সরকারি কলেজ সম্পর্কিত নির্দেশনা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা কেন?

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৃতীয়বারের মতো টানা প্রায় ১৪ বছরের সরকার চলছে এখন। নূরুল ইসলাম নাহিদ দুই মেয়াদে টানা ১০ বছর (২০০৯-২০১৮) শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। অধ্যাপক ড. হারুন-অর রশিদ দুই মেয়াদে টানা ৮ বছর (২০১৩-২০২১) জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক টানা প্রায় ৯ বছর (২০০৯-২০১৭) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। এমন দীর্ঘস্থায়ী সরকার, তথা দেশ শাসনের ধারাবাহিকতা, দীর্ঘদিনের শিক্ষামন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদাধিকারী ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে কবে দেখা যাবে কিংবা আদৌ দেখা যাবে কি না জানি না। সংগত কারণেই প্রায় দেড় যুগের বিশেষ এ সময়টিতে শিক্ষাক্ষেত্রে জাতির অনেক প্রত্যাশা ছিল; কিন্তু প্রকৃত অর্থে লাগামহীনভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাবৃদ্ধি, নতুন নতুন বিভাগ ও কোর্স খোলা এবং ক্ষেত্রবিশেষে বাগাড়ম্বর ছাড়া বাস্তব উপযোগী ও সুদূরপ্রসারী কাজ কতটুকু হয়েছে তা ভেবে দেখার বিষয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবুবকর সিদ্দিক মে মাসে সাংবাদিকদের জানান, এখন কলেজগুলোর তালিকা সংগ্রহ করে কোন কলেজ কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হবে সেই কাজ শুরু হয়েছে।

বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেশে কলেজ আছে প্রায় আড়াই হাজার। এর মধ্যে ৮৮১টি কলেজে স্নাতক (সম্মান) পড়ানো হয়। আর মাস্টার্স পড়ানো হয় ১৭০টি কলেজে। কলেজগুলোর মধ্যে আনুমানিক সাড়ে ছয়শ সরকারি আর বাকিগুলো বেসরকারি।

মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মে। পদ-পদবিধারীদের ক্ষেত্রেও একই কথা। খোদ সরকারও কাজের মধ্য দিয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে। ২০১৪ সালের ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপ কমাতে নির্দেশনা দেন। ওই নির্দেশনায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা সরকারি কলেজগুলোকে সংশ্লিষ্ট এলাকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার কথা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনার পর একই বছরের (২০১৪) ডিসেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের নিয়ে সভা হয়। সভায় উপাচার্যরা কলেজগুলোকে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিতে একমত হন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক (সম্মান) পড়ানো হয়-এমন সরকারি কলেজগুলোকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নানারকম জটিলতার কথা তুলে অধিভুক্ত করার কাজটি সময়মতো বাস্তবায়ন করা হয়নি। এরপর আবার এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাগিদ দেওয়া হয়।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা রাজধানীর সাতটি সরকারি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। কলেজগুলো হলো-ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। শুরু থেকেই সরকারি কলেজগুলোকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনতা থেকে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হস্তান্তরের বিষয় নিয়ে সৃষ্টি হয় নানা মতভেদ। এমনকি উল্লিখিত ঢাকার সাতটি কলেজ নিয়েও উপাচার্য ড. আরেফিন সিদ্দিক ও ড. হারুন অর রশিদের মাঝে দেখা দেয় একধরনের টানাপোড়েন। বিষয়টি খুবই হতাশাজনক যে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া একটি নির্দেশনা দীর্ঘ আট বছরেও বাস্তবায়ন করা গেল না!

২.

১৮৫৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয় কলকাতায়। একই বছর (১৮৫৭) কলকাতার মতোই মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই) ও বোম্বেতেও (মুম্বাই) পৃথক দুটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। এর ২৪ বছর পর ১৮৮২ সালে লাহোরে স্থাপিত হয় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় (University of the Punjab)। প্রতিষ্ঠাকাল বিবেচনায় লাহোরে অবস্থিত পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় উপমহাদেশের চতুর্থ বিশ্ববিদ্যালয়। আর পঞ্চমটি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, স্থাপিত ১৮৮৭ সালে। এভাবেই ঢিমেতালে বাড়তে থাকে উপমহাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৪ বছর পর ১৯২১ সালে স্থাপিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময় বাংলা, পাঞ্জাব, আসাম প্রভৃতি এলাকার জনসাধারণের ভাগ্য নতুন করে নির্ধারিত হয়। রেডক্লিফের দেওয়া দাগ অনুযায়ী এসব এলাকার জনগণ ভারতীয় অথবা পাকিস্তানি পরিচয়ে পরিচিত হন (অবশ্য আসামের ক্ষেত্রে অনুষ্ঠিত হয় গণভোট)। পাঞ্জাব বিভক্তির ফলে এর পাকিস্তানি অংশের (পশ্চিম পাঞ্জাব) প্রাণকেন্দ্র লাহোর আর ভারতীয় অংশ (পূর্ব পাঞ্জাব) চণ্ডীগড়কেন্দ্রিক গড়ে উঠতে শুরু করে।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময় শিক্ষাক্ষেত্রে বড় সমস্যা দেখা দেয় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে। ঐতিহ্যবাহী এ বিশ্ববিদ্যালয়টির ভৌগোলিক অবস্থান ও মূল স্থাপনা পাকিস্তানের অংশে পড়লেও এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে এর আওতাধীন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পড়ে যায় ভারতীয় অংশে। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of the Punjab) একাডেমিক পরিধি ছিল খুবই বিস্তৃত। প্রতিষ্ঠার সময়ই শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বিস্তৃতি এবং চাপ কমানোর জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনতা থেকে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে মুক্ত করে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। এছাড়া উত্তর ভারতের বেশির ভাগ অংশ, এমনকি মিয়ানমারের কিছু অংশও পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন ছিল। কিন্তু দেশবিভাগের ফলে পাকিস্তানি এ বিশ্ববিদ্যালয়টি এর ভারতীয় অংশে অবস্থিত কলেজগুলোর অন্তর্ভুক্তি বাতিল করে দেয়। অথচ আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাস্তবতায় এ নিয়ে কারও বলা বা করারও কিছু ছিল না। ভারত-পাকিস্তান দুটিই পৃথক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। রাতারাতি অধিভুক্ত ভারতীয় ওইসব কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কেউ প্রথমবর্ষ, কেউ দ্বিতীয়বর্ষ, কেউ আবার শেষবর্ষের শিক্ষার্থী। একইভাবে কেউ হয়তো মিডটার্ম, কেউ আবার ফাইনাল পরীক্ষার্থী। অনেকে পরীক্ষা দিয়ে ফল প্রকাশের আশা নিয়ে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে। কেউ হয়তো রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করেছে। এমনই এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সঙ্গে এ নিয়ে তাদের অভিভাবকদেরও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। অস্থিরতা দেখা দেয়, এমনকি গান্ধী-নেহরু-আজাদের মতো রাজনীতিকদের মাঝেও। এ অবস্থায় ভারত সরকার তাদের পাঞ্জাবের চণ্ডীগড়ে তড়িঘড়ি একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে খুব দ্রুত তা বাস্তবায়ন করতে উঠেপড়ে লেগে যায়। এভাবে স্বাধীনতার বছরই, ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠা পায় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় নামে উপমহাদেশে আরও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতিবেশী দুটি স্বাধীন দেশ। দুই দেশের সীমান্তবর্তী একই নামে দুটি প্রদেশ বা জনপদ। আবার একই নামে দুটি পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ও। তবে একই নামে পরিচিত হলেও ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের বানানটিতে শুরুতেই কিছুটা ভিন্নতা দেওয়া হয়। ১৮৮২ সালে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানটি University of the Punjab (লাহোর) নামে প্রসিদ্ধি লাভ করলেও ১৯৪৭ সালেরটি Panjab University (চণ্ডীগড়) নামে পরিচিতি পায়।

এদিকে একই সময় পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বাংলা (বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি) বিভাগের ফলে কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক আওতা এবং কর্মপরিধিতেও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। অবশ্য এ নিয়ে কিছু বিপত্তিরও সৃষ্টি হয়। শুরুতে (১৯২১) আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল শহরের ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজ এমন গুটিকয় প্রতিষ্ঠান। ঢাকা শহরের বাইরে পূর্ববঙ্গব্যাপী বিভিন্ন জায়গায় স্থাপিত কলেজগুলোর সবকটি ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। আরেকটি বাস্তবতা-অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আদল অনুসরণে যাত্রার শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনার্স কোর্স চালু করে তিন বছর মেয়াদি। কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অনার্স কোর্স ছিল দুই বছর মেয়াদি। এমন প্রেক্ষাপটে ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ববঙ্গের সবকটি কলেজ নতুন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। তবে বাংলাভাগের ফলে উল্লিখিত কলেজগুলো, হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য পাঞ্জাব ভাগের মতো এমন কোনো অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এনে আবাসিকের পাশাপাশি এফিলিয়েটিং বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবেও দায়িত্ব পালন করে যায় নবোদ্দমে।

বাংলা ও পাঞ্জাবভাগের পাশাপাশি আসামে হয় গণভোট। গণভোটের ভিত্তিতে সিলেট ও কুমিল্লা জেলা পূর্ববঙ্গ তথা পাকিস্তানের অধীনে আসে আর করিমগঞ্জ জেলা আসাম তথা ভারতের অন্তর্ভুক্ত থেকে যায়। এসব এলাকায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় না থাকায় কলেজগুলো নিয়ে নতুন আর কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি।

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু (১৮৮৯-১৯৬৪) ও প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮-১৯৫৮) দুজনই প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। উভয়েই আমৃত্যু যার যার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। নেহরু চার মেয়াদে টানা ১৭ বছর (১৯৪৭-১৯৬৪) আর আজাদ তিন মেয়াদে টানা ১১ বছর (১৯৪৭-১৯৫৮)। শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে টানা ১১ বছর এমন দৃষ্টান্ত উপমহাদেশে আর দ্বিতীয়টি নেই। উপমহাদেশ বিভক্তির অব্যবহিত পর সদ্যস্বাধীন একটি দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ দুজন নেতা যে প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় দিয়ে গেছেন, তা উভয় নেতাকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক