ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫ ফাল্গুন ১৪৩৩
 
শিরোনাম

যুদ্ধ শেষ করতে চায় ইসরায়েল, ইরানের কাছে পাঠিয়েছে বার্তা

অনলাইন ডেস্ক
২৩ জুন, ২০২৫ ২১:১৪
অনলাইন ডেস্ক
যুদ্ধ শেষ করতে চায় ইসরায়েল, ইরানের কাছে পাঠিয়েছে বার্তা

ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হামলার পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল। এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার আরব মিত্রদের মাধ্যমে ইরানের কাছে ইসরায়েলের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। আরব ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সোমবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

ইসরায়েলি টেলিভিশন চ্যানেল-১২ এর খবরে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ‘অপারেশন রাইজিং লায়নের’ মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি নির্মূল করে নিজেদের সামরিক লক্ষ্য খুব দ্রুত অর্জন করতে পারবে বলে প্রত্যাশা ইসরায়েলের।

আরবের কর্মকর্তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, ইসরায়েল এই অভিযান শিগগিরই শেষ করতে চায় বলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের আরব মিত্রদের মাধ্যমে ইরানকে বার্তা দিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব দেওয়া ছাড়া ইরান এখনই অভিযান শেষ করতে চায় না। 

ইসরায়েলি এক কর্মকর্তা রোববার টাইমস অফ ইসরায়েলকে বলেছেন, ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি বাতিল করতে রাজি হলে ইসরায়েল এখনই বোমা হামলা বন্ধ করার জন্য প্রস্তুত আছে। তিনি বলেন, ‘‘এই অভিযান বন্ধের বিষয়টি আমাদের ওপর নয়, বরং ইরানের ওপর নির্ভর করছে। আমরা চাইলে এখনই শেষ করতে পারি। সেক্ষেত্রে যদি একটি চুক্তি হয়, তাহলে ইসরায়েল তার অভিযানের ফলাফলে সন্তুষ্ট থাকবে।’’

চ্যানেল-১২ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযান শেষ করার দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, ইসরায়েল একতরফাভাবে ঘোষণা করতে পারে যে, তারা তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন করেছে এবং ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করেছে।

দ্বিতীয়ত, উভয়পক্ষই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিতে পারে। যদিও ইসরায়েল এটিকে কম গ্রহণযোগ্য হিসেবে মনে করে।

তবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ না করলে ইসরায়েল আরও জোরালোভাবে পাল্টা হামলা চালাবে। আর এই হামলার প্রধান টার্গেট হবে ইরানি শাসকগোষ্ঠী। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াল্লা বলছে, সোমবার তেহরানের কেন্দ্রস্থলে সরকার-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল এক ধরনের বার্তা দিতে চেয়েছে। সেটি হলো ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে এই ধরনের ইসরায়েলি হামলা আরও বৃদ্ধি পাবে।

নিরাপত্তা সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে ওয়াল্লা বলছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিই এই লড়াই বন্ধে তেহরানের রাজি হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায়।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা ইরানকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনবে এবং শেষ পর্যন্ত তারা পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে রাজি হবে বলে তারা প্রত্যাশা করছেন।

তবে যদি ইসরায়েল মনে করে ইরান আবারও এই কর্মসূচি শুরু করতে চাইছে, তাহলে তারা পুনরায় বিমান হামলা চালাবে। এর আগে, রোববার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল তাদের লক্ষ্য অর্জনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর গুরুতর ক্ষতি করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, ইসরায়েল কোনও দীর্ঘস্থায়ী ‌‌‌‘যুদ্ধে’ জড়াতে চায় না। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান বন্ধ করার প্রশ্নই আসে না বলেও মন্তব্য করেছেন নেতানিয়াহু।

সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

প্রাসঙ্গিক
    মন্তব্য

    সাক্ষাৎকারে মার্কিন ইতিহাসবিদ

    ‘ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট, দ্বিতীয় প্রজন্মের অপরাধী’

    অনলাইন ডেস্ক
    ২৩ জুন, ২০২৫ ২০:৫৯
    অনলাইন ডেস্ক
    ‘ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট, দ্বিতীয় প্রজন্মের অপরাধী’

    মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একজন ফ্যাসিস্ট ও যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের জন্য বাস্তব হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ইতিহাস বিশারদ মার্কিন অধ্যাপক এভার্ন শোয়্যাপ।

     

     

    এমনকি ট্রাম্পকে ‘বোকা সুযোগসন্ধানী’ ও ‘শ্বেতাঙ্গ দ্বিতীয় প্রজন্মের অপরাধী’ বলেও অভিহিত করেছেন এভার্ন শোয়্যাপ।বলেছেন, তিনি এমনই একজন অপরাধী যিনি কিনা নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির মতাদর্শে বিশ্বাসী, আর এই দলটিই জায়োনিস্ট শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করে।

    শোয়্যাপের মতে, ট্রাম্পের নীতিগুলো কাঁচা, অপরিপক্ব এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে। 

    তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প যা কিছু সিদ্ধান্ত নেবে, তা ক্ষতিকরই হবে।’ 

    একই সঙ্গে তিনি মার্কিনিদের সতর্ক করে বলেন, ‘চলমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে সেনা পাঠানো আরও বিপজ্জনক হতে পারে, তবে ট্রাম্প তা করবেন না।’

    এই মার্কিন বিশ্লেষক বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের জটিল বাস্তবতা বোঝার মতো মেধা ট্রাম্পের নেই। তাই তার বক্তব্যে ছিল স্ববিরোধিতা ও অস্পষ্টতা।’

    ইসরাইল-ইরান চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ এবং এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে এভার্ন শোয়্যাপ বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের এক কুয়াশাচ্ছন্ন পরিস্থিতিতে আছি। আমরা জানি না, বিশেষত আমরা জানিই না আমেরিকার এই হস্তক্ষেপের প্রকৃতি কী এবং এর দীর্ঘমেয়াদি ফল কী হতে পারে।’

    প্রসঙ্গত, পারমাণবিক ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে টানা পাঁচদফা আলোচনা করে যুক্তরাষ্ট্র। ষষ্ঠ দফার আলোচনায় বসার আগেই গত ১৩ জুন থেকে ইরানের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা শুরু করে যুদ্ধবাজ ইসরাইল।

    জবাবে শতশত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ইসরাইলে পালটা হামলা চালায় ইরানও। যাতে রীতিমত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ইসরাইল। এর জেরে মিত্র দেশকে সাহায্য ও ইরানের কোমর ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে শনিবার রাতে ইরানের প্রধান তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা- ফোর্দো, নাতাঞ্জ ও ইস্ফাহানে বাংকার বাস্টার বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

    ইরান-ইসরাইল সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের এভাবে জড়িয়ে পড়াকেই এ অঞ্চলে বৃহত্তর সংঘাতের জন্য দায়ী করছেন অনেকে।তারই ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প প্রশাসনের সমালোচনা করলেন মার্কিন বিশ্লেষক এভার্ন শোয়্যাপও।

    প্রাসঙ্গিক
      মন্তব্য

      হরমুজ প্রণালী কী? কেন এই জলপথ গুরুত্বপূর্ণ?

      অনলাইন ডেস্ক
      ২৩ জুন, ২০২৫ ২০:২৯
      অনলাইন ডেস্ক
      হরমুজ প্রণালী কী? কেন এই জলপথ গুরুত্বপূর্ণ?

      ইরানের তিনটি সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন বিমান বাহিনীর হামলার যে অভূতপূর্ব নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তা নিশ্চিতভাবেই গোটা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাকে আরও গভীর ও পোক্ত করেছে।

      বস্তুত, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ইরানের সাবেক রাজা বা শাহ রেজা পাহালভীর পতন এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় ইসলামপন্থি শাসকগোষ্ঠী আসীন হওয়ার পর এই প্রথম ইরানে হামলা চালাল পশ্চিমের কোনো দেশ।

      এখন ইরানের জবাব দেওয়ার পালা। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে মার্কিন এই হামলার জবাব দিতে পারে ইরান।

      প্রস্থ হরমুজ প্রণালীর দৈর্ঘ ৩৩ কিলোমিটার এবং প্রস্থ স্থানভেদে সর্বোচ্চ ৩৯ কিলোমিটার থেকে সর্বনিম্ম তিন কিলোমিটার। এই প্রণালীর একপাশে ইরান, অপরপাশে ওমান। জলপথটি একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরকে আরব সাগর ও ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং ইরানকে আরব উপদ্বীপ থেকে ইরানকে পৃথক করেছে।

      বিশ্বের শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথগুলোর একটি এই হরমুজ প্রণালী। প্রতিদিন এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্দরে পৌঁছায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এবং তার সমপরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতি গ্যাস। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে যত তেল এবং তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহ হয়, তার এক পঞ্চমাংশই হয় এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে।

      জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজার পর্যবেক্ষক সংস্থা ভোরটেক্সা’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে ১ কোটি ৭৮ লাখ থেকে ২ কোটি ৮ লাখ পরিশোধিত-অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস।

      জ্বালানি তেল উত্তোলন ও বিপননকারী দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের সদস্যরাষ্ট্র সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ইরাক তাদের বেশিরভাগ তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে এশিয়ার দেশগুলোতে পাঠায়।

      এই পথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে আছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ৫ম নৌবহর।

      ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিলে কী হবে?

      ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তার ব্যাপক প্রভাব পড়বে। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে যে পরিমান তেল সরবরাহ হয়, হঠাৎ করে তার এক পঞ্চমাংশ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়বে লাফিয়ে লাফিয়ে।

      তবে ইরান যদি সত্যিই এমন করে, তাহলে তা হবে দেশটির জন্য এক প্রকার আত্মঘাতী পদক্ষেপ। কারণ জ্বালানি তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ইরানের তেলও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায় এই জলপথ বেয়ে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো বর্তমানের ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে ইরানের পাশে আছে। যদি হরমুজ প্রণালী ইরান বন্ধ করে দেয়— তাহলে নিজেদের স্বার্থেই তারা সমর্থন প্রত্যাহার করে নেবে— এমন আশঙ্কা রয়েছে ব্যাপক।

      এবং শুধু ইরানের নিজের বা উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলোই নয়— হরমুজ প্রনালী বন্ধ হয়ে গেলে বড় ক্ষতি হবে চীনেরও। কারণ, চীন ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ইরানের মোট উৎপাদিত তেলের ৯০ শতাংশই যায় চীনে।

      ইরান কি সত্যিই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে?

      রোববার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল প্রেস টিভি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইরানের পার্লামেন্ট মজলিশে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া বিষয়ক একটি বিল পাস হয়েছে; তবে সেখানে উল্লেখ আছে যে এ ইস্যুতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

      ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি রোববার জানিয়েছেন, ইরানে মার্কিন বাহিনীর বোমাবর্ষণের জন্য ‘গুরুতর পরিণতি’ ঘটবে।

      এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মার্কো রুবিও জানিয়েছেন ইরানকে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া থেকে বিরত রাখতে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চেয়েছে ওয়াশিংটন।

      মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে সোমবার তিনি বলেছেন, “যদি তারা সত্যিই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়— তাহলে তা হবে একটি ভয়াবহ ভুল পদক্ষেপ এবং একই সঙ্গে তাদের নিজেদের জন্য অর্থনৈতিক আত্মহত্যা। কারণ এই প্রণালী দিয়ে তাদের তেলও পরিবহন করা হয়।”

      “আমি বেইজিংকে এ ইস্যুতে ইরানের সঙ্গে কথা বলার আহ্বান জানিয়েছি। কারণ তারা ইরানের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।”

      সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

      প্রাসঙ্গিক
        মন্তব্য

        কতগুলো পারমাণবিক বোমা রয়েছে ইসরাইলের কাছে?

        অনলাইন ডেস্ক
        ২৩ জুন, ২০২৫ ২০:১৩
        অনলাইন ডেস্ক
        কতগুলো পারমাণবিক বোমা রয়েছে ইসরাইলের কাছে?

        গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকেই যে ইসরাইলের নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, সেটি কারোরই অজানা নয়। যদিও দেশটিকে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে বিষয়টি স্বীকার করতে দেখা যায়নি। 

        বরং ইরান ‘পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি রয়েছে’ দাবি করে সপ্তাহখানেক আগে দেশটির ওপর হামলা শুরু করেছে ইসরাইল। জবাবে ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে। এ অবস্থায় দেশ দুটি মধ্যে সংঘাত ক্রমেই আরও বাড়তে দেখা যাচ্ছে।

        শান্তি ও নিরাপত্তা বিষষক স্পেনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডেলাস সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের গবেষক ও পদার্থবিজ্ঞানী হাভিয়ের বোহিগাস বিবিসি মুন্ডোকে বলছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলই একমাত্র দেশ, যার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) গত মার্চ মাসে জানিয়েছিল যে, ইরান এখন পর্যন্ত ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তবে পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে হলে এটি ৯০ শতাংশের ওপরে অর্জন করতে হবে।

        এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরানসহ অন্যান্য দেশগুলো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর করলেও ইসরাইল এখন পর্যন্ত সই করেনি।

        ফলে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মতো একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর আইএইএ-কে তাদের সম্ভাব্য পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করতে দিতে তারা বাধ্য নয়। যদিও ইসরাইল নিজে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার একজন সদস্য।

        যেহেতু দেশটি পরিদর্শনের অনুমতি দেয় না, সেকারণে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে খুব একটা তথ্যও পাওয়া যায় না।

        যতটুকু তথ্য জানা যায়, সেগুলো মূলত ফাঁস হওয়া তথ্য, মার্কিন প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি বিভাগের প্রতিবেদন এবং পারমাণবিক কর্মসূচি পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর গবেষণা থেকে প্রাপ্ত।

        এছাড়াও ইসরাইলের সাবেক পরমাণু প্রকৌশলী মোর্দেচাই ভানুনুর সাক্ষাৎকার থেকেও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে একটা ধারণা পাওয়া যায়।

        এক সময় ইসরাইলি পারমাণবিক কেন্দ্রে কর্মরত ভানুনু-কে গত শতাব্দীর আশির দশকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। পরে ১৯৮৬ সালে তিনি ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য সানডে টাইমসের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন।

        ওই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমেই ভানুনু তখন বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন যে, ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এই তথ্য প্রকাশ করার জন্য তাকে অনেক বছর জেলও খাটতে হয়েছে।

        আমিমুত

        পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে তথ্য প্রকাশিত হলেও ইসরাইলের নেতারা নিজ মুখে কখনও সেটি স্বীকার করেননি, আবার অস্বীকারও করতে দেখা যায়নি। এক্ষেত্রে তারা বরং অস্পষ্টতা রাখার নীতি মেনে চলেন।

        পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে ইসরাইলের সরকারের এই নীতিকে বলা হয় ‘আমিমুত’, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা’।

        যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যাভনার কোহেন উল্লেখ করেছেন, ইসরাইলের পারমাণবিক যুগে এই নীতিটি সম্ভবতঃ তাদের সবচেয়ে স্বতন্ত্র ব্যাপার। 

        যদিও ইসরাইলের ইতিহাসে এই নীতি মোটেও নতুন কিছু নয়। দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি শিমন পেরেজ তার আত্মজীবনীতেও বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

        তিনি বলেছেন, অস্পষ্টতার শক্তি যে কত প্রচণ্ড, সেটি আমরা শিখেছি...যারা দ্বিতীয়বার হলোকস্ট করতে চেয়েছিলেন, তাদের জন্য এই অস্পষ্টতা বা সন্দেহ একটি শক্তিশালী প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করেছে।

        অধ্যাপক কোহেনও তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে অস্বচ্ছতার এই নীতি ইসরাইলের সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলগত এবং কূটনৈতিক অর্জন।

        ডেলাস সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের গবেষক জেভিয়ার বোহিগাস বিবিসি মুন্ডোকে বলেন, ইসরাইল তার নিজের পছন্দেই অস্পষ্টতার নীতি গ্রহণ করেছে এবং সেটা হয়েছে। যেহেতু দেশটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর করেনি, সে কারণে তাদের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন করতে দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।

        তিনি আরও বলেন, সামরিক শক্তির ক্ষেত্রে বেশিরভাগই দেশই সবকিছু স্পষ্ট করতে চায় না। তবে পারমাণবিক ইস্যুতে ইসরাইল আরও বেশি অস্পষ্টতা বজায় রাখে।

        পদার্থবিজ্ঞানী বোহিগাস বলেন, এটির মাধ্যমেই তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে বলে মনে হচ্ছে। ফলে আমরা এতটুকুই জানতে পারছি যে, দেশটির একটি পারমাণবিক কর্মসূচি রয়েছে এবং তাদের কাছে একাধিক পারমাণবিক বোমা আছে, যা তারা প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারে। তবে ইসরাইলের নেতারা অবশ্য এ বিষয়টি কখনও স্বীকার বা অস্বীকার করেননি।

        ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যাভনার কোহেন বলেন, এই অস্পষ্টতাই ইসরাইলকে অস্তিত্বগত হুমকির বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিপরীতে দেশটিকে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা নৈতিকও, কোনো ধরনের মূল্যই দিতে হয়নি।

        নেতানিয়াহু সমর্থন যোগানো ইসরাইলি গণমাধ্যম ইসরাইল হায়োম, যা দেশটিতে সবচেয়ে বেশি প্রচারিত সংবাদপত্র, দেশটির পারমাণবিক ক্ষমতা সম্পর্কে গোপনীয়তার নীতির বিষয়ে একটি দীর্ঘ নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।

        সেখানে বলা হয়েছে, ইসরাইলের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো যেকোনো মূল্যে (মধ্যপ্রাচ্যে) পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানো।

        কারণ আমিমুত নীতির সমর্থকরা মনে করেন, ইসরাইল তার অস্পষ্টতার নীতি থেকে সরে আসলে মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।

        যদিও পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর আর্মস কন্ট্রোল অ্যান্ড নন-প্রলিফারেশন’ জানাচ্ছে যে, ইসরাইলের এই ‘অস্পষ্টতার নীতিই’ বরং মধ্যপ্রাচ্যকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ‘অন্যতম প্রধান বাধা’।

        পরমাণু কর্মসূচি সামনে এসেছিল যেভাবে

        ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে প্রথমবার তথ্য জানা যায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ১৯৬২ সালের একটি নথি থেকে।

        গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে দক্ষিণ ইসরাইলে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে ফ্রান্স ও ইসরাইলের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল বলে ওই নথিতে বলা হয়।

        ডেলাস সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের গবেষক জেভিয়ার বোহিগাস বলছেন, ফ্রান্সের সঙ্গে ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল প্লুটোনিয়াম অর্জনের জন্য একটি চুল্লি তৈরি করা।

        গুগল ম্যাপে শহরটির অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, নেগেভ নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টার নামের ওই পরমাণু গবেষক কেন্দ্রটি ডিমোনা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে একটি মরুভূমির মাঝখানে অবস্থিত।

        প্রথমদিকে ওই স্থাপনাটিকে বস্ত্রশিল্পের কারখানা এবং কৃষি ও ধাতুবিদ্যা সংক্রান্ত গবেষণা কেন্দ্র হিসাবে বর্ণনা করেছিল ইসরাইল। পরবর্তীতে ষাটের দশকে এসে ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়ন তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি প্রথমবার স্বীকার করেন।

        দেশটির পার্লামেন্টে দেওয়া এক ভাষণে পারমাণু গবেষণা কেন্দ্রটির উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ ছিল বলে দাবি করেন।

        বোহিগাস বলেন, কিন্তু মার্কিন প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে এটা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, ইসরায়েলের একটি পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি রয়েছে।

        যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রকাশিত গোপন নথি থেকে জানা যায়, ১৯৭৫ সালের মধ্যেই দেশটির সরকার নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল যে, ইসরাইলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। এরপর আশির দশকে এসে পরমাণু প্রকৌশলী মোর্দেচাই ভানুনু ইসরাইল সরকারের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয় আবারও সামনে আনেন।

        সানডে টাইমসের কাছে অভিযোগ

        ইসরাইলি পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে আরও বিস্তারিতভাবে জানা যায় গত শতাব্দীর আশির দশকে ব্রিটিশ গণমাধ্যম সানডে টাইমসে প্রকাশিত ইসরাইলি পরমাণু প্রকৌশলী মোর্দেচাই ভানুনুর সাক্ষাৎকার থেকে।

        ভানুনু ১৯৮৫ সালে চাকরিচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় নয় বছর যাবত ইসরায়েলের ডিমোনা পারমাণবিক কেন্দ্রে কাজ করেন। ওই নয় বছরে তিনি গোপনে স্থাপনাটির বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার বেশ কিছু ছবি তোলেন।

        সেই ছবিতে দেখা যায়, কেন্দ্রটিতে পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিষ্কাশনের সরঞ্জাম এবং পরীক্ষাগার দেখা যায়।

        ভানুনু ১৯৮৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পরমাণু অস্ত্রবিরোধী একটি সম্মেলনে অংশ নেন। সেখানেই কলম্বিয়ার ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক অস্কার গুয়েরেরোর সঙ্গে তার দেখা হয়। গুয়েরেরোই তাকে ইসরাইলি পরমাণু কেন্দ্রের ছবিগুলো প্রকাশে রাজি করাতে সক্ষম হন।

        এরপর ভানুনু ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য সানডে টাইমসের সাংবাদিক পিটার হাউনামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

        এ বিষয়ে হাউনাম বিবিসির ‘উইটনেস হিস্ট্রি’ অনুষ্ঠানকে বলেন, বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ইসরাইল তার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়বে বলে বিশ্বাস করতেন ভানুনু। যদিও বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটেনি।

        উইটনেস হিস্ট্রিতে প্রচারিত তথ্য থেকে জানা যায় যে, সাক্ষাৎকার প্রচারের পর ভানুনুকে মাদক সেবন করানোর পর অপহরণ করে ইসরাইলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে রাষ্ট্রদ্রোহ ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তাকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেয় ইসরাইল। তবে ভানুনু অবশ্য তাতে দমে যাননি।

        দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ২০০৪ সালে মুক্তি পান তিনি। তখন ভানুনু বলেছিলেন যে, অতীতের ভূমিকার জন্য তিনি মোটেও অনুতপ্ত নন, বরং গর্বিত এবং খুশি এ ঘটনার পর তাকে আবারও সাজা দেওয়া হয়।

        বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ইসরাইল ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে তার ওপর। এই মোর্দেচাই ভানুনুর কল্যাণেই ইসরাইলের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি সম্পর্কে বিশ্ববাসী নিশ্চিত হয়েছিল।

        ঠিক কতগুলো বোমা আছে?

        ১৯৮৬ সালে ভানুনু জানিয়েছিলেন যে, ওই সময় ইসরাইলের কাছে আনুমানিক ১০০ থেকে ২০০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড ছিল।

        বোমার সামনের যে অংশে মূলত বিস্ফোরক রাখা থাকে, সেটি ওয়ারহেড নামে পরিচিত। ভানুনু কয়েকশ ওয়ারহেড থাকার দাবি করলেও পরমাণু অস্ত্র পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো অবশ্য তা বলছে না।

        সুইডেনভিত্তিক পরমাণু অস্ত্র পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, বর্তমানে ইসরাইলের কাছে ৯০টির মতো ওয়ারহেড থাকতে পারে।

        এসব ওয়ারহেড তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্লুটোনিয়াম দক্ষিণ ইসরাইলের ডিমোনা শহরের কাছে অবস্থিত নেগেভ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রের চুল্লিতে উৎপাদিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

        যদিও ইসরাইলের সরকার দাবি করে আসছে যে, পরমাণু চুল্লিটির উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ২৬ মেগাওয়াট। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন যে, চুল্লিটির উৎপাদন সক্ষমতা আরও অনেক বেশি।

        ইসরাইলের অন্যান্য পারমাণবিক স্থাপনার মতো এই চুল্লিটিরও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নজরদারির বাইরে রয়েছে। ফলে সেটির অপব্যবহার হচ্ছে কী-না এবং পারমাণবিক কর্মসূচি কতটা শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি স্বাধীনভাবে যাচাই করার সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে ইসরাইল যদি তথ্য না দেয়, তাহলে কীভাবে জানা যাবে যে, দেশটির কাছে কতগুলো পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে?

        যদিও পদ্ধতিটি আগেও বিভিন্ন সময় ব্যবহৃত হয়েছে। ইসরাইলের মতো উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রেই একই পদ্ধতি প্রয়োগ করে দেশটির ‘পারমাণবিক ওয়ারহেড’ সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। উত্তর কোরিয়ার কাছে প্রায় ৫০টি ওয়ারহেড রয়েছে বলে অনুমান করেন তারা।

        বোহিগাস জানান যে, ২০১১ সালে নিউ স্টার্ট ট্রিটি স্বাক্ষরের আগে যখন পরমাণু স্থাপনাগুলো পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক ছিল না, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে থাকা পারমাণিক বোমার সংখ্যার বিষয়ে আনুমানিক একটা ধারণা পেয়েছিল পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো। পরে তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর দেখা গেছে, সেগুলো বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

        পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত মধ্যপ্রাচ্য কতদূর?

        ২০১২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইসরাইলের পারমাণবিক কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক দলের পরিদর্শন উন্মুক্ত করার জন্য আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। কিন্তু ইসরাইলের পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডাও সেই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। 

        ১৯৭০ সালে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর ও অনুমোদন করেছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে ইসরাইলি হামলার পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, তারাও চুক্তিটি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করছেন।

        অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যকে পারমাণবিক মুক্ত অঞ্চল ঘোষণার অনুরোধ নিয়মিতভাবেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জমা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইসরায়েল সেটি প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি এটিকে তারা তাদের আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর আক্রমণ বলেও বিবেচনা করেছে।

        জাতিসংঘের নিরস্ত্রীকরণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ইসরাইল মনে করে মধ্যপ্রাচ্যকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল ঘোষণার প্রস্তাবগুলো আদতে ওই অঞ্চলের প্রকৃত ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সক্ষম না।

        জেভিয়ার বোহিগাস বলছেন, এটা খুবই উদ্বেগজনক যে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব এবং আন্তর্জাতিক সব আইন লঙ্ঘনকারী ইসরাইলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং অন্য কোনো দেশ তাদের পরমাণু কার্যক্রম বন্ধ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।

        তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

        প্রাসঙ্গিক
          মন্তব্য

          নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যেভাবে সামরিক শক্তি অর্জন করেছে ইরান

          অনলাইন ডেস্ক
          ২৩ জুন, ২০২৫ ১৯:৪১
          অনলাইন ডেস্ক
          নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যেভাবে সামরিক শক্তি অর্জন করেছে ইরান

          ইরান-ইসরাইল সংঘাতের তীব্রতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। দুই দেশই পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সংঘাতের এই পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়তে পারে এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

          সম্প্রতি ইসরাইলে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এটিকে ইসরাইলের অপরাধের ‘ন্যূনতম শাস্তি’ বলে উল্লেখ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

          এ হামলার কৌশলগত দিক বিশ্লেষণ করে আমেরিকার ইনস্টিটিউট ফর দ্যা স্টাডি অফ ওয়ার বলছে, এত বেশি সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র এমনভাবে ছোড়া হয়েছে; যেটি ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে।

          ইসরাইলি বাহিনী সবার আগে ঘনবসতি এলাকায় হামলা ঠেকাতে চেয়েছে এবং তুলনামূলক কম ঘনবসতি এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়ে। এজন্য বেশ কয়েকটি বিমানঘাঁটি যেগুলো তুলনামূলক কম ঘনবসতি এলাকায় সেগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি ইসরাইল।

          তেল আবিবের কাছে গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সদর দপ্তরের কাছেও আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। আগে থেকেই ইসরাইল বা আমেরিকার জন্য একটা বড় মাথাব্যথার জায়গা ছিল ইরান।

          লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি অথবা সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর অস্ত্রশস্ত্রের পেছনে ইরানের সম্পৃক্ততার কথা এসেছে বারবার। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ ছিল অনেক আগে থেকেই।

          আয়রন ডোমসহ শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও ইরানের হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে পারেনি ইসরাইল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বহু ধরনের নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরান কীভাবে অস্ত্র পাচ্ছে বা তৈরি করছে?

          আধুনিক অস্ত্রের ইতিহাস

          ইরানের বর্তমান অস্ত্রের সক্ষমতার পেছনে যেসব বিষয় কাজ করেছে সেটা জানতে একটু পেছন থেকে শুরু করতে হবে। 

          দ্যা মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের তথ্যমাতে, ইরানের সামরিক বাহিনীর ইতিহাস আড়াই হাজার বছর পুরনো। তবে আধুনিক সেনাবাহিনী বা অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার শুরুটা হয়েছিল রেজা খান বা রেজা শাহ পাহলভির হাত ধরে যিনি ১৯২০-এর দশকে সেনাকমান্ডার থেকে পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী ও রাজা হয়েছিলেন।

          সামরিক বাহিনীর কমান্ডার হওয়ার পর তিনি আরতেশ বাহিনী গঠন করেন; যেটিকে আধুনিক এক সশস্ত্র বাহিনীর সূচনা হিসেবে দেখা হয়। তিনি ইরানকে একটি আঞ্চলিক শক্তিতে রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন।

          এজন্য তিনি হাজারো অফিসারকে বিদেশে মিলিটারি একাডেমিতে পাঠিয়েছিলেন, পাশাপাশি নিজ দেশের বাহিনীকে বড় করতে থাকেন এবং তাদের প্রশিক্ষণ দিতে পশ্চিমা অফিসারও নিয়োগ দেন। 

          দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরানের দখল নেয়।

          নাৎসি জার্মানির সঙ্গে সুসম্পর্কের জেরে রেজা শাহকে সরিয়ে রাজার আসনে আনা হয় তার ছেলে মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে, যিনি শাসনকালের প্রায় পুরোটা সময় পশ্চিমাপন্থি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

          পশ্চিমাদের নজর ছিল ইরানের তেলের দিকে, সেই তেলের টাকায় ৬০ থেকে ৭০ দশকজুড়ে মূলত আমেরিকা থেকে বহু আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র কেনা হয়। 

          ইরানের শেষ শাহ বা রাজা মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশকে আধুনিকায়ন করতে উদ্যোগ নিলেও জনবিচ্ছিন্নতা, একনায়কতন্ত্রএমন নানা প্রেক্ষাপটে বিপ্লবের সূচনা হয়। দাঙ্গা, ধর্মঘট আর বিক্ষোভের বাস্তবতায় দেশ ছেড়ে পালাতে হয় শাহ ও তার পরিবারকে।

          তবে তার অস্ত্র কেনা, সামরিক প্রশিক্ষণ, এমন নানা পদক্ষেপের কারণে ১৯৭৯ সালে বিপ্লবের সময় ইরানের বাহিনী ছিল সেই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর একটি।

          ইরানের সামরিক শক্তির ইতিহাস ও সক্ষমতার বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে আমেরিকার ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির প্রতিবেদনে।

          বিপ্লব, নিষেধাজ্ঞার শুরু, সামরিক দিকে মোড় ঘোরানো ইরান-ইরাক যুদ্ধ

          ইসলামি বিপ্লবের সঙ্গে আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির প্রত্যাবর্তন বা উত্থানেও সমস্যা ছিল না, সমস্যা বাঁধে কয়েক মাসের মাথায় যখন তার অনুগত একদল শিক্ষার্থী তেহরানে মার্কিন দূতাবাসের দখল নিয়ে ৫২ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে। তাদের দাবি ছিল, দেশান্তরী শাহকে বিচারের জন্য তেহরানে আনা।

          চারশো ৪৪ দিন স্থায়ী হওয়া এই সংকটের জেরে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র।

          ইরান সেসময় অনেকটা একঘরে এবং সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। সেটাকেই ‘প্রথম অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা’ বলা যায়; যার জেরে তখন পর্যন্ত বাকি থাকা অস্ত্রের সরবরাহ আর পায়নি ইরান।

          শাহ পাহলভির রেখে যাওয়া সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি ইসলামিক রেভল্যুশন গার্ড কর্পস বা বিপ্লবী বাহিনী গড়ে তোলা হয় আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে।

          ১৯৮০ সালে ইরানে ইরাকের হামলা 

          প্রাথমিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও ধীরে ধীরে পেশাদারিত্ব বাড়তে থাকে নবগঠিত বিপ্লবী গার্ডের। ১৯৮২ সালে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনীকে হটিয়ে পাল্টা হামলা করে ইরান। প্রথমদিকে আগেরকার মার্কিন অস্ত্র দিয়ে মোকাবিলা করলেও যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে এক পর্যায়ে জোড়াতালি দেওয়া শুরু করতে হয়।

          যেমন একটি ফাইটার এফ-ফোরটিনের যন্ত্রাংশ আরেকটায় লাগিয়ে এমনভাবে, বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন ড. হুশ্যাং হাসান ইয়ারি, যিনি সামরিক ও ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক এবং কানাডার রয়্যাল মিলিটারি কলেজের একজন এমিরেটাস অধ্যাপক। তিনি বলেন, লিবিয়া থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি স্কাড মিসাইল ও যন্ত্রাংশ এনে, রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং করে কীভাবে বানানো হয়েছে, সেটা দেখে নিজেরা বানানোর চেষ্টা করে।

          ড. হুশ্যাং হাসান ইয়ারি আরও বলেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিগ্যানও গোপনে কিছু অস্ত্র বিক্রি করে, যা কন্ট্রা স্ক্যান্ডাল নামে পরিচিত। ইসরাইল কিছু অস্ত্র পায়, উত্তর কোরিয়া থেকেও ক্ষেপণাস্ত্র নেয়। ধীরে ধীরে এগুলোর সঙ্গে নানা গবেষণা চালিয়ে প্রয়োজন মেটাতে থাকে এবং তারা অবৈধভাবে বাইরে থেকে অস্ত্র আনার একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ঢুকে যায়।

          ১৯৮৮ সালে যথেষ্ট সমর্থন এবং রসদের অভাবে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য হলেও যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়ে ইরানের সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা নীতিতে।

          পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি, সব মিলিয়ে পরবর্তী দশকগুলোতে স্বনির্ভরতা ও যুদ্ধের সক্ষমতা বাড়াতে উদ্বুদ্ধ হয় ইরান।

          বিপ্লব এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে বলে উল্লেখ করেন বিবিসি পার্সিয়ান সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক পারহাম ঘোবাদিও। তিনি আরও বলেন, বিশেষত ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়। এজন্য ‘উত্তর কোরিয়ান, চীনা এবং রাশিয়ানদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে থাকে এবং নিজেরাই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে থাকে। 

          ৯০-এর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শিয়া গোষ্ঠী আর বিভিন্ন দিকে সম্ভাব্য মিত্রদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক শক্ত করতে থাকে ইরান।

          চার দশকের বেশি সময় ধরে বহু ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসে দেশটির ওপর। শুধুমাত্র জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ইরান সংশ্লিষ্ট ছয় শতাধিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আমেরিকা।

          বর্তমান সক্ষমতা এবং এর উৎস

          ইসরাইলের এবারকার হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ২০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র; যেটি অনেক কম সময়ে আঘাত হানতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, এগুলো ঠেকানো কিছুটা কঠিন। কারণ, এর গতি।

          এপ্রিল মাসে ইসরাইলে ইরান যে হামলা করেছিল সে তুলনায় এটি একটি বড় পার্থক্যের জায়গা বলে উল্লেখ করেন পারহাম ঘোবাদি। তিনি বলেন, আগেকার হামলায় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোনের মতো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।

          যেখানে ড্রোন ইসরাইলে পৌঁছাতে ছয়-সাত ঘণ্টা সময় নেয়; সে তুলনায় এবারকার হামলায় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করেছে ইরান। যেটা ইসরাইল পৌঁছাতে গড়পড়তা দশ মিনিটের মতো সময় লাগে বলে উল্লেখ করেন পারহাম ঘোবাদি।

          প্রায় দুই হাজার কিলোমিটারের মতো দূরত্ব; এত কম সময়ে পাড়ি দেওয়ায় আগের তুলনায় বেশি আঘাত হানতে পেরেছে মনে করেন তিনি। বলেন, শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে দেখলেও ইরানের স্বল্প ও দূরপাল্লার বিভিন্ন ধরনের মিসাইল রয়েছে।

          যেমন শাহাব-৩ দুই হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত পাড়ি দিতে সক্ষম, অর্থাৎ ইসরাইল পার করে মিশর, অন্যদিকে ইউরোপ, রাশিয়া, ভারত বা চীন পর্যন্তও যেতে পারে সে ক্ষেপণাস্ত্র।

          ইরানের অস্ত্র সরঞ্জামের বড় যোগানদাতা রাশিয়া হলেও ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকেই নিজেদের তৈরি ড্রোন দিয়েছে ইরান। অনেকে বলেন, ইরান যদি একবার কিছু একটা দেখার সুযোগ পায় এবং মনে করে তাদের জন্য এটা ভালো হতে পারে তাহলে সেটা তারা বানিয়ে ফেলতে পারে।

          পারহাম ঘোবাদি বলেন, কয়েক বছর আগে আমেরিকার ড্রোন ভূপাতিত করার পর তারা ড্রোন বানাতে থাকে এবং এখন ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি তাদের প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ড্রোন। 

          তবে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ মাধ্যম আইএসএনএ’র এপ্রিল মাসের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স আরও বেশ কিছু দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের তথ্য উল্লেখ করেছ।

          হাজ কাসেম, এটি ১৪০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে, খেইবার, ২০০০ কিলোমিটার এবং সেজিল, ২৫০০ কিলোমিটার, যেটি ঘণ্টায় ১৭ হাজার কিলোমিটারের বেশি গতিতে ছুটতে সক্ষম।

          মধ্যপ্রাচ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা ইরানের সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র। বহু ধরনের মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্রের বহর ছাড়াও অনেক ধরনের অস্ত্রসম্ভার রয়েছে ইরানের।

          সেনাবাহিনীর রয়েছে অনেক ধরনের বন্দুক, ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান, রকেট লঞ্চারের মতো অস্ত্র।

          নৌবাহিনীর রয়েছে অনেক ধরনের ছোট-বড় রণতরী, নেভাল মাইন বা বিস্ফোরক, ডুবোজাহাজ, হেলিকপ্টারবাহী তরী এবং টহল জাহাজ।

          বিমানবাহিনীর আছে হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান ও বহু ধরনের ড্রোন। সাইবার শক্তিও যথেষ্ট উন্নত করেছে ইরান।

          এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধ করার দিক তো ছিলই, যেটা নিয়ে সম্প্রতি জো বাইডেনও জানিয়েছেন, ইরানে কোনো পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরাইলের হামলা তিনি সমর্থন করেন না।

          নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর বহরকে তুলনামূলক পুরনো ধাঁচের বা কম সক্ষম হিসেবে দেখা হলেও গত মঙ্গলবারের হামলা থেকে বোঝা যাচ্ছে, তাদের হামলা এবং আঘাত করতে পারার যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে, বলছিলেন পারহাম ঘোবাদি।

          গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের তথ্য অনুয়ায়ী, সামরিক সক্ষমতায় ১৪৫টি দেশের মধ্যে ইরানের অবস্থান ১৪তম, যা ইসরাইলের (১৭-তম) চেয়েও এগিয়ে।

          তাদের হিসেবে ইরানের ৫৫১টি সামরিক বিমান, ১২৯টি হেলিকপ্টার, ৬৫ হাজার ৭৬৫টি সাঁজোয়া যান, ১ হাজার ৯৯৬টি ট্যাংক, ১০১টি যুদ্ধজাহাজ ও ১৯টি ডুবোজাহাজ রয়েছে।

          তবে ইরানের অস্ত্র নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সেখানেও পাওয়া যায় না।

          উদাহরণস্বরূপ সেখানে ইরানের নৌবাহিনীতে কোনো আকাশযান বা হেলিকপ্টার বহন করার সক্ষমতা নেই বলা হয়, যদিও ২০২১ সালে ইরানের সামরিক মহড়ার প্রকাশিত ছবিতে মাকরান নামে একটি হেলিকপ্টারবাহী জাহাজ দেখা যায়।

          তবে প্রশ্ন আসে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কীভাবে এই সক্ষমতা তৈরি করলো। ড. হুশ্যাং হাসান ইয়ারি বলেন, নিজস্ব অস্ত্র সমৃদ্ধ করতে ইরান বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। পশ্চিমা দেশগুলো থেকে যন্ত্রাংশ চোরাচালান করে নিয়ে আসে। এছাড়া রাশিয়া তো আছেই, চীন ও উত্তর কোরিয়ার ওপরেও কিছুটা নির্ভর করে তারা। 

          স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ২০২৪ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৩ সালেই ইরান ১০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ এক হাজার কোটি ডলারের বেশি অস্ত্রের পেছনে খরচ করেছে।

          গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের হিসেবে, বছরে ৯৯৫ কোটি ডলার বাজেট বরাদ্দ করা হয় সামরিক খাতে।

          তবে ড. হুশ্যাং হাসান ইয়ারির মতে, পশ্চিমাদের তুলনায় ইরানের অস্ত্র অতটা নিখুঁত না হওয়ায় তারা বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র বাড়িয়েছে; যেটা সাম্প্রতিক হামলাগুলো থেকেও লক্ষ্য করা যায়।

          বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো  ড. রাজিয়া সুলতানা বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি করতে কাজ করার মতো ইরানের বেশ কিছু বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, যারা ন্যানোটেকনোলজি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর মতো গবেষণা ও কাজ করেন। 

          ইরান, মধ্যপ্রাচ্য, লেবাননের হিজবুল্লাহ সম্পর্কে গবেষণাধর্মী লেখা রয়েছে তার। ইরান বিভিন্ন প্রযুক্তি পণ্য রপ্তানিও করে বলে জানাচ্ছেন তিনি।

          এত অর্থ আসে কীভাবে?

          ইরানের আর্থিক সামর্থ্যের পেছনে সবচেয়ে বড় যে দিক কাজ করেছে সেটি মূলত- এর প্রাকৃতিক সম্পদ।

          যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালেও বিশ্বে গ্যাসের দ্বিতীয় ও তেলের তৃতীয় বৃহত্তম মজুদ ছিল ইরানের। তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদে যথেষ্ট সমৃদ্ধ ইরান। 

          এছাড়া ইরান লাগোয়া হরমুজ প্রণালী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ৩৪ কিলোমিটার প্রশস্ত এ অংশ দিয়ে বিশ্বের ২১ শতাংশ তেলের সরবরাহ হয়।

          গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার তথ্যমতে, মজার বিষয় হলো ইরানের জ্বালানি কেন্দ্র করে নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা থাকলেও খোদ আমেরিকাও তাদের জ্বালানি কেনে। ১০ বছর পুরোপুরি বন্ধ থাকলেও গত চার বছরে কিছু তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য কিনেছে তারা, যেটা প্রকাশ করেছে আমেরিকাই। জ্বালানি তো বটেই, এর বাইরেও নানা ধরনের পণ্য রপ্তানি করে ইরান।

          রাজিয়া সুলতানা আরও বলেন, বিশ্বে বাণিজ্যে খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে ইরানের আপেল, গম, যব, কমলা, আখ, আলু, পোল্ট্রি বা সবজির মতো পণ্য রয়েছে। এছাড়া অস্ত্র, সিমেন্ট, রাসায়নিক পদার্থ, নির্মাণসামগ্রী, সার, ধাতব পণ্য, টেক্সটাইলের মতো অনেক ধরনের পণ্য রয়েছে। বড় যুদ্ধ বাঁধলে সেসব খাতে বিশ্ববাজারে একটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে তারা। বাংলাদেশেও ইরানের আতর, রত্নপাথর বা জাফরানের মতো পণ্য কিনতে পাওয়া যায়।

          এছাড়া পারস্য সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধ ইতিহাস ইরানের পণ্যকে বিশ্বব্যাপী আলাদা একটা নামডাকের জায়গা দিয়েছে। ইরানের কার্পেট, কারুপণ্য ও হস্তশিল্পে উদাহরণ দিয়ে রাজিয়া সুলতানা বলছিলেন, ‘আমেরিকা যে ইরানকে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে; তা সত্ত্বেও আমি ওয়াশিংটনে, বোস্টনে সেসব কার্পেটের দোকান দেখেছি।’

          আনঅফিসিয়াল বাণিজ্যের মাধ্যমে বার্টার, হুন্ডি, ক্রিপ্টোকারেন্সির মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক বাজারও ধরে রেখেছে ইরান, যেখানে বড় ক্রেতা হিসেবে আফগানিস্তান, সিরিয়া, তুরস্ক, চীন, রাশিয়ার মতো দেশ রয়েছে, বলছিলেন তিনি।

          ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগলিক অবস্থানও রয়েছে যেটা এশিয়ার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর এবং ইউরোপের সংযোগ তৈরি করে।

          অনেক ইরানি বিশ্লেষক মনে করেন, নিষেধাজ্ঞায় জনগণের ওপরে বড় ধাক্কা আসলেও সেসব নিষেধাজ্ঞাই ইরানকে স্বনির্ভর হতে, নিজেদের উন্নতিতে বিকল্প পথ তৈরি করতে সাহায্য করেছে। এছাড়া ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে এবং বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সমৃদ্ধ করতে নেতৃত্বের একটা বড় প্রভাবের কথাও আসে।

          ইরানের কিছু পর্যবেক্ষকের সঙ্গে আলোচনায় ড. রাজিয়া সুলতানা ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়েছেন। তিনি বলেন, তার (খামেনি) একনায়কতন্ত্রটা দেশের জনগণ অতটা ভালোভাবে না নিলেও, তারা এটা স্বীকার করে যে দেশের স্বার্থে, বিশেষত পশ্চিমা শক্তিকে পাল্লা দিতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব ধরে রাখতে আয়াতুল্লাহ খামেনির যে নেতৃত্ব এবং সাহস; সেটা বড় ভূমিকা পালন করে।’

          এমন অনেক কিছুর সমন্বয়ে নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়েই মধ্যপ্রাচ্যের একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করে গেছে ইরান।

          গড়ে তুলেছে বিস্তৃত এক প্রক্সি নেটওয়ার্ক

          বর্তমানে যে পরিস্থিতি তাতে পশ্চিমা নানা নিষেধাজ্ঞা থেকে ইরানে বের হয়ে আসার মতো কোনো আলামত তো নেই, বরং বড়সড় যুদ্ধে জড়ালে আরও কিছু নতুন বাস্তবতার মুখেই পড়তে যাচ্ছে তারা।               

          প্রাসঙ্গিক
            মন্তব্য
            সর্বশেষ সংবাদ
              সর্বাধিক পঠিত