ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যার জন্য এটাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বলা হয়। বিশ্বব্যাপী সংঘটিত এই সংঘাত ১৯১৪ সালে শুরু হয়ে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলে। এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং ধ্বংসাত্মক যুদ্ধগুলির মধ্যে একটি। যাতে বিশ্বের সব বড় বড় শক্তি জড়িত ছিল এবং ভূ-রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপকে পুনর্নির্মাণ করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কারন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্নিহিত কারণগুলি জটিল এবং আন্তঃসম্পর্কিত ছিল। যুদ্ধের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ি এমন কিছু মূল কারণগুলির মধ্যে অন্যতম কয়েকটি কারন-
১. সামরিকায়ন: প্রধান ইউরোপীয় শক্তিগুলি তাদের সামরিক বাহিনী এবং অস্ত্র তৈরি করে একটি বিশাল অস্ত্র প্রতিযোগিতায় জড়িত ছিল। এটি একটি উত্তেজনাপূর্ণ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করেছিল, যেখানে দেশগুলি প্রয়োজনে একে অন্যের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে প্রস্তুত ছিল।
২. জোট: বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নিরাপত্তা বাড়াতে এবং আগ্রাসন রোধ করতে জোট গঠন করে। দুটি প্রধান জোট ব্যবস্থা ছিল ট্রিপল এন্টেন্টে (ফ্রান্স, রাশিয়া এবং যুক্তরাজ্য নিয়ে গঠিত) এবং ট্রিপল অ্যালায়েন্স (জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবং ইতালি)।
৩. সাম্রাজ্যবাদ: ইউরোপীয় শক্তিগুলি সারা বিশ্বে উপনিবেশ এবং বিভিন্ন অঞ্চল দখলের জন্য প্রতিযোগিতা করছিল, যার ফলে উত্তেজনা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
৪. জাতীয়তাবাদ: বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী ও জাতির মধ্যে জাতীয়তাবাদী উচ্ছ্বাস এবং গর্ব ও পরিচয়ের দৃঢ় অনুভূতি তাদের স্বার্থ রক্ষা এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার প্রবল ইচ্ছা এই যুদ্ধের শুরুর পেছনে অবদান রাখে।
৫. আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যা: যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ট্রিগার ছিল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্ডিনান্ড এবং তার স্ত্রীকে বসনিয়ার সারাজেভোতে, ২৮ জুন, ১৯১৪ সালে একজন সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদী দ্বারা হত্যা করা। এই ঘটনাটি যুদ্ধ ঘোষণার দিকে ধাবিত করে।
যুদ্ধে আমেরিকার যোগদানের প্রেক্ষাপট:
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে না জড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের জনপ্রিয়তা কিছুটা হলেও বেড়েছিল। ১৯১৬ সালের নভেম্বরে সামান্য ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছেলেন তিনি। কিন্তু এর ঠিকা পাাঁচ মাস পরেই জাতিকে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার আহ্বান জানান প্রেসিডেন্ট উেইলসন। তিনি তখন বলেছিলেন, গণতান্ত্রিক আদর্শ টিকিয়ে রাখতে বিশ্বকে অবশ্যই নিরাপদ করতে হবে। এর মধ্যে আমাদের নিজের স্বার্থোদ্ধারের কিছু নেই। কোন ভূখন্ড জয় বা কাউকে অধীনস্থ করার আকাঙ্খা নেই আমাদের।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপকে পরিণত করেছিল বিশাল এক কসাইখানায়। যুক্তরাষ্ট্র লড়াইতে যোগ দেওয়ার পর সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটে।
বেশ কয়েকটি কারণ ছিল যা আমেরিকার সংঘাতে প্রবেশের দিকে পরিচালিত করেছিল:
১. অনিয়ন্ত্রিত সাবমেরিন যুদ্ধ: জার্মানি, কেন্দ্রীয় শক্তিগুলির মধ্যে একটি, অনিয়ন্ত্রিত সাবমেরিন যুদ্ধের একটি নীতি প্রকাশ করেছিল, যেখানে বলা হয়- তাদের সাবমেরিনগুলি ব্রিটেনের আশেপাশের জলসীমায় প্রবেশ করা বেসামরিক জাহাজ সহ যে কোনও জাহাজকে আক্রমণ করবে। এর ফলে কেন্দ্রীয় শক্তি বেশ কয়েকটি আমেরিকান জাহাজ ডুবিয়ে দেয়, যার ফলে আমেরিকান জীবন ও সম্পত্তির ব্যপক ক্ষতি হয়। যা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের মাঠে টেনে আনে।
২. জিমারম্যান টেলিগ্রাম: ১৯১৭ সালের জানুয়ারিতে, ব্রিটিশরা জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জিমারম্যানের মেক্সিকোতে জার্মান রাষ্ট্রদূতের কাছে একটি গোপন বার্তা আটকে দেয়। টেলিগ্রাম জার্মানি এবং মেক্সিকোর মধ্যে একটি সামরিক জোটের প্রস্তাব করেছিল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবেশ করে, মেক্সিকোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে উত্সাহিত করা হয়। বিনিময়ে, মেক্সিকোকে টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো এবং অ্যারিজোনায় হারানো অঞ্চলগুলি ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে। এই ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং যুদ্ধের পক্ষে জনগণের মনোভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
৩. অর্থনৈতিক স্বার্থ: যুদ্ধে অংশগ্রহনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঋণ ও সরবরাহের মাধ্যমে মিত্র শক্তিকে (প্রাথমিকভাবে ব্রিটেন ও ফ্রান্স) আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিত্রশক্তিকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুবিধা দেখেছিল এবং যদি মিত্ররা পরাজিত হয়, তাহলে একটি উদ্বেগ ছিল যে তারা তাদের ঋণ পরিশোধ করতে পারবে না, যার ফলে আমেরিকান কোম্পানিগুলির আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। যা যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের মাঠে টেনে আনে।

৪. মিত্রদের প্রতি সহানুভূতি: অনেক আমেরিকান সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে মিত্র শক্তির সাথে বিশেষ করে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের সাথে সংহতির অনুভূতি অনুভব করেছিল। বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে জার্মান নৃশংসতার প্রচার এবং রিপোর্ট মিত্রদের পক্ষে যুদ্ধে যোগদানের জন্য জনসমর্থনকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
৫. উইলসনের আদর্শবাদ: রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন গণতন্ত্র, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপর ভিত্তি করে একটি বিশ্বব্যবস্থার একটি দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ইউরোপে একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা এবং এই ধরনের বিধ্বংসী সংঘাত যাতে আর না ঘটে তা নিশ্চিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৈতিক দায়িত্ব ছিল।
যুদ্ধে জড়ানো শত কারন থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জনমত প্রাথমিকভাবে বিভক্ত ছিল। কিছু আমেরিকান ইউরোপীয় দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষতা এবং অ-সম্পৃক্ততার পক্ষে, অন্যরা হস্তক্ষেপের পক্ষে। ১৯১৫ সালে আরএমএস লুসিটানিয়া এবং জিমারম্যান টেলিগ্রামের বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পরেই মার্কিন সরকার এবং জনগণের সম্পৃক্ততা ও জনমতের উপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র ১৯১৭ সালে যুদ্ধে প্রবেশের দিকে সরে যায়।
অবশেষে ৬ এপ্রিল, ১৯১৭ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
ফলাফল: ১১ নভেম্বর, ১৯১৮ সালে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। কেন্দ্রীয় শক্তিগুলি (জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, অটোমান সাম্রাজ্য এবং বুলগেরিয়া) মিত্র শক্তির কাছে পরাজিত হয়েছিল (প্রাথমিকভাবে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইতালি এবং পরে যুক্তরাজ্যের দ্বারা)। যুদ্ধের ফলে লক্ষাধিক মানুষ মারা যায় এবং আহত হয় এবং ইউরোপ জুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি করে।
১৯১৯ সালে স্বাক্ষরিত ভার্সাই চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটায় এবং আঞ্চলিক ক্ষতি, ব্যাপক ক্ষতিপূরণ এবং যুদ্ধের সকল দায় স্বীকার সহ জার্মানির উপর কঠোর শাস্তি আরোপ করা হয় ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে।
ভার্সাই চুক্তি শর্তগুলি জার্মানিতে অসন্তোষের সৃষ্টিতে ব্যপক অবদান রাখে এবং শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা পালন করেছিল।
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


মন্তব্য