সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘আমাদের বন্ধন, রইবে চিরন্তন’

বিশ্ববিদ্যালয়! একটি স্বপ্নের স্থান যেখানে প্রত্যেক বিচরণ করার স্বপ্নে বিভোর থাকে। তবে কল্পনার স্থান হলেও ভর্তিযুদ্ধে উত্তীর্ণ হবার পরে পরিবার ও পুরোনো বন্ধু ছেড়ে যখন আসতে হয় তখন যেন মায়ার বাঁধনে ছুরি চালাতে হয়! নতুন পরিবেশ। সবকিছুই নতুন। তবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আবারো জীবনের নতুন করে পথচলা শুরু হয়। তৈরি হয় কিছু বন্ধু, বড় ভাই ও আপু। একটি পরিবার ছেড়ে আরেকটি পরিবারের দানা বাঁধে।

আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরেই পেয়েছিলাম চিরস্মরণীয় কয়েকজন ভাই আপুকে। মোরশেদ হাবিব, ইমরান শুভ্র, শহিদুল ইসলাম আর জামাল উদ্দিনসহ সহ বেশ কয়েকজন ভাইকে। ছাবেকুন্নাহার, সুমাইয়া পারভীন আর শারমিন আপুর ভালোবাসার কথা না হয় উল্লেখ নাই বা করলাম। আর কয়েকজন অকৃত্রিম বন্ধু পেয়েছি। বন্ধুত্ব যে কতটা প্রকট হতে পারে তা বিশ্ববিদ্যালয়ে না পড়লে বোঝা যাবে না। বিশ্বাস ও ভালোবাসার মাধ্যমে এসব বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। কখনো যে ঝগড়া বা মনোমালিন্য হয় না, তা নয়। বরং এসবে আরো সম্পর্ক গাঢ় করে। রাতে ঝগড়া হলে সকালে ক্যাম্পাসে প্রথমেই বন্ধুটিকে খুঁজে বের করা হলো প্রথম কাজ। মিষ্টি সুরে স্যরি দোস্ত বলা আর সেই সাথে থাকে আরেকটি বাক্য। দোস্ত চল, চা খাবো। বিলটা কিন্তু তুই দিবি।

আমার সার্কেলটি মূলত গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে। মানবসেবা ছিল আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য। কারো রক্ত লাগবে? কারো আর্থিক সহায়তা লাগবে? কারো বইপত্র লাগবে? এমন কোন প্রয়োজনীয়তার কথা শুনলেই আমরা মুহূর্তেই হন্য হয়ে তা ব্যবস্থা করার চেষ্টা করতাম।

এসবের বাইরেও আমরা সিনিয়র-জুনিয়র ক্যাম্পাসে বা আশেপাশে ঘুরতে বের হতাম। মাঝে মাঝে রিতু ও রিফা আমাদের জন্য খাবার রান্না করে নিয়ে আসতো। আমরা গো-গ্রাসে গিলে ফেলতাম। ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের মতো মাতৃমূর্তি ধারণ করে রিতু রিফারা বলতো ধীরে ধীরে খা। আটকে যাবে তো।

প্রথম বর্ষ থেকেই বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনে বিচরণ শুরু করি। রোটার‌্যাক্ট ক্লাব, রোভার স্কাউট, কনজুমার ইয়ুথ, লণ্ঠন, লেখক ফোরামসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে সক্রিয় কাজ করি। প্রেম বঞ্চিত সংঘ ছিল আনন্দ লাভের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। দুঃখজনক হলেও দীর্ঘদিন থেকে ক্যাম্পাস বন্ধ। প্রচন্ড মিস করছি এই সংগঠনগুলোর মিলনমেলাকে।

এখন নিজ বিভাগের গল্প করি। লোকপ্রশাসন বিভাগ। সাহিত্যরস বলতে কিছুই নেই এর কোর্সগুলোতে। তবে কোন কোন শিক্ষক ক্লাসে এসে ক্লাসকে মজাদার করে তুলতে পারেন। আবার কোন শিক্ষকের চোখ রাঙানিকে আমরা এতোটাই ভয় করি যে সবসময় মনে মনে প্রার্থনা করি তিনি যেন ক্লাস না নেন। আবার ক্লাস নিতে আসলেও সবসময় মনে মনে জপি কখন তিনি ক্লাস থেকে বের হবেন।

আমাদের ক্লাসে ৩/৪ জন রয়েছে যাদের কাজ হলো স্যার বের হবার মুহূর্তে প্রশ্ন করা। তখন বিশেষ করে আমার মতো ব্যাকবেঞ্চারদের এতো বিরক্ত লাগে তা প্রকাশ করা যাবে না। কখনো আমরা বিরক্ত হয়ে মুখ দিয়ে আহ উহ ইস শব্দ করতাম। একদিন তো নিপা রেগেই গেল, তোমরা শব্দ করছো কেন! আমি বুঝতে না পারলে জিজ্ঞাসা করবো না নাকি?

আবার আমাদের বান্ধবীরা ক্লাস করার জন্য অত্যন্ত উদগ্রীব থাকে। শিডিউল ক্লাস না থাকলেও স্যারের রুমে গিয়ে স্যারকে ক্লাস করার জন্য ডেকে নিয়ে আসে। তখন আমরা হাঙ্গর মাছের মতো তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। তবে লক ডাউনে অঘোষিত গৃহবন্দী থাকার ফলে এখন বুঝি এসব একদিন স্মৃতি হবে। যখন মনে পড়বে, হাসব। ফিরে পেতে চাইব পুরোনো দিনগুলো। কিন্তু কখনোই ফিরে আসবে না।

সম্ভবত প্রত্যেক বিভাগের ন্যায় আমার বিভাগেও কিছু বন্ধু রয়েছে। যাদের সাথে মিশলে মনে হয় পরিচয় যেন হাজার বছর ধরে। তবে নিজেকে একান্ত নিজের মাঝে গুটিয়ে রাখতে চাই এমন সহপাঠীর সংখ্যাও কম নয়। বিভাগের বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন উপায়ে দুষ্টুমি হয়। সুরভীর ফেসবুকের সকল ছবিতে হা হা রিএক্ট, নন্দিতাকে বৌদি বলে ডাকাসহ অন্যান্য বন্ধুদের মজার মজার উপনামে ডাকা ও শোনা। আবার কখনো আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে মজার বিতর্ক করি। একপক্ষ বলে রঙিন টেলিভিশন আবিষ্কারের পর কখনো বিশ্বকাপ না পাওয়া দল, হাত দিয়ে গোল দিয়ে ফুটবলের ঈশ্বর প্রভৃতি। আর্জেন্টিনার সমর্থকরা মোটেও ছাড় দেবার পাত্র নয়। জামার্নির কাছে ৭ গোল খাওয়াকে উদ্দেশ্য করে সেভেন আপ দল, নেইমারকে উদ্দেশ্য করে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার দলসহ আরো মজার বাক্য। আবার কখনো বিভিন্ন জেলার আঞ্চলিকতাকে মজা করে বন্ধুরা নিজেদের মধ্যেই আনন্দ ভাগ করে নেয়। তবে এসবের একটি নির্দিষ্ট আদর্শ থাকে। কখনো সিরিয়াসভাবে নেয়া যাবে না। সবাই যে সেটি পারে তাও নয়। এজন্য কখনো কখনো দু-একজনের হাতাহাতির ঘটনাও যে ঘটে না্ তা বলা যাবে না। তবে তা অন্যান্য বন্ধুরা মিলে সমাধান করে দিই। এভাবেই চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন। দেখতে দেখতে দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। চতুর্থ বর্ষে আমাদের ব্যাক বেঞ্চার বন্ধুদের কারো খাতার মধ্যে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স দেখতে পেলেই অন্যরা বলে দোস্ত, তোর ক্যাডার হওয়া নিশ্চিত। চালিয়ে যা। আমার ছবিটা সত্যায়িত করে দিস কিন্তু…..