সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘প্রিয় ক্যাম্পাস- তোমাকে লিখা চিঠি’

প্রিয় ক্যাম্পাস,
জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কভিট-১৯ আক্রান্ত আমি চার দেয়ালের ছোট্ট ঘরে বন্দি হয়ে তোমাকে ভিষণ মনে পরছে।এই চার দেয়ালের ছোট্ট ঘরে বসে শুধু ম্মৃতি রোমন্থন করে মৃত্যু ভয় দূরে রাখতে চাই এখন।জানি না সুস্থ পৃথিবীতে সুস্থ হয়ে আবার তোমার সাথে দেখা হবে কি না। মনে হচ্ছে কত শত কোটি বছর তোমাকে দেখি না,তোমার ঘ্রান শুকি না বুক ভরে কত সহস্র যুগ।কোভিট-১৯ আমার ঘ্রান আর জীবনী শক্তি অনেকটাই কেড়ে দিয়েছে যে। ভিষন চঞ্চল আমাকে একেবারে বিছানা বন্দি করে রেখেছে। অবশ্য প্রচন্ড জ্বরের ঘোরে আমি না কি প্রায়ই ক্যাম্পাসের নানা ঘটনা বিচ্ছিন্ন ভাবে বলে প্রলাপ বকি,প্রলাপের শব্দে গভীর রাতে অনেকের ঘুম ভেঙে যায়,খুব বিরক্ত হয়। তবে কেউ কাছে আসে না,এ মাহামারিতে কেউ কাউকে যে ছুঁতে বারন,কাছে আসতে ভিষন মানা।এ মহামরি সবার থেকে সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে,মনে হচ্ছে সবাই এই অনিশ্চিত আছড়ে পরা ঢেউের সমুদ্রে এক একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। মনের ভিতর জমে থাকা সব সুখ-দুঃখের স্মৃতি তো তোমাকে নিয়েই। আমার স্মৃতিতে আর থাকবেই বা কি? আবার দেখা হবে কি তোমার সাথে? আমার ভিষন্ন দুপুর, ব্যস্ত ক্লাস,পরীক্ষা, বন্ধু সব কিছু এখন কেমন যেনো ফ্যাকাশে মনে হয়। এ অসুস্থ কদিনে মনে হচ্ছে আমি বর্ণান্ধ হয়ে যাচ্ছি। রঙ্গিন ক্যম্পাসকে কল্পনায় বড় বেশি সাদা-কালো মনে হয় এখন। মুখে রুচি নেই,ঔষুধ খেতে ভালো লাগে না তবু মনে পরে ক্যন্টিনের অমৃত সিঙ্গারার স্বাদ। প্রিয় ক্যাম্পাস, তোমার কি ভালো লাগে হৈ হুল্লোড় ছাড়া এতটা শান্ত, এতটা নিরব থাকতে? ধূলো জমে তোমার উপর এতদিনে অাস্তর পরে আছে নিশ্চয়ই, বুনো লতাপাতা বেড়ে উঠা জঞ্জালে কি আমার মত দম বন্ধ মনে হয় তোমার?

ক্যাম্পাসের পুকুর ধারে হিজল গাছটার কথা খুব মনে আমার।পুকুর জুড়ে রক্ত লাল শাপলা ফুটে, প্রসস্থ জুড়ে থাকা শাপলা পাতায় যখন হিজল লাল ফুল ঝরে পরে বাতালো আলতো ঝাপটায় – মনে হয় সে এক অপূর্ব দৃশ্য! প্রেয়সীর কাজল কালো নেশতুর চোখের মত যেনো নেশা লাগে তখন-চোখ ফেরানো যায় না।এ হিজল গাছটায় নিচে কোন এক গোধূলি সময়ে দাঁড়িয়ে হিজল ফুলের মালা প্রেয়সীর খোঁপায় দিতে দিতে বলেছিলাম- আজীব হাত ধরে হাঁটবো দুজন।দুজন মিলে দেখবো জীবনের শেষ সূর্যস্তটিও।কখনো যদি আমি ভুলে নিরুদ্দেশ হয়ে যাই তবে অভিমানী তুমি আবার হিজল তলে এসে একা বসে থেকো,আমি ঠিকই হিজলের মালা খোঁপায় দিয়ে এখানে এসে তোমার মান ভাঙ্গাবো। কথা রাখে নি প্রেয়সী, এ দুঃসময়ে শুনলাম প্রেয়সী না কি অন্যের ঘরনি হয়ে গেছে। কি অবলীলায় মানুষ পুরাতন স্মৃতি ভুলে নতুন স্মৃতির জন্ম দেয়!আমি মন খারাপ করিনি, এখন যে বড্ড দুঃসময় পৃথিবীর । দুঃসময়ে সব মেনে নিতে হয়।কেউ এ ভয়াবহ দুঃসময়ে কোথাও সুখি হতে চাইলে আমি বা বাঁধা দেবার কে? প্রেয়সী চলে যাক,তুমি ভালো থেকো হিজল গাছ,শাপলা ঘেরা পুকুর,প্রিয় ক্যাম্পাস।কেউ অভিমানী চোখে ফিরে না আসুন,আমি বেঁচে থাকলে ঠিকই আসবো কোন এক সুসময় বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায়- বুক ভরে তোমার ঘ্রান নিবো ভালোবেসে।
এ দুঃসময়ে একা একা শুয়ে থাকলে বন্ধুদের কথা মনে পরে খুব। সবাই এ কয়েকটা দিনে কেমন যেন হয়ে গেলো।থমকে যাওয়া পৃথিবীতে হয়ত খুন টুসি আর ভালেবাসাও থমকে গেছে খানিকটা।কেমন আছে সবাই? কেমন আছে প্রিয় হোস্টেল? কেমন আছে খুপরির মতো আমার হৈ চৈ করা ছোট্ট রুম? কেমন আছে -আমার জন্মদিনে প্রিয় বন্ধুর কাছ থেকে উপহার পাওয়া ভাঙ্গা ফুলদানিটা, আমার ফেলে আসা ছবি আঁকার খাতাটা, কালো মেয়েটার জন্য ছেঁড়া খাতায় রাতজেগে লেখা কবিতাগুলো? আবার খুব যেতে ইচ্ছে করে সেই প্রিয় ঘরে-আমার আধ- বুনা স্বপ্নগুলো যেখানে অগোছালো করে ফেলে এসেছি বেহিসেবী ভালোবাসায়।

আমার চার দেয়ালের ঘরটিতে বইগুলো সব ধূলি জমে আছে এখন। মন খারাপের সন্ধ্যায় অঝোর বৃষ্টি নামে,এ মিথ্যে শহর আমার বড় অচেনা,বড় বিষাদ লাগে এখন। ক্যাম্পাসে গিয়ে দল বেঁধে বৃষ্টি ভিজতে ইচ্ছে করে খুব।ইচ্ছে করে খুব সুস্থ হয়ে উঠি, দল বেধে হোস্টেলের ছাদে গিয়ে জ্যোছনা রাতে রাতভর বেসুরা গলায় গান গাই আর ঢুলু ঢুলু চোখে সকালে ক্লাসে যাই। কবে ফিরে পাবো মহামারী মুক্ত উচ্ছল ক্যাম্পাস জীবন? বুক পকেটে স্বপ্ন নিয়ে অপেক্ষায় কাটে আমার কভিট-১৯ আক্রান্ত আমার জীবন।আমি ভালো নেই প্রিয় ক্যাম্পাস,তুমি ভালো থেকো।
ইতি
তোমারই ভালোবাসায় সিক্ত
এক ক্যাম্পাসিয়ান।