সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘কাটা দাগ’

ব্যাগ গোছাতে গিয়ে অনেক টা দেরি করে ফেলেছি । সকাল ৯টায় আমার ট্রেন ।এখন সকাল ৮টা বাজে । স্টেশনে পৌঁছতে আরও মিনিট ৪০ তো লাগবেই । আমার গন্তব্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় । ওখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করেছি অনেক দিন আগেই । আজ যাচ্ছি উদ্বোধনী ক্লাসে অংশ নিতে । অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছলাম । প্রথম ক্লাস কিছু নীতি বাক্য আর অনুপ্রেরণা সূচক বাক্য দিয়ে শেষ হল । দ্রত বন্ধু পাতানোর স্বভাব থাকলেও প্রথম ক্লাসে খুব একটা সুবিধে করে উঠতে পাড়লাম না । আমার থাকার বন্দবোস্ত হল হলের এক গণরুমে, আমার এক দূর সম্পর্কের ভাইয়ের সুপারিশে । এখানে অনেকেই আমার মত নতুন । রাতে খাবার টেবিলে একটা ছেলের সাথে পরিচয় বিনিময় হল । বাসা নীলফামারিতে, রাকিব নাম ।প্রথম দর্শণে ভাল ছেলে বলেই মনে হল । কথা বার্তাও বেশ মার্জিত । গণরুমে ফিরে আবার ওর সাথে সাক্ষাত হল । আমার থেকে তিন বিছানা পরেই তার বিছানা। তার সাথে অনেক্ষন গল্প করলাম । ও ইতোমধ্যেই আরো দুটো বন্ধু পাতিয়েছে । রাতুল আর শিফাত । ওরা দুজনে রাকিবের বিছানাই বসে গল্প করছে । তাদের সাথে আমার খুব বেশি কথা হল না । সবাই যে যার বিছানায় ঘুমাতে গেলাম ।

পরদিন ক্লাস শেষে রুমে এসে দেখি ওরা তিনজন আমার জন্য অপেক্ষা করছে । ওরা ঠিক করেছে একসাথে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখবে । সারাদিন ক্যাম্পাসটা ঘুরে সন্ধ্যেবেলা রুমে ফিরলাম।এর মাঝেই আমাদের চারজনের বন্ধুত্বটা ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে শুরু করেছে । সময় পেলেই আমরা চারজন আড্ডায় মেতে উঠি । দেখতে দেখতে চার মাস কেটে গেলে । আমরা গণরুম ছেড়ে একসাথে হলের একটি রুমে উঠেছি । হঠাৎ রাকিব বলল আজকের দিনে রেডিও তে একটা ভূতের গল্পের অনুষ্ঠান হয় । সবাই মিলে অনষ্ঠানটা শুনবে । বিষয়টা আমাদের কাছে নতুন তাই আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করতে লাগলাম । রাত ১২ টায় অনুষ্ঠানটা শুরু হল । আমরা চার জন একসাথে মেঝেতে শুয়ে অনুষ্ঠানটা শুনছি । রাকিব লাইট বন্ধ করে দিল এতে নাকি বেশি মজা লাগবে । গল্পগুলো বেশ ভয়ানকই ছিল । হঠাৎ শিফাত লাফ দিয়ে শেষ মাথা এসে সবার মাঝে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ল । এত বড় ছেলে ভূতে এত ভয় পায় ভেবে বেশ হাসি লাগল । বুঝলাম শিফাত যতই বিশাল দেহি হোক না কেন ও খুব ভিতু স্বভাবের । অনুষ্ঠানটা শেষ হতে হতে রাত ২টা বেজে গেল । আমরা তিন জন মেঝেতে ঘুমাবো বলে ঠিক করেছি । ভিতু শিফাত আমার আর রাকিবের মাঝে আস্ত একটা লোহার রড নিয়ে শুয়ে আছে ভূত আসলে ওটা দিয়ে ঘায়েল করবে । রাতুল তার বিছানা করছে উপরে । হঠাৎ ভয়ংকর শব্দ শুনতে পেলাম । দেখলাম রাতুল দৌড়ে দরজার দিকে যাচ্ছে । আর শিফাত ভয়ে আমদের উপর দিয়ে রোলার চালিয়ে দরজা দিয়ে ছুটে পালালো । শিফাতের ১০৫ কেজি শরীরের ওজনে আমার দম প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । এর পর যা দেখলাম তাতে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাওয়ার মত অবস্থা হল । রাতুল বিছানা করতে গিয়ে তার চাদরটা ফ্যানের পাখার সাথে বাধিয়ে ফেলেছে তাতেই এই ভয়ংকর শব্দটির উৎপত্তি । রাতুল ভয় পেয়ে দরজার পাশে থাকা ফ্যানের সুইচটা বন্ধ করার জন্য দৌড় দিয়েছিল । আর বেচারা শিফাত ভেবেছে ঘরে ভূত হামলা করেছে তাই আমাদের মাড়িয়ে দিয়ে দরজা দিয়ে দৌড়ে পালিয়েছে । একটু পরেরই দেখলাম শিফাত দরজায় উকি দিচ্ছে । কিছু হয়নি দেখতে পেয়ে ভেতরে এসে পুরো ঘটনা শুনে রাতুলকে আচ্ছা মত ধোলায় দিল । ধোলায় শেষ করে সবাই ঘুমিয়ে গেলাম।

দেখতে দেখতে পরীক্ষা চলে এল । আমরা পড়াশোনায় মনোযোগী হলাম । আজ কেন জানি রাকিবের পড়ায় মন নেই বাইরে কিছু একটা দেখছে সে । আমি জিজ্ঞেস করতেই ও বলল বন্ধু ডাব খেলে কেমন হয় । আমি বুঝতে পারলাম হলের পাশের ডাব গাছটাই ওর নজর পড়েছে । যেমন চিন্তা তেমন কাজ । ডাব চুরি করার একটা খশরা পরিকল্পনাও করা হয়ে গেলো । কিন্তু রাতুল যেতে চাচ্ছে না ।তবুও ওকে জোর করে নিয়ে গাছটার গোড়ায় গিয়ে পৌঁছালাম । রাতুলের ওজন কম তাই ওকেই জোর করে গাছে উঠালাম । ও ডাব নিচে ফেলছে আর আমরা ধরছি । হঠাৎ করেই একটা নারকেল গাছের পাতা গোড়া সুদ্ধ খুলে পাশের দোকানের টিনের চালায় পড়ে জোরে শব্দ হল । নৈশপ্রহরী টের পেয়ে যাবে এই ভয়ে আমরা যে যার মত দৌড় লাগালাম । অন্যদিকে রাতুল আমাদের চেয়ে তিন গুল দ্রুতবেগে গাছ থেকে নেমে আসল । ওর দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম ও চিৎপটাং হয়ে পড়ে আছে । আমরা আর কোন কিছু চিন্তা না করে ওকে চ্যাংদোলা করে নিয়ে দৌড় দিলাম । রাতুলের দূর্ভাগ্যজনক পতনের কারণ হচ্ছে ওই গাছে বেঁধে রাখা কাপড় শুকানোর নাইলোনের দড়ি ।রুমে এসে দেখলাম তার উরুতে গভীর ক্ষত হয়ে গেছে ।ক্ষতটা সারলেও চিরস্থায়ী দাগ রেখে গেছে।এরকম হাজারো স্মৃতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা শেষ করলাম ।

আজ সবাই ক্যাম্পাসে এক হয়েছি দেখা করার উদ্দেশ্যে সাথে রাতুলের স্ত্রীও আছে । সবাই মিলে চায়ের আড্ডায় বসেছি । পাশ থেকে শিফাত রাতুলকে বলে বসল ,দাগটা কিসের ভাবি কি জানে ?সবাই কিছু না বলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল । এখনও আমাদের বন্ধুত্ব আগের মতই।