সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘বন্ধুত্ব’

“এতোগুলো বই সওওব তোর? গল্পের বই তো তুই পড়িসনা। এই সেমিস্টারের সব বই একসাথে কিনে ফেলেছিস?” আমার হাত থেকে খাকি রঙের বইয়ের প্যাকেটটা নিতে নিতে জিগ্যেস করলো তিন্নী। মেয়েটা বেশ অবাক হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। আর হবে নাইবা কেন? আমাদের ব্যাচের সর্বোচ্চ সিজিধারী এই মেয়েটা ছাড়া কেউ এতো বই কেনে না, বেশিরভাগই লাইব্রেরি থেকে পড়ে।
আমি তিন্নীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বললাম, “আমি আজকে উঠি। একটু কাজ আছে।”

আমি উঠে পড়তেই অরণী আমার হাতটা টেনে ধরে বললো, “কোথায় যাচ্ছিস? খেতে যাবিনা এখন? একসাথেই যাই চল। আমরাও তো খাবো! এরপর নাহয় কাজে যাস।” বাকিরা সবাই ওর প্রস্তাবে সায় দিলো। রাফি তো বলেই ফেললো, “তুই কখনো আমাদের সাথে নিতে চাস না। তাই আজকে আর তোকে ছাড়ছিনা। একসাথে কোথাও একটা গিয়ে খাওয়াদাওয়া করবো। তোরা সবাই কী বলিস?”
এরকম পরিস্থিতিতে এর আগেও বেশ কয়েকবার পড়তে হয়েছে আমাকে কিন্তু প্রতিবারের মতো করে আজকে সামাল দিতে পারবো বলে মনে হচ্ছেনা।

মাসে একবার-দু’বার বন্ধু-বান্ধবের সাথে খেতে যাওয়াটা হয়তো অনেকের জন্যে তেমন কোনো বড় ব্যাপার না কিন্তু আমার কাছে বিলাসিতাই বটে। বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন, গত বছর রিটায়ার করেছেন। আমার ছোট ৩টা ভাইবোন প্রত্যেকেই স্কুলে যায়। পাঁচজনের সংসারটা চালাতে হিমশিম খাওয়া বাবার হাতে মাস শেষে সামান্য কিছু টাকা তুলে দিতে তিনটা টিউশন করাই। মাইনের সিংহভাগটা বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়ার পর আমার হাতে যা থাকে তা দিয়ে সারামাস কোনোমতে খেয়ে-পড়ে বাঁচা গেলেও বিলাসিতা করা যায়না। আর এই আমারই কীনা বন্ধুত্ব হতে হলো নীলা, রাফি, তিন্নী, ইকবালের মতো ছেলেমেয়েদের সাথে? এরা প্রত্যেকেই উচ্চবিত্ত কিংবা উচ্চ-মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। ওদেরকে কখনো বুঝতে দিতে চাইনি আমার ক্ষমতা রোজ দুপুরে ক্যান্টিনে ২০ টাকায় ভাত খাওয়া পর্যন্তই। আর তাই ওদের সাথে বন্ধুত্বের মাঝেও একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে রেখেছিলাম শুরু থেকেই।

নানা কৌশলে গত সাত মাস ধরে ওদের করা সব খেতে কিংবা ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান এড়িয়ে গেছি। আজ আর তা হচ্ছেনা বুঝতে পেরে ওয়াশরুমে যাওয়ার নাম করে ওদের থেকে কিছুটা আড়ালে সরে গেলাম। মানিব্যাগের সবকটা পকেট খুঁজে দেখলাম সর্বসাকুল্যে দুইশো টাকার মতো আছে।মাসের শেষদিকে হাতে টাকাপয়সা তেমন নেই৷ তাই এটা দিয়ে কমপক্ষে দু’দিন চলার ইচ্ছা ছিল। অবশ্য এই খাকি রঙের প্যাকেটভর্তি বইগুলো আজকে বিকালের মধ্যে এক জায়গায় পৌঁছে দিলে, তাতে আরো শ’খানেক টাকা পাওয়া যাবে। কিন্তু ওরা যেসব জায়গায় যায় সেখানে কী এতো অল্প টাকায় চলবে? কেন যে হল থেকে কিছু টাকা নিয়ে আসলাম না! কয়েকটা দিন নাহয় ক্যাম্পাস থেকে বেইলী রোড, বাংলামটর পর্যন্ত হেঁটেই পড়াতে যেতাম। তাও আজকের দিনে ইজ্জতটা তো বাঁচতো!

এরই মধ্যে ফোনটা বেজে উঠলো। অসংখ্য জায়গায় ফেটে যাওয়া ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে ইকবালের নাম। ধরতেই ঝাড়ি দিয়ে বললো, “ওয়াশরুমে এতোক্ষণ কী? খিদায় পেট চো চো করছে। তাড়াতাড়ি আয় তো ভাই।”

আমার মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে উধাও হয়ে যেতে পারলে সবচেয়ে ভালো হতো। ওদের কাছ থেকে অবশ্য চাইলে কিছু টাকা ধার নিতে পারি, আগামী মাসে বেতন পেয়ে শোধ করে দেওয়া যাবে। কিন্তু এই প্রথমবার কোথাও যাচ্ছি একসাথে, এখনই ধার চাইলে সবাই কী মনে করবে? এসব ভাবতে ভাবতে এসে দেখি আমার জন্য অপেক্ষা করছে ওরা সবাই।
নিজেই জিগ্যেস করলাম, “কীভাবে যাবি? রিকশায়? এতোজন তো তিন্নীর গাড়িতে জায়গা হবেনা।”
“রিকশায় কেন যাবো? একসাথে গল্প করতে করতে হাঁটি বরং”, রাফির দেওয়া প্রস্তাবে বেশ স্বস্তি পেলাম। যাতায়াতের খরচটা তো অন্তত বাঁচলো!

ওরা নানা বিষয়ে আলাপ করতে করতে হাঁটছে, হাসাহাসি করছে। কিন্তু আমি শত চেষ্টা করেও ওদের সাথে যোগ দিতে পারছিনা। আমার মাথায় হিসেব চলছে অনবরত। তাই ওদের থেকে খানিকটা পিছিয়েও পড়েছি।

আমাকে অবাক করে দিয়ে ছেলেমেয়েগুলো দলবেঁধে ডাকসু ক্যান্টিনে ঢুকলো। সবার কাছ থেকে ২০টাকা করে তুলে নিয়ে খাবার আনা হলো। ইকবাল তো বিস্বাদ হলদেটে পানির মতো দেখতে একবাটি ডাল আর আলুভর্তা খেয়ে আঙ্গুল চাটতে চাটতে বললো, “এতো মজার খাবার ২০টাকায় দিয়ে এদের পোষায় কী করে বলতো?”
আমার দিকে তাকিয়ে অরণী চেহারায় একটা গম্ভীর ভাব ধরে রেখে বললো, ” আসলেই রে, এখন থেকে আমি এখানে-ওখানে খেয়ে টাকা পয়সা নষ্ট করবোনা বাপু। তোর সাথে রোজ দুপুরেই এখানেই এসে পড়বো।”

তিন্নীর আবদারে দুপুরের খাওয়া সেরে সবাই এখন মলচত্বরে দাঁড়িয়ে ৫টাকার কুলফি খাচ্ছে। আর আমি খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ভাবছি এতোদিন ধরে এই মানুষগুলোর সাথে অযথাই দূরত্ব বজায় রেখে চলেছি। বন্ধুত্বের কাছে সবকিছুই যে অতি ক্ষুদ্র সেটা এতো দেরিতে বুঝতে পারায় বেশ আফসোস হচ্ছে। আচ্ছা, আমি কী কাঁদছি? তা নাহলে ওই সামান্য দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ চারটাকে এমন ঝাপসা দেখছি কেন?