সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজ পর্যায়ের গল্প- ‘ক্লাস সিক্সে পদার্পণ’

ক্লাস সিক্স

কবে ক্লাস শুরু হয়েছিল আমার মনে নাই। প্রথমদিনের প্রথম ক্লাসে সম্বভত আমরা মতি স্যারকে পাই। স্যার অমায়িক মানুষ। একদম শিশুদের মতো মত মন। আমার বা আমাদের কারোরই মনে হয়নি আমরা ছিলাম তার অপরিচিজন। তিনি বুঝালেন এটা হাই স্কুল। আমরা বড় হয়েছি। সুতরাং আচরনেও আমাদের বড় হতে হবে। তারপর জুলেখা ম্যাডাম আর জসিম স্যারকে পেয়েছিলাম। উভয়ই আমাদের নানা গাইড লাইন দিয়েছিলেন। যাহোক হাই স্কুলের ভয়টা আস্তে আস্তে কেটে যেতে লাগলো। একটা বড় সুবিধা পেয়েছিলাম আমরা। আমরা যারা কাছের সুহরী প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র ছিলাম যেহেতু সংখ্যায় বেশি ছিলাম আর তাই সুহরী হাই স্কুলে উঠে আমাদের বেশ দাপট ছিল। অন্য গ্রামের ছেলে-মেয়েরা বেশ সমীহ করতো আমাদের। বড় হবার সাথে সাথে দাপট কি জিনিস আস্তে আস্তে বুঝতে শিখলাম। সেই সাথে নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে লাগলাম।

ক্লাস সিক্সের ক্লাস শুরুর দিকে হঠাৎ নবীল নামের একটা চশমাওয়ালা ছেলের আবির্ভাব। ও ছিল আমাদের মাঝে প্রথম চশমাওয়ালা ছেলে। আমাদের স্কুলের হেড স্যার ছিলেন রাজা মিয়া স্যার। তাই এখানে দাপট চললোনা। তার সাথে বেশ লিয়াজো রাখতাম। অচীরেই সে আমার আর সাব্বিরের বন্ধুর লিষ্টে যুক্ত হল।

ক্লাস সেভেন

ক্লাস সিক্সের পর যখন সেভেনে উঠলাম তখন বন্ধুর লিষ্টটা বেশ লম্বা হয়ে গেল। প্রাইমারি স্কুলের দীর্ঘ ৫ বছরের বন্ধুদের সাথে লিষ্টে ক্লাস সিক্সের অন্য স্কুল থেকে আসা ছেলেদের নামও যুক্ত হল। মেয়েরা অবশ্য কখনো আমার বন্ধু ছিলনা। মেয়েদের থেকে বেশ খানিকটা দূরে রাখতাম আমি নিজেকে। স্কুলে তখন চোখ টিপা ব্যাধি মহামারি আকার ধারণ করেছিল। প্রায়ই শুনা যেত অমুক তমুককে চোখ টিপা মেরেছে। আর এই চোখ টিপা নিয়ে স্কুল থেকে গ্রাম সবত্র চায়ের কাপে আলোচনার ঝড় উঠতো। ক্লাস সেভেনে আমি গনিতের জন্য আলাদা একটা খাতা করেছিলাম। সেই খাতায় শুধু অংক করতাম। মনে আছে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় আমি একা কেবল ৯৪ পেয়েছিলাম। বিষয়টা আমার জন্য বেশ রোমাঞ্চকর ছিল। কেননা গনিতে আমার বেশ ভাল রেকর্ড ছিল। তাছাড়া ক্লাস সেভেনে প্রথম আমি স্কুল থেকে পালাই। সেদিন সারাটা দিন আমার জন্য ছিল চরম বিরক্তিকর। কিছুটা সময় সাব্বির সাথে কলাগাছের ভেলা নিয়ে পানিতে খেলা করি তারপর তো আর সময় যেন কাটতে চায়না। সেদিন থেকে প্রতিজ্ঞা করি আর কখনো স্কুল থেকে পালাবোনা। আর কখনো স্কুল পালাইনি।

ক্লাস সেভেনের আরেকটি ঘটনা মনে পড়লে এখনো হাসি পায়। স্কুলে তখন আমাদের পানি পান করার একমাত্র ব্যবস্থা ছিল টিউবওয়েল। ক্লাসে কারো পানির তৃষ্ণা পেলে স্যারকে বলে টিউবওয়েলে গিয়ে পানি পান করতে হত। একবার আমি আর আমার এক ফ্রেন্ড ক্লাস চলাকালিন অবস্থায় পানি পান করার জন্য স্যারকে বলে টিউবওয়েলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি সুন্দর একটা কলম টিউবওয়েলের পাশে রাখা। সাধারনত টিউবওয়েলে এসে অনেকে পানি পান করার সময় হাতে থাকা কলমটা আশেপাশে কোথাও রাখতো তারপর যাবার সময় সেটা নিতে ভুলে যেত।কলমটা দেখে বেশ সুন্দর লাগলো। কিন্তু অন্যের জিনিস তো আর নেওয়া যায় না। ধরা খেলে মান ইজ্জত কা সাওয়াল। কলম যেমন ছিল ঠিক তেমন রেখে টিউবওয়েল থেকে ফেরত আসার পথে দেখি সমছ যাচ্ছে পানি পান করতে। সাথে থাকা বন্ধুটিকে বললাম দেখ কেমন করে সমছকে দিয়ে কলমটি নিয়ে আসি। সমছ কাছে আসতে বললাম আমার বন্ধু কলমটা টিউবওয়েলে ফেলে আসছি তুই যদি একটু কষ্ট করে নিয়ে আসতে। সাথে সাথে সমছের উত্তর আমি তোর চাকর নাকি আমি তোর কলম কেন নিয়ে আসবো। এবার তাকে সরাসরি ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে বসলাম। বললাম তুই না আমার বন্ধু। বন্ধু হয়ে বন্ধুর জন্য এই সামান্য কাজটা করতে পারবেনা? আর যায় কই বেচারা। ও এবার বললো তাহলে ঠিক আছে নিয়ে আসবো। এরপর দেখি সত্যি সত্যি সমছ কলমটা নিয়ে আসছে। আমি আর বন্ধু হাসতে হাসতে ততক্ষনে শেষ।

ক্লাস এইট

যখন ক্লাস এইটে উঠলাম তখন আমাদের মধ্যে বেশ একটা সিনিয়র সিনিয়র ভাব কাজ করলো। আমাদের তখন ইংরেজির ক্লাস নিতেন জসিম উদ্দিন স্যার। হেড স্যার না থাকলে থার্ড স্কুলের ভারপ্রাপ্ত হেড । সবাই উনাকে এতটাই ভয় পেত যে আড়ালে টাইগার নামে ডাকতো। আমার মুখস্ত বিদ্যা শক্তি মাশাআল্লাহ বেশ ভাল ছিল। বড় বড় অংক যেখানে মুখস্ত করে ফেলতাম সেখানে ইংরেজি ছিল ডাল ভাত। আর তাই স্যারের কাছে তেমন ধরা খেতে হতনা। অবশ্য তখন আমি একটু সাহিত্যমনা ছিলাম। নিজে নিজে ছড়া লিখে ফেলতাম। একবার বাংলা পরীক্ষায় বৃষ্টির রচনায় আমার নিজের একটি ছড়াকে তাইতো কবি বলে বলেছেন বলে লিখে দিয়ে আসছিলাম। সেবার পরীক্ষায় বাংলায় ৮১ নাম্বার পেয়েছিলাম।তখন আমার দুইটা মেয়ে বন্ধু হলো বেষ্ট ফ্রেন্ড। ক্লাস এইটে আবার বৃত্তি নামক প্যারা শুরু হল। আমি অবশ্য সেই প্যারা থেকে নিজেকে কোনক্রমে মুক্ত রাখলাম। তাছাড়া তখন আমি সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলায়ও বেশ আসক্ত ছিলাম। অনেক সময় আমার পরীক্ষা চলতো দেখা যেত আমি মাঠে প্র্যাকটিস করছি। আমার বন্ধু রাহাত মারাত্মক সুন্দর বলিং করতো। স্কুলে তার বলিং দেখার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো। ইমন ছিল অপেনিং ব্যাটম্যান। সমছ অলরাউন্ডার। খেলাধুলার এই নেশা আমাকে এতটাই আসক্ত করেছিল যে বার্ষিক পরীক্ষায় ইতিহাসের সেরা ভালো রেজাল্ট করেছিলাম সেবার আমি।

ক্লাস এইটে থাকাকালিন সময়ে আমার বন্ধু ইমন আবার নতুন করে প্রেমে পড়েছিল। মেয়েটির আমাদের জুনিয়র ছিল। স্কুলের পাশেই ছিল ওদের বাড়ি। বাংলার ঢালিউডের আকাশে তখন নায়িকা পূর্ণিমার আবির্ভাব। ইমন ওকে নায়িকা পূর্ণিমার ফটোকপি বলতো। বেশ কয়েকদিন সে পূর্ণিমার ফটোকপির পিছনে ঘুরাঘুরি করে। সম্বভত পূর্ণিমার মনের গ্রিন সিগনাল না পেয়ে বেচারা ইমনের প্রেমে লাল সিগনাল জ্বলে উঠে। এরপর অবশ্য সে পুনরায় আরেকটি প্রেমে পড়েছিল। সেই মেয়েটিও জুনিয়র ছিল। আফসোস সেটিও ব্যার্থ হয়েছি।

তারপর জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেলাম এবং বৃত্তি ও পেলাম সাধারণ কোঠায়।

ক্লাস নাইন

ভর্তি ফি জমা দিলাম বিএসসি শিক্ষক এর কাছে তারপর নতুন বই নিলাম মনে একটা অন্যরকম আনন্দ হয়েছিল তখন। প্রিয় স্কুল ক্যাম্পাসে সবার সাথে মজা করতাম বড় ছোট।স্কুল লাইফের মতো আনন্দ আর কিছু ছিলো না। প্রিয় স্কুল এর পরিবেশ ছিল দারুন। স্যারদের ভালোবাসা আমাকে অনেক আগ্রহ জাগিয়ে ছিলো নতুন কিছু শেখার। ক্যাম্পাসের পরিবেশ ছিল যা বলার মতো না।বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে দশম শ্রেণিতে উঠি।তারপরে দেশে মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে মনোরম পরিবেশ এর ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে যায়। জানি না কবে আবার দেখবো ঐ সুন্দর পরিবেশ।