সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘ক্যাম্পাসের ডায়েরি’

এক বিখ্যাত দার্শনিক বলে গিয়েছেন, “Life is nothing but a collection of memories” অর্থাৎ “জীবন একগুচ্ছ স্মৃতির সমষ্টি ছাড়া কিছুই নয়।” জীবনে চলার পথে কত স্মৃতি জড়িয়ে থাকে আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে! এই লেখাটা যখন লিখছি, মানবজাতি এক দুঃসময় পার করছে। এই মুহূর্তটির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আমরা কেউ। অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে যখন ঘরে বন্দি আছি, তখন একটু স্মৃতিচারণা করে নেয়া যায়। পুরনো দিনের কথা স্মৃতিতে হাতরাতে ভালো লাগে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আমার যাত্রা শুরু ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯ এ। স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আনন্দ কতটা, তা শুধু স্বপ্নদ্রষ্টাই জানেন! চান্স পাওয়ার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকবার গিয়েছি; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে যখন পা রাখলাম, অনুভূতিটা ছিল অন্যরকম। ১৩ জানুয়ারি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনে নিজের ক্লাস রুমে প্রবেশ করলাম একরাশ রোমাঞ্চ আর উদ্দীপনা নিয়ে। স্যার যখন নাম কল করলেন, বুঝে নিলাম আমার নাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাতায় উঠে গেছে!

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ক্লাসে চেয়ারম্যান স্যারের একটি কথা মনে ধরল। স্যার বলেছিলেন, “জীবন কঠিন, তবে যতটা কঠিন আমরা বানিয়ে ফেলি, ঠিক ততটা না। জীবনে খারাপ সময় আসে, খারাপ সময়ের পর অবশ্যই ভালো সময় আসে। খারাপ সময়টায় শুধু ধৈর্য আর সাহস নিয়ে টিকে থাকতে হয়।”

একবুক স্বপ্ন আর উদ্দীপনা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হলো তবে একটা বড় ধাক্কা খেলাম যখন দেখলাম এবং বুঝলাম, “ভার্সিটিতে উঠ, ভার্সিটিতে উঠলে কোনো পড়ালেখা নাই”, এটি অবাস্তব এবং ফাঁপা একটি বুলি! একের পর এক টিউটোরিয়াল, মিডটার্ম, এসাইনমেন্ট, টার্ম পেপারে নাভিশ্বাস অবস্থা! তবে এ অবস্থা খুব বেশিদিন টিকিয়ে রাখিনি। এক তুড়ি মেরে সব উড়িয়ে দিয়েছি!

সময়ের পরিক্রমায় ক্লাসরুম থেকে শুরু করে বটতলা, শ্যাডো, মল চত্বর, মধুর ক্যান্টিন, কার্জন, টিএসসি, হল কিংবা লাল বাস- এই সব কিছুই হয়ে উঠল জীবনের অংশ।

ক্লাস শুরু হওয়ার অল্পদিন পরই, ফেব্রুয়ারিতে ডিপার্টমেন্ট থেকে সুন্দরবন-১০ লঞ্চ যোগে ট্যুরে যাওয়া হলো; এটি ছিল আমার জীবনের প্রথম লঞ্চ ভ্রমণ! “বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা খুব গুরুগম্ভীর, শিক্ষার্থীদের সাথে মিশেন না” এই ধারণাটা আমার ভেঙ্গে যায় ট্যুরে গিয়ে। আমরা একসাথে নেচেছি সবাই!

করোনার এই দুঃসময়ে ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকদের সহযোগিতা দেখে উনাদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসাটা আরও বেড়ে গেছে। আমাদের মধ্যে যাদের আর্থিক অবস্থা একটু খারাপ, শিক্ষকরা পরিচয় গোপন রেখে আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন, দিয়ে যাচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বুঝলাম, জীবনটা শুধু নিজের জন্য নয়। আশেপাশের প্রতিটি মানুষের প্রতি আমার দায়িত্ব আছে। ক্যাম্পাসের কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে যুক্ত হলাম। এমনই একটি সংগঠন “সমাজের জন্য জাগরণ”, এই সংগঠনটি ঢাবির দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শ্রুতিলেখক ম্যানেজ করে দেয়। শ্রুতিলেখক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে বুঝলাম, জীবনে অনেক লড়াই করতে হবে! কখনোই হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না।

স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সংগঠন বাঁধনের সাথে যুক্ত আছি।
এক মুমূর্ষ রোগীকে রক্ত দিতে বন্ধুকে সাথে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছিলাম। মেডিকেল কলেজের এক চিকিৎসক বলছিলেন, “ঢাকা ভার্সিটি, ঢাকা মেডিক্যাল, বুয়েটের ছেলেমেয়েরা না থাকলে হসপিটালের অর্ধেক রোগী রক্তের অভাবে মারা যেতো।”

বন্ধু ছাড়া তো জীবন অচল। এখানে হরেক রকমের বন্ধু পাওয়া যায়! কিছু বন্ধু পেয়েছি, যারা শুধু বন্ধু নয়; আমার ভাই। আমি একটি ক্লাসরুমের ভেতরে পুরো বাংলাদেশকে দেখতে পেলাম! কতো বৈচিত্র্য! ৬৪ জেলার ছেলেপুলে পড়তে এসেছে এখানে। আছে যেমন অনেক ধনীর ছেলে, আছে তেমন কৃষক আর দিন-মজুরের ছেলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ খোঁজে পেলাম। কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে পাহাড়ি এসব ভেদাভেদ এখানে এসে মিশে গেছে। আমার ডিপার্টমেন্টে এক মারমা বন্ধু আছে। তার কাছে পাহাড়ের গল্প শুনি, কীভাবে জুম চাষ করে সেটার গল্প শুনি। এইবার তার সাথে বান্দরবানে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে যাওয়ার কথা ছিল, করোনা সেটা আটকে দিয়েছে। বেঁচে থাকলে একদিন নিশ্চয়ই যাবো।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে জীবনের বিস্তৃত রূপটা অনুভব করেছি। খুব সতর্কতার সাথে সবকিছু মোকাবেলা না করলে জীবন উল্টোপথে দৌড় দিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে উপলব্ধি করেছি, ‘এই দেশকে আমার অনেক কিছুই দেওয়ার বাকি আছে, অনেক কিছু দিতে হবে।’

ঢাবিতে আমার ক্যাম্পাস লাইফটা খুব শর্ট, এখনও পথ চলা অনেক বাকি আছে। তবে এই অল্প দিনেই যে কত স্মৃতি তৈরি হয়েছে! কত ভালো লাগা, কত আবেগ যে মিশে আছে ক্যাম্পাসের প্রতিটি ইট, কাঠ, পাথর, গাছপালার সাথে!

আমার জীবন থেকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইফ’ বাদ দিলে আমার অনেক স্মৃতি হারিয়ে যাবে! একটি বিশেষ দিনে আমি আমার স্মৃতিগুলো হাতড়াচ্ছি। আজ ১ জুলাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। ১৯২১ সালে ঠিক এই দিনেই যাত্রা শুরু করেছিল জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক এই প্রতিষ্ঠানটি।

এখন ক্যাম্পাসে থাকার কথা ছিল, করোনা সব ওলট-পালট করে দিল। নীরবে-নিভৃতে শতবর্ষে পদার্পণ করতে যাচ্ছে প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বেঁচে থাকলে ২০২১ তো আছেই, ইনশাআল্লাহ্। শতবর্ষ তখন ধুমধামের সাথে উদযাপন করবো!

শুভেচ্ছা নিও, প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পৃথিবীর অসুখটা সেরে গেলে আবার দেখা হবে!