শিরোনাম
ইরানে মার্কিন হামলায় জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্বেগ
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। তিনি একে ‘উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলে পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি’ হিসেবেও অভিহিত করেন।
এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে আরো ভয়াবহ সংকট তৈরি করতে পারে বলেও সতর্ক করেন এবং অবিলম্বে পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদরদপ্তর থেকে এএফপি এ খবর জানায়।
এক বিবৃতিতে গুতেরেস আরো বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। এটি ইতোমধ্যে অস্থিতিশীল অঞ্চলটিতে ভয়ানক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি, এর কোন সামরিক সমাধান নেই।
তিনি বলেন, সমাধানের একমাত্র পথ কূটনীতি, একমাত্র আশা হল শান্তি।
যেভাবে কাজ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাঙ্কার ব্লাস্টার বোমা
ইরানের ভূগর্ভে নির্মিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর আঘাত হানতে সক্ষম এমন একমাত্র বাঙ্কার ব্লাস্টার বোমাটির মালিক যুক্তরাষ্ট্র। এর নাম ‘জিবিইউ-৫৭এ/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর’ (এমওপি)। এটি নন-নিউক্লিয়ার ‘বাঙ্কার ব্লাস্টার’ বোমা, যা মাটির নিচের বাঙ্কার ধ্বংস করে ফেলতে পারে।
এই ধরনের বোমার দিক থেকে এটি পৃথিবীতে সবচেয়ে বড়। নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এই বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের ওজন ৩০ হাজার পাউন্ড বা ১৩ হাজার ৬০০ কেজি।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ‘জিবিইউ-৫৭এ/বি’ প্রায় ছয় মিটার লম্বা। এটি মাটির প্রায় ২০০ ফুট (৬১ মিটার) গভীরে প্রবেশ করে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে বলে ধারণা করা হয়। আর যদি ধারাবাহিকভাবে একের পর এক বোমা ফেলা হয়, তবে এটি মাটির আরও গভীরে প্রবেশ করতে পারে। এমওপি বোমা নির্মাণ করেছে বোয়িং।

বর্তমানে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের স্টিলথ বম্বার বি-২ স্পিরিট বিমান এই এমওপি বোমা বহনে সক্ষম। অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘নর্থরপ গ্রুম্যান’ কোম্পানির নির্মিত এই বিমান মার্কিন বিমানবাহিনীর সর্বাধুনিক বিমান।
নাতাঞ্জের পর ফর্দো হলো ইরানের দ্বিতীয় পারমাণবিক সমৃদ্ধিকরণকেন্দ্র। তেহরান থেকে প্রায় ৬০ মাইল (৯৫ কিলোমিটার) দক্ষিণ-পশ্চিমে কোম শহরের কাছে একটি পর্বতের নিচে এর অবস্থান। ২০০৬ সালে এর নির্মাণ শুরু হয় এবং ২০০৯ সালে এটি কার্যকর হয়। ওই বছরই তেহরান প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ফর্দোর অস্তিত্ব স্বীকার করে। এই স্থাপনাটি প্রায় ৮০ মিটার (২৬০ ফুট) পাথর ও মাটির গভীরে অবস্থিত এবং ইরান ও রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা সুরক্ষিত।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে ধ্বংস করাই হলো ইরানে হামলার মূল উদ্দেশ্য। আর এই হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হলো ফর্দো, জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। ইসরায়েলের যুক্তরাষ্ট্র দূত ইয়েখিয়েল লেইটার ফক্স নিউজকে বলেছেন, এই পুরো অভিযানের লক্ষ্য হলো ফর্দো নিশ্চিহ্ন করা।
একটানা ৩৭ ঘণ্টা উড়ে ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমান
ইরানের তিনটি পরমাণু কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ফোরদো, নাতাঞ্জ আর ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র এসব হামলা চালায়। আর এই হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করে অত্যাধুনিক বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান। এই হামলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সরাসরি ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধে জড়াল।
এসব বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করে এবং একটানা প্রায় ৩৭ ঘণ্টা উড়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়।
নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রোববার ভোরে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানা বি-২ বিমানগুলো মিসৌরিতে তাদের ঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের পর প্রায় ৩৭ ঘণ্টা ধরে অবিরাম উড়েছিল এবং আকাশে থাকা অবস্থায়ই বেশ কয়েকবার জ্বালানি নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এই কর্মকর্তা বলেন, হামলায় অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বোমারু বিমানগুলো মাঝ আকাশে একাধিকবার জ্বালানি নিয়েছে।
হামলার পর হোয়াইট হাউস থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় না ফিরলে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মার্কিন বিমানবাহিনী এই প্রথম কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের বাংকারবিধ্বংসী বোমা জিবিইউ-৫৭ ব্যবহার করল।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ৬টি বি-২ বোমারু বিমান ইরানের ভূগর্ভস্থ ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনায় ৩০ হাজার পাউন্ড ওজনের ১২টি বাংকারবিধ্বংসী বোমা ফেলেছে। অন্যদিকে মার্কিন নৌবাহিনীর সাবমেরিন থেকে ইরানের নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনায় ছোড়া হয়েছে ৩০টি টিএলএএম ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।
একই মার্কিন কর্মকর্তা আরও বলেন, একটি বি-২ বোমারু বিমান নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় দুটি বাংকারবিধ্বংসী বোমা ফেলেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ধ্বংস করা। ইরান যে পারমাণবিক হুমকি তৈরি করেছে, তা বন্ধ করা।
হোয়াইট হাউস থেকে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণভাবে, চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
ইরানের তিন পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে তেহরান। তবে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যে তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার কথা যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, সেগুলো আগেই খালি করে ফেলা হয়েছিল। তাই সেখানে এমন কিছু ছিল না, যা বিকিরণ সৃষ্টি করে নাগরিকদের ক্ষতির কারণ হতে পারত।
ইরানের আলোচনার টেবিলে ফেরা উচিত: যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক হুমকি ‘প্রশমনের’ জন্যই যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে হামলা চালিয়েছে। খবর বিবিসির।
ইরানের তিন পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এক বিবৃতিতে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া যাবে না। নিরাপত্তার হুমকি দূর করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিয়েছে।’
কিয়ার স্টারমার আরও বলেন, আমরা ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসতে এবং চলমান সংকটের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানাচ্ছি।
এর আগে শনিবার (২১ জুন) রাতে ইরানের তিন পারমাণবিক স্থাপনায় সরাসরি হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এ কথা ঘোষণা করে জানান, তার দেশ ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় সফল হামলা সম্পন্ন করেছে। স্থাপনাগুলো হলো ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান।
পরে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় সময় শনিবার রাত ১০টায় হোয়াইট হাউস থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন ট্রাম্প। এ সময় ইরানকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘হয় শান্তি আসবে, নয়তো ইরানের জন্য আরও অনেক বড় ট্র্যাজেডি হবে যা আমরা গত আট দিনে দেখেছি।’
ট্রাম্প বলেন, ‘মনে রাখবেন, এখনও অনেক লক্ষ্যবস্তু বাকি আছে। আজ রাতটি ছিল তাদের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন এবং সম্ভবত সবচেয়ে মারাত্মক। কিন্তু যদি শান্তি দ্রুত না আসে তবে আমরা নির্ভুলতা, দ্রুততা এবং দক্ষতার সাথে অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে যাব।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘এ হামলার উদ্দেশ্য ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা শেষ করে দেওয়া। সন্ত্রাসের মদদদাতা বিশ্বের এক নম্বরে থাকা দেশটির পারমাণবিক হুমকি থামিয়ে দেওয়া।’
মার্কিন হামলার পর দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে ইরান
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর পর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে ইরান। ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাথমিকভাবে আনুমানিক ৩০টি রকেট ছোড়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খবর রয়্যা নিউজের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব হামলা মূলত ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোর দিকে চালানো হয়েছে। যদিও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত এখনো জানা যায়নি, তবে এমন ধারাবাহিক হামলা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাকে আরও উসকে দিচ্ছে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ফোরদো, নাতানজ ও ইসফাহান এলাকায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ‘সফল’ হামলা চালিয়েছে। তার কিছুক্ষণ পর থেকেই ইরানের পক্ষ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাল্টা হামলা শুরু হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হতে পারে যদি কূটনৈতিকভাবে দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ না নেওয়া হয়।
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


মন্তব্য