সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘ক‍্যাম্পাস’

.
কখন ট্রেনে উঠেছি কিছুই মনে পড়ছে না। ট্রেনটা যেন হাওয়ায় ভেসে ভেসে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌছাল। স্টেশনের বাইরে এসে প্রায় লাফিয়ে বাসে উঠে বসলাম। বাস চলতে লাগলো শাহবাগের উদ্দেশ্যে। সবকিছু অদ্ভূতভাবে ঘটতে লাগলো।
শাহবাগে নেমেই হাঁটতে শুরু করলাম ক‍্যাম্পাসের দিকে। কেমন খাপছাড়া ভাব চারিদিকে। চিরচেনা শাহবাগের এমন ছন্নছাড়া ভাব আগে কখনো দেখিনি। জাদুঘর পেরিয়ে চারুকলা অনুষদের ফুটপাত ধরে হাঁটছি। পুঁতির মালা, বাঁশি, বইয়ের দোকান চারুকলার ফুটপাতে লেগেই থাকে, আজকেও আছে তবে ক্রেতা নেই। মনসুর ভাইয়ের সাথে দেখা। ফুটপাতে বাঁশি বাজান, বিক্রিও করেন।
মনসুর ভাই কেমন আছেন? বলে জড়িয়ে ধরলাম।
আশ্চর্য, করোনার ভাইরাসের কথা একবারও মনে হল না। মনসুর ভাই খুবই খুশি হলেন।
আরেকটু সামনে বইপোকার সাথে দেখা। বইয়ের ভ‍্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বইয়ের ভ‍্যানটার নাম বইপোকা। বই কিনতে কিনতে পরিচয়। অমায়িক মানুষ, নিজে না পড়তে পারার দুঃখ থেকেই বই বিক্রি করেন, প্রচুর বই পড়েন, বহুদিন যাবৎ ক‍্যাম্পাসে আছেন। অমায়িক হাসিতে কুশল জিঙ্গেস করে হাত বাড়িয়ে দিলেন।

২.
মুহূর্তের মধ‍্যে নিজেকে আবিষ্কার করলাম মল চত্বরে। যেন হাওয়ার গতিতে চলে এলাম নিমেষেই।
ক‍্যাম্পাস ছাড়ার আগের মল চত্বর আর এখনকার মল চত্বরের কোনো মিল নেই। সবুজ ঘাসে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। মনে হয় সবুজ চাদর বিছিয়ে দিয়েছে কেউ পুরো এলাকা জুড়ে। অপার্থিব সৌন্দর্যে ভরে উঠেছে ক‍্যাম্পাসের এই প্রিয় যায়গা। সবুজ ঘাসের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশ দেখা আমার বহুদিনের অভ‍্যাস। কোনো কিছু না ভেবেই সবুজ ঘাসের উপর শুয়ে পড়লাম। আহা শান্তি। মনে হল গ্রামের নদী পাড়ে সবুজ ঘাসের উপর শুয়ে আছি।
চারিদিক এতো চুপচাপ কেনো বুঝতে পারছি না। আমি ছাড়া মল চত্বরে আর কোনো মানুষও নেই। কেন নেই তার কোনো কূল কিনারাও করতে পারলাম না।

৩.
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট। আমাদের প্রিয় আইইআর। সামনে আসতেই সাব্বির স‍্যারের সাথে দেখা। স‍্যারের হাসির নিজস্ব একটা স্টাইল আছে, সব সময় মিটিমিটি একটা হাসি স‍্যারের মুখে লেগেই থাকে। সালাম দিলাম।
‘রাবাত, লেখালেখি কেমন হচ্ছে? বলেই স‍্যারের মুখ হাসিতে ভরে উঠল। আমাকে দেখলেই স‍্যার এই প্রশ্নটা করেন।
‘জ্বী স‍্যার, ভালোই হচ্ছে’। প্রিয় স‍্যারের সাথে দেখা হয়ে খুবই ভালো লাগলো। কিন্তু একবারও মনে হল না স‍্যার তো যুক্তরাজ্যের ওয়েষ্ট ল‍্যান্ড ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতে গেছেন তাহলে আইইআরে আসলেন কিভাবে।

৪.
আইইআর থেকে কখন টিএসসিতে এলাম বুঝতে পারলাম না। দেখি স্বপন মামার দোকানে হিরা আর রিফাত বসে আছে। আমাকে দেখেই হৈ হৈ করে উঠে জড়িয়ে ধরল। করোনা ভাইরাসের কোনো তোয়াক্কাই করলো না। হিরা চায়ের তাগাদা দিল;
মামা, চা দেন তিনটা। স্বপন মামা হাসিমুখে চা এগিয়ে দিল তিন কাপ। কতদিন পর টিএসসিতে চা খাচ্ছি অথচ ক‍্যাম্পাসে থাকলে একদিনও বাদ যায় না।
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম কিন্তু চায়ের দাম দেওয়া হয়নি। আমাদের মধ্যে চায়ের বিল সব সময় রিফাত দেয়, আজ সে দেয়নি, আমাদের দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। স্বপন মামাও কিছু বলল না। পরের বার মনে করে দিয়ে দিতে হবে।
চল, শহীদ মিনার যাই, হিরা বলল। আমরা হাসি ঠাট্টা করতে করতে শহীদ মিনারের দিকে হাঁটতে থাকলাম।

৫.
চোখের পলকে দেখি এসএম হলের মাঠে বসে আছি। সাজিদ আর ফেরদৌসও আছে। কতদিন থেকে আমরা খুলনায় ট‍্যুর দিতে চাচ্ছি। ফেরদৌসের বাড়ি খুলনার বাগেরহাট। ওদের বাড়িও বেড়ানো যাবে। এর আগে আমরা তিন জনে সিলেট গেছি সাজিদের বাড়িতে। মাধবকুন্ড, হামহাম, জাফলং, শাহ জালালের মাজার সব দেখে আসছি। ফোর্থ সেমিষ্টার শেষ করে আসছিলাম নর্থ বেঙ্গল ট‍্যুরে। রংপুরে নেমে সবকিছু দেখে তারপর গিয়েছি দিনাজপুর। স্বপ্নপুরী, রাজবাড়ি, হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয় সবশেষে আমাদের বাড়ি উত্তরের শেষ জনপদ পঞ্চগড়। ওরা কাঞ্চন জঙ্ঘা দেখেছিল। উত্তরের প্রচন্ড শীতে সাত দিনও তারা গোসল করেনি, একথা বলতেই হো হো করে হেসে উঠলাম সবাই।
আমরা খুলনা ট‍্যুরের পরিকল্পনা করতে শুরু করলাম। কোথায় কোথায় যাবো তার তালিকা, বাজেট ইত‍্যাদি। ফেরদৌসের এলাকা, সেই বলতে লাগলো গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধুর কবর, বাগেরহাটে ষাট গম্বুজ মসজিদ, তারপর সুন্দরবন। এতেই বাজেট শেষ হয়ে যাবে।

৬.
কাঁধে কিসের যেন একটা খোঁচা অনুভব করলাম।
কে যেন বলতেছে; উঠ, কত বেলা হয়ে গেছে দেখ।
আমি বললাম; আমরা খুলনা ট‍্যুরে যাচ্ছি।
এবার মায়ের গলা শুনতে পেলাম; এই খোকা উঠ, কিসের খুলনা ট‍্যুরে যাচ্ছিস, তুই তো বাড়িতে।

ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। আমি না বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে চলে গেছি? তাহলে কি এতক্ষণ এলোমেলো স্বপ্ন দেখছিলাম। মা বললেন, ঘুমের ঘোরে বলতেছিস তুই নাকি খুলনা ট‍্যুরে যাবি। স্বপন দেখতেছিলি? হ‍্যাঁ মা, বলে জানালার পাশে তাকিয়ে রইলাম।

করোনা ভাইরাস আমাদের জীবনকে ওলটপালট করে দিয়েছে। কেমন আছে ক‍্যাম্পাসের প্রিয় মানুষেরা? বন্ধু, টিচার, মনসুর ভাই, স্বপন মামা, বইপোকা, হাশেম ভাই সবাই ভালো আছে তো? করোনার পর সবাইকে দেখতে পাবো তো? কবে ফেরা হবে ক‍্যাম্পাসে জানিনা। বেঁচে আছি তাই জীবনের প্রতি দায় আছে এখনো।