সেশনজট এড়াতে নোবিপ্রবির বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত

অনলাইন শ্রেণী কার্যক্রমে অংশ নিতে নানা সমস্যার সম্মুখীন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী। তাদের উপেক্ষা করেই এরমধ্যে স্বল্প সময়ে সেশন সম্পন্ন করে জট এড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা মনে করেন, বঞ্চিতদের বিবেচনার বাহিরে রেখে অনলাইনে কোর্স সম্পন্ন করার সিদ্ধান্তে তারা চরম বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।

গত ৯ আগস্ট (রবিবার) বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় অনলাইনে শ্রেণি কার্যক্রমের মাধ্যমে ফাইনাল পরীক্ষা ব্যতীত সকল কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এতে সেশনজট এড়াতে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে করোনার ছুটির ফলে চলমান সেমিস্টারের ত্রিশ শতাংশ নম্বরের অবশিষ্ট কার্যক্রম সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সহসায় বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হলে শিক্ষার্থীদের সুবিধামত সময় দিয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষা নিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও হয় উক্ত সভায়। একাডেমিক কাউন্সিল সভার একাধিক সূত্র এই বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন।

অনলাইন কার্যক্রমের আরো সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি দীর্ঘায়িত হলে আপাতত বর্তমান সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়া হবে না। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে অনলাইনেই পরবর্তী সেমিস্টারের কার্যক্রম শুরু করা হবে। ছুটির উপর নির্ভর করবে শিক্ষার্থীদের পরবর্তী সেমিস্টারের কার্যক্রম। এতে বছরের শেষদিক পর্যন্ত ছুটি থাকলে ২য় সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা ব্যতীত সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলা সাপেক্ষে মাঝখানে উপযুক্ত বিরতি দিয়ে দুই সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা একসাথে অনুষ্ঠিত হবে।

অবসরে দীর্ঘ সময় যেন নষ্ট হয়ে না যায়, সেই চিন্তা মাথায় রেখে ইউজিসির নির্দেশনা ও শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন একাডেমিক কাউন্সিল সূত্র। তারা বলেছেন, এই সব সিদ্ধান্তই সম্ভাব্য, সবকিছুই নির্ভর করবে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি এবং সরকারি নীতি নির্ধারক পর্যায়ের সিদ্ধান্তের উপর।

করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার কিছুদিন পর থেকে বিভাগসমূহ নিজস্ব আঙিকে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া শুরু করেছে। পুরোপুরি শুরু না হলেও অধিকাংশ শিক্ষকরা মাঝেমধ্যেই ক্লাস নিয়েছেন। ওইসব ক্লাসে অনেক শিক্ষার্থীই বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। শিক্ষকদের নিকট তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান চেয়ে আসলেও শিক্ষকরা এসবের তোয়াক্কা করছেন না বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। তাদের ভাষ্য মতে, বিশ্ববিদ্যালয় এই সিদ্ধান্ত নিতে সেইসব বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করেনি। এসবের সমাধান দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম চালানোর সিদ্ধান্ত নিলে শিক্ষার্থীরা আর বৈষম্যের শিকার হত না বলে জানিয়েছে তারা।

ডিভাইস, ডাটা প্যাক ও নেট স্পিড নিয়ে সমস্যা থাকায় প্রায় সব বিভাগেই শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কোন ক্লাসেই যোগ দিতে পারছে না। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন। তারা বলেন, উপযুক্ত ডিভাইস না থাকায় প্রত্যেক ক্লাসেরই কিছু শিক্ষার্থী অংশ নিতে পারছে না। কিছু শিক্ষার্থীর পরিবার করোনায় অসচ্ছতার চরমে পৌছায়, ডাটা কেনার সামর্থ না থাকায় তারাও অনলাইন ক্লাসের বাহিরে থেকে যাচ্ছে। এছাড়া ডাটা কিনার সামর্থ থাকলেও গ্রামাঞ্চলে পর্যাপ্ত নেট স্পিড না থাকায় কিছু শিক্ষার্থী থেকে যায় এই পদ্ধতির ক্লাসের বাহিরে। শিক্ষার্থীরা মনে করে, এই তিন শ্রেণি মিলে ৪০-৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে বিবেচনার বাহিরে রেখেই বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শিক্ষার্থীরা বলেন, যেখানে ইউজিসি ডিভাইস দেওয়ার জন্য ২৫ আগস্টের মধ্যে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের তালিকা চেয়েছে, সেখানে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেমিস্টার সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত বিবেচনাহীন। এছাড়া অনেক বিভাগেই চলমান সেমিস্টারের কোর্সসমূহ অধিকাংশই বাকি রয়েছে। সেখানে কোভিড ১৯ ভীতির মধ্যে স্বল্প সময়েই সেমিস্টার সম্পন্ন করা হলে এটি ছাত্র-ছাত্রীদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।এতে শিক্ষকদেরই কোর্স শেষ হবে, শিক্ষার্থীদের নয়। তারা আরো বলেন, কিছু শিক্ষক নেট সমস্যা নিয়েই ক্লাস চালিয়ে যান, এতে উপস্থিত শিক্ষার্থীরাও ক্লাসের কিছুই বুঝতে পারে না। কিন্তু তারা দায়সারা ক্লাস নিয়ে যেতে থাকেন। ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

ফেসবুকে দেয়া ভাষ্য মতে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার সাথে সংযোগের চিন্তাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, তবে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাদ দিয়ে শুধু মাত্র সেশনজট এড়ানোই যেন এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ না হয়। এতে ছাত্র-ছাত্রীদের কোর্স সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে যেন এর আউটপুটও থাকে। সেজন্য এইসব সমস্যার সমাধান দিয়ে অনলাইন ক্লাসের স্পষ্ট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কার্যক্রমের শুরু করার দাবি জানিয়েছে শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের দাবি, স্বল্প সময়ে সেমিস্টার শেষ না করে উপযুক্ত সময় দিতে হবে। এতে তাদের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে না এবং ইউজিসির ডিভাইস সুবিধা পাওয়া শিক্ষার্থীরাও অংশ নিতে পারবে। প্রত্যেক ক্লাসের আগে ম্যাটারিয়াল দেওয়া এবং ক্লাস লেকচার রেকর্ড করে তা শিক্ষার্থীদের দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যেন ক্লাসে অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীরাও নিজের সুবিধা মত লেকচার দেখতে পারে। এবং ক্লাস টেস্ট এর ক্ষেত্রে ক্লাসের সকলের সর্বসম্মত মত অনুসারে পদ্ধতী ঠিক করে পরীক্ষা নিতে হবে।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের ডাটা সমস্যার সমাধান দিয়ে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর প্রয়োজনীয় লেকচারের পুনঃপাঠদান দিয়ে উপযুক্ত সময় রেখে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া ক্লাস করতে চান না। নোবিপ্রবি সাংবাদিক সমিতির ফেসবুক পেইজ থেকে পোল গঠন করে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের উপর ক্লাস করার পক্ষে-বিপক্ষে মতামত জানতে চাওয়া হয়। এতে অংশগ্রহণ কারী শিক্ষার্থীদের ৭৮ শতাংশই এ অবস্থায় ক্লাস করতে চান না। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্লাস করার পক্ষে ৩১৬ জন হ্যাঁ ভোট দিলেও অংশগ্রহণ কারী প্রায় ১৫শ শিক্ষার্থীর বাকি সবাই বিপক্ষে তথা না ভোট দিয়েছে। এদের বেশিরভাগই চান এই সমস্যাগুলোর সমাধান দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম চালানোর ব্যাপারে স্পস্ট বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা হোক।

এসব সমস্যার সমাধান নিজের বিভাগীয় শিক্ষকদের উপর নির্ভর করছে বলে মনে করেন, নোবিপ্রবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও প্রক্টর ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর। তিনি বলেন, বিভাগসমূহ উদ্যোগ নিয়েই ডাটা সমস্যার সমাধান করে তাদের ক্লাসে নিতে পারেন।শিক্ষকদের উচিত ক্লাসের একদিন আগেই লেকচারের সফটকপি দিয়ে দেওয়া এবং প্রয়োজনে ক্লাস রেকর্ড করে দূর্বল নেটওয়ার্কের আওতায় থাকা শিক্ষার্থীদের সুবিধাজনক সময়ে দেখার সুযোগ করে দেওয়া।

তিনি আরো বলেন, ইউজিসি থেকে অসচ্ছল ছাত্র-ছাত্রীদের ডিভাইস দেওয়ার জন্য তালিকা চেয়েছে। আমরা স্বচ্ছ একটি তালিকা দিবো, যেন ডিভাইস সুবিধা পেয়ে আমাদের অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসার সুযোগ পায়। এছাড়া চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য বিভাগীয় চেয়ারম্যান ছাত্র- ছাত্রীদের জন্য উপযুক্ত সময় চাইলে সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সুবিধামত বিশ্ববিদ্যালয় বিবেচনা করবে।

নোবিপ্রবি প্রক্টর আরো বলেন, ক্লাস টেস্ট ও এসাইনমেন্ট এর ক্ষেত্রে ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদের সর্বসম্মত মত অনুসারে তাদের সুবিধা বিবেচনা করে শিক্ষকরা যেন নির্দিষ্ট পদ্ধতি ঠিক করে কার্যক্রম চালিয়ে নেয়।

শিক্ষার্থীদের ভালোর জন্যই অনলাইন শ্রেণি কার্যক্রম চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান নোবিপ্রবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মো দিদার-উল-আলম। যেহেতু শিক্ষার্থীদের কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এটি যেন আবার তাদের অসুবিধার সৃষ্টি না করে। সেজন্য তিনি শিক্ষকদের নির্দেশ দেন, ছাত্র-ছাত্রীদের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করেই যেন কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হয়। সমস্যায় থাকা শিক্ষার্থীরা যেন কোন প্রকার হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখেই শিক্ষকদের অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন উপাচার্য।