সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘জ্যাকেট’

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখার ৪ বছর হতে চলল। এই ৪ বছরে ভালো, খারাপ প্রচুর অভিজ্ঞতা হয়েছে কিন্তু আজও যখন পেছন ফিরে তাকাই ১ম বর্ষের ঘটনাগুলো চোখের সামনে ভাসে। ১ম বর্ষ মানে বড় বড় স্বপ্ন নিয়ে কিছু ছেলেমেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন। সাথে যেন বিশ্বজয় করার মত উচ্ছ্বলতা। তো সেরকম চোখে বড় বড় স্বপ্ন, নতুন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর উদ্বিগ্নতা আর অবশেষে ৪/৫ মাসের হাড়ভাঙা খাটুনির পর একটা স্থায়ী আশ্রয় প্রাপ্তির তৃপ্তিবোধ নিয়ে ২০১৭ সালের ১লা জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখলাম আমি। গার্লস স্কুল, গার্লস কলেজে টানা ১০ বছর অধ্যয়ন করার পর কো-এডুকেশনের এই পরিবেশে কিছুটা জড়তা বোধ করছিলাম। আমি বরাবরই শান্ত স্বভাবের তাই ক্লাসে আমার সহপাঠীদের মজার মজার কথাবার্তা শুনে নিরবে হাসতাম। তখন ক্লাসে একে অপরকে পঁচানোর প্রতিযোগিতা চলছিল। অনভ্যস্ততার দরুণ সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম পঁচানি খাওয়ার। মনে মনে দোয়া করতাম যেন এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় যেখানে আমাকে পঁচানি খেতে হয়। তো সবকিছু ভালোই চলছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তঃডিসিপ্লিন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।(খুবিতে ডিপার্টমেন্টগুলোকে ডিসিপ্লিন বলা হয়) তো আমাদের ডিসিপ্লিন ব্যবসায় প্রশাসনের মেয়েরা হ্যান্ডবলে নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে ফাইনাল রাউন্ডে চলে গেল। ১৭ই জানুয়ারি, ২০১৭ একটা স্মরণীয় দিন কারণ ঐ দিন বিকেলে আমরা ফার্মেসীকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দুই দলকেই ভিসি স্যার ট্রফি দেবেন। সবাই একারণে মাঠে সমবেত। এর আগে বলে রাখি যেখানে ঘটনাটার সূত্রপাত। আমাদের সিআর রাফি তার স্বভাবসুলভ সহজেই সবার সাথে মিশতে পারার গুণাবলির দরুণ আমার সাথেও অল্প কয়েকদিনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেছিল। ভর্তির পরপরই ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই রাফি নিজ উদ্যোগে সবার সাথে সবার পরিচয় হওয়ার জন্য গ্রুপ খুলেছিল। তার এই মহৎ উদ্যোগের কারণে রাফির সিআর হওয়া নিয়ে কারো দ্বিমত ছিল না। তো ক্লাস শুরু হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই ক্লাসের ব্যাপারে সিআরকে সবাই জ্বালায়। আমিও নানা দরকারে রাফির সাথে কথা বলতাম। জানুয়ারি মাস স্বাভাবিকভাবেই শীতকাল। সিআর রাফির ব্যস্ততা ও ব্যাগে অন্যান্য জিনিসপত্র থাকার কারণে দুপুরে যখন গরম লাগতো জ্যাকেট খুলে রাখার জায়গা ছিল না। আমার ব্যাগটা বড় থাকার কারণে রাফি প্রায়ই তার জ্যাকেটটা আমার কাছে রাখতে দিত। অন্যান্য দিনের মত যেদিন ফাইনাল খেলা ছিল ঐ দিন লাঞ্চ টাইমে আমার কাছে জ্যাকেট রাখতে দিয়েছিল। বিকেলে খেলার মাঠে আমি সবার চেয়ে একটু আলাদা হয়ে যেখানে ভিসি স্যার ট্রফি দেবে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। খেলাধুলার প্রতি আমার আগ্রহ কোনোকালেই ছিল না কিন্তু আমাদেল দল জিতেছে এজন্য একটা ভালোলাগা কাজ করছিল। সন্ধ্যা হচ্ছে শীতও বাড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই সিআর মানুষকে ক্লাস বাদে খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমি জ্যাকেট ফেরত দেয়ার জন্য ওকে খুঁজেছিলাম কিন্তু পাইনি। তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরষ্কার বিতরণী দেখলাম। যখন পুরষ্কার বিতরণী শেষ তখন ক্লাসের কেউ একজন আমাকে দেখে বলল, “কই ছিলি? রাফি তোরে খুঁজতেছে।”
“হ্যাঁ, আমিও ওকে খুঁজ…” কথা শেষ হওয়ার আগেই দেখলাম সবাই হাসাহাসি করতেছে। ব্যাপার কি কিছুই বুঝলাম না। খুবির ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপ্লিনের আলাদা একটা ঐতিহ্য আছে৷ অন্যান্য ডিসিপ্লিনরা যখন খেলার মাঠে ভেঁপু, ড্রাম এসব নিয়ে যায় সেখানে আমাদের শক্তি আমাদের গলা। খেলায় জিত হোক বা হার আমরা খেলার মাঠে এবং পরবর্তীতে আমাদের একাডেমিক বিল্ডিং এর সামনে যেয়ে সবাই গোল হয়ে একটা শ্লোগান দেই আর সেটা হচ্ছে “Who let the dog’s out”, এরপর ৪ বার ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ বলে শেষ। শুরুতে আমার কাছে ব্যাপারটা খুবই আজব লাগত। কিন্তু এখন ভালোই লাগে। তো সবার হাসাহাসি করার কারণ বুঝতে পারার আগেই সবাই একাডেমিক বিল্ডিং এর দিকে রওনা হলাম। ওখানে সবাই মিলে শ্লোগান দেয়া শেষ হলে আবার সবাই হাসাহাসি করছিল। পরবর্তীতে জানতে পারলাম রাফি খেলার মাঠে ক্লাসের যাকেই পেয়েছে, একটা প্রশ্ন করেছে, ” হালিমা কই, আমার ঠান্ডা লাগতেছে।” ব্যাস, যেটার ভয় আমি পাচ্ছিলাম সেটাই হল। আমাদের ব্যাচে তখন ৫৫ জন ছিল। সবাই ঐ দিনের পর থেকে আমাকে পঁচাতে লাগল। সেই পঁচানি ক্লাস থেকে শুরু করে মেসেঞ্জার গ্রুপ পর্যন্ত ছিল। এমনকি এখনও পঁচায়। শুরুতে খুবই বিব্রতবোধ করতাম। রাফিকে তখন ইচ্ছে হত মারি। এই ঘটনার পর থেকে আমি ওর জ্যাকেট নিজের কাছে রাখা ছেড়ে দিছিলাম। এখন এসব ভাবলে হাসি পায়। একটা কথা আছে, যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ… যদিও এটা কথার কথা কিন্তু টাইম ট্র্যাভেল করা গেলে আমি সেই মজাদার স্মৃতিময় ১ম বর্ষে ফিরে যেতে চাই। সেই দিনগুলোকে অনেক মিস করি। হঠাৎ ই যেন বড় হয়ে গেলাম। বড় হওয়ার সাথে সাথে ক্যারিয়ারের চিন্তা এসে জুটেছে আর শুধু কি ক্যারিয়ারের চিন্তা, ক্যারিয়ারের সাথে সাথে হাজারটা চিন্তা। সবাই যেন খুব সিরিয়াস হয়ে গেলাম। সিরিয়াস না হলেও অন্তত সিরিয়াস হওয়ার ভাণ করছি। করোনায় ঘরবন্দী হয়ে আমরা অধিকাংশ অলস সময় কাটাচ্ছি। এই অলস সময়ের কোনো একটা অংশে আমি স্মৃতিচারণ করি। মাঝেমাঝে গ্যালারির ছবিগুলো দেখি আর ভাবি দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না, সেই যে আমার নানারঙের দিনগুলি…