সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘প্রিয় হৃদয় হরণ, কেমন আছ তুমি’

সময়টা ২০১৯ সালের ১২ই নভেম্বর। সে দিন রাজশাহী রেলস্টেশনের ১নং প্লাটফর্মের দিকে একটু এগোতেই দেখতে পাই তোমাকে । থুত্থুরে হাড় কাঁপা অবস্থায় রেলস্টেশনের প্লাটফর্মের ধুলো বালিতে শুয়ে খাবারের জন্য আহাজারি করে কান্না দেখে আমি অবাক হয়ে গেছি। ইস! পৃথিবীর কি নির্মম পরিহাস! তুমি হয়তো জানোনা যে, তোমার কান্নার সাথে যখন বলছিলে, “বাবারে বাবারে আমারে চাট্টা খাবার দে” তখন আমার হৃদয় কতটুকু ব্যথিত হয়েছে।
তারপর তোমার দিকে এগিয়ে গেলাম। তোমার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করলাম। বুঝলে; আমি হতবাক হয়ে গেছি তোমার খাবার খাওয়ার দৃশ্য দেখে। সত্যি এই পৃথিবীতে ক্ষুধার কাছে সব নস্যি। খেতে খেতে কত গল্প হল আমাদের। তুমি তোমার নাম বললে, সোনাবানু। আমি তোমার নাম ‘সোনাবানু’ পরিবর্তন করে ‘হৃদয় হরণ’ রাখলাম।
তোমার ছোটবেলা, কৈশর, যৌবন, এখন যে তোমার বয়স প্রায় ৮২ পেরিয়ে গেছে তার কথাও বললে। আমি নির্বাক হয়ে শুনলাম। তুমি যে এখন চোখে তেমন দেখতে পারোনা, আর হাঁটতেতো তেমন একটা পারেইনা। কেননা ভিক্ষা করতে গিয়ে ট্রেন থেকে নামার সময় পড়ে গিয়ে দুটো পায়েই ভেঙ্গে গেছে। আর বিধাতার কি নির্মম পরিহাস দেখ; কোমড়ে আবার বিশাল কুঁজ। বয়সের ভার, শরীরের কাহিল অবস্থা, দিনের পর দিন না খেয়ে থাকার গল্প যখন বলছিলে তখন আমি একদম স্বাভাবিক থাকতে পারিনি জানো!
তোমার বিছানা নেই, ঘুমাও প্লাটফর্মের ধুলোবালির মেঝেতে। তোমার চাঁদর নেই, শীত নিবারণের বস্ত্র নেই, প্লাটফর্মের চারদিকে খোলা থাকায় শীতের হুহু বাতাসে থুতনি কাঁপিয়েই দিন রাত পার কর। মশারী নেই, মশার কথা কি বলব বল? তোমার সম্পর্কে যখন এসব জানছিলাম তখন আমি কেন অন্য কেউ স্বাভাবিক থাকতে পারবে না।

সেই থেকে আমাদের বন্ধুত্ব হল! ক্লাস, টিউশনি শেষ করেই ছুটতাম তোমার কাছে। একসাথে খেয়েছি, বসেছি, কত জীবনের গল্প করেছি একে অপরের। তুমি কাঁদতে, আমি কাঁদতে দিতাম না। তুমি হাসলে আমি শুধু তাকিয়ে থাকি অবাক দৃষ্টিতে; হ্যা তুমি হাসবে! এ পৃথিবীতে তুমি কাঁদার জন্য আসোনি, তুমি হাসবে, তুমি হাসার জন্যও এসেছ!

উফ! জানো হৃদয় হরণ! এই করোনা ভাইরাস বড্ড শয়তান, পাজি। সারা পৃথিবীকে স্থবির করে দিয়েছে। তোমার কাছ থেকে আমাকে বহু দূরে আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। কতদিন তোমাকে দেখিনা! কেমন আছ তুমি? কেমন করে চলছে তোমার? তোমার সব ঠিকঠাক আছে তো? দু বেলা দু মুঠো মুখে কিছু জুটছে তো? উফ! তোমাকেনা আমি বড্ড মিস করছি। তোমাকে নিয়ে আমার বড্ড চিন্তা হয় হৃদয় হরণ!
প্রিয় হৃদয় হরণ, তোমাকে যেমন বড্ড মিস করি ঠিক তেমনি মিস করি প্রিয় বন্ধুদেরকেও। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের চারদিকে উদীপ্ত করা তারুণ্যের উচ্ছালতা ও ক্যাম্পাসের অরুণাদয়ের বিহব্বলতা আমাকে আয় আয় বলে বারবার ডাকে।
যে বন্ধুরা জন্মদিনের পার্টিতে উচ্ছাসের সাথে চ্যাংদোলা দিয়ে পুকুরে ফেলে দিতো সেই বন্ধুরাই আবার ক্লাসের অনুপস্থিতে পোক্সি দিয়ে ক্লাসে প্রেজেন্ট করে দেবে। বড্ড মিস করছি ক্লাসের ক্লান্তির পর রফিক ভাইয়ের চায়ের দোকানের আড্ডা। মিস করছি টুকিটাকির আড্ডাও। সারাদিনের ক্লাস, এসাইনম্যান্ট, টিউটেরিয়ালের ক্লান্তি চায়ের ভ্যাবসা মার্কা ধোয়ায় বন্ধুদের সাথে ফু দিয়ে উড়িয়ে দিতাম। সুরুত সুরুত চায়ের চুমুকের শব্দে বিপদে পরা বন্ধুকে জানিয়ে দিতাম, বন্ধু আমরাতো আছি নাকি! ভয় পাচ্ছিস কেন?
সন্ধ্যার পর বেঞ্চ ফাঁঠানো বাজনায় গলা খেকরিয়ে গান গাওয়া থেকে সাধারন বিষয়ে তুখোড় তর্ক তারপর ভূমি কাপানো হো হো হাসিতে হেসে উঠার সময় গুলোকে বড্ড মিস করছি।