ভাষা আন্দোলনের সাত দশক একুশের চেতনা ছড়িয়ে পড়ুক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে

ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। ভাষার কারণেই প্রাণিকুলের অন্যান্য প্রজাতি থেকে মানুষ আলাদা। একটা শিশু জন্মের পর তার মায়ের মুখ থেকে যে ভাষা শোনে, সেই ভাষার সঙ্গে তৈরি হয় তার আত্মিক সম্পর্ক। সেই ভাষা হয়ে উঠে তার ভীষণ আপন। তার মাতৃভাষা।

পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙালিই একমাত্র জাতি, যারা রক্ত ঝরিয়েছিলেন মাতৃভাষায় কথা বলার জন্য। মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য বাঙালির সেই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘও ২১ ফেব্রুয়ারিকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি। আমাদের এ আত্মত্যাগের কথা ছড়িয়ে গেছে সারাবিশ্বে। জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ দিনকে নিজেদের মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে; যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌবরেব।

১৯৫২ সালে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে রফিক, জব্বার, শফিউল, সালাম, বরকত মায়ের ভাষায় কথা বলার যে অধিকার আমাদের এনে দিয়েছিলেন, তার সাত দশক পূর্ণ হচ্ছে। এই সাত দশকে বদলে গেছে অনেক কিছুই।

পরিবর্তন জীবনের অংশ। পরিবর্তন গ্রহণ করেই মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়। সাত দশক আগে যেসব কথা মানুষ চিন্তাও করেনি সেসবই আজ বাস্তব। বর্তমান নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে নব্যপ্রযুক্তিকে সঙ্গী করে। প্রযুক্তির জাদুকাঠিতে বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয়। এক ক্লিকেই এই প্রজন্ম ভার্চুয়ালি ঘুরে আসতে পারে সারা বিশ্বে।

বিশ্বায়নের এ প্রভাব পড়েছে ভাষাতেও। নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে তাই বাংলাভাষাকেই কঠিন মনে হয়। শুদ্ধভাবে বাংলা লিখতে পারা তো দূরের কথা, বলতে গেলেও হোঁচট খান অনেকেই। সেই প্রতিফলন অবশ্য আজকাল টেলিভিশন কিংবা রেডিও খুলতেই দেখা যায়। উপস্থাপকের মুখ থেকে প্রায়ই প্রিয় দর্শক কিংবা শ্রোতার পরিবর্তে শুনতে হয় ডিয়ার ভিউয়ার্স কিংবা ডিয়ার লিসেনার্স। আমাদের নতুন প্রজন্ম কিন্তু এসব শুনেই বড় হচ্ছে। তাদের কাছে তাই প্রিয় দর্শক কিংবা শ্রোতা নয়, ডিয়ার ভিউয়ার্স কিংবা ডিয়ার লিসেনার্স এই দেশের নিজস্ব সম্ভাষণের প্রতীক।

তাই এই জগাখিচুড়ি ভাষা তারা নিজেদের জীবনেও প্রয়োগ করতে দ্বিধাবোধ করে না। অথচ ভাষা একটা জাতির সংস্কৃতির প্রতিফলক। তাই কথা জগাখিচুড়ি ভাষায় বললে সংস্কৃতি যে নিজস্বতা হারাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর ভাষা আর সংস্কৃতি নিজস্বতা হারালে একটি জাতির স্বকীয়তা অনেকটাই হুমকির মুখে পড়ে।

তবে আশার কথা- ভাষা আন্দোলনের সাত দশক আর বিজয়ের পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও নতুন প্রজন্ম ভোলেনি পূর্বপুরুষের ত্যাগের ইতিহাস। নানা ক্ষেত্রে অবদান রেখে বিশ্ব দরবারে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন তারা। তাই পরিবর্তনের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে নয়, বরং পরিবর্তনকে হাতিয়ার করে শুদ্ধতা বজায় রেখে বাংলাভাষাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবেন তারা। আজকে এ তরুণ সমাজই তো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেবে মহান একুশের চেতনা। ভাষা আন্দোলনের সাত দশকে নতুন প্রজন্মের কাছে এটাই প্রত্যাশা।