The Rising Campus
Education, Scholarship, Job, Campus and Youth
শনিবার, ১৩ই এপ্রিল, ২০২৪

কাজী নজরুল ইসলামের ছেলেবেলা: দারিদ্র নিয়ে অতি বাড়াবাড়ি

কাজী নজরুল ইসলাম নামটি একই সাথে কবি ও কিংবদন্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর নানামুখী প্রতিভা, সময়ারে তুলনায় এগিয়ে থাকা, সময়ের সাথে খুব দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, ঝড়ের মতো গতিময় বাচন ভঙ্গি, সৃষ্টিমুখর জীবযাত্রা এবং জীবনের অর্ধেক সময় সৃষ্টিহীন নির্বাক থাকার ট্রাজেডি তাকে করে তুলেছে কিংবদন্তি। আর এই ফাকে নজরুলের সৃজন-ভুবন পাঠ, জীবন-ইতিহাস রচনায় সর্বত্র ভ্রান্তির বিস্তার ঘটেছে। অনেকক্ষেত্রে তা সত্য বলে প্রতিষ্ঠাও পেয়েছে। তেমনি নজরুলের দারিদ্র নিয়েও করা হয়েছে অতি বাড়াবাড়ি।

চুরুলিয়া নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা: 

চুরুলিয়া নিয়ে যেভাবে গন্ডগ্রাম বলে ধারণা তৈরি করা হয়েছে আদতে চুরুলিয়া তা কখনো ছিলোনা। কুতবুদ্দীন আইবেকের সেনাপতি বক্তিয়া খালজি নদীয়া অভিযান পরিচালনা করে বর্ধমানের মঙ্গলকোটের রাজাকে পরাস্ত করেন। সেই ১২০২ সালের পরে চুরুলিয়ায় গ্রাম সমাজের গোড়াপত্তন হয়। গ্রামের মানুষ সমবেতভাবে গ্রামীণ ফসল চাষ করতো এবং ভাগাভাগি করতো। মোগল আমলেও চুরুলিয়ায় জমিদারি ব্যবস্থা চালু হয়নি। চুরুলিয়া মূলত স্বয়ংশাসিত গ্রাম হিসেবে গড়ে ওঠে। গ্রামের ফসল গ্রামেই থাকতো। ফসলেই খাজনা দেওয়ার রীতি চালু ছিল। উৎপাদন না হলে খাজনা দেওয়ার চল ছিল না। বলা চলে চুরুলিয়া একটি স্বয়ংসম্পূর্ন গ্রাম হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল।

নজরুলের দারিদ্র নিয়ে অতি বাড়াবাড়িঃ

তৎকালিন সময়ে পুরো সমাজ ব্যবস্থানে নাড়িয়ে দেয় পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়। পলাশির পরাজয় নজরুলের পরিবারেরও কপাল পুড়ায়। তাঁদের পারবার ছিলেন মোগল আমলের স্থানিক কাজী বা বিচারকের দায়িত্বে। এই বিচারিক কাজের জন্য তাঁদের ১৯৯৮ বিষা জমি দান করা হয়। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হলে তৈরি হয় জমিদরি। ফসলের পরিবর্তে জমির খাজনা আদায় করার রীতি চালু হলো টাকায়। ফসল উৎপাদন হোক আর না হোক বিন খাজনার লাখোরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হলো। কর বসলো নজরুলের পূর্ব-পুরুষদের জমির ওপরও। সেই সময় তাদের ওপর খাজনা বসানো হয় ৫৪ টাকা ৫ পাই।

সেই থেকে কবি পরিবারে অর্থনৈতিক অবক্ষয় শুরু হয়। জমি-জমা ক্রমশই হাতছাড়র হয়ে যেতে থাকে। তাছাড়া ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ শাসকেরা পারসি ভাষার বদলে ইংরেজি ভাষা চালু করলো সরকারি কাজকর্মে। পারসি জানা শিক্ষিত মুনুষও পড়ল বিপদে। কাজী পরিবারেও নেমে এল সেই সংকট। অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে নজরুলের বাবা ফকির আহমদ যখন সংসারের হাল ধরলেন তখনও তাদের চল্লিশ বিঘে সম্পত্তি ছিল। তবে নজরুলের বাবা  কাজী ফকির আহমদের ছিল ভীষণ পাশা খেলার নেশা। পাশা খেলে বিক্রি করে দিলেন কিছু জমি। কবির মা জাহেদা তখনও দান-খয়রাতি করে বেড়াতেন। পারিবারিক ঠাট বজায় রাখাই তখন কবি পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক দিক থেকে এ-রকম ভেঙে পড়া সময়েই নজরুলের জন্ম।

তাই বলে কাবির পিতা কাজী ফকির আহমদ তখন না খেতে পাওয়া দারিদ্রের কাতারে গিয়ে পৌঁছান নি। আসলে কবি পরিবারের দুর্দশার যে চিত্র বিভিন্ন লেখায় তুলে ধরা হয়েছে তার মধ্যে অনেক বাড়াবাড়ি আছে। আসলে কাজী নজরুল ইসলামকে খুব দরিদ্র দেখিয়ে একটা বৈপরীত্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

নজরুলের বাবা মসজিদে ইমামতি করে টাকা রোজগার করতেন আর সেই টাকাতে কোনোমতে তাঁদের সংসার চলত এমন কথাও ঠিক নয়। নেই নেই করেও তখনো কবি পরিবারে জমির আয় ভালােই ছিল। পরবর্তীতে কবির ভাইপোরা তাই বলেছেন। কবি পরিবারে পোষ্য সংখ্যাও বিরাট ছিল না। তিন ভাই এক বোনকে নিয়ে সবমিলিয়ে ছয়-সাত জনের পরিবার।

তাই না খেতে পেয়ে নজরুল বাড়ি ছেড়ে আসানসোলে রুটি-বিস্কুটের দোকানে চাকরি করতে গেলেন বা গার্ড সাহেবের খানসামা হলেন এমন ধারনার কোন ভিত্তি নেই। নজরুলের আর ভায়েরা তো গ্রামেই খেয়ে পরে বেচে ছিলেন। তারা অল্প বিস্তর কিছু লেখাপড়াও করেছেলেন।

তাই নজরুলের ঘর ছাড়ার বা চাকরি করার আসল কারণ কখনো দারিদ্র নয়। এভাবে সরলীকৃত সংজ্ঞায় কবিকে ব্যাখ্যা করলে তাঁর জীবন চেতনার বৈশিষ্ট্য ও কাব্য প্রতিভার উৎসটাই গুলিয়ে যেতে পারে। তার ব্যক্তিত্বের ওপরও অবিচার করা হবে।

কবি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন অভাবের তাড়নায় নয়। এক বিবাগী কাল্পনিক মনের টানেই কবি ঘর ছাড়েন। খুবই বালক বয়সেই কবির মধ্যে জাগ্রত হয় বিচিত্র জ্ঞানপিপাসা। সেই জ্ঞানান্বেষণের তাজনাই ছিল চুরুলিয়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার একটি বড় কারণ। কবি যখন যেখানেই কাটান, স্কুলের লেখাপড়ার সঙ্গে তার ১৯০৯ থেকে ১৯১৭ কোন রকম ছেদ পড়েনি। তাই হলে তিনি যথাসময়ে প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে মধ্যবর্তী আট বছরে প্রবেশিকা পরীক্ষার দশম ক্লাসে এসে পৌছাতে পারতেন না।

তাই অভাবে ঘর ছেড়েছেন বলে যে বয়ান চালু আছে তা কোন ভাবেই ঠিক নয়। মূলত বিভিন্ন বিষয়ে বিচিত্র জ্ঞানপিপাসা ছিল কবির। আর এ কারনেই তিনি ছুটে চলেছেন। চলতে চলতে দোকানের বা খানসামার কাজ পেলে একটু থমকে গিয়ে সেটাও করেছেন ক্ষণিকের জন্য। তাতে কবির লাভই হয়। তিনি কাজী বাড়ির আয়মাদারি অহমিকা ভাঙতে সক্ষম হন নিজেকে দিয়েই। একই সাথে আত্মনির্ভরতাও শেখেন এই বাউন্ডুলেপনা থেকেই।

তথ্যসূত্র: নজরুল: অজানা কথা

You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.

  1. প্রচ্ছদ
  2. সম্পাদকীয়
  3. কাজী নজরুল ইসলামের ছেলেবেলা: দারিদ্র নিয়ে অতি বাড়াবাড়ি

কাজী নজরুল ইসলামের ছেলেবেলা: দারিদ্র নিয়ে অতি বাড়াবাড়ি

কাজী নজরুল ইসলাম নামটি একই সাথে কবি ও কিংবদন্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর নানামুখী প্রতিভা, সময়ারে তুলনায় এগিয়ে থাকা, সময়ের সাথে খুব দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, ঝড়ের মতো গতিময় বাচন ভঙ্গি, সৃষ্টিমুখর জীবযাত্রা এবং জীবনের অর্ধেক সময় সৃষ্টিহীন নির্বাক থাকার ট্রাজেডি তাকে করে তুলেছে কিংবদন্তি। আর এই ফাকে নজরুলের সৃজন-ভুবন পাঠ, জীবন-ইতিহাস রচনায় সর্বত্র ভ্রান্তির বিস্তার ঘটেছে। অনেকক্ষেত্রে তা সত্য বলে প্রতিষ্ঠাও পেয়েছে। তেমনি নজরুলের দারিদ্র নিয়েও করা হয়েছে অতি বাড়াবাড়ি।

চুরুলিয়া নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা: 

চুরুলিয়া নিয়ে যেভাবে গন্ডগ্রাম বলে ধারণা তৈরি করা হয়েছে আদতে চুরুলিয়া তা কখনো ছিলোনা। কুতবুদ্দীন আইবেকের সেনাপতি বক্তিয়া খালজি নদীয়া অভিযান পরিচালনা করে বর্ধমানের মঙ্গলকোটের রাজাকে পরাস্ত করেন। সেই ১২০২ সালের পরে চুরুলিয়ায় গ্রাম সমাজের গোড়াপত্তন হয়। গ্রামের মানুষ সমবেতভাবে গ্রামীণ ফসল চাষ করতো এবং ভাগাভাগি করতো। মোগল আমলেও চুরুলিয়ায় জমিদারি ব্যবস্থা চালু হয়নি। চুরুলিয়া মূলত স্বয়ংশাসিত গ্রাম হিসেবে গড়ে ওঠে। গ্রামের ফসল গ্রামেই থাকতো। ফসলেই খাজনা দেওয়ার রীতি চালু ছিল। উৎপাদন না হলে খাজনা দেওয়ার চল ছিল না। বলা চলে চুরুলিয়া একটি স্বয়ংসম্পূর্ন গ্রাম হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল।

নজরুলের দারিদ্র নিয়ে অতি বাড়াবাড়িঃ

তৎকালিন সময়ে পুরো সমাজ ব্যবস্থানে নাড়িয়ে দেয় পলাশির যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয়। পলাশির পরাজয় নজরুলের পরিবারেরও কপাল পুড়ায়। তাঁদের পারবার ছিলেন মোগল আমলের স্থানিক কাজী বা বিচারকের দায়িত্বে। এই বিচারিক কাজের জন্য তাঁদের ১৯৯৮ বিষা জমি দান করা হয়। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু হলে তৈরি হয় জমিদরি। ফসলের পরিবর্তে জমির খাজনা আদায় করার রীতি চালু হলো টাকায়। ফসল উৎপাদন হোক আর না হোক বিন খাজনার লাখোরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হলো। কর বসলো নজরুলের পূর্ব-পুরুষদের জমির ওপরও। সেই সময় তাদের ওপর খাজনা বসানো হয় ৫৪ টাকা ৫ পাই।

সেই থেকে কবি পরিবারে অর্থনৈতিক অবক্ষয় শুরু হয়। জমি-জমা ক্রমশই হাতছাড়র হয়ে যেতে থাকে। তাছাড়া ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ শাসকেরা পারসি ভাষার বদলে ইংরেজি ভাষা চালু করলো সরকারি কাজকর্মে। পারসি জানা শিক্ষিত মুনুষও পড়ল বিপদে। কাজী পরিবারেও নেমে এল সেই সংকট। অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে নজরুলের বাবা ফকির আহমদ যখন সংসারের হাল ধরলেন তখনও তাদের চল্লিশ বিঘে সম্পত্তি ছিল। তবে নজরুলের বাবা  কাজী ফকির আহমদের ছিল ভীষণ পাশা খেলার নেশা। পাশা খেলে বিক্রি করে দিলেন কিছু জমি। কবির মা জাহেদা তখনও দান-খয়রাতি করে বেড়াতেন। পারিবারিক ঠাট বজায় রাখাই তখন কবি পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থনৈতিক দিক থেকে এ-রকম ভেঙে পড়া সময়েই নজরুলের জন্ম।

তাই বলে কাবির পিতা কাজী ফকির আহমদ তখন না খেতে পাওয়া দারিদ্রের কাতারে গিয়ে পৌঁছান নি। আসলে কবি পরিবারের দুর্দশার যে চিত্র বিভিন্ন লেখায় তুলে ধরা হয়েছে তার মধ্যে অনেক বাড়াবাড়ি আছে। আসলে কাজী নজরুল ইসলামকে খুব দরিদ্র দেখিয়ে একটা বৈপরীত্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

নজরুলের বাবা মসজিদে ইমামতি করে টাকা রোজগার করতেন আর সেই টাকাতে কোনোমতে তাঁদের সংসার চলত এমন কথাও ঠিক নয়। নেই নেই করেও তখনো কবি পরিবারে জমির আয় ভালােই ছিল। পরবর্তীতে কবির ভাইপোরা তাই বলেছেন। কবি পরিবারে পোষ্য সংখ্যাও বিরাট ছিল না। তিন ভাই এক বোনকে নিয়ে সবমিলিয়ে ছয়-সাত জনের পরিবার।

তাই না খেতে পেয়ে নজরুল বাড়ি ছেড়ে আসানসোলে রুটি-বিস্কুটের দোকানে চাকরি করতে গেলেন বা গার্ড সাহেবের খানসামা হলেন এমন ধারনার কোন ভিত্তি নেই। নজরুলের আর ভায়েরা তো গ্রামেই খেয়ে পরে বেচে ছিলেন। তারা অল্প বিস্তর কিছু লেখাপড়াও করেছেলেন।

তাই নজরুলের ঘর ছাড়ার বা চাকরি করার আসল কারণ কখনো দারিদ্র নয়। এভাবে সরলীকৃত সংজ্ঞায় কবিকে ব্যাখ্যা করলে তাঁর জীবন চেতনার বৈশিষ্ট্য ও কাব্য প্রতিভার উৎসটাই গুলিয়ে যেতে পারে। তার ব্যক্তিত্বের ওপরও অবিচার করা হবে।

কবি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন অভাবের তাড়নায় নয়। এক বিবাগী কাল্পনিক মনের টানেই কবি ঘর ছাড়েন। খুবই বালক বয়সেই কবির মধ্যে জাগ্রত হয় বিচিত্র জ্ঞানপিপাসা। সেই জ্ঞানান্বেষণের তাজনাই ছিল চুরুলিয়া ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার একটি বড় কারণ। কবি যখন যেখানেই কাটান, স্কুলের লেখাপড়ার সঙ্গে তার ১৯০৯ থেকে ১৯১৭ কোন রকম ছেদ পড়েনি। তাই হলে তিনি যথাসময়ে প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে মধ্যবর্তী আট বছরে প্রবেশিকা পরীক্ষার দশম ক্লাসে এসে পৌছাতে পারতেন না।

তাই অভাবে ঘর ছেড়েছেন বলে যে বয়ান চালু আছে তা কোন ভাবেই ঠিক নয়। মূলত বিভিন্ন বিষয়ে বিচিত্র জ্ঞানপিপাসা ছিল কবির। আর এ কারনেই তিনি ছুটে চলেছেন। চলতে চলতে দোকানের বা খানসামার কাজ পেলে একটু থমকে গিয়ে সেটাও করেছেন ক্ষণিকের জন্য। তাতে কবির লাভই হয়। তিনি কাজী বাড়ির আয়মাদারি অহমিকা ভাঙতে সক্ষম হন নিজেকে দিয়েই। একই সাথে আত্মনির্ভরতাও শেখেন এই বাউন্ডুলেপনা থেকেই।

তথ্যসূত্র: নজরুল: অজানা কথা

পাঠকের পছন্দ

মন্তব্য করুন