সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজ পর্যায়ের গল্প ‘অশ্রুধারিণী’

কোনো এক বৃষ্টিমুখর বিকেল। প্রাঙ্গনটিতে নেমে এসেছিল রাজ্যের স্নিগ্ধ অন্ধকার। সূর্য ঢাকা পড়েছিলো ধূসর মেঘ রাজ্যের আড়ালে। কালো ও নীল মিলে কেমন একটা রঙ যেন প্রকৃতি সৃষ্টি করে দিয়েছিলো। সেদিন আবার ছিলো আমার স্কুল জীবনের শেষ পরীক্ষা।পরীক্ষা শেষে বরাবরের মতোই আমি বড় মাঠটার কিনারায় ছাউনিতে এসে দাঁড়াই বান্ধবীদের অপেক্ষায়।

কি সুন্দর বৃষ্টি! আকাশ কাঁপিয়ে ঝমঝম করে পড়ছে তো পড়ছেই। তার যেন কোনো বিশ্রাম নেই। সেই বৃষ্টি কণিকাদের সৌন্দর্য মুক্তাকেও হার মানায়। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকতে মন চায়।

এদিকে মাঠ জুড়ে কাদা। পরীক্ষা কেমন দিয়েছি তা নিয়ে আমার কোনো চিন্তাই নেই। বুকটা বারবার এই ভেবে ডুকরে উঠছে যে, দশ দশটা বছর শেষ হয়ে গেলো এই প্রাঙ্গণে। আর আজ আমি এই বিদ্যালয়ের উপর সম্পূর্ণ অধিকার হারাতে যাচ্ছি। আজকের পর কি তাহলে এই বিদ্যালয়ের সাথে আমার লেন-দেন আজীবনের জন্য শেষ? ফেলে আসা লাল-নীল দিনগুলো আমি আর কখনোই পাবো না?

কিন্তু কেনো? এই বিদ্যালয়, এই মাঠ-প্রাঙ্গন, এই গাছপালা সবই তো আমার অস্তিত্বের অংশ, আমার প্রাণের সাথে শক্ত করে বাঁধা। ধরণীর কার সাধ্য আছে এ বাঁধন ছিন্ন করার?

কারও নেই। তবে কেন আমাকে এখান থেকে বিদায় নিতে হবে? কেন আমার কানে বাজবে বিদায় ধ্বনি?

আচ্ছা আমি এই প্রাঙ্গণের বাতাস ছাড়া শ্বাস নিতে পারবো তো?

এরকমই সাত-পাঁচ ভেবে যখন চোখে আমার অশ্রু জমা হচ্ছিলো, তখনই ঝাপসা চোখে দেখলাম, ছোট্ট আমি মাঠের কাঁদায় হুটোপুটি খাচ্ছি। পৃথিবীর সকল আনন্দ জড়ো করে এই প্রাঙ্গনে নামিয়ে এনে বৃষ্টিতে অবিরাম ভিজে যাচ্ছি। বৃষ্টির মায়াবী পানি ছিটিয়ে দিচ্ছি বান্ধবীদের গায়ে। সেই আমি’র মনে কত ফূর্তি! কত আনন্দ! ঠোঁট জুড়ে কি মায়াবী হাসি!

হঠাৎ তার এই হাসি পাল্টে গেল। চোখে মুখে নেমে এলো ভয়। আমি দেখতে পেলাম, পিটি টিচার লাঠি নিয়ে তেড়ে যাচ্ছেন ছোট্ট আমি’র দিকে। আহারে! আজ আর বেচারির রক্ষে নেই। এত বকা খাওয়া সত্ত্বেও কেন যে বাচ্চাটার শিক্ষা হয় না। আর কতদিন পিটি টিচার তার পিছে এভাবে দৌড়াবেন? বাচ্চাটার কি মায়া করে না?

আমি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে মুখ টিপে হেসে দিলাম। দৃশ্যটা বেশ মজার ছিল। নিজেকে বুঝালাম, আজকের পর থেকে আর আমার পিছে পিটি টিচার দৌড়াবেন না। আজ থেকে তাকে আমি এই চাকুরী হতে চিরমুক্তি দিলাম।

কি আজব না? কখনো শুনেছেন শিক্ষার্থী নিজের শিক্ষককে চাকুরী থেকে মুক্তি দেয়?

সাদাকালো ঝাপসা স্মৃতিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেলে দেখতে পেলাম পুরো মাঠ খালি। কিছুক্ষণ আগেও যেসব আকাশী-সাদা পরীরা মাঠে বৃষ্টি বিলাস করছিলো তারাও নেই। আমি কি ভেবে অপরাহ্নের সেই সন্ধ্যা রাঙা মাঠে নেমে গেলাম। সাথে সাথে আকাশ পানি টুপটুপ করে আমার শরীর স্পর্শ করতে লাগলো। আমি বৃষ্টিস্রোতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। এই প্রাঙ্গনে বোধ হয় আজ আমার শেষ বৃষ্টি বিলাস। অতীতের মায়ামাখা স্মৃতিগুলো মনে উঁকি দিচ্ছে বিধায় আমার চোখের নোনা জলের সাথে বৃষ্টিকণা একাকার হয়ে জমিনে গড়াচ্ছে। বুকটা আমার বারবার ডুকরে উঠছিলো। বিদায় বেদনা কত কঠিন! সেদিন আমার ভেতরের কষ্টটা বোধ করি এই প্রাঙ্গনের ভেজা মাটি ব্যাতীত আর কেউ দেখেনি। সীমাহীন আকাশটাও তাই আমার সাথে তাল মিলিয়ে কেঁদেছিলো।

মাঠের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে, মুখখানা কালো মেঘে আচ্ছন্ন আসমানে তাক করে নিজের স্কুল জীবনের শেষ বৃষ্টি বিলাসটা সেড়ে নিতে ব্যাস্ত আমি হঠাৎ টের পেলাম আমার ডান কানটা আস্তে আস্তে উপরে উঠে যাচ্ছে। আমি তীব্র ব্যাথায় কানে হাত দিয়ে “আউচ” শব্দ করে পিছে তাকাতেই দেখি ছাতা হাতে পিটি টিচার আমার দিকে হিংস্র বাঘিনীর মতো তাকিয়ে আছেন। চোখ দিয়ে যদি মানুষকে গিলে ফেলা যেত, তবে হয়তো তিনি তা-ই করতেন।

তিনি ধমকে বলেছিলেন, “বেশি সাহস বেড়েছে? এসএসসি পরীক্ষার আগে ঠান্ডা লাগানোর ধান্ধা তাই না? জ্বর বাঁধিয়ে বাসায় বসে থাকো, পরীক্ষা আর দেওয়া লাগবে না। তোমাদের মতো ফাঁকিবাজদের ধরে ধরে পিটাতে ইচ্ছে করে আমার!”

অন্যসময় হলে আমি তার ধমক খেয়ে ততোক্ষনে চুপসে যেতাম। কিন্তু সেদিন প্রথমবার! প্রথমবার আমি তাকে ভয় পাইনি। তার ধমকে চুপসে যাইনি।
কারণ আমার হৃদয়টা গত দশ বছরে যা উপলব্ধি করেনি, সেদিন তা করেছিলো। শিক্ষকরা বকেন-ই আমাদের ভালোর জন্য। এতে তাদের বিন্দুমাত্র স্বার্থ নেই। একেবারেই নেই। অথচ এতগুলো বছর আমি তাদের রাক্ষস ভেবে এসেছি, ছি!

সেদিন তার ধমকের সামনে কিছু বলতে পারিনি। বোবা হয়েছে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মন ছটফট করছিলো তাকে বলার জন্য, “ম্যাম, আমার কানটা কি আরেকবার মলে দেবেন? দিন না শেষবারের মতো। আপনাকে আর কখনোই জ্বালাবো না আমি।”

শিক্ষকরা এত মায়াবী হয় জানতাম না। এত মমতা তারা কোথায় রাখেন?

“ভিকারুননিসা” যেন প্রানের ক্যাম্পাস। এই একই ঠিকানায় ফিরে যাব আমি বারবার। ছুটির ঘোষণা হোক আর যাইহোক,কতদিন হলো বটবৃক্ষের ন্যায় মাথার উপর ছায়াদানকারী শিক্ষকদের দেখি না। প্রাণপ্রিয় প্রাঙ্গণে বৃষ্টি বিলাস করি না। বন্ধুদের গভীর আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরি না। একদিন সব ঠিক হবে, সেদিন বন্ধুদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলবো,

“তোদের খুব মনে পড়েছিল রে, খুব কেঁদেছিলাম।”