The Rising Campus
News Media

রাবি ছাত্রলীগের সম্মেলন কাল : শীর্ষ পদে অছাত্র-বিতর্কিত ও বিবাহিতদের আধিপত্য!

রাবি প্রতিনিধি: ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাত্রলীগের ২৬তম সম্মেলন। এবার শীর্ষ দুই পদে ৯৩ জন পদপ্রত্যাশীদের জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন। নতুন কমিটিতে পদ পেতে শেষ সময়ে জোর তৎপরতা শুরু করেছেন নেতাকর্মীরা। সভাপতি-সম্পাদক পদ বাগিয়ে নিতে প্রার্থীরা ধরনা দিচ্ছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের দুয়ারে। ক্যাম্পাসে সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও প্রেসবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেই কমিটি ঘোষণা হবে জানা গেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সূত্রে। সেই হিসেবে আগামীকাল যেকোনো সময় জানা যাবে কারা হচ্ছেন রাবি ছাত্রলীগের কান্ডারী।

অভিযোগ আছে, শীর্ষ দুই পদের দৌঁড়ে এগিয়ে থাকা বেশিরভাগই অছাত্র, বিবাহিত, ড্রপআউট কিংবা বিভিন্ন অপকর্মে ‘বিতর্কিত’। অনেকের বিরুদ্ধে শিবিরের সঙ্গে গোপনে আঁতাতের অভিযোগও রয়েছে।

রাবি ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন নেতৃত্বের দৌঁড়ে এগিয়ে আছেন বর্তমান কমিটির সহসভাপতি কাজী আমিনুল হক লিংকন। ২০১০-১১ সেশনের শিক্ষার্থী লিংকন মার্কেটিং বিভাগ থেকে বিবিএ-এমবিএ শেষ করেছেন। ছাত্রত্ব ধরে রাখতে সান্ধ্যকালীন এমবিএ কোর্সে ভর্তি হয়েছেন। তবে এই প্রার্থী ৫ বছর আগে বিয়ে করেছেন বলে জানা গেছে। আয়ান নামে একটি ছেলে সন্তানও আছে।

কুষ্টিয়া সদরের হাউজিং ‘সি’ ব্লকের বাসিন্দা তেল ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন খোকনের মেয়ে রিফা তিন্নীকে ২০১৭ সালের ২৭ জুন বিয়ে করেন তিনি। কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি আতিকুর রহমান অনিকের আপন খালাতো বোন তিনি।

বিয়ে কিংবা তার ছেলে সন্তান নেই দাবি করে লিংকন বলেন, ‘বিরোধীপক্ষ এসব ছড়াচ্ছে। আমি কখনো বিয়ে করিনি। তবে এক মেয়ের সঙ্গে ২০১৩ সালে আমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল।’

শীর্ষপদের দৌঁড়ে আছেন রাবি ছাত্রলীগের উপ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের শিক্ষার্থী তাওহীদুল ইসলাম দুর্জয়। অনার্স শেষ করেছেন। কিন্তু ছাত্রত্ব ধরে রাখতে মাস্টার্স শেষ করেননি। তিনি বিভিন্ন সময় ক্যাম্পাসের অসহায় নানিদের পাশে দাড়িয়েছেন। তাছাড়া, আওয়ামী পরিবারের সন্তান হওয়ায় সক্রিয় নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। ক্লিন ইমেজের প্রার্থী হিসেবে তার নামটি আলোচনায় আছে।

কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফারসি বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের শিক্ষার্থী এনায়েত হক রাজুর মাস্টার্স শেষ হলেও শীর্ষ পদ পেতে চালাচ্ছেন লবিং-গ্রুপিং। তার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি, নারী কেলেঙ্কারীসহ বিবাহ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এনায়েত রাজুকে বেশ কয়েক দিন নারীসহ তারা আটক করেছেন। পরে ছাত্রলীগ পরিচয়ে তিনি মুচলেকা পান। এ ছাড়া রাবি শাখা শিবিরের সাবেক সভাপতি আশরাফুল আলম ইমনের সঙ্গেও তার সখ্যের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে রাজু বলেন, ‘শিবিরের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক থাকার প্রমাণ কেউই দিতে পারবে না এবং আমি বিবাহিত নই। আমার ইমেজ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না।

এছাড়াও শীর্ষ এই দুইটি পদের একটি পেতে বিভিন্ন স্থানে লবিং ও দৌঁড়ঝাঁপ করছে আন্তর্জাতিক বিভাগ থেকে ড্রপ আউট ও শাখা ছাত্রলীগের উপ-প্রশিক্ষণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ হিল গালিব। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সূত্রে জানা যায়, ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে গালিব বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু পরবর্তীতে টানা তিনবছর প্রথম বর্ষ অতিক্রম করতে না পারায় ড্রপ আউট হয়ে যান তিনি। পরে অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অনার্স শেষ করেছেন বলে দাবি করলেও সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে শিক্ষাগত যোগ্যতায় তিনি শুধু এসএসসি ও এইচএসসির তথ্য প্রদান করেন। পাশাপাশি তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে জীবনবৃত্তান্তে দাবী করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক বিভাগে ভর্তির কার্ড ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড যা প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থীরা পেয়ে থাকেন তা জীবনবৃত্তান্তে জুড়ে দেন তিনি।

ড্রপআউটপের বিষয়টি এড়িয়ে এবিষয়ে গালিব বলেন, আমি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। মাদকের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পদপ্রার্থীদেরকে ডোপ টেস্ট করানো হোক। তাহলেই বুঝা যাবে।

নেতৃত্বের দৌঁড়ে থাকা আরেকজন বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থী শাহীনুল ইসলাম সরকার ডন। ছাত্রত্ব দেখানোর জন্য তিনি ইংলিশ অ্যান্ড আদার ল্যাংগুয়েজের জার্মান ভাষার শর্ট কোর্সে ভর্তি রয়েছেন। তবে ডন বলেন, ‘আমাদের বিপক্ষ গ্রুপের কেউ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রোগান্ডা ছড়াতে পারে।’

বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান মিশু। নিজ বিভাগ থেকে ড্রপ-আউট হলেও তার বিরুদ্ধে হলে সিট বাণিজ্য, মাদক সরবরাহ, চাঁদাবাজি ও ক্যাম্পাসে দোকান ভাঙচুরের অভিযোগ রয়েছে।

মিশুর বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক বিজয় কৃষ্ণ বণিক বলেন, আমরা তাকে (মিশু) বিভাগ থেকে প্রত্যয়নপত্র দিতে পারি নি। যদি তার ছাত্রত্ব থাকতো তাহলে প্রত্যয়ন পত্র দিতে তো কোন সমস্যা ছিলো না। এখন বাকিটা আপনারাই বুঝে নেন।

তবে মিশুর দাবি, তার চতুর্থবর্ষ চলমান। তার সঙ্গে যারা রাজনীতি করেন, তাদের কিছু অপকর্মের অভিযোগ তার দিকে এসেছে।

আসন্ন সম্মেলনে সভাপতি পদের দৌঁড়ে বেশ আলোচনায় আছেন বিতর্কিত ছাত্রলীগ নেতা তন্ময়। সে ফোকলোর বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ২০১৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইয়াবাসহ অবৈধ মাদক সরবরাহে জড়িত তালিকায় তার নাম আসে।

এছাড়া, চলতি শিক্ষাবর্ষে রাবি’র ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনায়ও তার নাম আসে। যার প্রেক্ষিতে রাবি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে তাকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। সম্প্রতি সম্মেলনে সিভি জমা দেওয়ার একদিন আগে তন্ময়ের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তীতে তিনি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পদের জন্য সিভি জমা দেন।

ক্যাম্পাসে প্রচার আছে, তন্ময় স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার পারিবারিক এক আত্মীয়ের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে তার মাধ্যমে লবিং করে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেন তিনি। এবার সেই ব্যাক্তির মাধ্যমে শাখা ছাত্রলীগের শীর্ষ পদটি ভাগিয়ে নিতে দৌড়ঝাপ করছেন বিতর্কিত এই ছাত্রলীগ নেতা।

অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা মুশফিক তাহমিদ তন্ময়কে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

বর্তমান কমিটির সহসভাপতি ২০১৫-১৬ সেশনের শিক্ষার্থী মেসবাহুল হক। দলের মধ্যে গ্রুপিং ও তার পরিবার বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে মেসবাহুল হক বলেন, ‘আমার সঙ্গে কেউ শিবির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ দিতে পারলে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেব।’

এ ছাড়াও পদের দৌঁড়ে রয়েছেন বর্তমান কমিটির সহ-সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম শান্ত, নাট্যকলা বিভাগের ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থী ও কমিটির সহসভাপতি জাকিরুল ইসলাম জ্যাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ মামুন ও কার্যনির্বাহী সদস্য আল মুক্তাদির তরঙ্গ, মাদারবকশ হলের সহ-সভাপতি সাজ্জাদ হোসাইন ও শাহ মখদুম হলের সভাপতি তাজবিউল হাসান অপূর্ব। এর বাইরেও অনেকের নাম শোনা যাচ্ছে।

এসব বিষয়ে রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘সম্মেলন উপলক্ষে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুসারে বিবাহিত, অছাত্র, বয়স নেই; এমন কারও নেতৃত্বে আসার সুযোগ নেই। সৎ ও যোগ্য প্রার্থীরা নেতৃত্বে আসবে বলে আশাবাদী।’

সার্বিক বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাসিক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, রাবিতে ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগ্য, দক্ষ, সাংগঠনিক সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পরীক্ষিতরাই নেতৃত্বে আসুক, এটাই সকলের চাওয়া। আমিও সেটিই চাই।

সম্মেলনের বিতর্কিতদের বিষয়ে রাবি ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক মেহেদী হাসান তাপস বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট। এখানে ত্যাগী ও ক্লিন ইমেজধারী নেতাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। বিতর্কিত, অছাত্র এবং ড্রপ আউটে অভিযুক্তরা কোনো ভাবেই নেতৃত্বে আসতে পারবে না।

1
You might also like
Leave A Reply

Your email address will not be published.