প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনছে সরকার।

প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনছে সরকার। নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের মোট আটটি এবং মাধ্যমিকে দশটি বিষয় পড়ানো হবে।

এর মধ্যে প্রাথমিকের বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি নতুন দুটি বিষয় হলো- ‘শিল্পকলা’, ‘শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা’ এবং মাধ্যমিকের বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান, ধর্মশিক্ষা, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষার পাশাপাশি নতুন তিনটি বিষয় হলো জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, শিল্প ও সংস্কৃতি।

নতুন শিক্ষাক্রমে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির দুটি পাবলিক পরীক্ষা থাকবে না। পাশাপাশি নবম ও দশম শ্রেণিতে মানবিক, বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা নামে বিভাগও তুলে দেয়া হবে। সেটি ঠিক হবে উচ্চ মাধ্যমিকে গিয়ে।

জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মশিউজ্জামান বলেন, ‘নতুন শিক্ষাক্রমে কয়েকটি নতুন বিষয় যেমন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তেমনি পুরোনো বিষয়গুলোকেও নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। বলা যায়, কয়েকটি বিষয় নামের দিক থেকে নতুন হলেও বিষয়বস্তুর দিক থেকে পুরোপুরি নতুন নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, বর্তমান পাঠ্যক্রমে আমাদের একটি বিষয় আছে যার নাম ‘চারুকলা’। নতুন শিক্ষাক্রমে এর নাম দেয়া হয়েছে ‘শিল্প ও সংস্কৃতি’। এর ফলে এ বিষয়ে শিখন ক্ষেত্র অনেক বাড়বে। আগে যেমন এ বিষয়ে শুধু চারুকলাকে ফোকাস করা হতো, এখন চারুকলার পাশাপাশি নৃত্যকলা, নাট্যকলা, সংগীত ইত্যাদি বিষয় থেকে শিক্ষার্থী জানতে পারবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি প্রাথমিকে থাকবে শিল্পকলা নামে এবং মাধ্যমিকে শিল্প ও সংস্কৃতি নামে।’

অন্যদিকে ‘শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা’ বিষয়ে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গেও পরিচিত হবে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘যেকোনো পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা যেন মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখতে পারে, এ জন্য কিছু মৌলিক জ্ঞান এ বিষয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অর্জনের সুযোগ পাবে। এর ফলে শিশুরা সব ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করবে।’

বেশ কিছুদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে গুঞ্জন উঠেছে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আর্কষণ করা হলে ড. মশিউজ্জামান বলেন, ‘এ ধরনের কোনো কিছু পাঠ্যপুস্তকে থাকবে না। তবে শিক্ষার্থীরা যেন প্রজনন স্বাস্থ্যের বিষয়ে জানতে পারে, এ সম্পর্কিত অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’

প্রজনন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অধ্যায়ে কী কী থাকবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ইন বিল্ট আমাদের সবাইকেই (ছেলে ও মেয়ে) প্রজননের বেশ কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এ বিষয়ে যেন শিক্ষার্থীরা সুস্পষ্ট ধারণা পায়, এ জন্য আমরা “শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা” বিষয়ে প্রজনন স্বাস্থ্য নামে অধ্যায় রেখেছি।’

‘অন্যদিকে “জীবন ও জীবিকা” বিষয়টি হবে পেশাভিত্তিক। নবম ও দশম শ্রেণিতে এ বিষয়ে বাধ্যতামূলকভাবে প্রত্যেক শিক্ষার্থী কৃষি, সেবা বা শিল্প খাতের একটি পেশায় দক্ষতা অর্জন করবে। এতে দশম শ্রেণি শেষে একজন শিক্ষার্থী যেকোনো একটি পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবে।’

ডিজিটাল প্রযুক্তি বিষয়ে কী পড়ানো হবে, এমন প্রশ্নে এনসিটিবির এই সদস্য বলেন, ‘বর্তমান শিক্ষাক্রমে আমাদের আইসিটি নামে একটি বিষয় আছে। এই বিষয়টির ব্যাপ্তি বাড়িয়ে এর নাম দেয়া হয়েছে “ডিজিটাল প্রযুক্তি”। এর ফলে শিক্ষার্থীরা আইসিটির প্রাথমিক জ্ঞান আহরণ করার পাশাপাশি ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের সতর্কতা, অনলাইন ক্রাইম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নিয়মকানুন ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে পারবে।’

সমন্বিত শিক্ষাক্রমে প্রত্যেক ধর্মের জন্য আলাদা পাঠ্যবই থাকবে বলেও জানান তিনি।

বলেন, ‘প্রত্যেক ধর্মের জন্য আলাদা পাঠ্যবই তৈরি করা হচ্ছে। অনেকেই বলার চেষ্টা করছেন, নতুন শিক্ষাক্রমে একটি বইয়ের মাধ্যমে সকল ধর্মের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করবে, বিষয়টি ঠিক নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেক ধর্মের বইয়ে আমরা তিনটি শিখন ক্ষেত্র রেখেছি। এগুলো হলো ধর্মীয় জ্ঞান, ধর্মীয় বিধিবিধান ও ধর্মীয় মূল্যবোধ। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে। এ ছাড়া নতুন শিক্ষাক্রমে টিচিং লার্নিং সিস্টেম এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিজ নিজ ধর্মের আচার-ব্যবহার, বিধিবিধানগুলো পড়ার পাশাপাশি গ্রুপ স্টাডির মাধ্যমেও আলোচনা করবে। এরপর তারা এগুলো বিদ্যালয়ের দেয়ালিকায় উপস্থাপন করবে। এতে শিক্ষার্থীরা সব ধর্ম সম্পর্কে জানতে পারবে।’