অন্যরূপেও দেখা দিচ্ছেন সাকিব

আজ থেকে ঠিক দুই মাস আগের ঘটনা। গত ১১ জুন প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগের এক ম্যাচে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে লাথি মেরে স্টাম্প উপড়ে ফেলেছিলেন সাকিব আল হাসান। সেই ছবি ভাইরাল হলো।

সাকিবের ঘটনা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে ছড়াল। মানুষ দুই ভাগ হলো। এক ভাগ বলল, সাকিব ঠিক কাজ করেছেন। অন্যদের কথা, ভদ্রলোকের খেলায় এ কেমন অভব্যতা!

আজ ১১ আগস্ট। ওই ঘটনার ঠিক দুই মাস পর সাকিব আল হাসানকে নিয়ে বাংলাদেশের কোনো লোকালয়েই কোনো ভাগাভাগি নেই। এই লেখায় প্রসঙ্গটা নতুন করে না এলে আজকের দিনে হয়তো কারও মনেই পড়ত না ১১ জুনের ঘটনা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সদা পরিবর্তনশীল চরিত্র সাকিবের এই মুহূর্তের অবস্থান যে অনেকটা নায়কের মতোই!

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছবি বদলে গেছে। এখন ফেসবুক খুললেই ভেসে উঠছে টি-টোয়েন্টি দলের গর্বিত অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে সাকিবের বিজয় উদ্‌যাপনের হাস্যোজ্জ্বল মুহূর্ত। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪-১-এ জেতা সিরিজের ট্রফি হাতে তিনি দাঁড়িয়ে নাসুম আহমেদ, শামীম হোসেনদের সঙ্গে। সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে বেরিয়ে সাফল্যের মধ্যমণি হতে সাকিবের সময় লাগল মাত্র দুই মাস।

কোয়ান্তাসের ভাড়া করা বিমানে পরশু গভীর রাতে দেশে ফিরে গেছে বেদনাহত অস্ট্রেলিয়া দল। যাওয়ার সময় যে দুঃস্বপ্নটা তারা সঙ্গে নিয়ে গেল, ম্যাথু ওয়েড-মিচেল মার্শদের সেটি সাকিব একা উপহার দেননি। অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহর বিচক্ষণ নেতৃত্ব অনেকটাই কৃতিত্ব দাবি করে। দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সিরিজ জিতিয়েছেন। শেষ ম্যাচের পর যে হুংকারটা দিয়েছেন, একজন সাহসী অধিনায়ক হিসেবে সেটি আরও স্পষ্ট করে তুলেছে মাহমুদউল্লাহর ছবিটা। অস্ট্রেলিয়াকে ৪-১-এ হারিয়ে মাহমুদউল্লাহর ঘোষণা—টি-টোয়েন্টিতে ঘরের মাঠ এখন বাংলাদেশের দুর্গ। এখানে খেলতে এলে কেউই ছাড় পাবে না।

সিরিজে বাংলাদেশের ব্যাটিং ভালো হয়নি, কিন্তু নিজেদের কন্ডিশনের সুবিধা কাজে লাগানো বিষাক্ত বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং অর্ডারটাকে তো নীল করে দেওয়া গেছে! কাজটা কখনো করেছেন সাকিব, কখনো নাসুম, কখনো মোস্তাফিজ বা শরীফুল। অস্ট্রেলিয়ার দর্প চূর্ণ হওয়াটা যেন বাংলাদেশের বোলারদের কাঁধে কাঁধ মেলানো আক্রমণেরই ছবি। অনেক দিক থেকেই অভূতপূর্ব এই সিরিজ জয়ের সাফল্য কারও একার হাত ধরে আসেনি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে দূর ভবিষ্যতেও দলীয় প্রচেষ্টার দারুণ এক উদাহরণ হয়ে থাকবে এই সিরিজ।

তবু কিছু জায়গায় সাকিবের ভূমিকা আলাদা হয়ে থাকবে। পাঁচ ম্যাচের সিরিজে মাত্র একবার ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েও সিরিজ সেরার পুরস্কার তো তাঁর ক্রিকেটীয় পারফরম্যান্সেরই স্বীকৃতি! নতুন করে সেই ফিরিস্তিতে না গিয়ে দলে সাকিবের অন্য ভূমিকার কথাই বলা যাক। সে ভূমিকা আসলে একজন ছায়া অধিনায়কের।

এই মুহূর্তে সাকিব কোনো সংস্করণেই বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক নন। আপাতত তাঁর নেতৃত্বে আসার কোনো সম্ভাবনাও নেই। কারণ, টি-টোয়েন্টি এবং ওয়ানডের অধিনায়ক হিসেবে মাহমুদউল্লাহ-তামিম ধারাবাহিক সাফল্য পাচ্ছেন। বাংলাদেশের জন্য কঠিনতম সংস্করণ টেস্টের অধিনায়ক হিসেবে থিতু হতে মুমিনুল হকেরও আরও সময় প্রাপ্য। আপাতত সাকিবের নেতৃত্বে না আসার আরেকটা কারণ, সাকিব নিজেও চান না অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ডটা আবার পরতে।

প্রিমিয়ার লিগের লাথি-কাণ্ডের পর সাকিবের একটা উপলব্ধির কথা বলা যাক। সে রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা সাকিবের পরে এটাও মনে হয়েছে, অধিনায়কত্বটা তাঁর আর না করাই ভালো। অধিনায়ক হওয়া মানে সব চাপ সামনে থেকে সামলানো। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সেটা করতে গেলে কখনো কখনো মেজাজ হারাতে হয় বৈকি। আর সেই মেজাজ হারানো পরিস্থিতিকে কতটা কদর্য করে তুলতে পারে, সেটা নিশ্চয়ই নিজের লাথি মারার ছবি দেখে সাকিবও বুঝেছেন।

জিম্বাবুয়ে সফরের পর এই অস্ট্রেলিয়া সিরিজে সাকিব একটা ব্যাপার অন্যদেরও বুঝিয়ে দিয়েছেন। অধিনায়ক না হয়েও তাঁর পক্ষে এমন অনেক কিছুই করা সম্ভব, যেটা দলের অধিনায়কের কাজ সহজ করে দেয়। জিম্বাবুয়ে সফরে তিনি যেমন দলের তরুণ ক্রিকেটারদের কাছের মানুষ হয়ে ছিলেন। মাঠে, মাঠের বাইরে সহচর হয়ে ছিলেন সব সময়। মাঠ ও মাঠের বাইরে সবকিছুর সঙ্গে সাকিবের সম্পৃক্ততা এতটাই বেশি ছিল যে মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে তিনিই দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন না তো!

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সদ্য সমাপ্ত সিরিজেও মাঝেমধ্যেই সেই ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছেন সাকিব। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বারবারই কাছে গিয়ে বোলারদের পরামর্শ দিয়েছেন। কোন ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে কার বোলিংয়ে ফিল্ডিংটা কী হবে, সেটা ঠিক করেছেন। এমনকি নিজে মিড অনে দাঁড়িয়েও মাঠে ফিল্ডারদের এদিক-সেদিক করেছেন। মাঠে যেন অধিনায়কের ছায়াসঙ্গী হয়েই ছিলেন তিনি!

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলার সুবাদে টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার সাকিব। এই সংস্করণের রসায়নটা তাঁর চেয়ে ভালো বোঝা আর কেউ নেই দলে। অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহও তাই অস্ট্রেলিয়া সিরিজে সাকিবকেই দিয়েছিলেন সতীর্থদের অনুপ্রাণিত করার দায়িত্ব। সাকিব যে কাজটা ভালোভাবেই করেছেন, সেটি যাঁরা খেলা দেখেছেন, তাঁদের সবারই বোঝার কথা।

একজন সিনিয়র খেলোয়াড় হিসেবে এটা সাকিবের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে যে তিনি তরুণ খেলোয়াড়দের পরামর্শ দেবেন, তাঁদের একই সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করবেন। তবে এটাও সত্যি, একটা সময়ে এই জিনিসটাই ছিল না সাকিবের মধ্যে।

২০১৮ সালের জুনের কথা। সাকিবের নেতৃত্বে ভারতের দেরাদুনে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশ দল। এখন অধিনায়ক না হয়েও তিনি দলের সঙ্গে যতটা মিশে থাকছেন, সেবার অধিনায়ক হয়েও ততটা মিশে থাকতে দেখা যায়নি সাকিবকে। টিম হোটেলে, দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে দেখা সাকিব যেন ছিলেন দলবিচ্ছিন্ন একজন মানুষ।

খুঁজলে হয়তো বাংলাদেশের ক্রিকেটে এ রকম আরও ছবি পাওয়া যাবে। কিন্তু সেসব খোঁজার আর দরকার নেই। অলরাউন্ডার সাকিব যে নিজেই খুঁজে নিয়েছেন দলে তাঁর অন্য ভূমিকা। এখন শুধু একটাই আশা—তামিমের ওয়ানডে এবং মুমিনুলের টেস্ট দলেও তিনি থাকবেন অধিনায়কের ছায়াসঙ্গী হয়ে।