শিরোনাম
শাবির এক শিক্ষককে ফেনসিডিল দিতে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মী আটক
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে চলছে শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন। আর এর মধ্যেই নতুন ঘটলো নতুন এক ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষককে ফেনসিডিল সরবরাহ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে আটক হয়েছেন জাহিদুর রহমান নামে এক নিরাপত্তাকর্মী।
সোমবার রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন সংলগ্ন টিচার্স ডরমিটরিতে এক শিক্ষককে ফেনসিডিল দিতে যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীরা ওই নিরাপত্তাকর্মীকে হাতে-নাতে আটক করেন।
পরে শিক্ষার্থীরা ছবি দেখালে আটক নিরাপত্তাকর্মী নিশ্চিত করেন ওই শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মাজহারুল হাসান মজুমদার। নিরাপত্তাকর্মীর দেয়া অন্যান বর্ণনাও ওই শিক্ষকের সঙ্গে মিলে যায়।
জানা গেছে, সোমবার রাত ১১টার দিকে ফেনসিডিল নিয়ে উপাচার্যের বাসভবনের দিকে যাওয়ার সময় নিরাপত্তা কর্মীকে আটক করা হয়। এ সময় জাহিদুরের কাছ থেকে একটি আইডিকার্ড পাওয়া যায়। ওই আইডিকার্ডে তার নাম জাহিদুর রহমান বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আটকের পর জাহিদুর নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের পাশের অতিথি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। এরপর আটক জাহিদুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি বলেন, একজন স্যার আমাকে বলেন এক লোক একটি ওষুধ দেবে তা এনে দিতে। ওই শিক্ষকের কথামতো আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কাছ থেকে এক লোকের দেয়া ওষুধ নিয়ে আসি। এটি ফেনসিডিল কিনা তা আমি জানতাম না। পরে গণমাধ্যমকর্মী, পুলিশ ও তিন শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে তাকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি ভবন ও ডরমেটরিতে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে এ অভিযুক্ত শিক্ষককে পাওয়া যায়নি। পরে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকের ছবি দেখালে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মাজহারুল হাসান মজুমদারকে শনাক্ত করেন জাহিদুর।
এ বিষয়ে পুলিশের উপ-কমিশনার আজবাহার আলী বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে দেখেছি শিক্ষার্থীরা তাকে আটক করেছেন। তখন শিক্ষার্থীরা তার হাতে একটি ফেনসিডিলের বোতল পায়। এতে হিন্দি ও ইংরেজিতে লিখা আছে এটি ফেনসিডিল। আমরা এ ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছি। তবে, কে অভিযুক্ত রয়েছেন তা মৌখিকভাবে বলা হলেও তদন্ত সাপেক্ষে তা বের হয়ে আসবে।
সংকট সমাধানে দ্রুত সিদ্ধান্ত চান শিক্ষার্থীরা
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আমরণ অনশন এখনো চলছে। গতকাল সোমবার রাত ১১টায় অনশনের ১২৮ ঘণ্টা পেরোলেও সংকট থেকে বেরিয়ে আসার কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক–শিক্ষার্থী সবাই এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের দ্রুত সিদ্ধান্ত দেখতে চাইছেন।
এদিকে এ আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বাইরে তৃতীয় একটি পক্ষ ‘ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টায়’ লিপ্ত আছে বলে ধারণা প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।
অন্যান্য দিনের মতো গতকালও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ক্যাম্পাসে ‘আহ্বান মিছিল’ কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। কর্মসূচি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সিলেটে এসে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পরে ছয়টার দিকে আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে অনশনকারীদের পাশে অবস্থান নেন।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, শনিবার রাতে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে তাঁদের যে ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হয়, সেখানে সংকট থেকে উত্তরণের আভাস পাওয়া যায়নি। পরদিন দুপুরে আবার ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে বসার কথা ছিল। এরপর থেকে তাঁরা সে বৈঠকের অপেক্ষায় থাকলেও গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সাড়া পাননি। বৈঠক আদৌ হবে কি না, এ নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছে।
আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের একজন সাদিয়া আফরিন বলেন, ‘অনশনকারীরা ক্লান্ত-বিধ্বস্ত-অসুস্থ। তাঁদের অবস্থা মৃত্যুপথযাত্রীর মতো। এরপরও উপাচার্যের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা একচুল সরবেন না। তবে আমরা এখনো আলোচনার জন্য প্রস্তুত।’
শনিবার দিবাগত রাতে ভার্চ্যুয়াল বৈঠক আয়োজনে শিক্ষামন্ত্রী যে প্রতিনিধিদলকে শাবিপ্রবিতে পাঠিয়েছিলেন, এর অন্যতম সদস্য সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই তাঁরা গত রোববার বিকেলে উপাচার্যের বাসভবনের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। এটা খুবই অমানবিক কাজ। এমন সহিংসতা পরিহার করার জন্য আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করছি। আর ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের লিখিতভাবে তাঁদের দাবিগুলো উপস্থাপন করতে বলেছিলেন। সেটা শিক্ষার্থীরা এখনো না দেওয়ায় পুনরায় আলোচনা হয়নি। তবে আমরা বিশ্বাস রাখি, আলোচনার মাধ্যমেই এ সমস্যা কেটে যাবে।’
অনশন ভাঙানোর ব্যর্থ চেষ্টা
গতকাল সন্ধ্যা ছয়টার কিছু আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আলমগীর কবিরের নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক আমরণ অনশনকারীদের জন্য খাবার নিয়ে গেলে শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে শিক্ষকেরা উপাচার্যের বাসভবনে যেতে চাইলে শিক্ষার্থীরা ভেতরে ঢুকতে বাধা দেন। যেতে না পেরে প্রক্টর আলমগীর কবির গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, উপাচার্যের বাসভবনের বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন করায় ও কাউকে যাতায়াতের সুযোগ না দেওয়ায় সেখানে উপাচার্যের পরিবার ও শিক্ষক-কর্মচারীসহ ১৫ জন আটকে পড়েছেন।
প্রক্টর বলেন, হৃদ্রোগের সমস্যার কারণে উপাচার্যকে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয়। তাঁর ওষুধ ও খাবার শেষ হয়ে পড়ায় তাঁরা সেসব দ্রব্য বাসভবনে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বাধায় সেসব পৌঁছাতে পারেননি।
‘সমাধান এখন আমাদের হাতে নেই’
শাবিপ্রবির বর্তমান অচলাবস্থা এবং এ থেকে উত্তরণ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ মো. আনোয়ারুল ইসলাম গতকাল বিকেলে বলেন, ‘আমরা শিক্ষকেরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বোঝাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। শুরুতে তাদের যে তিন দফা দাবি ছিল, সেসবও উপাচার্য মহোদয় মেনে নিয়ে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল! এখন আর সমাধান আমাদের হাতে নেই। তবে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। নিশ্চয়ই আলোচনার মাধ্যমে এ সংকট কেটে যাবে।’
এদিকে শাবিপ্রবির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে উপাচার্য সম্পর্কে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে একটা ধারণা পাওয়া গেছে। তাঁরা জানিয়েছেন, ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট প্রথমবারের মতো ফরিদ উদ্দিন আহমেদ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর গত বছরের ৩০ জুন দ্বিতীয়বারের মতো নিয়োগ পান তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি। ফলে তিনি সরকারের ‘গুডবুকে’ আছেন। তবে চলমান আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়, এ নিয়ে কারও সুস্পষ্ট ধারণা নেই।
তৃতীয় পক্ষের ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টার অভিযোগ
প্রতিবেদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জানান, শাবিপ্রবির চলমান আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বাইরে তৃতীয় একটি পক্ষ ‘ফায়দা হাসিল করার অপচেষ্টায়’ লিপ্ত আছে বলে মনে করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।
গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান ঢাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. রহমত উল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া।
বিবৃতিতে বলা হয়, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। চলমান পরিস্থিতিতে রোববার আন্দোলনকারীরা হঠাৎ করেই উপাচার্যের বাসভবনের পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস–সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন। এটি অমানবিক এবং তা শিক্ষাঙ্গনের আন্দোলনে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত মাত্রা যুক্ত করেছে। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেকোনো সমস্যা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করাই বাঞ্ছনীয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে যে ধরনের তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপিত হয়েছে, তা থেকে প্রতীয়মান হয়, একটি বিশেষ মহল এ আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপান্তরের অপচেষ্টা করছে।
বিভিন্ন সংগঠনের কর্মসূচি
শাবিপ্রবির উপাচার্যকে অপসারণ করে চলমান সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়ে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে গতকাল বিকেলে সংহতি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘সিলেটের নাগরিকবৃন্দ’ ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচি বিভিন্ন শ্রেণি–পেশা ও রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট নাগরিক অংশ নেন। এ ছাড়া সরকারকে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে গতকাল গণমাধ্যমে এক বিবৃতি পাঠিয়েছে গণতন্ত্রী পার্টি সিলেট জেলা ও মহানগর শাখা।
তদন্তের দাবি আনু মুহাম্মদের
প্রতিবেদক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় জানান, সব উপাচার্য পদত্যাগ করলে, তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেছেন, ‘শাহজালালের উপাচার্যের পদত্যাগের বিষয়ে অন্য উপাচার্যরা পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদি বিষয়টি সঠিক হয়, তাহলে সেটি আমাদের জন্য ভালো খবর। সরকারের উচিত হবে, উপাচার্যরা পদত্যাগ করার পরপর একটি তদন্ত কমিটি করা। তদন্তের মাধ্যমে তারা কী করেছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।’
শাবিপ্রবির আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে গতকাল দুপুর ১২টা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে প্রতীকী অনশন করেন বিভিন্ন সরকারি–বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আনু মুহাম্মদ এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এসেছি শিক্ষকসমাজের বড় কলঙ্ক থেকে বাঁচতে। ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষায় সিলেটে যে ঘটনা ঘটেছে, তা এখন গোটা শিক্ষক সমাজের সম্মান রক্ষায় চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে। এর মূল কারণ, কীভাবে উপাচার্য নিয়োগ হচ্ছেন, তা আমরা সবাই জানি।’
কর্মসূচির আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। এ সময় ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হকের নেতৃত্বে তাঁর সংগঠন গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ ছাত্র জোট ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সমন্বয়ে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের ব্যানারে একটি মিছিল এসে কর্মসূচিতে সংহতি জানায়।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ১২ দিন ধরেই উত্তাল শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়। আন্দোলনের প্রথম দিকে দাবি পূরণ না হওয়ায় গত বুধবার বেলা তিনটা থেকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে আমরণ অনশনে বসেন ২৪ শিক্ষার্থী। তাঁদের একজনের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় বাড়ি চলে গেছেন তিনি। অসুস্থ হয়ে ১৫ জন এখন হাসপাতালে ভর্তি। অপর আটজনের শরীরে স্যালাইন পুশ করেছেন চিকিৎসকেরা। আমরণ অনশনের পাশাপাশি গত শনিবার রাত ৮টা থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শুরু করেছেন গণ-অনশন।
জার্মান সরকার শিক্ষার্থীদের কী কী সেবা দিচ্ছে
বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের যানবাহনে হাফ পাসের জন্য আন্দোলন হয়েছে। এরপর হাফ পাসের দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিনগুলোতে নিম্নমানের খাবার নিয়ে প্রায়ই কথা শোনা যায়। ক্যানটিনের এ খাবারে ভরপুর থাকে কার্বোহাইড্রেট আর নামমাত্র সামান্য প্রোটিন। নেই কোনো বৈচিত্র্য আর অন্য পুষ্টিগুণ ওতে নেই বললেই চলে। যদিও একই এই গতানুগতিক খাবার চলছে বছরের পর বছর।
জীবনের দীর্ঘ সময় বিশ্ববিদ্যালয় হলে থেকে ক্যানটিনের এ খাবার খেয়ে মেধা বিকাশ ও সৃজনশীল হওয়া দুঃসাধ্যই বটে। শিক্ষার্থীদের মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো অবস্থা হয় হলগুলোর গণরুম। গাদাগাদি করে বাস করা গণরুমের শিক্ষার্থী কীভাবে পারে দুশ্চিন্তামুক্তভাবে শুধুই পড়াশোনায় ফোকাস করতে?
অন্যদিকে প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাসেবার নামে মিনি চিকিৎসালয় থাকে। ওখানে চিকিৎসা বলতে প্রাথমিক চিকিৎসা আর তিন বেলা প্যারাসিটামল, হিস্টাসিন, সিনামিন আর ওরস্যালাইনের প্যাকেটের ব্যবস্থা। আমরা মুখেই বলি ‘একজন শিক্ষার্থী জাতির ভবিষ্যৎ’ আদতে সেই ভবিষ্যতের রাস্তা আমরা কণ্টকপূর্ণ করে রেখেছি। শিক্ষার আন্তর্জাতিক মান ধরে রাখতে সরকারকে শিক্ষার্থীবান্ধব হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। দেশের উন্নয়ন আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য শিক্ষার্থীদের পথ মসৃণ করা ছাড়া আর কোনো দ্বিতীয় পথ থাকতে পারে না। উন্নয়ন উন্নয়ন বলে গলা ফাটিয়ে নিজের ঢোল নিজে পেটানো আর ‘মুখেন মারিতং জগৎ’ ছাড়া এর বেশি কিছুই করা সম্ভব নয়। বিনা মূল্যে শিক্ষা, শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্ন থাকার ব্যবস্থা, যানবাহনসেবা, স্বাস্থ্যসেবা, খাবারের মান, বিনা মূল্যে আইনি সেবা ইত্যাদি পারে একজন শিক্ষার্থীকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নতি করতে এবং তাদের দ্বারাই দেশের সম্মান ও উন্নয়ন বয়ে আনতে।
পৃথিবীর অন্যতম উন্নত রাষ্ট্র ও জ্ঞান–বিজ্ঞানের তীর্থস্থান জার্মানি কেমন শিক্ষার্থীবান্ধব—এবার সেই প্রসঙ্গে আসছি এবং এই আসাটা আসলে বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনার জন্য নয়। আমাদের ঘাটতি কোথায় এবং কেন আমরা এগিয়ে যেতে পারছি না, এইটুকু জানার জন্য তথ্যগুলা জেনে রাখা ভালো।
জার্মানিতে বাসাভাড়া থেকে শুরু করে ক্যানটিনে খাওয়াদাওয়া, যানবাহনে ভ্রমণ, স্বাস্থ্যসেবা এমনকি আইনজীবীর সাহায্য পেতেও শিক্ষার্থীরা বিশেষ সুবিধা পান। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত নাগরিক ও চাকরিজীবীদের ঘাড় ভেঙে টাকা আদায় করে সেই টাকা দিয়েই শিক্ষার্থীদের সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করা হয়। শিক্ষার্থীদের এত্ত এত্ত সুযোগ–সুবিধা পাওয়া দেখলে নিজেরই হিংসা হয়—ইশ! সারা জীবন যদি শিক্ষার্থী থেকে যেতে পারতাম!
প্রথমত, বাসাভাড়ার ক্ষেত্রে জার্মানিতে সব থেকে বাড়াবাড়ি রকমের যে সমস্যা হয়, সেটা হলো বছর শেষে অতিরিক্ত একটা টাকা গুনতে হয় এবং এটা নির্ভর করে ভাড়াটে কতটুকু বিদ্যুৎ, পানি ও রুম হিটার ব্যবহার করছে। যদিও মাস শেষে প্রত্যেক ভাড়াটে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বিদ্যুৎ বিল ও পানির বিল হিসেবে পরিশোধ করেন। বছর শেষে এই উটকো টাকার পরিমাণ ব্যবহারের তারতম্যভেদে ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। আবার ভাড়াটে একেবারেই কিপ্টামি করে চললে টাকা ফেরতও পেতে পারেন। তবে ফেরত পাওয়ার ঘটনা খুব বিরল। ইতিবাচক খবর হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা এ–জাতীয় ঝামেলা থেকে মুক্ত। শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট আবাসনগুলোতে এদের মাসিক ভাড়ার অতিরিক্ত কোনো টাকা গুনতে হয় না। সে সারা বছর ধরে যতটুকুই বিদ্যুৎ বা পানি খরচ করুক না কেন। জার্মানদের মতো একটা মিতব্যায়ী ও কৃপণ জাতির কাছ থেকে পাওয়া উপহার শিক্ষার্থীদের জন্য একটা বিরাট মজার ব্যাপার।
পাবলিক যানবাহনে শিক্ষার্থীদের চলাফেরা করার জন্য কোনো টিকিট বা টাকা খরচ করতে হয় না। স্টুডেন্ট কার্ড দেখালেই ল্যাটা চুকে যায়। এবার অনেক শিক্ষার্থী যাঁরা জার্মানিতে পড়ছেন, তাঁরা রেগে গিয়ে বলতে পারেন, ‘এটা মিথ্যা কথা! ছয় মাস পরপর টিকিটের জন্য টাকা জমা দিচ্ছি তো।’
তাহলে এবার একটু বিস্তারিত বলি। প্রতিটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন চার্জের নামে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা করতে হয়। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে দেড় শ থেকে পাঁচ শ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ টাকার সিংহভাগ যায় পরিবহন খাতে।
যেমন জার্মানির স্যাক্সনি আনহাল্ট অঙ্গরাজ্যের হালে শহরে মার্টিন লুথার বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন চার্জ (ছয় মাস অন্তর) ২৪ হাজার টাকা। এ টাকার মধ্যে ১৫ হাজার টাকা পাবে পরিবহন অফিস। বিশ্ববিদ্যালয় নেবে ৮ হাজার টাকা এবং শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিলে যাবে ১ হাজার টাকার মতো। হাজার হাজার টাকার অঙ্ক শুনে অনেক টাকা মনে হলেও একজন শিক্ষার্থী পার্ট টাইম চাকরি করে যা আয় করেন, তার তুলনায় ছয় মাসের ব্যবধানে এসব ১৫ হাজার, ২৪ হাজার টাকা কোনো টাকাই না বরং পয়সা।
অর্থাৎ জার্মানিতে একজন শিক্ষার্থীর আদর দেখলে জামাই আদর টাইপ মনে হতে পারে। যানবহনে ফ্রি ঘোরার একটা নির্দিষ্ট এলাকা থাকে। যদিও মুক্তভাবে জার্মানির পুরো দু–একটা অঙ্গরাজ্যজুড়ে ঘুরেফিরে বেড়ানোর জন্য এই একটা স্টুডেন্ট কার্ড যথেষ্ট। একজন শিক্ষার্থীর জন্য দিনে ২৪ ঘণ্টা ফ্রি ভ্রমণে বাস, ট্রেন, ট্রাম উন্মুক্ত থাকে।
যদিও একজন সাধারণ যাত্রীর জন্য জার্মানিতে বাস, ট্রাম, ট্রেনের টিকিট যথেষ্ট ব্যয়বহুল। সব যানবহনে টিকিট চেকার অন্য সব টিকিট উল্টে–পাল্টে স্ক্যান করে পরীক্ষা করলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট কার্ড দূর থেকে দেখামাত্রই ধন্যবাদ দিয়ে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। এটাও একটা সম্মান।
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিমাও একটু আলাদা রকমের সেবা দেয়। ৩০ বছরের নিচে যেকোনো শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্যবিমা নির্দিষ্ট করা থাকে এবং সরকার অনুমোদিত বিমা কোম্পানিভেদে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে। যদিও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যবিমা নির্ভর করে তার আয়–রোজগার কেমন। একজন ফুলটাইম চাকরিজীবী ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্তও স্বাস্থ্যবিমা দিয়ে থাকেন। যদিও চিকিৎসাসেবার জন্য হাসপাতাল ও জার্মানির যেকোনো ক্লিনিকের চিকিৎসা সবার জন্যই সমান।
জার্মানিতে আইনি জটিলতায় পড়েছেন? একজন আইনজীবী দরকার! প্রচণ্ড ব্যয়বহুল! আপনাকে পদে পদে হাজার থেকে লাখ টাকা খরচ করতে হবে অথচ একজন শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিলের মাধ্যমে ফ্রি আইনি সেবা পান। ওই যে সেশন চার্জের সঙ্গে এক হাজার টাকা শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিলে দেওয়া হলো। এ সেবাটা ওই টাকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। ফ্রি আইনি সেবার ব্যাপারটা একটা শিক্ষার্থীর জন্য প্রচণ্ড আশীর্বাদস্বরূপ।
একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিনে একই খাবারে তিন ধরনের খাবার বিল ঠিক করা থাকে—শিক্ষার্থী, শিক্ষক/স্টাফ ও অতিথি। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের খাবারের দাম শিক্ষক বা স্টাফদের থেকে অর্ধেকের কম দাম ধার্য করা থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, অতিথিদের একই খাবার ক্যানটিন থেকে দ্বিগুণ দামে কিনে খেতে হয়। চা, কফির ভেন্ডিং মেশিন ও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আলাদা করা থাকে। এখানেও শিক্ষার্থীরা অর্ধেক দামে চা, কফি, ড্রিংকস কিনতে পারেন। দুপুরের খাবারে থাকে নানা রকম বৈচিত্র্য। সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবসেই নানা বৈচিত্র্যের খাবার পরিবেশন করা হয় এবং খাবারে এটাও লেবেলিং করা থাকে যে কোন খাবারের পুষ্টিগুণ কেমন।
মোদ্দা কথা, মসৃণ পথের একটি অরাজনৈতিক আবহে মোড়ানো শিক্ষার্থীরা নিজে পারে সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীল হতে এবং এরাই পারে দেশকে উন্নত মানের সেবা দিতে, অন্যথায় নয়! * লেখক: মাহবুব মানিক, গবেষক, মার্সেবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স, হালে, জার্মানি
শিক্ষককে ৬ মাসের বেশি বরখাস্ত রাখা যাবে না
বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষকদের ছয় মাসের বেশি সময় বরখাস্ত রাখা যাবে না। এই নির্দেশনা দিয়ে এক রিট আবেদনের উপর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষককে ৬ মাসের বেশি বরখাস্ত রাখলে সেই আদেশ বাতিল হয়ে যাবে।
গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর মাগুরার স্কুল শিক্ষক বাদশা মিয়ার রিটের প্রেক্ষিতে এই রায় দেয়া হয়েছিল। তিনি ১৪ বছর ধরে বরখাস্ত ছিলেন। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের স্বাক্ষরের পর ১৫ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হলো।
রায়ে বেসরকারি শিক্ষকদের চাকরিবিধিমালায় এই আইন সংযোজন করতে বলা হয়েছে। একই সাথে এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি ইস্যু করে সব শিক্ষা বোর্ড এ বিষয়ে পরিপত্র জারি করতে বলা হয়েছে।
রিটের আদেশে আদালত বাদশা মিয়ার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে ৯০ দিনের মধ্যে যোগদান করানোর নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়া তার বকেয়া বেতন-ভাতাও পরিশোধের নির্দেশ দেন আদালত।
রিটকারীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর বেসরকারি শিক্ষকদের ৬ মাসের বেশি বরখাস্ত রাখা যাবে না বলে রায় দেন হাইকোর্ট। ওই আদেশে ৬ মাসের বেশি শিক্ষককে বরখাস্ত রাখলে আদেশ বাতিল হয়ে যাবে বলে উল্লেখ করা হয়।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির পল্লব আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার।
ইউনিসেফের প্রতিবেদন স্কুল বন্ধ থাকায় বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত
করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসে এবং কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর দুই বছর পূর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে ইউনিসেফ শিশুদের পড়াশোনার ওপর মহামারিটির প্রভাব সম্পর্কে প্রাপ্ত সবশেষ উপাত্ত তুলে ধরেছে। আজ সোমবার (২৪ জানুয়ারি) ইউনিসেফ এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করে।
২০২০ সালের প্রথম দিকে কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে স্কুল বন্ধ ছিল। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে স্কুলগুলো পুনরায় খুলে দেওয়া হলেও সরকার নতুন করে চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্কুল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি মি. শেলডন ইয়েট বলেন, কোভিড-১৯ মোকাবিলার ক্ষেত্রে স্কুল বন্ধ করতে হলে তা অবশ্যই শেষ অবলম্বন হিসেবে অস্থায়ী ভিত্তিতে করতে হবে। সংক্রমণের ঢেউ সামাল দিতে আমরা যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছি তার মধ্যে প্রতিষ্ঠান বন্ধের ক্ষেত্রে সবার শেষে এবং খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে স্কুল থাকা উচিত।
ইউনিসেফের শিক্ষা-বিষয়ক প্রধান রবার্ট জেনকিন্স বলেন, বৈশ্বিক শিক্ষা ব্যবস্থায় কোভিড-১৯ সম্পর্কিত বিঘ্নের দুই বছর পূর্ণ হবে আগামী মার্চে। খুব সহজভাবে বললে, আমরা শিশুদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে প্রায় অপূরণীয় মাত্রার ক্ষতি প্রত্যক্ষ করছি। তবে পড়াশোনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার অবসান ঘটাতে হবে এবং শুধু স্কুল পুনরায় খুলে দেওয়াই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। পড়াশোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে শিক্ষার্থীদের নিবিড় সহায়তা প্রয়োজন। শিশুদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য, সামাজিক বিকাশ এবং পুষ্টি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে স্কুলগুলোকে শুধু শেখানোর নির্ধারিত গণ্ডির বাইরেও যেতে হবে।
শিশুরা গণনা ও স্বাক্ষরতার মৌলিক দক্ষতা হারিয়েছে। বৈশ্বিকভাবে পড়াশোনায় ব্যাঘাতের অর্থ হলো—লাখ লাখ শিশু শ্রেণিকক্ষে থাকলে যে একাডেমিক শিক্ষা অর্জন করতে পারতো তা থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বঞ্চিত হয়েছে, যেখানে ছোট ও আরও বেশি প্রান্তিক শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে স্কুল বন্ধের কারণে পড়াশোনার ক্ষতি হওয়ায় ১০ বছর বয়সীদের ৭০ শতাংশই সহজ পাঠ্য পড়া বা বোঝার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি, যা মহামারির আগের সময়ের তুলনায় ৫৩ শতাংশ বেশি।
ইথিওপিয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা স্বাভাবিক শিক্ষাবর্ষে যে পরিমাণ গণিত শিখতে পারতো তার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শিখতে পেরেছে বলে ধারণা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, টেনেসি, উত্তর ক্যারোলিনা, ওহাইও, ভার্জিনিয়া ও মেরিল্যান্ডসহ অনেক অঙ্গরাজ্যে পড়াশোনার ক্ষতি পরিলক্ষিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, টেক্সাসে ২০২১ সালে গ্রেড ৩-এর দুই-তৃতীয়াংশ শিশুদের তাদের গ্রেডের জন্য গণিতে দক্ষতা কম ছিল। ২০১৯ সালে এই হার ছিল অর্ধেক শিশু।
ব্রাজিলের বেশ কয়েকটি প্রদেশে গ্রেড ২-এর প্রতি ৪ শিশুর মধ্যে ৩ জন পড়ার দক্ষতা অর্জন থেকে বিচ্যুত, যা মহামারির আগে ছিল প্রতি ২ শিশুর মধ্যে একজন। দেশটিতে ১০-১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন জানিয়েছে, তাদের স্কুল পুনরায় খুলে দেওয়ার পরে তারা আর স্কুলে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে না।
দক্ষিণ আফ্রিকায় স্কুলগামী শিশুদের শিক্ষাবর্ষে যে অবস্থানে থাকার কথা তার চেয়ে তারা ৭৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পিছিয়ে আছে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের জুলাইয়ের মধ্যবর্তী সময়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে বলে জানা গেছে।
স্কুল বন্ধ থাকার কারণে এর নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। স্কুল বন্ধ থাকায় তা পড়াশোনার ক্ষতির পাশাপাশি শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করেছে, তাদের নিয়মিত পুষ্টি প্রাপ্তির উৎস কমিয়ে দিয়েছে এবং তাদের নিগ্রহের শিকার হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
ক্রমেই উঠে আসা তথ্য-প্রমাণ দিচ্ছে যে, কোভিড-১৯ শিশু ও তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ হারে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা সৃষ্টি করেছে, যেখানে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মেয়ে, কিশোর-কিশোরী এবং গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারীরা অধিক হারে এই সমস্যাগুলোর সম্মুখীন।
স্কুল বন্ধ থাকার সময়ে বিশ্বব্যাপী ৩৭ কোটিরও বেশি শিশু স্কুলের খাবার থেকে বঞ্চিত হয়, যা কিছু শিশুর জন্য খাবার ও দৈনিক পুষ্টি প্রাপ্তির একমাত্র নির্ভরযোগ্য উৎস এবং তারা সেটা হারায়।
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


মন্তব্য