গবেষণা হয় না দেশের ২৭ বিশ্ববিদ্যালয়ে

দেশের ২৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কাজের জন্য কোনো বরাদ্দ ছিল না। এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কার্যক্রম ছাড়াই উচ্চতর ডিগ্রির সনদ বিতরণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ৪৭তম প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

এতে করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা দূরের কথা, এক ধরনের সনদ বিক্রি করা হচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে এখনও মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভর করে ডিগ্রি প্রদান করায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কার্যক্রম বাড়াতে হলে বরাদ্দ ও পলিসি নির্ধারণ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

ইউজিসির সর্বশেষ (২০২০ সালের) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে বর্তমানে ৬৪টি সরকারি ও ১০৭ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তার মধ্যে ২৭টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বাবদ কোনো ধরনের অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি।

এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে- সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, দ্যা পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, ফার্স্ট ক্যাপিট্যাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যাল, ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ বেঙ্গল ইন্ট্যারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রণদা প্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয়, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, দি ইন্ট্যারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স, রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় (কুষ্টিয়া), সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়, রূপায়ন এ কে এম শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয়, আনোয়ার খান মডার্ন ইউনিভার্সিটি, জেড এম আর এফ ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স, আহসানিয়া মিশন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা খান বাহাদুর আহসান উল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়, শাহ মখদুম ম্যানেজম্যান্ট ইউনিভার্সিটি (রাজশাহী), ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি (বরিশাল), ইন্ট্যারন্যাশনাল স্টান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ব্রাক্ষণবাড়িয়া, ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচম্যান অ্যান্ড টেকনোলজি, মাইক্রোল্যান্ড ইউনির্ভাসিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং আর টি এম আল কবির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি।

এসব প্রতিষ্ঠানের একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। কোনোটার শিক্ষার্থী কম, অল্প কয়েকটি অনুষদ চালু থাকায় গবেষণা কাজের জন্য বরাদ্দ রাখা সম্ভব হয়নি। অবার অনেকগুলো নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চালু হওয়ায় গবেষণা বাবদ তাদের কোনো ধরনের বরাদ্দ রাখা সম্ভব হয়নি।

জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য (গবেষণা সহায়ক ও প্রকাশনা বিভাগ) প্রফেসর ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার সনদ পেতে গবেষণার সঙ্গে সর্ম্পক নেই, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা থাকতে হবে। গবেষণা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় চলবে সেটি কাম্য নয়। তারা যাতে বেশি বেশি গবেষণা কাজ করে সে জন্য তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। এ বাবদ বরাদ্দ বাড়াতেও সরকারকে আহ্বান জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বরাদ্দ পায় না বলে গবেষণা কাজ করতে আগ্রহী হয় না। এ খাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ তহবিল তৈরি করতে হবে। দেশের ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু সরকারি বরাদ্দনির্ভর থাকলে হবে না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। সেটিকে মাথায় রেখে গবেষণার জন্য ফান্ড তৈরির আহ্বান জানান প্রফেসর ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন।

তিনি আরও বলেন, নতুন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মূলত গবেষণা বরাদ্দ ছিল না। তদের পর্যাপ্ত ফান্ড না থাকায় এ জন্য অর্থ বরাদ্দ দিতে পারেনি। সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়ে কয়েকটি পদে জনবল নিয়োগ দিয়ে থাকে। গবেষণার জন্য তেমন বরাদ্দ দেয় না। তারপরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের গবেষণা কার্যক্রমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইতেও এগিয়ে রয়েছে। তারা দেশি-বিদেশি অর্থ আনতে সক্ষম হচ্ছে। শুধু সরকারি বরাদ্দের উপর নির্ভর না করে সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

এদিকে বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সনদ বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়। সেখানে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়ে বা ভর্তি না হলেও অনেকে অর্থ ব্যয় করে সনদ কেনার সুযোগ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সে কারণে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ তারেক আহসান বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসলে টিচিং নাকি গবেষণা করবে সেটি নির্ণয় করতে হবে। টিচিং হলে একটি কোর্স সম্পন্ন করে সার্টিফিকেট দেওয়া কাজ হয়ে থাকে। আর গবেষণা বা রিসার্চ ইউনিভার্সিটি হলে বড় অংশ জুড়ে গবেষণা করতে হয়। আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম-সিলেবাসে সেটি দেখা যায় না।

তিনি বলেন, গবেষণা করতে হলে একটি বড় ধরনের ফান্ড প্রয়োজন হবে। সেটি সবসময় অবহেলিত। পলিসি তৈরির প্রক্রিয়াটা আসলে পারসেপশন বেইজড, এভিডেন্স বেইজড না। ইউনিভার্সিটির সঙ্গে পলিসি তৈরির প্রক্রিয়ার সংযোগ অনেক দরকার। আমরা সবসময় সরকারের কাছে গবেষণা ফান্ড পাবো তা কিন্ত নয়। অন্যান্য দেশের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তহবিল তৈরি করতে হবে। সে জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। তাহলে আর ফান্ডের সংকট হবে না। এটা করলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা সংস্কৃতি তৈরি হবে।

অধ্যাপক মোহাম্মদ তারেক আহসান আরও বলেন, গবেষণা সংস্কৃতি তৈরি না হলে ফান্ডের সংকট কাটবে না। শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি শিক্ষকদের আগ্রহ তৈরি করতে হবে। শুধু অর্থ দিয়ে তা হবে না। যে উৎস থেকে অর্থ আসছে সেগুলোকেও আমরা কতটুকু কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছি সেটিও ভেবে দেখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নিয়োগ, পদায়নে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত জার্নালে প্রচার করতে হবে। তাহলে শিক্ষকরা নিজেকে প্রমোট করতে এ দিকে গুরুত্ব দেবেন। এ ধরনের একটি পলিসি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। নতুবা শুধু সার্টিফিকেট (সনদ) বিতরণ হবে। শিক্ষার্থীদের কাছে ফি নিয়ে ক্লাস ও থিওরি পড়িয়ে শেষ করা হবে। সেখান থেকে বের হয়ে আসা জরুরি বলেও মনে করেন এ গবেষক।