শিরোনাম
ইবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু'র তদন্তের দাবিতে আন্দোলন, উত্তেজনা ও হট্টগোল
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আল কোরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহ'র রহস্যজনক মৃত্যুতে উত্তাল হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। শনিবার (১৯ জুলাই) সকাল ১১ টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা। তবে আন্দোলন চলাকালীন কয়েক দফায় হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে।
জানা যায়, গতকাল শুক্রবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে আজ শনিবার আন্দোলনের ঘোষণা দেন ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের সমন্বয়ে ঘটিত সংবর্ত-৩৬ ব্যাচ। একইদিনে আন্দোলনের ঘোষণা দেন আল কোরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ। এদিকে আজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের সামনে আন্দোলন চলাকালীন সময়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয় হয় সংবর্ত-৩৬ ও আল কোরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মধ্যে। হঠাৎ করে সংবর্ত-৩৬ ব্যাচ গায়েবানা জানাজার সিদ্ধান্ত নিলেও আল কোরআন বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষার্থী তাতে সাড়া দেননি। এতে দুই পক্ষের মধ্যে হট্টগোল হয়। পরবর্তীতে গায়েবানা জানাজা শেষে সংবর্ত-৩৬ ব্যাচ পুনরায় প্রশাসন ভবনের সামনে আন্দোলনে মিলিত হন। এরপর কয়েক দফায় তাদের মধ্যে হট্টগোল হতে দেখা যায়। এছাড়া আন্দোলনে ইবি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরসহ রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলো সংহতি প্রকাশ করেন। ইবি ছাত্রদল ব্যানার নিয়ে গেলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দলীয় ব্যানার নামিয়ে নিতে বলেন। ফলে ছাত্রদল দলীয় ব্যানার গুটিয়ে নেন। এদিকে আন্দোলনে ছাত্রশিবিরকে হট্টগোলের জন্য দায়ী করে বক্তব্য দেন সাজিদ আব্দুল্লাহ'র বন্ধু ইনসানুল ইমাম। পরবর্তীতে তিনি ভুল বুঝতে পেরে বক্তব্যের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন ছাত্রশিবিরের নেতৃবৃন্দের কাছে। এর ফলে আন্দোলনে ভাঙন দেখা দেয়। কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন শিক্ষার্থীরা। এসময় শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেন এখানে কোনো রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থাকবে না। সবাইকে সাধারণ হিসেবে অংশগ্রহণ করতে হবে।
পরে বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মতিনুর রহমান, ইউট্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ড. তোজাম্মেল হোসেন ও জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য প্রদান করেন। তবে জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা সংহতি প্রকাশ করতে চাইলে তাদেরকে সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে জানা যায়। এছাড়া আল কোরআন বিভাগের শিক্ষকদের বক্তব্য দিতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে সংবর্ত-৩৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। সেইসময় ইফতেহার উদ্দীন তামিম নামের এক শিক্ষার্থী বারবার মাইক নিয়ে ঝামেলা করছিলো বলে অভিযোগ করেছেন অনেকেই। এদিকে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. এম এয়াকুব আলীকে অসম্মান করার অভিযোগ উঠে এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। ওই শিক্ষার্থীর নাম মেহেদী হাসান। তিনি বাংলা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী।
এদিকে আন্দোলনে এসব হট্টগোল ও নানা অব্যবস্থপনার বিষয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সহ সমন্বয়ক গোলাম রব্বানী বলেন, আন্দোলনে রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনসহ আমাদের সকলের অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু সংবর্ত-৩৬ ব্যাচ আন্দোলনে নিজেদের ব্যানার জাহির করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আন্দোলনটি আরও সুন্দর হতে পারতো। সকল ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরা কথা বললে আন্দোলনটি আরও দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়তো। এধরনের আন্দোলনে সংবর্ত ৩৬ সহ যারা বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে তাদেরকে তীব্র নিন্দা জানাই।
সাজিদ আব্দুল্লাহর বন্ধু ইনসানুল ইমাম বলেন, আজকের আন্দোলনে আমাদের সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব ছিল। এছাড়া অসংখ্য শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি হওয়ায় কিছুট মিস ম্যানেজমেন্ট হয়েছে। আমি যখন বক্তব্য দিচ্ছিলাম তখন আমার কানে অনেকেই অনেক কথা বলছিল। এসময় আমার বক্তব্যে একটু ত্রুটি হয়েছিল যার ফলে একটু বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এরজন্য আমি পরবর্তীতে ক্ষমাও চেয়েছি। আমার জায়গা থেকে এসব ভুলের উর্ধে উঠে সকল রাজনৈতিক ও সমাজিক সংগঠনের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে আমরা আমাদের ভাই সাজিদ আব্দুল্লাহর জন্য লড়াইয়ে নেমেছি। এ লড়াইয়ে আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে চাই। এ জন্য সকলের প্রতি আমার করজোড়ে অনুরোধ আপনারা আমার ভাইয়ের তদন্ত ছাড়া ঘরে বসে থাকবেন না দয়া করে। আপনারা যদি ঘরে বসে থাকেন তাহলে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে থাকবে। এটা আমরা হতে দিতে পারি না।
শহীদ সাগরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন বাঙলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২১-২২ সেশনের মেধাবী শিক্ষার্থী সাগর আহমেদ। তিনি মিরপুর ১০ নম্বরে চলমান আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে গিয়ে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন।
শনিবার (১৯ জুলাই,২০২৪) সাগরের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এক মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাগরের সহপাঠী, বন্ধুরা। দোয়া মাহফিলে সাগরের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয় এবং তার আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।
সাগরের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্মৃতিচারণ করে বলেন, "সাগর শুধু একজন বন্ধু নয়, সে ছিল আমার ভাইয়ের মতো। আমরা দুজন একসাথে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম, কিন্তু আজ সে আমাদের মাঝে নেই। সাগরের মতো সাহসী যুবক আমাদের পথ দেখিয়ে গেছে।"
দোয়া মাহফিলে সাগর সহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া সকল শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের জন্য দোয়া করা হয়। একইসঙ্গে শহীদদের হত্যা ও দমন-পীড়নের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। পরবর্তীতে শহীদ সাগরের রুহের মাগফেরাত কামনা করে পথচারীদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়।
এই আয়োজনটি ছিল শহীদ সাগরের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার একটি অনন্য প্রয়াস। তার আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে, এমনটাই মনে করছেন উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন ও গণজাগরণে শিক্ষার্থীদের এই অংশগ্রহণ একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করেন কলেজটির অনেকে।
ইবি শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহ'র রহস্যজনক মৃত্যু, সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে উত্তাল ইবি
গত বৃহস্পতিবার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শাহ আজিজুর রহমান হলের পুকুর থেকে সাজিদ আব্দুল্লাহ নামে এক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শনিবার (১৯ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে সমবেত হয় হাজারও শিক্ষার্থী। উত্তাল হয়ে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়। এময় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দেয় শিক্ষার্থীরা।
সাজিদ আব্দুল্লাহ'র মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—সেই বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠে ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের ভেতরে ঢুকে স্লোগান দিতে থাকেন তারা। এসময় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তব্যাক্তিরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললেও কোনো সুরাহ মেলেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির রুটিন দায়িত্বে থাকা প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. এম এয়াকুব আলী সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের সর্বোচ্চ আশ্বাস দিলেও শিক্ষার্থীরা তা উপেক্ষা করে এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেয়।
শিক্ষার্থীরা এ মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। মৃত্যুকে রহস্যজনক আখ্যা দিয়ে এর পেছনে প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ তুলেছেন তারা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আমরা লাশ দেখে প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম। আমাদের জানানোর প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পর সেই লাশ উদ্ধার করা হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে থানা হওয়ার পরেও পুলিশ আসতে এতো সময় লাগলো কেন? এছাড়া লাশ উঠানোর প্রায় আধা ঘণ্টা পার হলেও সেখানে কোন ডাক্তার বা অ্যাম্বুলেন্স আসেনি। পরে আমরা বাধ্য হয়ে ভ্যানে করে তাকে মেডিকেলে নিয়ে যাই। পরে তাকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
তারা আরও অভিযোগ করেন, লাশ শনাক্তের দুই ঘণ্টার মধ্যেও প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা কিংবা হল প্রভোস্টের দেখা মেলেনি। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা গুলোতে কোনো সিসি ক্যামেরা সচল নেই। এখন আমরা দেখতেও পাচ্ছি না, সে কখন কোথায় গিয়েছে। একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন নিরাপত্তার ঘাটতি মোটেও কাম্য নয়। আমরা প্রশাসনকে বার বার বলার পরেও তারা বাজেট ঘাটতির কথা বলে সিসি ক্যামেরা লাগাচ্ছে না। তাদের যদি এতই ঘাটতি থাকে তাহলে আমাদের বলুক আমরা নিজেরা চাঁদা তুলে সিসি ক্যামেরা লাগাবো।
এসময় শিক্ষার্থীরা সাজিদের মৃত্যুর তদন্ত দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশ করা, পুরো ক্যাম্পাস সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা, আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের এন্ট্রি ও এক্সিট শতভাগ মনিটরিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা, ক্যাম্পাসের চারপাশে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তাবেষ্টিত বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করা, ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট স্থাপন ও সক্রিয় রাখা ও বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। দাবি বাস্তবায়ন না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের এই কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন সংহতি প্রকাশ করে অংশ নেন।
এর আগে, সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল মাঠে শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহর গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সেখান থেকে মিছিল নিয়ে প্রশাসন ভবনের সামনে সমবেত হয় শিক্ষার্থীরা। এদিকে শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন না করা পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনেরও ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এছাড়া শুক্রবার রাতে মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে টর্চলাইট মিছিল করে শাখা ছাত্রশিবির। এসময় তারা নিরাপদ ক্যাম্পাস, শতভাগ আবাসিকতা, পুরো ক্যাম্পাস সিসিটিভির আওতায় আনার জোর দাবি জানান।
উল্লেখ্য: গত ১৭ জুলাই (বৃহস্পতিবার) বিকেল পাঁচটার দিকে শাহ আজিজুর রহমান হল সংলগ্ন পুকুরে সাজিদ আব্দুল্লাহর মরদেহ ভেসে থাকতে দেখে শিক্ষার্থীরা। পরে বিকেল সাড়ে ৬ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও ইবি থানা পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। সাজিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি শহিদ জিয়াউর রহমান হলের ১০৯ নং রুমে থাকতেন। তার বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলায়। বাবার নাম মুহাম্মদ আহসান হাবিবুল্লাহ ও মায়ের নাম সুমাইয়া আক্তার। এদিকে সাজিদ আব্দুল্লাহর মৃত্যু নিয়ে অনেকের মনে উঠেছে নানা প্রশ্ন—কীভাবে তার মৃত্যু হলো? আদৌও তার সঙ্গে কোনো ঘটনা ঘটেছিল কিনা? এসব প্রশ্ন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শহীদ জিয়াউর রহমান হল কর্তৃপক্ষ আলাদা আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ সাগরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
আজ ১৯শে জুলাই, সরকারি বাঙলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাগর আহমেদের(২১) প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ঠিক এক বছর আগে, কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন সময় ২০২৪ সালের এই দিনে রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। পরদিন ২০ জুলাই তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়।
সাগর রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের টাকাপোড়া গ্রামের কৃষক তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
একমাত্র পুত্রসন্তানকে হারিয়ে গভীর শোক আর অসীম শূন্যতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন সাগরের বাবা-মা। পরিবারের সকল আশা-ভরসা আর স্বপ্ন ছিল সাগরকে ঘিরে। একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে পরিবারটি এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। সাগরের মৃত্যুর এই এক বছর ধরে সময় যেনো থেমে আছে তার বাবা-মার জন্য।
সন্তানের মৃত্যুর একটি বছর পার হলেও বাড়িতে এখনো চলছে শোকের মাতম। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তোফাজ্জেল হোসেন এখনও স্বজনের কাছে ছেলেকে নিয়ে নিজের ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন হাতড়ে ডুকরে কাঁদছেন। মা গোলাপী বেগম এখনও স্বাভাবিক হতে পারেননি। সব সময় ছেলের জন্য আনমনা থাকেন।
স্বজনদের কাছ থেকে জানা যায়, গত বছরের ১৯ জুলাই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সাগর তার বাবাকে ফোন করেন। সবার খোঁজখবর নিয়ে বিকাশে এক হাজার টাকা দিতে বলেন। স্থানীয় নারুয়া বাজারে গিয়ে আধাঘণ্টা বাদেই টাকা দেন তার বাবা। টাকা পেয়েছে কিনা নিশ্চিত হতে কল দেন; কিন্তু রিসিভ হয় না।
একটার পর একটা কল তিনি দিতেই থাকেন। মিনিট দশেক পর একবার রিসিভ হলে অপর প্রান্ত থেকে কেউ একজন জানান, সাগর পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। পরে সাগরের মরদেহ এনে পরের দিন ২০ জুলাই গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।
ছেলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাগরের বাবা তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, “মাঠে কাজ করা দেখে সাগর প্রায়ই বলত- বাবা, আর ক’টা দিন অপেক্ষা করো। তোমাকে আমি আর রোদে পুড়তে দেব না। আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমার ছেলে তো কোনো অপরাধ করেনি। শুধু সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। আমার বুকের মানিক যেন পরপাওে ভালো থাকে সেই দোয়া আপনারা করবেন। সাগরের জন্য আমাদের সব কিছু থমকে গিয়েছে। প্রতিটা দিন আমাদের জন্য অভিশপ্ত।”
সরকারি বাঙলা কলেজে অধ্যায়নরত সাগরের সহপাঠীরা জানান, সাগর ছিলেন শান্ত, ভদ্র এবং সচেতন প্রকৃতির ছাত্র। তার কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। কেবল ন্যায্যতার পক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি সহপাঠীদের সঙ্গে আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন।
সাগরের সহপাঠী রাশিদুল ইসলাম আশা জানান, সাগর ছিলেন মানবিক ও নিরীহ প্রকৃতির একজন মানুষ। তিনি বলেন, “সে ছিল আমাদের মধ্যে সবচেয়ে মানবিক ও নিরীহ প্রকৃতির, সাগর কোনো ঝামেলায় থাকতো না। তাঁর আশা ছিলো পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হবে। এজন্য সে সরকারি চাকরির বৈষম্যমূলক কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলো। এখন তার নামটা শুধুই স্মৃতি।”
সাগরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গতোকাল শুক্রবার (১৮ জুলাই) বাদ জুম্মা নিজ বাড়িতে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন তার পরিবার। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার সাগরের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা-মার খোঁজ-খবর নেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে শহীদ সাগরের কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ ও জিয়ারত করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তারিফ উল ইসলাম।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান, সহকারি কমিশনান (ভূমি) এহসানুল হক শিপন, বালিয়াকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্বজন ও প্রতিবেশীরা।
সাগরের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ বাঙলা কলেজে তার সহপাঠীদের উদ্যোগেও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
সাগর তাঁর নিজ গ্রাম নারুয়ার স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিকের গন্ডি পার করে লিয়াকত আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০১৯ সালে মানবিকে এসএসসি পাস করেন। পরে রাজবাড়ী সরকারি কলেজে থেকে ২০২১ সালে এইচএসসি পাস করে উচ্চ শিক্ষার জন্য ঢাকায় আসেন। ঢাকায় এসে সরকারি বাঙলা কলেজে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে অনার্সে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি পার্ট-টাইম চাকরি করতেন। জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হলে তিনি এ আন্দোলনে যোগদান করেন এবং শহীদ হন।
সাগরের মৃত্যু সামাজিক অঙ্গন এবং ছাত্র মহলে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক বিমুর্ত প্রতীক হয়ে ওঠেন সাগর।
মুগ্ধর আত্মত্যাগ: এক মহাকাব্যের ঐতিহাসিক দিন আজ
চোখের নিচের তিলটাই বলে দিতো, কোনটা মুগ্ধ, কোনটা স্নিগ্ধ – মুগ্ধর বাবা
১৮ জুলাই ২০২৪—বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি রক্তাক্ত বিকেল, একটি নাম: মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। আজ সেই দিনটির এক বছর। এক বছর হয়ে গেল মুগ্ধ নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া মুগ্ধতা ছড়িয়ে আছে আন্দোলনের স্লোগানে, একটি পরিবারের প্রতিটি নিঃশ্বাসে এবং উত্তরার প্রতিটি ঘরে-গলিতে।
মুগ্ধর জীবনের শেষ দিনটি ছিল অভ্যাসের মতোই সাধারণ। পরিবারের সবাইকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বাসস্টেশনে। পরিবার যাচ্ছিল কক্সবাজার, উখিয়ায়। বিদায়ের সময় মায়ের উদ্দেশে বলে গিয়েছিলেন মাত্র দুটি শব্দ “আম্মু, যাই।” সেটাই ছিল তাদের শেষ দেখা। কেউ ভাবেনি, ছেলের মুখ আর দেখা হবে না। পরিবারের সদস্যরা তখনও জানতেন না, যে ছেলে হাসিমুখে বিদায় জানিয়েছিল, সে ওই বিকেলেই ইতিহাস হয়ে যাবে।
বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে মুগ্ধ ছিলেন আজমপুরে, যেখানে কোটা সংস্কার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের অংশ হিসেবে তিনি আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে পানি পান করাচ্ছিলেন। সহযোদ্ধাদের সেবায় ব্যস্ত সেই ছেলেটি, ঠিক ২৮ মিনিট পর ৫টা ৫০ মিনিটে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন রাজপথে। তার মৃত্যু ছিল আকস্মিক, কিন্তু প্রতিবাদে নিবেদিত ছিল তার প্রতিটি নিঃশ্বাস। মৃত্যুর ৯ মিনিট আগে নিজের মোবাইলে তিনি ধারণ করেছিলেন একটি ভিডিও—সেখানে উপস্থিত সবাইকে গুলির ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন মুগ্ধ। সেটাই ছিল তার শেষ বার্তা।
উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের বাড়িটি আজও মুগ্ধর অপেক্ষায় থাকে। তার ঘরের বিছানা, জামাকাপড়, টেবিল সবই আছে আগের মতো। শুধু নেই সেই হাসিমুখের তরুণ। যমজ ভাই স্নিগ্ধের সঙ্গে ছোটবেলার ছবি দেখিয়ে বাবা এখন বলেন, “চোখের নিচের তিলটাই বলে দিতো, কোনটা মুগ্ধ, কোনটা স্নিগ্ধ।” এখন সে চিহ্নই একমাত্র সম্বল।
মৃত্যুর তিন দিন আগে আন্দোলনে যাবার জন্য বাবা-মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছিলেন মুগ্ধ। বড় ভাই দীপ্তের সঙ্গে ছিল বন্ধুর মতো সম্পর্ক। কিন্তু মুগ্ধর মৃত্যুসংবাদটা শুনতে হয়েছিল উখিয়ায় অবস্থানরত বড় ভাইকেই; মুঠোফোনে জানিয়েছিল স্নিগ্ধ।
মায়ের জীবনের প্রথম সমুদ্র দর্শনের সেই দিনে, যখন তিনি অবাক হয়ে ছিলেন প্রকৃতির সৌন্দর্যে, ঠিক তখনই এসে পৌঁছেছিল ছেলের মৃত্যুর খবর। পরিবার চেয়েছিল মুগ্ধকে দাফন করতে উত্তরায় তার দাদা-দাদীর কবরের পাশে। কিন্তু নানা জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাকে শায়িত করা হয় কামারপাড়া কবরস্থানে, যেখানে কেবল এলাকার ভোটারদের দাফন করার রীতি। কিন্তু মুগ্ধর জন্য সেই নিয়ম ভাঙা হয়।
মুগ্ধ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক শেষ করে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে এমবিএ করছিলেন। একটি অপূর্ণ স্বপ্ন ছিল তার—বিমান বাহিনীতে যোগ দেওয়া। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। টেবিলে তার অর্জিত সব ক্রেস্ট সারি করে সাজানো যেন বলছে, এই তরুণ থেমে যাননি, থামেননি কখনো।
উত্তরার তার বাসার গলিটির নাম এখন ‘মীর মুগ্ধ সড়ক’। সেই গলিতে আর ফিরে আসে না মুগ্ধর পায়ের শব্দ, কিন্তু প্রতিবাদের প্রতিধ্বনির মতো বাজে তার নাম। যে তরুণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল বুক চিতিয়ে, সেই নামটি আজ ইতিহাস হয়ে গেছে।
গত ১১ জুলাই বিকেলে কামারপাড়া কবরস্থানে দেখা গেল মুগ্ধর সাদা মার্বেল পাথরের এপিটাফ। তার কবরের বুকে বেড়ে উঠেছে গাঁদা ফুলের গাছ হলুদ ফুলের হাসিতে ছড়িয়ে আছে এক গভীর শান্তি। কবরটি একা নয়; তার পাশে লম্বালম্বি শুয়ে আছেন আরেক শহীদ রিদোয়ান শরীফ রিয়াদ জয়। গাঁদা ফুলের গাছ যেন দুই শহীদের কবরকে এক করে রেখেছে। এ যেন এক পবিত্র যোগসূত্র মুগ্ধর পথ ধরে জয়, এবং মৃত্যুতে জন্ম নেওয়া এক মহাকাব্য।
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


মন্তব্য