সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘ ক্যাম্পাস ’

“নীল নব ঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে
ওগো, তোরা আজ যাসনে ঘরের বাহিরে। “

রবি ঠাকুর সেই কবেই ঘরের বাহিরে যেতে নিষেধ করেছেন। আজ আমরা স্বইচ্ছায় ঘরে বন্দি। তবে উনার বলার কারণ ছিল অন্য,আমাদেরটা ভিন্ন । আর আমাদের কারণটা যে কোভিড-১৯ তা আর বলার অবকাশ রাখে না । বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সময়টা তিন মাস শেষ হয়ে চার মাসে পড়েছে। আমার আড়াই বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এই সময়টাই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরে আছি ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতেই আমি একটি অদ্ভুত মজার ঘটনার সম্মুখীন হই । আমার ভর্তি পরিক্ষার কেন্দ্র ছিল ক্যাম্পাসেই । বিকেল বেলা পরিক্ষা শেষে ঝুমঝুম শব্দে বৃষ্টি নামলো। পরিক্ষা শেষ ! বৃষ্টি কি আমায় আর আটকে রাখতে পারে! বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটা শুরু করলাম। ক্যাফের সামনের মোড়ে আসতেই ঘটে গেল ইতিহাসের স্মরণীয় সেই ঘটনা । আমার জুতা গেল ছিঁড়ে! টুপ করে বসে পড়ে, ছেঁড়া জুতা সারানোর কাজে লেগে গেলাম। আর আমার অল্প দূরত্বে সামনেই ছিল কয়েক জন শিক্ষার্থী। আমায় দেখে বলে উঠলো, ‘’আরে করে কি,করে কি!”। তখন-ই “সরি দীপান্বীতা” নাটকের একটি দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো। অবশেষে সেই জুতা জোড়া পড়েই হাঁটতে সক্ষম হলাম।পীর শাহ জামান দীঘির পাশ দিয়ে যখন হেঁটে হেঁটে ফার্স্ট গেইটের দিকে আসছিলাম তখন দেখলাম একটা ছেলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে । আমি ভাবলাম বেচারার বোধ হয় পায়ে সমস্যা, তাই হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। পায়ের দিকে তাকাতেই আমার ধারণা ভূল প্রমাণিত হল। জুতা ছেঁড়া কেবল আমার একার সমস্যা নয় তা ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম । আর মনে মনে বললাম, ”সব দোষ ঐ বৃষ্টির !”

বিশ্ব‌বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম । আস্তে আস্তে “মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় “ আমার জীবনের অংশ হয়ে উঠলো । প্রথম একাডেমি ভবন ,দ্বিতীয় একাডেমি ভবন ,লাইব্রেরি ,ক্যাফে,মেডিকেল সেন্টার,হাতির কবর আর খাবার বলতে জিয়া হলের পেছনের খাবার হোটেল, সব-ই এখন অপরিহার্য বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত । সকাল আটটা থেকে ক্লাস শুরু হয়ে পাঁচটায় গিয়ে শেষ হওয়া, সিটি, ক্লাস , অ্যাসাইনমেন্ট ,লাইব্রেরিতে পড়তে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া ,বাসে বসে রেস্ট করতে করতে কখন বাস স্টপেজ ছেড়ে চলে গেছে তা খেয়াল না থাকা ,অবসর সময়ে হাতির কবরে বসে থাকা ,মাঝে মাঝে নির্মাণাধীন স্টেডিয়ামের কাজ পর্যবেক্ষণ করা , শহিদ মিনার ,বিজয় চত্বর ,প্রত্যয় একাত্তর আর ক্লাস বাতিল হবার আনন্দ ।ক্যাম্পাস বলতেই প্রথমেই মনে আসে এই বিষয়গুলোর কথা ।

দেখতে দেখতে কখন দুটি বছর পাড় হয়ে গেল বুঝতেও পারিনি। সব ভালই চলছিল । হটাৎ সবকিছু থমকে গেল । আড্ডার গুঞ্জন থেমে গেল, শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে ছাড়ল ক্যাম্পাস।

স্মৃতিচারণ করেই কাটছে দিন । বাসায় বসে সকলে শুধু একটি নতুন সকালের অপেক্ষা করছে। যে সকালে তারা শুনতে পাবে কোভিড-১৯ বলতে বাংলাদেশে আর কিছু নেই, খুলে দিয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । ক্যাম্পাসে আবার শুরু হবে মুক্ত প্রাণের আনাগোনা , শিক্ষার্থীরা আবার মগ্ন হবে উল্লাসে। কত স্মৃতি ক্যাম্পাসে! আরও যে অনেক স্মৃতি গড়া বাকি।

অপেক্ষা! কবে শেষ হবে এই অপেক্ষা? উত্তর কারো জানা নেই !