টিকা ছাড়াই ক্লাসে শিক্ষার্থীরা, অনলাইন ক্লাসও বন্ধ!

দুই ডোজ টিকার শর্তে গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে সারাদেশে মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে সশরীরে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। তবে দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো শিক্ষার্থীদের দুই ডোজ টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। বিশেষত রাজধানীর এমন অনেক স্কুল-কলেজ রয়েছে, যেখানে দুই ডোজ টিকা না পেয়ে ক্লাসে যেতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। তাদের জন্য রুটিন মাফিক অনলাইন ক্লাস নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও সেটি হচ্ছে না বলে অভিযোগ শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের। এতে সর্বোপরি ব্যাহত হচ্ছে টিকা না পেয়ে ঘরে বসে থাকা ওইসব ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ালেখা। এ অবস্থায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বলছে, আগামী দু-এক সপ্তাহের মধ্যে সব শিক্ষার্থীকে টিকার দ্বিতীয় ডোজের আওতায় আনা হবে। চলতি মাসেই শতভাগ শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু হবে ক্লাস কার্যক্রম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর শীর্ষ পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগ শিক্ষার্থী টিকার এসেছে। তবে সারাদেশে এখনো টিকার প্রথম ডোজ পাওয়া ২৬ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রথম শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চলা রাজধানীর মিরপুরে ৬০ ফিট রোড এলাকার আল নাহিয়ান বিদ্যানিকেতনে সরেজমিনে দেখা গেছে, স্কুলটি গড়ে তোলা হয়েছে কিন্ডারগার্টেনের আদলে। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক সংখ্যা ১২ জন।

প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান জানান, তাদের পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলের অনুমোদন রয়েছে। পাশের স্কুল থেকে বোর্ড পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। যে স্কুল থেকে রেজিস্ট্রেশন করা হয় সেই স্কুলের মাধ্যমেই অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে প্রথম ডোজের টিকা দিলেও এখনো আড়াইশোর মতো শিক্ষার্থী দ্বিতীয় ডোজ টিকার আওতায় আসেনি।

তিনি বলেন, প্রায় দুই বছর স্কুল বন্ধ ছিল। শিক্ষক সংখ্যা কম, তার ওপরে যদি শিক্ষার্থীরা ক্লাসে না আসে তাহলে তারা পিছিয়ে পড়বে। অভিভাবকরাও তা চায় না বলে সন্তানদের ক্লাসে নিয়ে আসে। তখন আর আমাদের কিছু করার থাকে না। টিকার দ্বিতীয় ডোজের জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় দুই হাজার ৩০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯৫ শতাংশ করোনার দুই ডোজ টিকা পেয়েছে। টিকা না পেয়ে যারা সশরীরে ক্লাসে আসতে পারছে না তাদের অনলাইন ক্লাস করানো হচ্ছে না বলে অভিযোগ শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ষষ্ঠ শ্রেণির একাধিক শিক্ষার্থী জাগো নিউজকে জানিয়েছে, তাদের কয়েকজন সহপাঠী টিকার দ্বিতীয় ডোজের সময় না হওয়ায় নিতে পারেনি। তারা ক্লাসে আসতে পারছে না। আগে স্যার-ম্যাডামরা অনলাইনে ক্লাস করালেও এখন করাচ্ছে না। ক্লাসে আসতে না পারায় ওদের অনেক মন খারাপ। অনলাইন ক্লাস হলেও পড়ালেখায় ব্যস্ত থাকতো। প্রতিদিন ক্লাসে যা পড়ানো হচ্ছে সেগুলো স্কুলের গ্রুপে দিয়ে ওদের পড়তে বলা হচ্ছে।

টিকা দ্বিতীয় ডোজের বিষয়ে খোঁজ নিতে আসা সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর মা আসমা রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে স্কুলে ক্লাস শুরু হলেও তার মেয়েকে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। করোনার দুই ডোজ টিকা না পাওয়ায় সে ক্লাসে আসতে পারছে না। কবে দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেওয়া হবে সেটি জানতেই তিনি স্কুলে এসেছেন।

তিনি বলেন, অধিকাংশ শিক্ষার্থী টিকা পাওয়ায় শিক্ষকরা অনলাইন ক্লাস বন্ধ করে দিয়েছেন। সে কারণে মেয়েটা পড়লেখা করতে চায় না। ক্লাসে এলে সময়টা ভালো কাটে, পড়ালেখায়ও ব্যস্ত থাকে। তার মতো যারা টিকা পায়নি তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছে বলে জানান এ অভিভাবক।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র শিক্ষক সৈয়দা নারগীস আক্তার বলেন, আমাদের ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী টিকার দুই ডোজের আওতায় এসেছে। যাদের এখনো দ্বিতীয় ডোজের সময় হয়নি তারাই শুধু বাকি রয়েছে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে আর কেউ বাকি থাকবে না।

যারা ক্লাসে আসতে পারছে না তাদের জন্য সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক অনলাইন ক্লাস নেওয়া হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি ‘রুটিন অনুযায়ী অনলাইন ক্লাস নেওয়া হচ্ছে’ বলে জানান। যদিও সেই রুটিন দেখাতে পারেননি তিনি।

এদিকে টিকার তত্ত্বাবধানকারী প্রতিষ্ঠান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে ১২-১৭ বছরের ১ কোটি ৩৯ লাখ ৬৩ হাজার ৯৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৯ হাজার ৬২৭ জন শিক্ষার্থী করোনার প্রথম ডোজের টিকা পেয়েছে। এর মধ্যে ১ কোটি ১০ লাখ ৪০ হাজার ৩৪৬ জনকে দ্বিতীয় ডোজের আওতায় আনা হয়েছে। দ্বিতীয় ডোজের বাইরে রয়েছে ২৬ লাখ ৪৯ হাজার ২৮১ জন। সে হিসাবে এখনো মাধ্যমিকে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬৮ জন শিক্ষার্থী টিকার প্রথম ডোজ পায়নি।

দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে ২৭ লাখ ৬ হাজার ৪৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৬ লাখ ৮৬ হাজার ২৪৬ জন প্রথম ডোজ পেয়েছে। দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ২০ লাখ ৭০ হাজার ৭১৬ জন। টিকার আওতায় প্রথম ডোজ ৯ শতাংশ ও দ্বিতীয় ডোজ ৭৬ শতাংশ রয়েছে।

বরিশাল বিভাগে ৯ লাখ ৬৮ হাজার ১৯০ জনের মধ্যে প্রথম ডোজ ৯ লাখ ১ হাজার ২৬১ জন এবং দ্বিতীয় ডোজের টিকা পেয়েছে ৬ লাখ ৪০ হাজার ৩১৭ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে প্রথম ডোজ ৯৩ শতাংশ ও দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী।

চট্টগ্রামে ১৭ লাখ ৪৬ হাজার ৬১ জনের মধ্যে প্রথম ডোজ ১৭ লাখ ৫ হাজার ৮২৫ জন এবং দ্বিতীয় ডোজের টিকা পেয়েছে ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৮ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে প্রথম ডোজ ৯৮ শতাংশ ও দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৭৪ শতাংশ।

কুমিল্লায় ১২ লাখ ১৮ হাজার ৪৫৪ জনের মধ্যে প্রথম ডোজ ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৮৫৪ জন অর্থাৎ ৯৮ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭০ জন, ৮৫ শতাংশ। খুলনায় ১৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৯১ জনের মধ্যে প্রথম ডোজ ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ২৫২ জন অর্থাৎ শতভাগ, দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ১১ লাখ ২২ হাজার ১৬৫ জন, ৭৬ শতাংশ।

ময়মনসিংহে ১৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৪৯ জনের মধ্যে প্রথম ডোজ ১৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৫৪ জন অর্থাৎ শতভাগ, দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৯৭৪ জন, ৯৩ শতাংশ। রাজশাহীতে ১৭ লাখ ৪২ হাজার ৮৯৪ জনের মধ্যে ১৭ লাখ ৪ হাজার ২৯১ জন প্রথম ডোজ, ৯৮ শতাংশ আর দ্বিতীয় ডোজ ১৫ লাখ ৬৪ হাজার ৫৪০ জন, ৯০ শতাংশ।

রংপুরে ১৬ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭৯ জনের মধ্যে ১৫ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৬ প্রথম ডোজ, ৯৮ শতাংশ আর দ্বিতীয় ডোজ ১১ লাখ ১৮ হাজার ৪৩১ জন, ৬৮ শতাংশ। সিলেটে ৮ লাখ ১৫ হাজার ৩৩৩ জনের মধ্যে ৭ লাখ ৭৮ হাজার ১৭৫ জন প্রথম ডোজ, ৯৫ শতাংশ আর ৬ লাখ ৬৪ হাজার ৫০৫ জন দ্বিতীয় ডোজ অর্থাৎ ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থী টিকা পেয়েছে।

শিক্ষার্থীদের টিকাদান শুরুর পর এক পর্যন্ত সারাদেশে সব মিলিয়ে প্রথম ডোজ ৯৮ শতাংশ আর দ্বিতীয় ডোজের টিকা পেয়েছে ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, যেসব শিক্ষার্থী টিকার দুই ডোজ পেয়েছে তাদেরই শুধু সশরীরে ক্লাসে আসতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যারা ক্লাসে আসতে পারবে না তাদের জন্য নিয়মিত অনলাইন ক্লাস নিতে হবে। এ নির্দেশনা কেউ অমান্য করলে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, সারাদেশে জোরালোভাবে শিক্ষার্থীদের টিকা কার্যক্রম চলছে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রথম ডোজ পাওয়া শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় ডোজের আওতায় আনা হবে। চলতি মাস থেকে পুরোদমে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করা হবে।