সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজ পর্যায়ের গল্প- ‘অভিশপ্ত চিঠি’

ফেব্রুয়ারী মাস । পাকা ধানের ঘ্রাণে প্রকৃতি আজ বিমোহিত । কনকনে শীতের সকাল । গ্রামের শান্ত পরিবেশে একটি বাড়ি । সকালবেলা বাবা-মায়ের সঙ্গে সকালের নাস্তা করে গ্রামের মেঠোপথে ঘুরতে গিয়েছিলাম । কিছু দূর যেতে না যেতেই আমার চোখ গেল রাস্তার পাশে থাকা এক বাসার দিকে । সম্ভবত ওই বাসার মেয়েটি তখন মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে । দাঁত ব্রাঁশ করতে বের হয়েছে বাড়ির সামনে পুকুর পাড়ে । তার পরনে ছিল কালো পোশাক । তার দু’হাতে ছিল রেশমি চুঁড়ি । চকচক করছে আলো । তার চেহারা থেকে আমার চোখ সরাতে পারছিলাম না । তার চেহারা দেখে আমি প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম । এতক্ষণে সে আমার দিকে তাকিয়ে মুখ না ধুঁয়ে বাসার ভিতর চলে গেল । এর পর প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বের হতাম ওই মেয়েটির বাসার সামনের ওই রাস্তার দিকে । কিন্ত আজ তার কোনো খোঁজ পাই না । তার পর প্রায়ই সকালে ঘুম থেকে উঠে বের হতাম ওই মেয়েটির বাসার সামনের রাস্তায় । কিন্তু ওই মেয়েটির কোনো খোঁজ নেই । যতই দিন যাচ্ছে তার প্রতি আমার ভালোবাসা বেড়েই চলছে । এখনো তার নাম জানা যায়নি । তবে ওই মেয়েটির বাবাকে আমি চিনি তার নাম কালাম । আমরা তাকে চাচা বলে ডাকি ।

কিছুদিন পর এক সকালবেলা স্কুলের জন্য রওনা হই । বাসা থেকে বের হয়ে কতদূর যেতে না যেতেই সেই মেয়েটির সাথে দেখা । তার গায়ে আমাদের স্কুলের পোশাক । আমি কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই তার চলার গতি বাড়িয়ে দিয়েছে । আমি বললাম আপনি দাঁড়ান । সে দাঁড়াল । আমি বললাম আপনার নামটা একটু বলবেন ? সে উত্তর দিল কেন ? আমি চমকে উঠি । এই রকম রাগী মেয়ে তো আমি আর কখনো দেখিনি । ততক্ষণে ওর চেহারা রাগে লাল হয়ে গেছে । ওই মেয়েটি বলল আমার নাম নীলা ।
আমি : তুমি পড়ো কিসে?
নীলা : আমি নবম শ্রেণিতে পড়ি । আপনি ?
আমি: আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি ।
নীলা : আমি আর দাঁড়াতে পারব না । আমার গনিত প্রাইভেট আছে । আমার তাড়াতাড়ি যেতে হবে ।
আমি : আমারও তাড়াতাড়ি যেতে হবে । চলুন একসাথে যাই ?
নীলা : আপনি আমার সাথে যেতে হলে শর্ত আছে !
আমি : কিসের শর্ত ?
নীলা : প্রতিদিন সকালে আমার বাসার সামনে ঘুরঘুর করতে পারবেন না । আমি : ঠিক আছে আমি তোমার বাসার সামনে ঘুরঘুর করব না । তবে আমরা একসাথে প্রতিদিন স্কুলে যেতে পারব তো ?
নীলা : ঠিক আছে আমরা একসাথে যাব ।

কয়েক দিন একসাথে চলাফেরার পরে শুরু হয় আমাদের ভালো বন্ধুত্ব । তবে এখনও ভালোবাসি কথাটি বলা হয়নি । একদিন স্কুল থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে আমার মনটা খুব খারাপ ছিল । কারণ, আমি ভাবতেছি আমাদের সমাজ ব্যার্থ প্রেমিকদের প্রতি নির্মম । আমি যদি নীলাকে ভালোবাসি কথাটি বলি তাহলে নীলা হয়ত বলবে আমি তোমাকে ভালোবাসি না । তখন আমি লজ্জা পাবো । আমাদের ভালো বন্ধুত্ব নিমিষেই শেষ হবে । এই বিষয়গুলো নিয়ে আমি চিন্তিত ছিলাম । হঠাৎ নীলা আমাকে ডাক দিলো কিরে নিরব (আমার নাম নিরব) ?
আমাদের মাঝে ভালো বন্ধুত্ব থাকায় আমরা দুজনে দুজনকে প্রায়ই নাম ধরে ডাকি । আমি ভাবছি আমার মন খারাপ নীলা বুঝে ফেলেছে।
নীলা : আজকে তোমাকে ভিষন চিন্তিত মনে হচ্ছে । তোমার কি হয়েছে ?
আমি : আজকে কেন জানি শরীরটা ভালো লাগছে না ।
নীলা : তোমর জ্বর হয়েছে নাকি, মাথা ব্যাথা ?
আমি : না ! কিছুই হয়নি । আমি ঠিক আছি ।
নীলা : কালকে স্কুলে যাবা ?
আমি : কালকে সম্ভবত যাব না ।
নীলা : তোমার মোবাইল নম্বরটা দিবা৷ ?
আমি : কেন ? আমার মোবাইল নম্বর দিয়ে কি করবা ?
নীলা : তুমি আছো না অসুস্থ ! খোঁজ খবর নিব ।
আমি : 0181……….এটা আমার নম্বর ।
কথা বলতে বলে আমারা প্রায় বাসার কাছে চলে আসলাম। নীলা ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেল ।
আমি আমার বাসায় চলে গেলাম । আমি গোসল করে মোবাইল নিয়ে বসে পড়লাম পড়ার টেবিলে । করণ যাকে নিয়ে আমার শুধু স্বপ্ন বুনা । সে আজ আমাকে ফোন দিবে ! এর চেয়ে খুশির খবর আর কি হতে পারে ?
নীলার কথা ভাবতে ভাবতে বিকেল কেটে গেল কোনো কল দিলো না । সন্ধ্যা হলো, আমি ওযু করে নামাজ আদায় করে, পড়ার টেবিলে বসলাম । বই খুলে পড়ার চেষ্টা করছি কিন্তু পড়ায় মন বসে না । বার বার মোবাইলের দিকে তাকাই । কখন নীলা ফোন দিবে !
শুধু আম্মুকে দেখানোর জন্য আমি পড়ার টেবিলে বসছিলাম । নীলার কথা ভাবতে ভাবতে এশার সময় এসে হাজির । চারদিকে মসজিদে আযান হচ্ছে । আমি ভাবছি নীলা হয়ত ভুলে গেছে আমার খোঁজ নিতে । হঠাৎ এমন সময় একটা অপরিচিত একটি ফোন আসলো আমার ফোনে ।
নীলা : আসসালামু আলাইকুম
আমি : ওয়ালাইকুম আসসালাম । কে আপনি ?
নীলা : আমি নীলা । কেমন আছেন ? আপনি এখন সুস্থ ?
আমি : আলহাদুলিল্লাহ। কোনো সমস্যা নেই । তুমি ঠিক আছো তো ?
নীলা : আমি ঠিক আছি । সত্যি বলেন আপনার কি হইছিলো ?
আমি : কিছুই হয়নি । একটু টেনশনে ছিলাম ।
নীলা : কিসের টেনশন ?
আমি : আমি তোমাকে নিয়ে খুব টেনশনে আছি । তোমাকে হারতে চাই না !

নীলা হঠাৎ কলটা কেটে দিল । নীলা লজ্জা পেয়েছে । আমার টেনশন আগের চেয়ে বেড়ে গেল । ভাবতে ভাবতে রাত ১১.০০ বেজে গেল হঠাৎ মোবাইলে ম্যাসেজ আসলো I ❤ you আমি বিশ্বাসই করতে পারলাম না নীলা আমাকে প্রোপোজ করবে! এটা আমি কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি । আমি লিখে ফেললাম I Love you 2 . তার পর থেকে দুজনের ভিতর তিল তিল করে ভালোবাসা জন্ম নেয় । নীলার সাথে কথা না বলতে পারলে আমার চোখে ঘুম আসে না ।

একদিন শেষ বিকেলে নূপুর পায়ে বিদায় নিচ্ছে সূর্য। কূয়াশা নেমে আসছে । চাদর বিছিয়ে ঘিরে নিতে চাচ্ছে। কর্ম বেষ্ট সবাই ফিরে যাচ্ছে । পড়ার টেবিলে বসে নীলার মোবাইলের জন্য অপেক্ষা করছি আমি । বেশী অপেক্ষা করতে হল না । নীলা আমার মোবাইলে কল দিল ।
নীলা : কেমন আছো ?
আমি : খুব ভালো । তুমি ?
নীলা : ভালো । কি করো তুমি ?
আমি : তোমার অপেক্ষায় ছিলাম । এখন তোমার সাথে গল্প করছি ।
নীলা : তুমি আমাকে নিয়ে একটা চিঠি লিখবা ?
আমি : আমি বললাম লিখব তো !
নীলা : কবে লিখবা ? কালকে লিখ ?
আমি : আমি বললাম কালকে তো বৃহস্পতিবার । কালকে আমি স্কুলে যাব না । মর্নিং ক্লাশ । বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিব খেলার মাঠে । তোমার জন্য শুক্রবার রাতে সুন্দর একটা চিঠি লিখব । শনিবার ক্লাস ছুটির পরে হাতে পাবা ।
নীলা : ওকে শনিবার তোমার চিঠির জন্য অপেক্ষায় রইলাম ।
আমি : আমাদের ভালোবাসার বন্ধন অটুট থাকুক আজীবন । ভালো থাকবা সুস্থ থাকবা । শনিবার সকালে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ ।

শনিবার সকালবেলা স্কুলে যাওয়ার সময় নীলার কোনো দেখা নেই । অনেকদিন পর আমি একা একা হেটে স্কুলে গেলাম । স্কুল ক্যাম্পাসে নীলার কোনো দেখা পেলাম না । আজকে মনটা বিষণ্ণ খারাপ । কিছুই ভালো লাগে না । ক্লাস ফাঁকি দিয়ে চলে এলাম বাসায় । বাসায়ও মন বসেছিলো না । নীলাকে কল দিলাম নীলার মোবাইল বন্ধ । অনেক দিন স্কুলে যাইনি । কারণ নীলার মোবাইল বন্ধ । নীলার কেনো খোঁজ নেই । সকালবেলা আমি নীলার বাসার সমনে ঘুরতে বের হইছি । নীলার বাসায় আজ অচেনা লোকজন বেড়াতে এসেছে । তাদের কাউকে আমি চিনি না । নীলার খোঁজ না পেয়ে বাড়ী ফিরে এলাম । সন্ধ্যার সময় নীলা আমার মোবাইলে ফোন দিল । আমি মোবাইল রিসিভ করার পর নীলা অঝড়ে কাঁদতে লাগলো । আমি বললাম নীলা তোমার কি হয়েছে ?
নীলার কোনো উত্তর নেই শুধু কাঁদতে লাগলো । অনেক্ক্ষণ পর নীলা কান্না কন্ঠে বলল , “ আমার বিয়ে হয়েছে ! তোমার লেখা চিঠিটা পাওয়ার আগেই আমার বিয়ে হয়ে গেল । যদি কাউকে দিয়ে পার তোমার লেখা চিঠিটা আমাকে দিও । আমি তোমার চিঠিটা স্মৃতি হিসেবে আজীবন নিজের কাছে রেখে দিব।তুমি তোমার প্রতি যত্ন নিও। ভালো থাকবা সবসময়। ”
আমি বললাম , তুমিও ভালো থাকবা সবসময় । তুমি সুখী হও দোয়া করি ।
এ বলেই আমি ফোন কেটে দিলাম ।
একটা জিনিস বুঝলাম , ‘ভালবাসার রাজ্যে গণতন্ত্রের কোন স্থান নেই ।’
আমি ভালোবাসা ভেঙ্গে যাওয়ার কষ্টটা সহ্য করতে পারছিলাম না । এই তিক্ততা কাটিয়ে ওঠা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না । যতই নীলাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি অবহেলায় কষ্টটা আরো বাড়ে । কষ্টগুলো নিজের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছি । আমার নিয়তি হলো , আমি ভালোবাসার । কিন্তু এই ভালোবাসাকে বাস্তব রূপে পাবো না কখনোই । প্রবল কালবৈশাখী ঝড় এসে আমার স্বপ্নগুলোকে ভেঙ্গে দিবে তাসের ঘরের মতন । গুঁড়োগুঁড়ো করে দেবে আমার প্রতিটা স্বপ্নকে , আমার ইচ্ছেকে , আমার ভালোবাসাকে । বিয়ের পর নীলা অনেক বার আমার সাথে যোগাযোগ করা চেষ্টা করলেও আমি নীলার কোনো যোগাযোগ রাখিনি । আমার অভিশপ্ত চিঠিটা আজও নীলাকে দেওয়া হলো না।