সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘খেয়াল’

একমাস আগেই ঘোষণা আসলো দেশে “কোভিড-১৯” রোগী নতুন করে সনাক্ত হয়নি এবং মহামারী পুরোপুরি নির্মুল হয়েছে। সবাই ধীরেধীরে স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে যাচ্ছে। টিভিতে খবরটা দেখে মনে হচ্ছিলো বুক থেকে বিশাল বড় এক পাথর নেমে গেছে। আজ বহুদিন পর বেশ ভালো লাগছে। অনেকদিন পর আবার প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরছি। আবার সেই ধরাবাঁধা রুটিন নয়টার ক্লাস। মনে হচ্ছে যেনো কয়েক মাস না কয়েক বছর পাড় করে দিয়েছি। আবার শুরু হবে সেই বোরিং ক্লাস,মিড,প্রেজেন্টেশন,এসাইনমেন্ট এর প্যাড়া। ক্লাসশেষে আজ আবার বেশ জমিয়ে একটা আড্ডা হবে। গোধূলির শেষ সময়টা থেকে ক্যাম্পাসের আনাচা কানাচে অনেকেই বসবে তার প্রিয় মানুষটা নিয়ে। চায়ের টেবিলে জমবে আবার বিতর্ক কে সেরা মেসি না রোনালদো? এই নিয়ে। তুমুল আলোচনা চলবে রাজনীতি,খেলা,অভিনয়,সাহিত্য নিয়ে। প্রিয় শিক্ষকদের ক্লাসগুলোই কি কম মিস করেছি? সবচেয়ে বিরক্তিকর শিক্ষকের ক্লাসগুলোও কিছুদিন ভালো লাগবে। ভাবতেই গায়ে কাটা দিচ্ছে। আবার সবাইকে দেখতে পাবো ভাবতেই পারিনি।

ক্যাম্পাসে ঢুকতেই মৃদুলের সাথে দেখা। আমাকে দেখেই ওর সেই চিরচেনা হাসি দিয়ে বললো “ভালো আছিস,মামা?” উত্তর দেয়ার আগেই জড়িয়ে ধরলো। এরপরে শুরু হলো ওর একনাগাড়ে করে যাওয়া বিখ্যাত বকবক। অলিম্পিকে যদি একনাগাড়ে কথা বলার প্রতিযোগিতা থাকতো মৃদুল নিঃসন্দেহে স্বর্ণ জিততো দেশের হয়ে। দূর্ভাগ্যবশত না থাকায় ওর এই বিরল প্রতিভা দাম পেলো না। ডিপার্টমেন্ট এ আসতেই আবার সেই চিরচেনা চিত্র। সবাই এলোমেলোভাবে দাড়িয়ে আছে। কেউ আগের মতোই আতেল হয়ে বই নিয়ে বসে আছে,কেউ কানে হেডফোন গুজে নিজের মতো বেখেয়ালি,অনেকে আবার জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এক বান্ধবী আবার এক বন্ধুকে মারছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বুঝলাম ছেলেটার দোষ মেয়েটার পাকা গুটি কেটে ফেলেছে লুডুতে।
কতো সাধারণ একটা দৃশ্য তাই না? অথচ এতদিন এতটুকুর জন্যে কতই না ছটফট করেছি খাচায় বন্দী পাখির মতো। দেখেই মনে হলো মরুভূমির মাঝে মনে হয় এক পশলা বৃষ্টি নেমেছে।

সিড়িতে দাড়িয়ে সুখের নিঃশ্বাস ফেলছি তখনই পিঠে এক থাপ্পড় পরলো “কিরে কি অবস্থা তোর?” পিছে ফিরে দেখি শিশির ভাই হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন। ভাই আবার ওনার এক ঘটনার জন্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ডিপার্টমেন্টে। একবার ওনি এক মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং সাথে শাড়ি গিফট করেছিলেন। কিন্তু,দূর্ভাগ্যবশত সেই মেয়ে প্রপোজালটা গ্রহণ করেনি। তাই ভাইও সুন্দরমতো সেই শাড়ি আবার ফেরত নিয়ে এসে ঐ শাড়ি দিয়ে দুটো পাঞ্জাবি বানিয়েছেন। সেই পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে ক্যাম্পাসেই দিব্যি ঘুরে বেড়ান ওনি। এই ঘটনা শোনার পর থেকে আমিও শিশির ভাইয়ের একনিষ্ঠ ভক্ত৷ কয়েক বছর সিনিয়র হলেও বেশ ভালো সম্পর্ক আমার সাথে। আমিও দ্বিগুণ উচ্ছ্বসিত হয়ে বললাম “ভাই বেশ ভালো আছি। আপনাকে শুকনো শুকনো লাগছে কেনো? ভূড়িটার স্বাস্থ্যও দেখি কমে গেছে একটু যত্ন নিবেন না মিয়া?”। কথা শুনে ভাই মারার জন্যে হাত তুলতেই একটু লাফ দিয়ে দূরে সরতে গিয়েই ধাক্কা খেলাম কারো সাথে। সরি বলার উদ্দেশ্য পিছনে ফিরতেই মনেমনে সৃষ্টিকর্তাকে লাখো ধন্যবাদ দিলাম। কারণ? কারণ,ধাক্কাটা খেয়েছি নায়লা আপুর সাথে। আমার প্রথম ক্রাশ শেষ ভালোবাসা। যদিও আমার চেয়ে দুইবছরের সিনিয়র আপু,রিলেশনও আছে। তবুও ওনাকে আমার চরম ভালো লাগে। আর খালি চেয়ারে বসে মজা নেই। মজা হচ্ছে সেই চেয়ার থেকে কাউকে তুলে দিয়ে নিজে বসাতে। আবার,গোলপোস্টে তো গোলকিপার থাকবেই তাই বলে কি গোল হবে না?।
ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া সিনিয়র আপুদের জুনিয়র ছেলের সাথের স্বার্থক প্রেমকাহিনী দেখে আমিও অনুপ্রেরণা নেই। মনে মনে আশাও করি একদিন আপুর সাথেই আমার কিছু একটা হবে। “সরি আপু ভুলে ধাক্কা লেগেছে” বলার পর আপুও বললেন “সমস্যা নেই পিচ্চি” বলেই চলে গেলেন। এটা ওনার ঘোর অন্যায় আমাকে পিচ্চি বলে ডাকেন ওনি। আরে ভাই দুইবছর ছোট মাত্র। এটা আর এমন কি? প্রিয়াংকা সাত বছরের ছোট ছেলে বিয়ে করে নাই? আমরা করতে চাইলেই দোষ?।

মেজাজটা একটু বিগড়ে গেলেও চুপচাপ ক্লাসে গিয়ে বসলাম। স্যার প্রথমে এসে কিছুক্ষণ করোনার অবস্থা নিয়ে বড়সড় ভূমিকা দিলেন। কয়েকজনকে দাড় করিয়ে আলাদা করে জিজ্ঞাসা করলেন। দুজন আবার মন খারাপের মতো করে স্যারকে বলেও ফেললো “স্যার অনেক মিস করেছি আপনার ক্লাস”। তেলের দাম কমে গেছে হয়তো তাই একটু স্যারকেও দিলো। স্যার এটেনডেন্স নিতে শুরু করলেন সিরিয়াসলি। আমার রোল আসতেই শুনলাম ” কিরে গাধা,অবেলায় কিসের ঘুম? সারাদিন খালি ঘুম আর মোবাইল।” প্রথমে অবাক হলাম। কারণ,কি আজব ব্যাপার। স্যারের গলা আম্মুর মতো শোনাচ্ছে। পরে আরেকবার যখন শুনলাম “এই উঠ। ভাত খাবিনা? আয় খেতে আয়। উদ্ধার কর আমাকে।” তখন বুঝলাম স্বপ্ন দেখছিলাম এতক্ষণ। তিন মাসের বেশি সময় ধরে গৃহবন্দী এখনো। টিভিটা অন রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। টিভির দিকের চোখ পড়তেই দেখলাম এক কোণায় লেখা “করোনায় মোট আক্রান্ত ১,৫৯,৫৫৮,মোট সুস্থ প্রায় ৬৬,২১১ মৃতের সংখ্যা ১৮৮৮”।

(সমাপ্ত)