সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘সূর্যহীন মেঘলা আকাশ’

আমরা সময়ের কাছে কিছু কিছু মুহূর্তে খুব দুর্বল হয়ে পরি,সামাজিকতার অসহায়ত্বে ভালোবাসা হেরে গিয়ে পিষ্টে ধরে কন্ঠস্বর,না পারি বের হতে, না পারি চিৎকার দিতে…

গল্পের শুরু ২০১৪ সালের শেষের দিকে,সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম। কত স্বপ্ন, কত আশা দু’চোখে। ভার্সিটি বাসস্টপ বাসা থেকে খুব একটা দূরে নয়, সমস্যাটা হলো বাসে, কথায় কথায় বাকবিতণ্ডা বেজে গেলো এক সিনিয়রের সাথে, প্রথমদিন বলে কথা মানসিকভাবে একদম চাচ্ছিলাম না এমন কিছু হোক। নিয়তির কাছে আমরা বড় অসহায়, এই ঝগড়াই যে সারাজীবনের কান্না হয়ে ঝরবে কে জানত সেদিন।

আস্তে আস্তে আমার আর সূর্যের সাথে খুব ভালো একটা সম্পর্ক হয়ে যায়, ভার্সিটির ক্লাস ফাকি দিয়ে কত ঘুরেছি আমরা। প্রখর রৌদ্রে বহু পথ ছত্রহীন হেটেছি, এক প্লেট ফুচকা ভাগাভাগি করে খেয়েছি, অকারনে রাস্তার পাশের সারিসারি গাছ গুনেছি, তার ক্লাসের ব্যস্ততায় আমি তার জন্য মাঠে বসে অপেক্ষা করেছি, আমার ব্যস্ততায় সে।
ভার্সিটির সিনিয়র জুনিয়র সবাই জানতো আমাদের বন্ধুত্বের কথা, তাদের চোখে অবশ্য আমাদের বন্ধুত্বের নাম ছিল প্রেম। কিন্তু ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও লজ্জা, ভয় না সংকোচ কিসের দ্বরূন যে ততোদিনেও ভালোবাসার কথাটা বলতে পারিনি সূর্যকে, সেটা আমার আজ ও অজানা।
পড়াশুনায় ভালো হওয়া সত্ত্বেও একটু ভুল ত্রুটিতে স্যার ম্যাম যখন পিনচ করে কিছু বলতো, আমার কিন্তু ভালোই লাগতো। এমন করে দুই বছরের বেশি কেটে যায়, আমি ৬ষ্ঠ সেমিস্টারে উঠলাম, আর সূর্য ৮ম। একদিন রাতে হঠাৎ সূর্য ফোন দিয়ে বললো, মেঘলা বাসা থেকে ডিসিশন হয়েছে বিএসএস শেষ করে, এমএসএস যেন বাহিরে করি। কথাটা শুনেই বুকের ভিতরটা মোচর দিয়ে উঠেছিলো। ও হয়তো বুঝে গিয়েছিলো ব্যাপারটা।

একদিন বিকেলে ক্লাস শেষে ক্যাম্পাস মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম, ঘাসফুলের আংটি দিয়ে হঠাৎ করে ও আমাকে প্রপোজ করলো, দিনটা কতটা স্পেশাল ছিলো, আমি আর আমার বিধাতা জানেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রই সৃষ্টিকর্তা দুই মেরুর দুইজনকে এক সুতোয় বাধেন, আমাদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ছিলোনা। কিন্তু মিলের বড় জায়গাটা ছিলো সম্মানের জায়গাটা।

তারপর কিছুদিনের মধ্যেই ওর জার্মানির স্কলারশিপটা হয়ে যায়। সংবাদটা সুখের হলেও মনে মনে কষ্টও পাচ্ছিলাম।

ঠিক করলাম ক্যাম্পাসে মাঠের যে জায়গাটাতে আমরা সবসময় বসতাম, ওই জায়গাটাতে বন্ধুরা মিলে একটা সারপ্রাইজ পার্টি দিবো ওর জন্য, প্লান অনুযায়ী সব হলো, খুব খুশি হয়েছিলো ও সেদিন, খুব ভালো একটা দিন ছিলো আমাদের জন্য।

কখনো কল্পনায় ও ভাবিনি, এটা আমার ক্ষনিকের বিচ্ছেদ কষ্ট নয়, এটা আমার সারাজীবনের ক্ষত।জার্মানি যাওয়ার আগে, ও বন্ধুদের সাথে কক্সবাজার ট্যুরে যাওয়ার প্লান করলো, সেদিনটি ছিল বৃহস্পতিবার, রাত ১১ টায় ও আমাকে ফোন দিয়ে বলল এখনই বাস ছাড়বে আমরা কক্সবাজার যাচ্ছি, ফিরে এসে দেখা হবে। রাত ৩ টায় সব শেষ হয়ে গেলো। শুনলাম ও আর পৃথিবীতে নেই। সূর্য ফিরলো কিন্তু আর দেখা হলো না।

এই পৃথিবীতে সবথেকে অসহায়,যে প্রেমিক/প্রেমিকার ভালোবাসার মানুষটা মারা যায়,শেষবারের মতো ছুয়ে দেখাটুকুও তার ভাগ্যে জুটেনা,চিৎকার দিয়েও বলতে পারেনা, এই মানুষটা তার কতটা আপন।
এরপর থেকে আমার কষ্টের পৃথিবীর প্রশান্তির জায়গা বলতে, আমার ভার্সিটির ওই মাঠটাই আছে। কিন্তু পুরো ক্যাম্পাস টাই আজ সূর্যহীন মেঘলা আকাশ।