শিরোনাম
খামেনি নিহত হলে ইরানের পরবর্তী শাসক কে হবেন?
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ‘অবস্থান’ জানেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তাকে এখনই ‘মারবেন’ না। গতকাল মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে এক বার্তায় তিনি এ দাবি করেন। এরপর তিনি ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্প’ করতেও বলেছেন।
এরপর থেকেই ৮৬ বছর বয়সি খামেনির মৃত্যু নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে।
সাম্প্রতিক ইসরাইলি বিমান হামলায় খামেনি তার বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সামরিক ও গোয়েন্দা উপদেষ্টাকে হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার-ইন-চিফ হোসেইন সালামি, দেশের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির প্রধান আমির আলী হাজিজাদেহ এবং গোয়েন্দা প্রধান মোহাম্মদ কাজেমি। এই ব্যক্তিরা কেবল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাই ছিলেন না, খামেনির উপদেষ্টা মহলের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বও ছিলেন।
শীর্ষ নেতাদের মৃত্যু ইরানের নেতৃত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে এবং পরবর্তীতে শাসনব্যবস্থার কী হতে পারে তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। ইরান আক্রমণের মুখে পড়ার পর যদি অকল্পনীয় কিছু ঘটে, তাহলে তার উত্তরসূরি কে হতে পারেন এমন শীর্ষ পর্যায়ের একটি তালিকা করেছে দ্য ইকোনোমিক টাইমস ও ইন্ডিয়া টুডে। চলুন জেনে নেই তাদের পরিচয়:
মোজতবা খামেনি
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ৫৫ বছর বয়সি ছেলে মোজতবা একজন মধ্যম স্তরের ধর্মযাজক, যিনি মূলত জনসাধারণের দৃষ্টির বাইরে থেকেই কাজ করেন। নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিষয় সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তিনি পর্দার অন্তরালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বলে মনে করা হয় এবং বিশেষ করে তিনি বিপ্লবী গার্ডের ঘনিষ্ঠ। অনেক পর্যবেক্ষক বিশ্বাস করেন যে খামেনি নীরবে তাকে উত্তরাধিকারের জন্য প্রস্তুত করছেন। তবে, ক্ষমতার একটি বংশীয় হস্তান্তর ইরানের মতো রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে পারে।
আলিরেজা আরাফি
আলিরেজা আরাফি খামেনির একজন অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য সহযোগী। আরাফি গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে রয়েছেন। যেমন- বিশেষজ্ঞরা পরিষদের উপ-সভাপতি, গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য, এবং কুম শহরের শুক্রবারের নামাজের নেতা। তার ইরানের ক্ষমতার কাঠামোর প্রতি গভীর জ্ঞান এবং বোঝাপড়া রয়েছে তার।
আলী আসগর হেজাজি
সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ে রাজনৈতিক-নিরাপত্তা বিষয়ক উপ-পরিচালক হিসেবে পরিচিত হেজাজির পর্দার আড়ালে বিশাল প্রভাব রয়েছে। রয়টার্স তাকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে বর্ণনা করেছে। তিনি নিরাপত্তা কার্যক্রম সরাসরি তত্ত্বাবধান করে থাকেন। গার্ড ও ধর্মীয় এলিট উভয়ের সঙ্গেই তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তিনি একজন ধর্মীয় নেতা নন, তবে খামেনির সঙ্গে তার সান্নিধ্য তাকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
মোহাম্মদ গোলপায়েগানি
মোহাম্মদ গোলপায়েগানি খামেনির অফিসের দীর্ঘদিনের প্রধান কর্মী এবং তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন। তিনি অনুগত এবং গোপনে থাকার জন্য পরিচিত। জনসাধারণের কাছে সুপরিচিত না হলেও, সিস্টেম কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান এবং পর্দার আড়ালে তার কেন্দ্রীয় ভূমিকা তাকে পরবর্তী নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রার্থী বা মূল খেলোয়াড় করে তুলেছে।
আলী আকবর বেলায়াতি
আলী আকবর বেলায়াতি, একজন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং খামেনির পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রবীণ উপদেষ্টা। ধর্মীয় জ্ঞানের সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে সরকারি অভিজ্ঞতার মিশ্রণ তাকে পুষ্ট করেছে। তিনি এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলে বসেন এবং ইরানের আঞ্চলিক জোটগুলোকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন। যদিও তিনি বিশ্বস্ত এবং শ্রদ্ধার পাত্র তবে তার বার্ধক্য এবং দুর্বল স্বাস্থ্য তার বিরুদ্ধে যেতে পারে।
কামাল খারাজী
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি এখন ইরানের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কৌশলগত কাউন্সিলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি কট্টরপন্থীদের তুলনায় বেশি মধ্যপন্থী বলে মনে হলেও সর্বদা শাসকগোষ্ঠীর সীমার মধ্যে থেকেছেন। ইংরেজিতে সাবলীল এবং জাতিসংঘে অভিজ্ঞ, খারাজী পারমাণবিক চুক্তির পর ইরানের কূটনীতি গঠনে সহায়তা করেছিলেন। সরকারের কেউ কেউ তাকে একজন দক্ষ, প্রযুক্তিবিদ হিসেবে দেখেন।
আলী লারিজানি
ইরানের পার্লামেন্টের সাবেক স্পিকার এবং রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের সাবেক প্রধান আলী লারিজানি কোমের এক সুপরিচিত ধর্মীয় পরিবারের সন্তান। বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী একজন রক্ষণশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি খামেনি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ঘনিষ্ঠ, তবে কিছুটা স্বাধীনচেতা হিসেবেও দেখা হয় তাকে। তার অভিজ্ঞতা এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী করে তোলে।
ইরানের ভয়ে কাতার-বাহরাইন থেকে যুদ্ধবিমান-জাহাজ সরিয়ে নিলো যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের হামলার ভয়ে কাতার থেকে কিছু যুদ্ধবিমান এবং বাহরাইন থেকে যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল বুধবার (১৮ জুন) বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে এমন তথ্য জানান দুই মার্কিন কর্মকর্তা।
তারা বলেছেন, ইরান যদি কোনো কথায় হামলা চালায় তাহলে তাদের এই সামরিক সরঞ্জামগুলো ঝুঁকিতে পড়বে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এমন সময় তাদের এসব যুদ্ধযান সরিয়ে নিলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলা চালানোর ব্যাপারে পুরো বিশ্বকে ‘অন্ধকারে’ রেখেছেন।
যুদ্ধবিমান সরানোর পাশাপাশি আজ বৃহস্পতিবার কাতারস্থ যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তাদের কর্মীদের আল উদাইদ বিমানঘাঁটিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এছাড়া মার্কিন নাগরিকদের সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনাও দিয়েছে দূতাবাস।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যত ঘাঁটি আছে সেগুলোর মধ্যে আল উদাইদ সবচেয়ে বড়। এটি কাতারের রাজধানী দোহার অদূরের মরুভূমিতে অবস্থিত।
নাম গোপন রাখার শর্তে দুই মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, সেনাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে কতগুলো বিমান ও জাহাজ সরানো হয়েছে এবং সেগুলো কোথায় নেওয়া হয়েছে এ ব্যাপারে তারা কথা বলতে রাজি হননি।
এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেসব যুদ্ধবিমান শক্ত শেল্টারের মধ্যে নেই সেগুলো আল উদেইদ ঘাঁটি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অপরদিকে বাহরাইনের একটি বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে নৌবাহিনীর জাহাজ। বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম বহর অবস্থিত।
এই কর্মকর্তা বলেছেন, “বিমান বা জাহাজ সরানো কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। সেনাদের নিরাপত্তাকে সবসময় প্রাধান্য দেওয়া হয়।”
গত শুক্রবার ইরানে হামলা চালায় দখলদার ইসরায়েল। এরপর ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে জড়িত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এরপর ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলিদের সঙ্গে যোগ দেয় তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে যেসব মার্কিন ঘাঁটি আছে তার সবগুলোতে হামলা চালানো হবে।
সূত্র: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের সরকার ফেলে দিতে পারবে, ইতিহাস কী বলে
চলমান ইরান-ইসরাইল সংঘাত এবং তেহরানের শাসকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হুমকির প্রেক্ষিতে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আবার সামনে এসেছে— ১৯৫৩ সালের মার্কিন-সমর্থিত ইরানি সরকার পতনের ঘটনা। সেসময় যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন মিলে ইরানের জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল।
কী হয়েছিল তখন?
মোসাদ্দেক ইরানের তেলক্ষেত্র জাতীয়করণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটা আমেরিকা ও ব্রিটেনের জন্য ছিল বড় ধাক্কা, কারণ তারা মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সেই সময়ে এটা ছিল শীতল যুদ্ধের উত্তপ্ত পর্ব।
যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের লক্ষ্য ছিল ইরানের তৎকালীন রাজা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা এবং নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জেনারেল ফজলুল্লাহ জাহেদিকে বসানো।
সিআইএ ও ব্রিটিশ এসআইএস মিলে মোসাদ্দেকবিরোধী মনোভাব তৈরি করতে প্রোপাগান্ডা চালায়। পরে তারা সেনাবাহিনী ও রাজপন্থীদের সহায়তায় বিশাল বিক্ষোভ সংগঠিত করে, যা ১৯৫৩ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
জাহেদির সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সিআইএ মাত্র দুই দিনের মধ্যে ৫০ লাখ ডলার সরবরাহ করে বলে গোপন দলিল থেকে জানা যায়।
২০১৩ সালে সিআইএ গোপন নথি প্রকাশ করে তাদের জড়িত থাকার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে। ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও এই ঐতিহাসিক ভুলের কথা স্বীকার করেন।
ফলাফল কী হয়েছিল?
সরকার পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র শাহকে জোরালভাবে সমর্থন দিতে থাকে। কিন্তু ইরানিরা এতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন এবং একে বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন। এ ক্ষোভ ইরানে দীর্ঘমেয়াদি মার্কিনবিরোধী মনোভাব তৈরি করে।
শাহের দুর্নীতি ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ১৯৭৯ সালে ইরানে গণ-আন্দোলন শুরু হয়। শাহের আধুনিকীকরণ নীতিকে ধর্মীয় নেতারা বিরোধিতা করেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ তার দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হন।
এ বিপ্লবেই ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র কায়েম হয় এবং শুরু হয় বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
যখন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে ‘শাসন পরিবর্তনের’ ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং খামেনিকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে— তখন ৭০ বছর আগের ঐতিহাসিক ভুল আবার স্মরণ করিয়ে দেয়— বিদেশি হস্তক্ষেপ যেমন সাময়িক সুবিধা দিতে পারে, তেমন দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়াও তৈরি করতে পারে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণ
যেভাবে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে ইরান
ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, এমন দাবি করে গেল শুক্রবার ভোরে দেশটির বিভিন্ন সামরিক, পরমাণু স্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের বসতিতে নির্বিচার হামলা চালায় ইসরাইল। তাদের হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ২৪০ জনের বেশি নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে অন্তত ৭০ জন নারী ও শিশু রয়েছে।
জবাবে ইসরাইলের মূল ভূখণ্ডে প্রায় ৪০০টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র ও শত শত ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। যাতে অন্তত ২৪ জন ইসরাইলি নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছে। ইরানের লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশজুড়ে ইসরাইলিদের ভূ-গর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিতে হচ্ছে।
ইরানের কিছু হামলা মধ্য ইসরাইলের আবাসিক এলাকায় আঘাত করেছে, যেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তেলআবিবে অবস্থিত ইসরাইলের সুরক্ষিত সামরিক সদর দপ্তর ‘কিরিয়া’-তেও হামলা হয়েছে, যদিও সেখানকার ক্ষতি সীমিত ছিল।
মঙ্গলবার ইরান দাবি করে, তারা ইসরাইলের একটি সামরিক গোয়েন্দা কেন্দ্র এবং মোসাদের একটি অপারেশন প্ল্যানিং সেন্টারে আঘাত করেছে। যেখানে তারা ইসরাইলের বিশ্বের অন্যতম উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে।
সাম্প্রতিক ইতিহাসে ইসরাইল তার ‘আয়রন ডোম’সহ অন্যান্য ব্যবস্থা ব্যবহার করে বেশিরভাগ আকাশ থেকে আসা হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তাহলে কীভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতিক্রম করছে?
ইসরাইলের আয়রন ডোম কী?
‘আয়রন ডোম’ ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থার শুধুমাত্র একাংশ। আল জাজিরার প্রতিরক্ষা সম্পাদক অ্যালেক্স গ্যাটোপোলাস জানান, এটি ‘মাল্টিটিয়ার্ড, ইন্টিগ্রেটেড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম’-এর সবচেয়ে নিচের স্তরের অংশ।
এই ডোম আসন্ন রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে, তার গতি ও পথ নির্ধারণ করে এবং তা প্রতিহত করে। ইসরাইল দাবি করে, এটি ৯০ শতাংশ কার্যকর। এটি ২০১১ সালে চালু হয়।
এটি মূলত স্বল্প-পরিসরের রকেট আটকানোর জন্য তৈরি, যেগুলো বড় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ধরা পড়ে না।
অন্যান্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
বারাক-৮: মধ্যম দূরত্বের ক্ষেপণাস্ত্র আটকায়;
ডেভিড’স স্লিং: মধ্যম থেকে দীর্ঘ দূরত্বের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে;
থাড সিস্টেম: স্বল্প, মধ্যম ও মাঝারি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারে;
অ্যারো-২ এবং অ্যারো-৩: দীর্ঘ দূরত্বের ক্ষেপণাস্ত্র আটকাতে ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে ইরানের মতো দেশের ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে?
প্রতিটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তিনটি উপাদান থাকে: রাডার, কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার এবং ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার। একবার শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত হলে, সিস্টেম বিশ্লেষণ করে কোন লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে হবে এবং সাধারণত একটি শত্রু ক্ষেপণাস্ত্রের বিপরীতে দুটি ইন্টারসেপ্টর ছোড়া হয়।
ইরান কীভাবে এই প্রতিরক্ষা ভেদ করল?
১. ইন্টারসেপ্টর শেষ করে ফেলা
ইরান একযোগে বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুঁড়ে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্লান্ত করে তুলেছে। প্রতিটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সীমিত সংখ্যক ইন্টারসেপ্টর থাকে।
২. হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র
ইরান বর্তমানে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় কমিয়ে দেয়। এর মধ্যে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র ‘হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল (এইচজিভি)’ যুক্ত থাকে, যেমন ফাতাহ-২।
এই এইচজিভিগুলো সাধারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো পূর্বানুমানযোগ্য পথে চলে না, বরং জিগজ্যাগ করে চলে, যা প্রতিরক্ষা সিস্টেমের জন্য চ্যালেঞ্জিং।
৩. ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র
ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র যেমন হোভেইজেহ, ধীরে চললেও নিচু দিয়ে উড়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম। এগুলো পাইলটবিহীন বিমানের মতো কাজ করে।
৪. বিভ্রান্তিকর টার্গেট
ইরান ছদ্ম-মিসাইল বা ড্রোন পাঠিয়ে রাডারকে বিভ্রান্ত করতে পারে, যাতে ইসরাইল তার ইন্টারসেপ্টর অপচয় করে ফেলে, এবং আসল ক্ষেপণাস্ত্র ভেদ করে ঢুকতে পারে।
৫. রাডার-প্রতিরোধ প্রযুক্তি:
কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে এমন প্রযুক্তি থাকে যা রাডারকে ফাঁকি দেয়, ফলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তা শনাক্ত করতে পারে না।
ইরান বা ইসরাইলের কি অস্ত্র ফুরিয়ে যেতে পারে?
গ্যাটোপোলাস বলেন, এই যুদ্ধ এখন একটি ‘অপচয়-ভিত্তিক যুদ্ধ’ (ওয়ার অব অ্যাট্রিশন)। ইসরাইল দাবি করছে তারা ইরানের আকাশে প্রভাব বিস্তার করছে, কিন্তু তেহরান থেকে তেলআবিবের দূরত্ব ১০০০ কিলোমিটার—যেখানে বিমান অনায়াসে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করতে পারে না।
ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় আকাশে জ্বালানি পূরণের সুযোগ পেলেও এতে তাদের বিমান স্টিলথ গুণ হারাতে পারে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়, ইরানের হাতে কত ক্ষেপণাস্ত্র আছে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো? আর ইসরাইলের কাছে কতটি অ্যারো-২ ও ৩ রয়ে গেছে যার মাধ্যমে তারা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
মরো অথবা পালাও, ইসরায়েলের জন্য দুই বিকল্প দিল ইরান
ইসরায়েলের জন্য দুই বিকল্প দিয়েছে ইরান। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) তাদের ভয়ংকর পরিণতি ভোগ অথবা পালিয়ে যাওয়ার জন্য দুটি বিকল্প বেছে নিতেম বলেছে।
বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) দ্য জুইশ প্রেসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আইআরজিসি এক বিবৃতি বলা হয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মতো সক্ষমতা ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নেই। এই পরিস্থিতিতে দখলদারদের সামনে দুটি বিকল্প রয়েছে।
প্রতিবেদনে ইসরায়েলিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে লুকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যথায় তাদের দখল করা ফিলিস্তিনি ভূমি ছেড়ে দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আইআরজিসি জানিয়েছে, এখন ইসরায়েলের আকাশ যেন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বরণ করে নেওয়ার জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেছে। দখলদারদের ওপর হামলা অব্যাহত থাকবে। চলমান সংঘাতে শহীদ হওয়া আইআরজিসির সাবেক প্রধান হোসেইন সালামির পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, এবার জায়নবাদীদের বিরুদ্ধে ‘জাহান্নামের দরজা’ খুলে দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে বাহিনীটি।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড আরও জানিয়েছে, ইসরায়েলে এক মুহূর্তের জন্যও সাইরেনের শব্দ থামবে না। দখলদারদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না এবং যত দ্রুত সম্ভব ফিলিস্তিনের দখলকৃত অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


মন্তব্য