শিরোনাম
গুলি চালিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিল ফ্যাসিবাদী সরকার : প্রধান উপদেষ্টা
মানুষের বুকে গুলি চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিল ফ্যাসিবাদী সরকার—বলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় তিনি একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।
মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) সকালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে দেশজুড়ে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ভিডিও বার্তায় তিনি এ কথা বলেন।
বিগত ১৬ বছরে মাফিয়াতন্ত্র কায়েম করা হয়েছিল মন্তব্য করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কোটা পদ্ধতি ছিল দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির হাতিয়ার। এ আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ আহkদের চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়নি। হাসপাতালগুলোকে তৎকালীন সরকার আহতদের চিকিৎসা না দিতে নির্দেশ দিয়েছিল। এ কারণে বহু মানুষ চিকিৎসা না পেয়ে দৃষ্টি হারিয়েছে, পঙ্গু হয়ে গেছে।
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আহত নিহতদের স্মরণ করে তিনি বলেন, শহীদ পরিবার ও আহতদের আর্থিক সহায়তা করা হয়েছে। গুরুতর আহতদের বিদেশে চিকিৎসা করানো হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে শহীদ পরিবার ও আহতদের কল্যাণে যাবতীয় বিষয়াদির প্রশাসনিক দায়িত্ব মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৮৩৬ শহীদ পরিবারের মধ্যে ৭৭৫টি পরিবারকে মোট ৯৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও মাসিক ভাতাবাবদ ব্যাংক চেক দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট যারা আছেন তাদেরও কয়েকটি বিষয় নিষ্পত্তি সাপেক্ষে সঞ্চয়পত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ৫ আগস্ট শুধু একটা বিশেষ দিবস নয়, এটি একটি প্রতিজ্ঞা, গণজাগরণের উপাখ্যান এবং ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে জাতির পুনর্জন্মের দিন। আজ আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। যাদের কারণে আত্মত্যাগের কারণে আমরা আমরা পেয়েছি স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের উত্তাল জুলাই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক সংকটময় অধ্যায়। ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এদেশের এই বিপুলসংখ্যক তরুণরা ১৬ বছর ধরে ক্রমাগত হতাশায় নিমজ্জিত ছিল। ভালো ফল করেও চাকরির জন্য ক্ষমতাসীনদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছে। চাকরিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর তদবির বাণিজ্য। যে তরুণ ঘুষ দিতে পারেনি এলাকার মাফিয়াদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে পারেনি, তার চাকরি হয়নি। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতি, যেটা মূলত ছিল দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আরেকটা হাতিয়ার। এর বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ দীর্ঘদিন প্রতিবাদ বিক্ষোভ করলেও ফ্যাসিবাদী শাসকের টনক নড়েনি।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন এই সেক্টরে মাফিয়াতন্ত্র কায়েম করে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি করা হয়েছিল। যারা আর্থিক বা অন্য সুবিধার বিনিময়ে স্বৈরাচারের পক্ষে কথা বলবে, কাজ করবে। স্বৈরাচারের পক্ষের সঙ্গী হলেই তার চাকরি হবে।
রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) রাত ৮টা ২০ মিনিটে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
বাংলাদেশ টেলিভিশন, বিটিভি নিউজ ও বাংলাদেশ বেতারে ভাষণটি একযোগে সম্প্রচার করবে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র জানিয়েছে, ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের কর্মকাণ্ড, জুলাই গণহত্যার বিচারের অগ্রগতি এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রমের সারসংক্ষেপ তুলে ধরবেন প্রধান উপদেষ্টা। পাশাপাশি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ সালের কোন মাসে অনুষ্ঠিত হবে—তা নির্দিষ্ট করে ঘোষণা করতে পারেন তিনি।
গণঅভ্যুত্থান দিবস উদযাপনে প্রস্তুত মঞ্চ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আজ ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে ‘জুলাই পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানমালা’-এর মূল মঞ্চ, সাউন্ড ও লাইটিং সিস্টেমের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। এছাড়া অনুষ্ঠানস্থল এবং আশেপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
সোমবার রাত থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। উচ্চ ধারণক্ষমতাসম্পন্ন সিসি ক্যামেরা ও গোয়েন্দা নজরদারি শুরু হয়েছে। তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান এবং র্যাব-২ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি খালিদুল হক হাওলাদার জানান, ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকে পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ ও র্যাব সদস্য মোতায়েন থাকবে।
বেলা ১১টা থেকে শুরু হবে বিভিন্ন শিল্পীগোষ্ঠীর সংগীত পরিবেশনা। বিকাল ৫টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন, যা বাংলাদেশ টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করবে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় থাকছে বিশেষ ড্রোন শো এবং রাত ৮টায় থাকবে ব্যান্ডদলের পরিবেশনা।
এদিকে অনুষ্ঠানস্থলের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার শামীম আহমেদ জানিয়েছেন, বৃষ্টির কথা মাথায় রেখে ওয়াটারপ্রুফ সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর সই করা এক গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, জনসমাগমের কারণে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে যান চলাচল বন্ধ থাকবে।
আসুন এমন বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে আর কোনো স্বৈরাচারের ঠাঁই হবে না: প্রধান উপদেষ্টা
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, জুলাই আমাদের নতুন করে আশার আলো- একটি ন্যায় ও সাম্যভিত্তিক, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ আমাদের রাষ্ট্র সংস্কারের যে সুযোগ এনে দিয়েছে তা যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচার ও তার স্বার্থলোভী গোষ্ঠী এখনো দেশকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করতে হবে। আসুন সবাই মিলে আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে আর কোনো স্বৈরাচারের ঠাঁই হবে না।
৫ আগস্ট ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা এ কথা বলেন।
গণঅভ্যুত্থান দিবসের কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন আজ (৫ আগস্ট)। এক বছর আগে এই দিনে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পূর্ণতা পায়, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্ত হয় প্রিয় স্বদেশ। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ, যাদের মুখবন্ধ আন্দোলনের ফসল আমাদের এই ঐতিহাসিক অর্জন, তাদের সবাইকে আমি এই দিনে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আজ আমি স্মরণ করছি সেই সব সাহসী তরুণ, শ্রমিক, দিনমজুর, পেশাজীবীদের, যারা ফ্যাসিবাদী শক্তিকে মোকাবিলা করতে গিয়ে শাহাদাত বরণ করেছেন। আমি গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি সকল জুলাই যোদ্ধাকে যারা আহত হয়েছেন, চিরতরে পঙ্গু হয়েছেন, হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। জাতি তাদের অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।’
এ সময় গণঅভ্যুত্থানে শাহাদাত বরণকারী সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান তিনি।
টানা ১৬ বছরের স্বৈরাচারী অপশাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিস্ফোরণ ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থান উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘জুলাই অভ্যুথানের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারমুক্ত নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে রাষ্ট্রকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ সব লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব খাতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। জুলাই গণহত্যার বিচারের কার্যক্রম দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। জুলাই শহীদদের স্মৃতি রক্ষা ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে অন্তর্বর্তী সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে রাজনৈতিক ও নির্বাচন ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সব সংস্কারে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা চলমান। একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে অন্তর্বর্তী সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।
দিনভর উৎসবমুখর আয়োজন
আজ ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ পাঠ করবেন প্রধান উপদেষ্টা
বহুলপ্রতীক্ষিত ঐতিহাসিক ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ আনুষ্ঠানিকভাবে আজ প্রকাশ করবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বিকাল ৫টায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন। অনুষ্ঠানে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, জুলাই শহীদপরিবারের প্রতিনিধি এবং আহত যোদ্ধারা উপস্থিত থাকবেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের একটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে দিনভর থাকছে উৎসবমুখর নানা আয়োজন। অনুষ্ঠান শুরু হবে বেলা ১১টা ২০ মিনিটে। নানা অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় বিকালে ঐতিহাসিক জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করা হবে। সবশেষ আয়োজন হিসাবে রাত ৮টায় থাকছে আর্টসেল-এর গান। এই দিবস উদ্যাপনে দেশের শিশু, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, বয়োজ্যেষ্ঠ নারী-পুরুষ সবাইকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এদিকে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে জুলাই ঘোষণাপত্র চূড়ান্ত করেছে। ঘোষণাপত্র পাঠ অনুষ্ঠানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এবি পার্টিসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সূত্রমতে, সব দল এ অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি পাঠাবে। তবে ঘোষণাপত্রের খসড়ায় ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের ইতিহাস যুক্ত করার জন্য সংশোধনী দিয়েছিল বিএনপি। এটি না থাকলে ঘোষণাপত্র পাঠের পর প্রতিক্রিয়া জানাবে দলটি।
জানা যায়, ঘোষণাপত্রে রয়েছে ২৬টি দফা। প্রথম ২১ দফায় মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের মানুষের অতীতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম থেকে শুরু করে জুলাই অভ্যুত্থানের পটভূমি বর্ণনা করা হয়েছে। পরের ৫টি দফায় রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা, আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুম-খুন, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সব ধরনের নির্যাতন-নিপীড়ন ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি লুণ্ঠনের অপরাধের দ্রুত উপযুক্ত বিচার, আইনের শাসন ও মানবাধিকার, দুর্নীতি, শোষণমুক্ত বৈষম্যহীন সমাজ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। একটি দফায় বলা হয়েছে, ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে। যুক্তিসংগত সময়ে আয়োজিতব্য নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের প্রস্তাবনায় এর উল্লেখ থাকবে এবং তফশিলে এ ঘোষণাপত্র সংযুক্ত থাকবে। এ ঘোষণাপত্র ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে কার্যকর বলে ধরে নেওয়া হবে।
তবে ঘোষণাপত্রে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের কথা উল্লেখ না থাকায় বিএনপির পক্ষ থেকে পাঠানো খসড়ায় সংশোধনী দিয়ে এদিনকে সঠিকভাবে উল্লেখ করার জন্য বলা হয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, দুদফায় অন্তর্বর্তী সরকার বিএনপিকে জুলাই ঘোষণাপত্র সংবলিত যে খসড়া দিয়েছে তাতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চকে সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি। আমরা বলেছি, এই জাতির শুরুই হলো ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে। তাকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবে ২৬ মার্চকে উপস্থাপন করতে চাননি, এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে বিএনপি। এছাড়াও রাষ্ট্রীয় এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতি চতুর্থ তফশিলের মাধ্যমে দেওয়া হবে। জুলাই ঘোষণাপত্রের ক্ষেত্রে বিএনপি যে সংশোধনী দিয়েছে, তা মেনে না নেওয়া হলে ঘোষণাপত্র পাঠের পর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জানাবে বিএনপি।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুকে এ বিষয়ে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টে লেখা হয়, ছত্রিশ জুলাই-গত বছর এই দিনে পৃথিবী দেখেছিল এক অভাবনীয় গণ-অভ্যুত্থান। যার ফলে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে গিয়েছিল ফ্যাসিস্ট। বহু শহীদের রক্ত এবং যোদ্ধাদের ত্যাগের পথ ধরে পুরো বাংলাদেশ এক হয়েছিল। পথে পথে ছিল উল্লাসমুখর জনতার জোয়ার। এতে আরও বলা হয়, এক বছর পর আবার ফিরে এসেছে ছত্রিশ জুলাই। এই দিনে ঘোষিত হতে যাচ্ছে জাতির কাঙ্ক্ষিত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’। এ উপলক্ষ্যে দিনব্যাপী আয়োজন থাকছে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউজুড়ে। আসুন আমরা সবাই পরিবার-পরিজন নিয়ে যোগ দিই ‘ছত্রিশ জুলাই’ উদ্যাপনে। ‘আমাদের ইতিহাস, আমাদের গৌরব’, লেখা হয় পোস্টে।
প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পোস্টে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ৫ আগস্ট ‘৩৬ জুলাই উদ্যাপন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানসূচি যুক্ত করা হয়। সূচি অনুযায়ী, অনুষ্ঠান শুরু হবে বেলা ১১টা ২০ মিনিটে। সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর গান দিয়ে শুরু হবে অনুষ্ঠান। এরপর পর্যায়ক্রমে কলরব শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনা থাকছে। দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে হবে ফ্যাসিস্টের পলায়ন উদ্যাপন, এরপর যথাক্রমে সায়ান, ইথুন বাবু ও মৌসুমি গান পরিবেশন করবেন। বিকাল ৫টায় ঐতিহাসিক জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করা হবে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত স্পেশাল ড্রোন ড্রামাও থাকছে। অনুষ্ঠানের আয়োজক সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় থাকছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। আর সহযোগিতায় থাকছে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ঘোষণাপত্রের দাবি জানানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে জুলাই ঘোষণাপত্র অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য সারা দেশ থেকে ছাত্র-জনতা আনতে ৮ জোড়া বিশেষ ট্রেন ভাড়া করেছে সরকার। কর্মসূচি শেষে এসব ট্রেনে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হবে।
জানা যায়, জুলাই ঘোষণাপত্রে ২৬টি দফা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-যেহেতু এই ভূখণ্ডের মানুষ দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের বঞ্চনা ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং নির্বিচার গণহত্যার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে জাতীয় মুক্তির জন্য রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। যেহেতু স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানের পদ্ধতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা ও অপপ্রয়োগের ফলে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধের জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল এবং গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন করেছিল। যেহেতু, স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীনতার মূলমন্ত্র গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিপরীতে বাকশালের নামে সাংবিধানিকভাবে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করে এবং মতপ্রকাশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করে, যার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর দেশে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব সংঘটিত হয়। যেহেতু, আশির দশকে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় বছর ছাত্র-জনতার অবিরাম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় এবং ১৯৯১ সালে পুনরায় সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। যেহেতু, দেশি-বিদেশি চক্রান্তে সরকার পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় ১-১১-এর ষড়যন্ত্রমূলক বন্দোবস্তের মাধ্যমে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার একচ্ছত্র ক্ষমতা, আধিপত্য ও ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করা হয়। যেহেতু, গত দীর্ঘ ষোলো বছরের ফ্যাসিবাদী, অগণতান্ত্রিক এবং গণবিরোধী শাসনব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে এবং একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অতি উগ্র বাসনা চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে সংবিধানের অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক পরিবর্তন করা হয় এবং যার ফলে একদলীয় একচ্ছত্র ক্ষমতা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। যেহেতু, বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসন, গুম-খুন, আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং একদলীয় স্বার্থে সংবিধান সংশোধন ও পরিবর্তন বাংলাদেশের সব রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে। যেহেতু, অবৈধভাবে ক্ষমতা অব্যাহত রাখতে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার তিনটি প্রহসনের নির্বাচনে (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন) এদেশের মানুষকে ভোটাধিকার ও প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত করে। যেহেতু, সরকারি চাকরিতে বৈষম্যবিলোপ ও দুর্নীতি প্রতিরোধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার ব্যাপক দমন-পীড়ন, বর্বর অত্যাচার ও মানবতাবিরোধী হত্যাকাণ্ড চালানো হয়, যার ফলে সারা দেশে দলমতনির্বিশেষে ছাত্র-জনতার উত্তাল গণবিক্ষোভ গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। যেহেতু, ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে অদম্য ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক দল, ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী, শ্রমিক সংগঠনসহ সমাজের সব স্তরের মানুষ যোগদান করে এবং আওয়ামী ফ্যাসিবাদী বাহিনী রাজপথে নারী-শিশুসহ প্রায় দুই সহস্র মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে, অগণিত মানুষ পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ববরণ করে এবং আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা জনগণের গণতান্ত্রিক লড়াইকে সমর্থন প্রদান করে। জনসাধারণের তীব্র আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে গণভবনমুখী জনতার উত্তাল যাত্রার মুখে অবৈধ, অনির্বাচিত, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। যেহেতু, বাংলাদেশর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলায় গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ব্যক্ত জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রত্যয় ও প্রয়োগ রাজনৈতিক ও আইনি উভয় দিক থেকে যুক্তিসংগত, বৈধ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। সেহেতু, বাংলাদেশের জনগণ যুক্তিসংগত সময়ে আয়োজিতব্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত জাতীয় সংসদে প্রতিশ্রুত প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশের মানুষের প্রত্যাশা, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আইনের শাসন ও মানবাধিকার, দুর্নীতি ও শোষণমুক্ত বৈষম্যহীন সমাজ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে। বাংলাদেশের জনগণ এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে যে, ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে। বিশেষত, যুক্তিসংগত সময়ে আয়োজিতব্য নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের প্রস্তাবনায় এর উল্লেখ থাকবে এবং তফশিলে এ ঘোষণাপত্র সংযুক্ত থাকবে। এ ঘোষণাপত্র ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে কার্যকর বলে ধরে নেওয়া হবে।
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


মন্তব্য