সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘স্বপ্নের কান্না’

উত্তরা হাওয়া খুব একটা আসে না। তবে আগে যখন ময়মনসিংহে বাসায় থাকতাম তখন খুব করে চাইতাম যেন উত্তরা হাওয়া আসে আর আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সেই দক্ষিণের প্রিয় পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
কিন্তু এখন ভালোলাগাটা সম্পুর্ণ বিপরীত হয়ে গেছে। এখন উত্তরা হাওয়া বয়ে গেলে আমার কষ্ট হয়। মনে পরে যায় কিছু দিন আগের কথা। কত আশায় ছিলাম, কত স্বপ্ন ছিল আমার। আজ সবই ভেস্তে গেল। তাই আর আগের মত অনুভূতি আসে না।
অনেক চেষ্টার পরেও প্রথমবার কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স হয় নি। বাবা মায়ের অক্ষরজ্ঞান নেই। তবু তারা বুঝে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ কথাটা কতটা বিস্তর। কোথাও চান্স না পাওয়াতে অনেক মন খারাপ ছিল তাদের। ২য় বার আবার ভর্তি পরীক্ষা দিব কিন্তু চান্স না পেলে যাতে একটা বছর হারিয়ে না যায় এটা মাথায় রেখেই ভর্তি হলাম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তির বিষয় ছিল পদার্থবিদ্যা।
আমি মানুষিক পরিবর্তনটা ঘটল ঐ সময়েই যখন মা’কে বললাম আমি ফিজিক্সে ভর্তি হয়েছি। তখন মায়ের কথাটা এমন ছিল, “ফিরিজের(ফ্রিজের) কাজকাম শিহা যে ঐডাত?” মায়ের কথাটা আমাকে একটুও হাসায় নি। কারন, এই মায়ের দোয়া আর সমর্থন না থাকলে আমি নিজেই হয়তো জানতাম না ফিজিক্স কী, ভর্তিতো অনেক দূরের কথা। পরবর্তীতে সুন্দর করে নিজের মত করে বুঝিয়ে দেই ফিজিক্স কী।
আরো কিছু কারন থাকা সত্ত্বেও এটায় ছিল অন্যতম কারন আমার মাঝে মূল্যবোধ সৃষ্টির। এরপর থেকে শুরু হয় স্বপ্ন, আমাকে যেতে হবে অনেক দূর, আমার বাবা মাকে সাথে নিয়ে।
২য় বার পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হই পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমদিকে মানসিক চাপে থাকলেও স্বস্তিলাভ হয় মার্চ মাসের শেষের দিকে রিজিওন এর কুয়াকাটা ভ্রমনে। আগে কখনো সমুদ্র দেখিনি। তাই ভালোই কেটেছে দিনটা, তারপর আবার নতুন নতুন বন্ধুবান্ধব, বড়ভাই। সারাদিন ঘুরেফিরে রাতে মায়ের সাথে কথা বলার সময় মনে হলো বাবা মাকে নিয়ে একবার ঘুরতে গেলে কেমন হয়। এটা মাথায় আসতেই রিজিওন এর সভাপতি ভাইয়ের সাথে কথা বললাম যে পরের বছর রিজিওনের ভ্রমনে আমার বাবা মাকে নিয়ে যেতে চাই। সভাপতি ভাইয়ের রাজি হওয়াতে আমার খুশি দেখে কে। শুরু হয়ে গেল আমার সংগ্রাম, বাবা মায়ের সমুদ্র দেখার সংগ্রাম, আমার স্বপ্নপূরনের সংগ্রাম।
বড়ভাইদের বলে টিউশন খুঁজতে লাগলাম। পেয়েও গেলাম প্রথমদিকেই একটা। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ক্লাস করে এসে আবার বিকালে টিউশনি করাতে শারীরিকভাবে অনেক কষ্ট হতো কিন্তু মানসিক ভাবে ছিলাম অনেকটা শক্ত। যত কষ্টই হোক টিউশনি করাতেই হবে আমাকে। এরই মধ্যে অনুষদের বিভিন্ন প্রোগ্রাম হতো কিন্তু আমার উপস্থিতি খুব একটা ছিল না। কোন চাঁদা দিতে ইচ্ছে করতো না। একটায় ছিল নেশা, বাবা মায়ের স্বপ্ন জয়। আর স্বপ্ন জয়ে টাকার অনেক দরকার। আমার হল থেকে প্রায় ৭০০ মিটার হেটে গিয়ে ক্লাস করতে হয়। ভেবেছিলাম একটা সাইকেল কিনবো। কিন্তু বিসর্জন দিলাম সেই চাওয়াকে আর মেনে নিলাম কষ্টকে। কষ্টের ফল নাকি অনেক মিষ্টি হয়, এই ভেবে। এইভাবেই চলছিল আমার সংগ্রামী ক্যাম্পাস জীবন।
২০১৯-২০ সেশনে নতুন ব্যাচ ভর্তি হলো। এরই মধ্যে বেশ কিছু টাকাও জমিয়ে ফেলেছি। তখন আরো গাঢ় হয়ে গেল আমার স্বপ্ন। এইতো, আর মাত্র তিনটা মাস। স্বপ্ন যে আমার হাতের কাছে এসে পড়েছে। এখন শুধু ছোঁয়ার অপেক্ষা। প্রতি রাতে ভাবতাম, আমার হলে থাকবে আমার বাবা আর কোন এক বান্ধুবীর কাছে থাকবে মা। সকালে উঠে ক্যাম্পাসে যাব। বাবা মা’কে নিয়ে হেটে বেড়াবো পুরো ক্যাম্পাস। আমার ক্যাম্পাস পাবে বাবা মায়ের চরণস্পর্শ। অনুষদের সামনে দাঁড়িয়ে তুলে দিব কিছু ছবি। টিএসসি তে বসে বাবা মা’কে নিয়ে খাবো। পরে একটু বসবো প্যারিস রোডে। গল্পে জমে থাকবে বাবা মা আর আমি আরো কিছু ছবি তুলে নিব এই ফাকে। সারাদিন ঘুরেফিরে মাগরিবের নামাযটা আমি আর বাবা কেন্দ্রীয় মসজিদেই আদায় করবো। ইশারা দিয়ে দু’একজন স্যারকে দেখাবো। এভাবেই একদিন কেটে যাবে।
পরদিন সকাল সকাল চলে যাব পরিবহণ শাখায়।বাসের সামনের দিকের কোন একটা সিটে বসবো আমরা তিনজন। মাকে দিব জানালার পাশে আর আমি থাকবো মাঝে। বাবা মাকে নিয়ে একটা সেলফি তুলে ফেইসবুকে আপলোড দিয়ে লিখবো, “বাবা মায়ের স্বপ্নপূরনের পথে।” বাসের পিছনে ছেলেরা গান গাইতে শুরু করতে আর আমি ব্যস্ত থাকবো বাবা মাকে প্রকৃতি দেখাতে। কুয়াকাটা গিয়ে বাবা মা যখন অবাক হয়ে বিশাল সমুদ্র দেখতে থাকবে তখন আমি শক্ত করে জরিয়ে ধরে বলবো, “তোমরা আমারে মাফ কইরা দিও, আমার জন্যে দোয়া কইরো।” তখন হয়তো কান্না থামাতে পারবো না। হয়তো বাবার চোখগুলাও হবে অশ্রুসিক্ত আর মায়ের চোখেও থাকবে সুখের কান্না। হয়তো আশীর্বাদ করবে, “আরো বড় হো বাজান।”
এই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পরতো বিছানায়। আর এভাবেই আমার প্রতি রাতে ঘুম হতো।

আজ ৩০শে জুন, কোথায় যেন হারিয়ে গেছে আমার স্বপ্নটা। অথচ আরো তিন মাস আগেই পূরণ হওয়ার কথা ছিল আমার স্বপ্ন। হয়তো নিয়তি চায় নি। কিন্তু চেয়েছি আমি, আমার বাবা মায়ের সুস্থতা। হয়তো সুস্থ এক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। আর সেই পরিবেশে আমি ঘুরবো আমার বাবা মায়ের হাত ধরে, সেই চিরচেনা ক্যাম্পাসে। আজও সেই প্রতীক্ষায় গুনছি প্রহর।