সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘ স্মৃতি কাহন ’

ভালোবাসায় সিক্ত প্রিয় ক্যাম্পাসের
মুখখানি পড়ছে মনে,
যেতে চাই আমি ফিরে যেতে চাই
স্মৃতি ভরা সেই অংগনে।।

ক্যাম্পাস সবার কাছে ভালো লাগার এক নাম, ভালো লাগার এক জায়গা। যার সাথে মিশে রয়েছে আমাদের মন। সবারই নিজের ক্যাম্পাস আছে। সবার মতো আমারও রয়েছে সুন্দর একটি ক্যাম্পাস।
আমি দিনাজপুর সরকারি কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্্ষের ছাত্রী। কলেজ চলাকালীন সময়ে নিয়মিত কলেজে যাওয়া হতো,ক্লাস,বন্ধুদের সাথে আড্ডা, খুনসুটি সবকিছু মিলে অসাধারণ সময় কাটানো হতো। কিন্তু হঠাৎ করোনা নামক মহামারীর করাল গ্রাসে আজ সব স্তম্বিত,স্তগিত।সারা দেশে লকডাউন জারি হয়েছে। প্রায় তিন মাস ধরে ক্যাম্পাস বন্ধ। যাওয়া হয়ে ওঠে না প্রিয় ক্যাম্পাসে।অনেক দূরে থাকলেও ক্যাম্পাস মন থেকে দূরে যায় নি। মন টা যেন এখনো সেই ক্যাম্পাসেই পড়ে আছে। খুব মনে পড়ে ক্যাম্পাসের কথা,ক্যাম্পাসের সাথে জড়িত স্মৃতি গুলো।
আমাদের ক্লাস শুরু হতো নয়টায়। গুটিকয়েক ছাড়া কেউই ক্লাসে সঠিক সময়ে হাজির হতে পারতাম না। দেরিতে গেলেই স্যারদের বকুনি খেতে হতো, দরজায় দাড়িয়ে থাকতে হতো। আমাদের মনে হতো যেন স্কুলে আছি এখনো। স্যারেরা অনেক মজা করে,সুন্দর করে ক্লাস নিতেন তবু খুবই বিরক্ত লাগতো।কিন্তু এখন দেরিতে গিয়ে স্যারদের বকুনি খাওয়া হচ্ছে না,তাদের মজার ক্লাস গুলো করা হচ্ছে না।ম্যাথ ননমেজর সাবজেক্ট হওয়ায় কখনো ম্যাথ ক্লাস করা হয়নি। করা হয়নি বললে ভুল হবে। কারণ যেদিনই আমি ক্লাস করতে গেছিলাম সেদিনই কোনো না কোনো কারণে ক্লাসই হতো না।শেষে ক্লাসটা করাই হলো না।
সবাই মিলে ডিপার্টমেন্টের সামনে কত সুন্দর আড্ডা দেয়া হতো। এখন আর আড্ডা দেয়া হয়না,আর হয় না কোনো খুনসুটি। ডিপার্টমেন্টের সামনে কয়েকজন মিলে ফুল গাছ লাগিয়েছিলাম। জানিনা ফুল গুলোর এখন কি অবস্থা!আমাদের কলেজ গেইটে এক বুড়ো দাদু ওয়েট মেশিন নিয়ে বসে থাকতো। বেশি কেউ ওজন মাপতে চাইতো না জন্য দাদুটা বলতো দুই বান্ধবী ৫ টাকা। অথচ একজন মাপাও কিন্তু ৫ টাকাই। দুজন মাপলে একজন ফ্রী তে মাপতে পারবে এতে অনেকে ওজন মাপতে আসবে।কেননা ফ্রী জিনিসের কথা শুনলে তো মানুষ হাত না ধুয়ে বসে পড়ে। দাদুর বুদ্ধিটা কিন্তু দারুন ছিল। দাদুকে দেখেই বুঝেছিলাম দাদু অনেক অসহায়। কিন্তু দাদু আবার এমন একজন লোক এমনি টাকা দিতে চাইলে উনি নেবেন না। তাই আমরা দুজন করে না মেপে একজন করে কয়েকদিন পর পর মাপতাম আর প্রতি জন ৫ টাকা করে দিতাম।এতে দাদুর লাভই হতো। মাঝে মাঝে দাদু বলতো কেউ ওজন মাপতেই চায় না অথচ আপনারা প্রায় প্রতিদিনই মাপেন।তখন আমরা বলতাম দাদু আমরা আমাদের ওজন নিয়ে চিন্তিত ওজন বেড়ে গেলে সমস্যা হতে পারে এজন্য। অথচ আমাদের ইচ্ছে দাদুকে সাহায্য করার। কিন্তু দাদুকে তা বুঝতে দেই নি। দাদুর মতো অসহায় কয়েকজন লোক প্রায় আসতো সাহায্য চাইতে। কেউ ই সাহায্য দিতে চাইতো না। কিন্তু আমরা দিতাম। জানিনা এখন এই অসহায় লোকগুলোর কি অবস্থা!
ক্লাস শেষে আমরা অর্থনীতি ডিপার্টমেন্টের ছাদে যেতাম। সেই ছাদ থেকে আমাদের ক্যাম্পাসটা অনেক সুন্দর লাগে। অনেক ভালো লাগতো।সবাই মিলে বরই খেতাম।আমাদের কলেজে অনেক বড় একটা লিচু বাগান আছে। ইচ্ছে ছিল লিচু খাব। কিন্তু তা হলো না। ক্যাম্পাসে সকলের আড্ডা বসে। সবাই বিভিন্ন কাগজ, ঠোংগা ইত্যাদি ফেলে ক্যাম্পাস টা নোংরা করত। সবাই কে বুঝাতাম যাতে এসব ময়লা ডাস্টবিন এ ফেলে দেয়। কিন্তু কেউই শুনতো না। অবশেষে আমরা কয়েকজন মিলে পুরো ক্যাম্পাস টা পপরিষ্কার করতাম। জানিনা এখন ক্যাম্পাস টা কি রকম আছে!
ক্যানটিনে আর বন্ধুদের থেকে ট্রীট নেয়া হয়না,কারো জন্মদিন পালন করা হয়না।,দুষ্টু মিষ্টি ঝগড়া হয়না,৫ টাকার বাদাম নিয়ে দশ বার জন মিলে খাওয়া হয় না।
ক্যাম্পাসে প্রায়ই কনসার্ট হতো। কেউ না গেলেও আমাদের সেখানে যাওয়া চাই চাই। এরকম মনে হতো যেন আমরা না থাকলে কনসার্ট অসম্পূর্ণ।
ক্যাম্পাসের সাথে কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে। অনেক মনে পড়ছে ক্যাম্পাসের কথা, যেতে ইচ্ছে হচ্ছে প্রিয় ক্যাম্পাসে। জানিনা কবে শেষ হবে এই মহামারী, শেষ হবে লকডাউন আর যাওয়া হবে ক্যাম্পাসে!
আবার আসিব ফিরে
হাজারো স্মৃতিদের ভিড়ে
আমাদের সেই স্বপ্ন নীড়ে।।