সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘স্মৃতিতে অম্লান তোমরা’

সময়ের সাথে সাথে ঘটনাপ্রবাহের সমষ্টি হলো মানবজীবন। মানবজীবনের এই ঘটনাপ্রবাহ আনন্দ-বেদনা,সুখ-দুঃখ,সাফল্য-ব্যর্থতার সমষ্টি । আর এই ঘটনাগুলো স্মৃতির ডায়রিতে জমা হয়ে যায় । সময়ের ব্যবধানে মানুষ কখনো কখনো স্মৃতির কথা মনে করে একা একা হাসে,আবার কখনো নীরবে আঁখিজল বিসর্জন দেয় । মানুষ মাত্রই স্মৃতি কাতর । আমিও মানুষ । মহামারির এই দিনগুলোতে কত কথাই মনে পড়ে যায় !

স্কুল কলেজের পাঠ শেষে স্বপ্ন যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, তখন বারবার মাথায় আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা । খবরের কাগজে যদি দেখা যেতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কিছু লেখা হয়েছে সেটাই পড়তাম মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে। এই নামটার সাথে কেন যে এতো আবেগ জড়িয়ে আছে বলতে পারি না । ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার পর ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে যখন ফলাফল দিলো দেখলাম আমি মেধা তালিকায় স্থান পেয়েছি । মনের অজান্তে দুচোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়েছিলো।পরে মনে হলো আনন্দ-বেদনায় মানুষের চোখের পানি বের হয়।

ভর্তি কার্যক্রম শেষ করে বাড়িতে বসে বসে ভাবতাম, কবে যে ক্লাস শুরু হবে ! এভাবে ভাবতে ভাবতেই ৩১ ডিসেম্বর বাড়ি থেকে রওনা দেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে উঠার উদ্দেশ্যে । হলে উঠার আগে ভাবতাম এক রুমে ৩-৪ জন থাকে । কিন্তু হলে উঠে দেখলাম বুক ভরা আশা আর চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে আরো অনেকেই এসেছে । ২০-২৫ জন স্বপ্নবাজ তরুণের ঠাঁই হলো ১০৩ নাম্বার রুমে । যদিও রুমটা ছোট, স্বপ্নতো আর ছোট নয়।আমার ক্লাস শুরু হয়েছিলো জানুয়ারি মাসের ৩ তারিখে। প্রথম দিন ক্লাসে গিয়ে দেখলাম রুমে এসি,মাল্টিমিডিয়া, প্রত্যেকের জন্য আলাদা চেয়ার। কত সুব্যবস্থা! প্রথম ক্লাসেই কয়েক জন শিক্ষক আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বললেন। ভালো লাগা শুরু হলো।

যখন বই কিনার কথা বলা হলো মনে করেছিলাম বিদেশি লেখকের বই দাম মনে হয় অনেক।শাহাদাতকে নিয়ে যখন নীলক্ষেত বই কিনতে গেলাম,দেখলাম বইয়ের দাম ১০০-১৫০ টাকা। যাক মনে শান্তি পেলাম।দেখতে দেখতে দুইটি বছর কেটে গেলো। এর মাঝে অনেক বই কেনা হয়েছে।কিন্তু কে জানতো ম্যানেজমেন্ট সাইন্স কোর্সের ওয়েটিং লাইন অধ্যায়ে এসে আমাদেরকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ওয়েট করতে হবে।এতোদিনে হয়তো তমাল মিস্টার বীনের আরো অনেক ভিডিও কাট করেছে প্রেজেন্টেশন দেওয়ার জন্য।সুমন দাশ স্যারের সকাল আট টার ক্লাস মানে সকাল আট টার ক্লাস খুব মিস করছি।

নতুন ক্যাম্পাসের সাথে পরিচিত হতে দল বেধে বের হতাম। ৩০-৩৫ জন বা আরো বেশি। জিয়া হলের সামনে থেকেই শুরু হতো ক্যাম্পাসের নতুন আগন্তুকদের সাথে পরিচয়। ফুলার রোড, পুরান ঢাকা, লালবাগ, ঢাকা মেডিকেল এইসব এরিয়া তো রাতে হাটতে হাটতেই ঘুরা হতো। ঘুরার মাঝেই কত স্মৃতি জমা হয়ে যায়।

একবার আমাদের ইয়ারমেট আক্কাস রাতে আমাদের ঘুরার দল থেকে আলাদা হয়ে গেলে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না।তারপর আমাদের ইয়ারের ২৫-২৬ জন,ইমিডিয়েট সিনিয়র ৮-৯ জন ভোর ৬ টা পর্যন্ত আশেপাশের পুরো এরিয়া খোঁজ করেছিলাম কিন্তু পাই নাই। সকালে সে মহসিন হল থেকে আসছে।এই কৃষ্ণচূড়া শোভিত ক্যাম্পাসের আরো কত স্মৃতি ভেসে উঠে আজ এই হৃদয় মাঝে। দার্শনিক বন্ধু সানি তার নতুন নতুন উক্তি দিয়ে আমাদের ভাবায়। আর বন্ধু মাহদি তো সেই প্রথম বর্ষ থেকেই জিমনেশিয়াম এ যাচ্ছে কিন্তু ২ বছর ৩ মাসে একদিনও তার যাওয়া হয়নি।

হলে কত সুন্দর গোলাপফুল ফুটে থাকে । কত সুন্দর দেখায়! কেউ একটি গোলাপও ছিঁড়ে না।কিন্তু ১৪ই ফেব্রুয়ারি সকালে সুন্দর ফুলগুলো কাকে যেন ভালোবেসে চলে যায় সেই উত্তর আমি আজও পাইনি।

পহেলা বৈশাখের আগের রাতে পাঁচ তলার ছাদে বসে ম্যানেজমেন্ট প্লানেটের ভুঁড়িভোজ আর সূর্য ভাই,গালিব ভাই,রিফাত ভাই, ইমতিয়াজ ভাইদের সে কি গান!আরেকজন মাল্টি ট্যালেন্ট কাজল ভাই,যার গিটারের সুরে অন্যরকম মাত্রা পায় গানের আসর। রমযান মাসে বিভিন্ন সংগঠনের ইফতার পার্টি, হলে আমাদের নিজেদের ইফতার আয়োজনেও প্রাণ থাকে । এবার তো করোনা ভাইরাসের কারণে কোনো প্রোগ্রামই হলো না। হলে থাকলে হয়তো সিহাব লবণের দায়িত্বে, ফারুক ‘বিষয়টা দেখছি’র দায়িত্বে,মাহি ইফতার কিনার দায়িত্বে, আর রাশেদ ভাই, ইলিয়াস ভাই সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করতো।

পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই মিলে একটা পরিবার । একজন কোনো অসুবিধায় পড়লে বা কেউ কোনো রোগে আক্রান্ত হলে পরিবারের সবাই তার চিকিৎসার জন্য চেষ্টা করে । দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের রক্তের যোগান দেওয়া, দেশের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে দেশের মানুষের জন্য কাজ করা যেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য । সবুজের মাঝে কৃষ্ণচূড়ার লাল আভায় সৃষ্ট লাল-সবুজ যেন বাংলাদেশকেই ফুটিয়ে তোলে ।

পৃথিবীর সাময়িক এই অসুস্থতা দূর হলে লাল বাসগুলো আবার এসে থামবে তার গন্তব্যে । মাঝে মাঝে মনে হয় এতো স্মৃতি এতো নাম, একটা উপন্যাস লিখে ফেলি । পরে আবার মনে হয় উপন্যাস তো অপূর্ণ থেকে যাবে কারণ এদের সাথে আরো অনেক দূর চলার বাকি।

সময়ের ব্যবধানে কত মানুষ হারিয়ে যায়!আমি আমার পরিবারের সবাইকে আবার দেখতে পারবো তো!