সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘প্রাণের ক্যাম্পাস’

ইচ্ছা ছিল ছোটবেলা থেকেই বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবো, অবশেষে আংশিক সফল হলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে। প্রথম যেদিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে আসলাম, ভেবেছিলাম কাউকে চিনি না, কি করব, কি হবে না হবে….কিন্তু আমাকে আশ্চর্য করে বড় আপুরা আমাকে সাদরে গ্রহণ করল। শুধু তাই না, রুমে গিয়ে দেখি আমার মতো জুনিয়র আরও অনেক আছে। সবাই মিলে বসে গল্প করলাম। বড় আপুরা আমাদের খাবারের আয়োজন করেছিলেন। যেহেতু প্রথম দিন অনেক ক্লান্ত ছিলাম, তাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরদিন সকালে আমাদের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস ছিল। সব স্যার, ম্যাডাম, সিনিয়র ভাইয়া, সহপাঠী, অন্য ডিপার্টমেন্টের শিক্ষার্থীদের সাথে পরিচয় হলো। আমাদের কি কি করণীয় তা বুঝিয়ে দেওয়া হলো। কাল থেকেই আমার কিছু বান্ধবী হয়ে গিয়েছিল। আমরা সবাই মিলে যখন ক্যাম্পাসে ফুসকা খাচ্ছিলাম, তখন আমাদের কিছু বন্ধুরা এসে মজা করে আমাদের কাছে ফুসকা খেতে চাইল। আমরা সম্মতি জানালে ওরা খেল। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো পুরো বিলটাই ওরা দিয়েছিল, আমাদের দিতে দেয় নি। দুপুরের খাবার ক্যান্টিনে খেলাম। তারপর বিকালে মাঠে বসে সবাই মিলে গল্প করলাম। অতঃপর সন্ধ্যায় আবারও হলে চলে আসলাম। আমার নিজের একটা রুটিন বানিয়ে ফেললাম। তারপর সবাই মিলে নিজেদের সম্পর্কে অনেক আলোচনা করে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন স্যার, ম্যাডামরা রেফারেন্স বই এর নাম বলে দিলো। বই কিনলাম। ক্লাস হতে লাগল। এর মধ্যে ৩য় শ্রেণির কর্মজীবীদের সাথে ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। শিক্ষকরা ল্যাব রিপোর্ট, অ্যাসাইনমেন্ট, লাইব্রেরি ওয়ার্ক, হোম ওয়ার্ক দিত এবং আদায় করত। এছাড়াও মাঝে মাঝে প্রেজেন্টেশন, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতাও আয়োজন করা হয়েছিল। এই সকল দিনে সব মেয়েদের শাড়ি আর ছেলেদের ফরমাল ড্রেস পড়া বাধ্যতামূলক ছিলো। আমি শাড়ি পড়তে পারতাম না। একজন বড় আপু পড়িয়ে দিয়েছিল। প্রেজেন্টেশন শেষ হলে সবাই মিলে স্যারদের সাথে ছবি তুলতাম। আমি দুইবার বিতর্কে নাম দিয়েছিলাম, দুইবারই সেরা বক্তা হয়েছি। ক্যাম্পাসে সব থেকে বড় লাভ হতো গ্রুপ স্টাডি করে। একজন কিছু না বুঝলে অন্যজন বুঝায় দিতো। মাঝে মাঝে বড় আপুরাও বুঝায় দিতো। তাদের থেকে অনেক নোটও নিয়ে ছিলাম। আমার রুমমেটও ছিল একজন বড় আপু। উনি আমাকে অনেক সাহায্য করতেন। একবার আমি অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম, উনি আমার সেবা করে সুস্থ করে তুলেছিলেন। এরপর পহেলা বৈশাখ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, বিজয় দিবস, ক্যাম্পাস ডে, ডিপার্টমেন্ট ডে তে র‍্যালি, সঙ্গীত, বক্তৃতা, নাচ, অভিনয়, আবৃতি সম্পন্ন হতো। মাঝে মাঝে নিজের ডিপার্টমেন্টের সবাই নেচে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করত। এভাবে চলতে লাগলো।

এরপর ১ম বর্ষ ১ম পর্ব পরীক্ষা সম্পন্ন হলো। আমি ভালো ফলাফল করে ২য় পর্বে উত্তীর্ণ হলাম। শুরু হয়ে গেল আগের থেকেও বেশি কড়াকড়ি। মজার ব্যাপার হলো, ছোটবেলায় আমরা যেমন খেলাধুলা, গল্প-আড্ডা দিতাম, এখানে এসে সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোকে ফিরে পেয়েছি। প্রকৃতি আবার ফিরে দিয়েছে সেই সোনালী দিনগুলোকে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমরা কিন্তু কেউ কাউকে চিনতাম না, অথচ কি সুন্দর মিশে গিয়েছি একে অপরের সাথে। স্যারদের সাথে অনেক ভালো সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। ক্যাম্পাসে কিছু সুন্দর এবং অবিবাহিত স্যার ছিল। আমার কিছু বান্ধবীরা তাকায় থাকতো। স্যার সব বুঝতেন। মাঝে মাঝে মজা করে বলতেন, ” আমাদেরও তোমাদের মতো বয়স ছিল, তোমরা যা ভাবো, কল্পনা করো, সেগুলো আমি অনেক আগেই পার করে এসেছি।” মাঝে মাঝে আমরা সবাই ঘুরতে যেতাম, খেয়ে-দেয়ে আবার ক্যাম্পাসে ফিরতাম। বান্ধবীদের পাল্লায় পড়ে আমিও রাতে একটু দেরি করে ঘুমাতাম আর একটু দেরিতে উঠতাম। মাঝে মাঝে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে অনেক চিন্তা করতাম। খারাপ লাগে যখন দেখি আমাদের কোনো সহপাঠী ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাচ্ছে। মনে হয় যেন আকাশ থেকে একটা নক্ষত্র ঝরে পড়ল।
এখন আমি ২য় বর্ষের ৩য় পর্বে। কিছুদিন ক্লাস করেছি। মহামরী করোনার জন্য ক্লাস বন্ধ হয়ে গেল। কোনো এক মহীয়সী বলেছিলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটা অনেকটা পরিবারের মতো। ” কথাটা হয়তো পুরোপুরিই ঠিক। এখানে এক একটা বন্ধু এক একটা পরিবার।

কবে যে ক্যাম্পাসটা খুলবে। কবে যে আবার আনন্দে মেতে উঠব। আল্লাহর কাছে শুধু এইটুকুই প্রার্থণা, এই মহামরী করোনা যেন দেশ থেকে দূর হয়ে যায়। অনেক মিস করছি প্রাণের ক্যাম্পাসকে……………..অনেক।