সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘দেখা হয়নি পুরোটা…’

‘কত শত রাত জেগে তোমায় চেয়েছি,
অবিনীত দৃঢ়তায় তোমায় পেয়েছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, একটি স্বপ্নের নাম। হাজার হাজার রাত জাগা শিক্ষার্থীর নিকট এটি একটি স্বপ্ন, অহংকার। দৃঢ় সাধনা আর তুমুল প্রতিযোগিতায় নিজেকে প্রমাণ করে প্রতিবছর এ প্রাণের ক্যাম্পাসে আগমন ঘটে শত শত নবীনের। অজপাড়া গাঁয়ের প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে, নিম্নবৃত্ত পরিবারের দারিদ্র্যের কষাঘাত মুক্ত হয়ে, শত মানুষের কটূক্তি আর অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করে প্রতিবছর এ ক্যাম্পাসে আগমন ঘটে এক একটি সূর্য সন্তানের। সংগ্রাম তাদের অস্তিত্ব, এগিয়ে চলা তাদের উদ্দেশ্য, দেশ এবং দেশের মানুষের কল্যাণ সাধন তাদের লক্ষ্য। নবাব পরিবারের দেয়া ৬০০ একর জমির উপর রমনা সিভিল লাইনে প্রতিষ্ঠিত প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধীকার আন্দোলন এবং সবশেষ স্বাধীনতা আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেছে। তাই ইতিহাসখ্যাত এবং বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুত্থানের পেছনে যে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রত্যক্ষ অবদান তার সদস্য হতে পেরে আমি সত্যি ধন্য।
অজস্র স্বপ্ন আর প্রত্যাশা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ। ফ্রেশার হিসেবে প্রবেশ এ বছরই। প্রথমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশের অনুভূতিটা ছিল এক কথায় অসাধারণ, চেতনা উদ্রেককারী। মনে হল ‘মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ’ দিয়ে পদার্পণ করেছি কোন এক স্বপ্নালোকে যেখানে সবাই শ্রেষ্ঠত্বের জন্য লড়ছে। এ শিহরণ সন্তুষ্টির, এ আবেগ প্রাপ্তির। তখন মনে একটি কবিতার উদ্ভব হল-

‘আস্থা আর ভালোবাসা তুমি, তুমি আলোকবর্তিকা;
নতুন দিনের শপথ তুমি, তুমি বিজয়ের পতাকা।’

স্বপ্নের ক্যাম্পাসের প্রতিটি সৌন্দর্যশৈলী বিমোহিত করতে লাগল। ছবিতে দেখা রাজকীয় ক্যাম্পাসটাকে এভাবে নিজের করে মন ভরে দেখবো যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না! ধীরে ধীরে পরিচিত হতে লাগলাম প্রাণের ক্যাম্পাসের সাথে। জানতে শুরু করলাম সবকিছুকে, বন্ধুত্ব বাড়তে লাগল, শুরু হল হই-হুল্লোড়-হাসি-আনন্দ আর সবার সাথে মিলে নতুন ক্যাম্পাসটাকে ঘুরে ঘুরে দেখা। অপরাজেয় বাংলা, স্বোপার্জিত স্বাধীনতা, দোয়েল চত্বর, ঢাকা গেইট, শহিদ মিনার এ সব কিছু যেন এক একটি রূপকথা হয়ে চোখের কোণে বিস্ময় সৃষ্টি করে! আপাতত পড়াশুনাকে উচ্ছন্নে দিয়ে উপভোগ করতে লাগলাম প্রাণের ক্যাম্পাসটাকে। কার্জন হল টাকে প্রথম যেদিন দেখলাম সেদিন মনে মনে এত আনন্দ অনুভব করেছিলাম ভাষায় প্রকাশ করার মত না! ছবিতে একে দেখেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আমার প্রথম ভালোবাসা। রোমাঞ্চের টানে সেখানে প্রায়শই সব বন্ধুরা মিলে আড্ডা, গান আর হাসি-খুঁশিতে মেতে উঠতাম। তখন প্রতিটি প্রাণে নিরন্তর আনন্দ বয়ে যেত। সবাই যেন একসাথে মিশে যেতাম। ক্লাস শেষ করেই সবাই মিলে ঢুঁ মারতাম ‘টিএসসি’তে’ (ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র), এ যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আরেকটি জগত। এখানে কেউ জমিয়ে আড্ডা দেয়, কেউ জমিয়ে প্রেম করে, কেউ দুনিয়াদারি ভুলে পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে আবার থেকে থেকে কারো গলায় গিটারের সুরে আচমকা হরেক রকম গান শুনতে পাওয়া যায়। আমরা বন্ধুরা মিলে সবুজ ঘাসের উপর বসে জমিয়ে গল্প করতাম আর মাঝে মাঝে ১ টাকার চায়ের নিমন্ত্রণে গোলটেবিল বৈঠকে জড়ো হতাম। আড্ডায় কেউ কেউ তাঁর জীবনসংগ্রামের ইতিহাস বলে কাঁদিয়ে দিত আবার কেউ কেউ হাস্যময়ী কথার জাদুতে মাতিয়ে রাখত। এ যেন সত্যি এক চাঁদের হাঁট।

টিচারদের মনোমুগ্ধকর লেকচারের পর ভরদুপুরে বন্ধুরা মিলে ‘টিএসসি বা ডাকসু ক্যাফেটেরিয়ায়’ হতো ২০ টাকায় তৃপ্তির ভুঁড়িভোজ। চারপাশে চলতো কথার কোলাহল। লাইন ধরে খাবারের টোকেন নেয়া, চেয়ার দখল করা, আবার লাইন ধরে খাবার এনে একসাথে বসে খাওয়া সে এক অন্যরকম অনুভূতি। ক্যাম্পাসে সিনিয়র আর জুনিয়রের মধ্যে সম্পর্কটা একটু জটিল। মাত্র প্রবেশ করেছি তাই এ সম্পর্কটা এখনো শিখে উঠতে পারি নি। লাইলী-মজনুর প্রেমলীলা দেখিনি কিন্তু তথাকথিত ‘প্রেম চত্বরে’ দেখেছি ঢাবিয়ানদের প্রেমলীলা! ক্লাস শুরুর আগে, ক্লাসের শেষে এবং ক্লাসের বিরতিতে বটতলায় জড়ো হয়ে আড্ডা দেয়া এবং কথার তালে তালে বাদাম খাওয়া মনে আনন্দের জোয়ার এনে দিত। হাসি-ঠাট্টা আর মজা-মাস্তিতে কেটে যেত ক্ষণের পর ক্ষণ। মাঝে মাঝে সিনিয়রদের কাছ থেকে আচমকা ট্রিট আড্ডা আরো জমিয়ে দিত। কখনো কখনো সবাই মিলে উঁকি দিতাম সিনেট ভবনে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ, সত্যি তাই। ডিএসএলআর (ডিজিটাল সিঙ্গল-লেন্স রিফলেক্স) ক্যামেরা দিয়ে সেখানে হয়ে যেত ছোটখাটো ফটোশুট। মনে হত সবাই সবার কত আপন, কত চেনা! হলের কথা না বললেই নয়। গণরুমে অপরিচিত পরিবেশে অপরিচিত মানুষ, নিজের সম্পত্তি অন্যের হয়ে যাওয়া আবার অন্যের সম্পত্তি নিজের হয়ে যাওয়া, সিনিয়রদের দ্বারা ম্যানার শেখা, গভীর রাতে ক্যাম্পাসের কোথায় কী আছে তা চিনে আসা, একে অপরের প্রতি ভালোবাসা আর দুষ্টুমি, ডাইনিংয়ে হরেক রকম খাবার আর ট্রিট নামক শব্দ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা দিয়েছে। তবে এ তো মাত্র শুরু। ঢাবির বাসে ভ্রমণ এক অন্যরকম শিহরণ জাগায়। ট্রাফিক উপেক্ষা করে ঢাবির লাল বাস যখন সবার আগে এগিয়ে চলে তখন অন্তরে হঠাৎ হিমেল হাওয়া বয়ে যায়, এক অন্যরকম ভাব আসে! বাসের ভিতর সবার সম্মিলিত কণ্ঠে গান মন প্রাণ জুড়িয়ে দেয়।

অথচ আজ সবকিছু থেমে আছে। থেমে আছে প্রাণের ক্যাম্পাসের চঞ্চলতা। মহামারি ‘করোনা’ ভাইরাস ক্যাম্পাসে এনে দিয়েছে শূন্যতা। এখন আর নেই কোন কোলাহল, নেই কোন আড্ডা, নেই কোন বন্ধুদের হাঁসিমুখ। খুব মিস করি প্রাণের ক্যাম্পাসটাকে, মিস করি নব বন্ধনে আবদ্ধ বন্ধুদের। কতদিন দেখা হয় না, ঘুরে বেড়ানো হয় না, চেনা হয়নি এখনো অনেক কিছু। তবু ভালো থাকুক প্রিয় ক্যাম্পাস, ভালো থাকুক প্রিয় মানুষগুলো। হয়তো আবার হবে দেখা, হবে দুরন্তপনা, ঘুরে বেড়ানো আর অনেক আনন্দ। সেই পর্যন্ত ভালো থাকুক পৃথিবী, ভালো থাকুক প্রাণের ক্যাম্পাস।