সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজ পর্যায়ের গল্প ‘পোড়া বসন্ত’

“কে বলেছে ভালোবাসা পুরোনো হয়?

সময়ের সাথে ভালোবাসাকে ভুলা যায়, কোন যুক্তি এটা?বসন্ত যতই পুরোনো হোক তা সব সময় রঙিন। জানো, আমি আজো তোমাকে সেই আগের মতোই ভালোবাসি। যাবার আগে একটা দিন দিবে আমায় সেই আগের মতো করে? সেই পহেলা ফাল্গুন এর মতো? তুমি থাকবে হলুদ শাড়িতে আর আমি নীল পাঞ্জাবিতে। হ্যাঁ,পাঞ্জাবি আমি তোমার জন্য পরবো সাথে পরবো লুঙ্গি। কিন্তু তুমি সেদিন সাজবে আমার মতো। আকাশি শাড়ির সাথে আলতা রাঙা হাতগুলো নীল রেশমী চুড়ি দিয়ে সাজাবো। আরেকহাতে পড়িয়ে দিবো কাঠ গোলাপ মালা। তবে মালাটা আমি নিজের হাতে বানাবো আমার বাগানের ফুল দিয়ে ।হ্যাঁ, সেদিনই তোমার জন্যেই প্রথমবার ফুল ছিঁড়বো আমার বাগান থেকে।তোমার চুলের খোপায় গুজে দিবো কাঠ গোলাপের শুভ্রতা। কপালে থাকবে দেবীর মতো বিরাট লাল টিপ।

তোমায় আমি দেখতে চাই লক্ষ্মী দেবীর মতো অপরূপা বেশে। চোখে কাজলের সাথে নাকে নথটাও পরে নিও। তোমায় কিন্তু বেশ লাগে! তোমার পায়ে আমি আলতা পরিয়ে দিবো। দু’জনে খালি পায়ে হাঁটবো নদীর পার ঘেঁষে যেন বাতাসে উড়ে যাওয়া চুলগুলো ঠিক করার ছুতোয় তোমার একটু ছুঁতে পারি। সেদিন নৌকাতে বসে তোমার ভেজা পা দুটোয় আমার প্রাণপ্রিয় নুপূর জোড়া পরিয়ে দিবো।আলতা লেপ্টে রাঙিয়ে দিবো তোমার অাধভেজা পা দুটো।

দুপুরের খাবার টা আমায় নিজ হাতে খাইয়ে দিবে তুমি। তোমার হাতে রান্না করা সেই খিচুড়ি আর বেগুন ভাজা,সাথে আমের আচার টাও এনো কিন্তু। আহ!মনে হয় যেন অমৃত।তোমার হাতের ছোঁয়ায় রান্নার স্বাদটা আরো বেড়ে যায়। বিকেলে সুমন মামার দোকানে বসে চা খাবো। দুজনে মিলে আড্ডা জমাবো বেশ।সবাই তাকিয়ে দেখবে আমাদের।হিংসে হবে সবার এমন পাগল মানুষের প্রতি এতো সুন্দর প্রিয়তমার ভালোবাসা দেখে।

সন্ধ্যার আবছা আলোতে তোমায় আমার লেখা কবিতা পড়ে শুনাবো।অমাবস্যার রাতে বড়ো রাস্তার পাশ ধরে হাটবো যেন কেউ আমাদের দেখতে না পারে।তুমি কথা বলবে আর আমি তোমার মিষ্টি কন্ঠস্বরটা উপভোগ করবো।আমাদের একসাথে কাটানোর মুহুর্তের সময় গুলো আগের মতো ফ্রেমবন্দী করবো না।কার না কার সৃষ্টিতে তোমায় কেন রাখবো!তুমি থাকবে আমার সৃষ্টিতে,আমার রঙের ক্যানভাসে। আমি আঁকবো তুমায়।খুব সুন্দর করে সাজাবো আমার মতো করে।

তুমি দেখে মুচকি হেসে বলবে,”পাগল একটা!” এমন করে একটা দিনের জন্য ভালোবাসবে আমায়? একটা দিনই চাইছি শুধু তারপরে না হয় চলে যেও।নিজের খেয়াল রেখো। তুমি শুধু তোমার নও,খানিকটা আমার ও। আমি যে তোমায় বড্ড বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলাম। চেয়েছিলাম কিছু গোপন না থাক। সবকিছু তোমায় বলে এক আকাশ ভালোবাসা ঠেলে দিবো তোমার পায়ে আর তুমি আমায় ভরসা দিয়ে বলবে,”কেউ না থাক আমি তো আছি। তোমার ব্যতিক্রম জীবনের সঙ্গী হবো আমি।” কিন্তু সবার কপালে সব বসন্ত সমান হয় না।আমার যে পুড়া বসন্ত! ভুলে গিয়েছিলাম তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের ভালোবাসতে নেই!ওদের প্রেমে পড়া বারণ!

রঙিন বসন্তের শুভেচ্ছা তোমায়। একটা প্রশ্নের উত্তর দিও,পৃথিবীতে কেউ কি আরো আছে ওমন ভালো বাসবে তোমায়?বলবে একটু আমায়?”

এখন বসন্ত পেরিয়ে বর্ষাকাল চলছে। হাইওয়ের পাশে টং দোকানে বসে ঝুম বৃষ্টিতে এসময় গরম গরম চা খাওয়ার মজাই আলাদা।তখনই রাস্তার পাশ গড়িয়ে যাওয়া পানির স্রোতে এসে এই চিঠিটা আমার পায়ে ঠেকলো। কালিগুলো ছড়িয়ে গেছে তাও লেখাগুলো বুঝা যাচ্ছিলো। অদ্ভুত! এতো সুন্দর চিঠিটা একটা অ্যামাজন শপিং ব্যাগের কাগজে লিখা ছিলো। বেশ আগ্রহ নিয়েই চিঠিটা পড়ছিলাম। কখন জানি হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে চিঠির আবেগে। আকাশ উড়ন্ত পাখিটার ডানা হঠাৎ ভেঙে দিলে যেভাবে মাটিতে পরে, চিঠির শেষটুকুতে আমার আবেগটাও এভাবেই নষ্ট হয়ে গেলো। ধুর!একটা হিজরার চিঠি এটা। বিরক্তি নিয়ে কাগজটা ফেলে দিলাম।রাস্তার চিঠি রাস্তায় পরে রইলো।

রাতে শুয়ে হঠাৎ মনে হলো চিঠির কথা। আসলে আমরা হয়তো মানুষের চেয়ে অভ্যাসগুলোকে ভালোবাসি বেশি। ভালোবাসা তৈরি হয় প্রচন্ড অভাববোধ থেকে। ভালোবাসার গল্পটা তৈরিও হয় চোখের স্বচ্ছ জলের রঙে। লেখাগুলো কেমন যেন দাগ কেটে গেছে আমার মনে।

কে জানে কার চিঠি ছিলো! ভাবতে লাগলাম চিঠির মানুষটি কি তার প্রশ্নের উত্তর দিতো? হয়তো দিতো না আবার হয়তো দিতো। প্রাপকের কাছে পৌঁছাবে জেনেও হয়তো লিখে রাখতো, “কেউ না….কেউ না!!”