সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘স্মৃতির পাতায় প্রিয় ক্যাম্পাস’

ক্যাম্পাস মানেই চোখজুড়ে ভেসে ওঠে অসংখ্য স্বপ্নের বাস্তবতায় পরিণত পাখায় ভর করার এক রাজ্য। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর তার ক্যাম্পাস জীবনে রয়েছে হাজারো স্মৃতি।ক্লাসরুম,বিভিন্ন চত্বর, রাস্তা, ছোট্ট চায়ের দোকান, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, উত্সবের দিনগুলোর আনন্দ, একসাথে গান গাওয়া এসবই স্মৃতির সাক্ষী ।

শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত সরকারি বরিশাল কলেজ ।সবুজ ঘাসে ঢাকা অগণিত ছাত্রছাত্রীদের কলতানে মুখরিত কলেজ ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাসের সেই মিষ্টি মধুর দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনও উদ্বেলিত হয়ে ওঠে ভেতরটা। কত স্মৃতি! কত কথা!

করোনার এই সময়ে নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেছে প্রিয় ক্যাস্পাস। ক্যাম্পাসের মায়া আর ভালবাসার টান যেন ক্রমেই উতলে উঠে। ছুটে যেতে ইচ্ছে করে সেই জ্ঞান-গরিমার তীর্থ ভূমিতে। যেখানে যৌবনাদীপ্ত তরুণ তরুণীরা পায় অগ্রিম সাগরে ভাসার এক অনাবিল প্রশান্তি। সমমনাদের নিয়ে গঠিত হয় বন্ধুত্ব ও ভালবাসার এক নিবিড় বন্ধন। দেশের ভিন্ন জায়গা থেকে আগত ভিন্ন মানসিকতা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ধর্মের মানুষগুলো হয়ে ওঠে এক আত্নার একই প্রাণ।
কলেজ ক্যাম্পাসের জীবনটা দারুণ বর্ণিল। কোন ব্যাচের নবীণ বরণ বা কোন ব্যাচের র‌্যাগ ডে, আজ কনসার্ট তো কাল ফানুশ উৎসব। এ যেন কখনও পড়াশোনায় একঁঘেয়েমি আসতে দেয় না। পহেলা বৈশাখের প্রস্তুতি চলে বেশ আগে থেকেই। রঙিন মুখোশ, ফেস্টুন, স্টেজ সাজানো, আলপনা আঁকা সবকিছুই ছাত্র শিক্ষক একসঙ্গে মিলে করি আমরা। এতে করে শিক্ষকদের সাথে শ্রদ্ধার সম্পর্কে বন্ধুত্বের ছোঁয়াও পাওয়া যায়। বিপদে আপদে সহজেই তাদের পাশে পাওয়া যায়। প্রত্যেক বছরের প্রভাতফেরী বা বিজয় র‌্যালি আমাদের মনে করিয়ে দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নোয়াবো না।

ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সাথে ডিপার্টমেন্ট এর পাশের সিড়িতে একসাথে আড্ডা দেয়া, দলবেঁধে খাওয়াদাওয়া, ঘুরতে যাওয়া, ক্যাম্পাসে দলবেঁধে হেঁড়ে গলায় গান গাওয়া…সবকিছুই মিস করি খুব। বরিশাল কলেজে মিস করার মত অনেক কিছু আছে- শহীদমিনার, ইনডোর থেলাঘর, ক্যান্টিন, পুকুরপাড়… কিন্তু আমি সবচেয়ে বেশি মিস করি ক্যাম্পাসের তমাল চত্তর। তমাল গাছটির গোল বাউন্ডরির দুই ধারে ঘন সবুজ ঘাস, গাছপালা আর পাখির ডাকে সব সময় এক অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করে। বিভিন্ন উৎসবে শিক্ষার্থীদের কোলাহলে শান্তির নীড় খ্যাত বরিশাল কলেজ ক্যাম্পাস সাজে নতুন এক অপরুপ সাজে। এছাড়াও ক্যাম্পাসের ফানুস উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,বৃক্ষরোপণ, পথশিশুদের মাঝে খাবার বিতরণ, ক্যাম্পাস পরিষ্কার ও সয়েল ক্লাব সহ বিভিন্ন ইভেন্টে নিজেকে জড়িয়েছি সক্রিয়ভাবে। মসি করি ক্যাম্পাস পরিবারের প্রতিভাবানদের, যাদের কাছে শিখেছি জীবনের অনেক আধ্যায়।

প্রানের ক্যাম্পাসের শেষ সপ্তাহের কথা বলি, ডিপার্টমেন্ট এর ম্যাম হঠাৎ তার রুমে যেতে বললো । ক্লাস শেষে তার রুমে যেতেই হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিল, মুজিব বর্ষ উপলক্ষে দেয়ালিকা তৈরির প্রতিযোগিতা হবে। চিঠি আসতে দেরি হয়েছে তাই হাতে সময় আছে ৭ দিন। কাগজটা হাতে দিয়ে হাসিমুখে বললেন ‘কলেজের সেরা দেয়ালিকা তো আমাদেরটাই, তাইনা?’। প্রিয় শিক্ষিকাকে নিজের সর্বোচ্চ চেস্টা করার প্রতিস্রুতি দিয়ে ক্লাসরুমে ফিরে আসলাম। দেয়ালিকার জন্য ১০ জনের টিম গঠন করে সবাইকে কাজ ভাগ করে দিলাম। লেখা সংগ্রহ, লেখা বাছাই, সাজানো, জিনিপত্র কেনাকাটা ইত্যদি কাজ করতে আমাদের ৫দিন লাগলো। হাতে সময় ২দিন। যেহেতু শেষদিন সকালের মধ্যে দেয়ালিকা প্রস্তুত করতে হবে তাই আমরা তার আগের দিন সব কাজ শেষ করবো। কথামত সেদিন সকাল ১০টায় আমরা কলেজে এসে কাজ শুরু করলাম। বিভিন্ন বর্ষের মোট ১০ জন মিলে দেয়ালিকা সম্পুর্ন করলাম ততক্ষনে বিকাল ৫টা বাজে। অনলাইনে অর্ডার করে সবাই মিলে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম ক্লাসরুমে।স্যার ও ম্যাম বারবার এসে আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। পরের দিন দেয়ালিকা প্রদর্শন হলো আর আমরা বিজয়ী হয়েছিলাম।সবার মুখের সেদিনের সেই আনন্দঘন হাসি আমাদের নিরলস পরিশ্রমকে ভুলিয়ে দিয়েছিল । সেদিনের সেই মুহুর্ত কখনোই ভোলার নয়।বন্ধুত্ব, ভালবাসা, শিক্ষক শব্দগুলো একই সূত্রে গাঁথা।

ভালবাসার ক্যাম্পাসের মুখরিত শৈশবগুলোর স্মৃতি আজও অমলীন ও মধুর বটে। ক্যাম্পাসের দিনগুলির কথা মনে করলে অনেক স্মৃতিবিজড়িত সময়ের কথাগুলো মনের আয়নায় ভেসে ওঠে। কতই না মধুর ছিল সেই সময়টা।

আমাদের মানসপটে কলেজ মানেই ভেসে ওঠে বহু চেনা মুখের ভীড়ে স্মৃতি বিজড়িত সেই মুখরিত রুপময় ক্যাম্পাস যা এখনও টানে যেন কোনো এক দুর্ণিবার আকর্ষণে। ফিরে যেতে ইচ্ছে করে কোনো এক স্নিগ্ধ সকালে, সেই সময়ে, সেই জীবনে, আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে! যেখানে এখনও ভোরের দোয়েল শীস দেয়, হলুদ পাখি ওড়াওড়ি করে।