সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘আমার দেখা ক্যাম্পাস’

আমি গত ১২ ই জানুয়ারি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হিসেবে ক্যাম্পাস জীবন শুরু করি।
আমার ক্যাম্পাসের পথচলা খুব একটা বেশি দিনের নয় তবুও এর ই মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার আবেগের জায়গা হয়ে দাড়িয়েছে।
গত ১৭ ই মার্চ সেই যে ক্যাম্পাস ছেড়ে বাসায় আসলাম কল্পনাও করিনি তাকে ছাড়া এতো দিন থাকতে হবে। আমি জানি আমাদের কে ছাফা ক্যাম্পাস ও কখনো ভাল থাকতে পারবেনা কেনোই বা পারবে কখনো তো এভাবে একা একা থাকেনি সে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কয়েকটা প্রচলিত কথা আছে। যেমনঃ একবার এক ছাত্র ক্লাসে স্যারকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা স্যার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো গেইট নাই কেনো? পৃথিবীর সব বিশ্ববিদ্যালয়ের তো গেইট আছে।
স্যার বললেন, সমুদ্রের কখনো গেইট থাকতে দেখেছিস? সমুদ্রের কোনো নির্দিষ্ট গেইট নাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে বিশাল এক সমুদ্রের মতো। জ্ঞ্যানের সমুদ্দুর, মুক্তচিন্তার সমুদ্দুর। এই বিশাল সমুদ্রের কোনো কার্পন্য নেই। সবাইকেই দুই হাত ভরে দেয়। সবাই আসতে পারে, সবাই শিখতে পারে। তোকে কেউ আটকাবে না, তুই চাইলে এই সমুদ্র দূর থেকে দেখে চলে যেতে পারিস,আবার চাইলে বিশাল এই সমুদ্র থেকে মনি মুক্তা খুঁজে নিতে পারিস। এই স্বাধীনতা আছে বলেই গেইট নেই।

প্রতিদিন সকালে উঠেই আজিমপুর থেকে হাটতে হাটতে প্রিয় ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হতো।একটি ক্লাস শেষ হলেই দৌড় দিতাম টিএসসি তে। সেখানকার হরেক রকমের চা না খেলে দিন ই যেতোনা। তেতুল চা, মরিচ চা, লালচা দুধ চা কতো রকমের ই যে চা ছিল। তারপর হতো বন্ধুদের মিলে জমে আড্ডা। হাকিম চত্বরে কিংবা ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে করে ফেলতাম একসাথে লাঞ্চ।আমি তো ইদানিং সেখানকার কাক ও কুকুর গুলোকেই মিস করছি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এখন পর্যন্ত আমি কোনো পরিচয়পত্র সংগ্রহ করিনি, না হলের না ডিপার্ট্মেন্টের। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বিক্রি করে বাড়তি কোনো সুবিধা পেতে কখনো ইচ্ছে করেনি। তবুও, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণে অনেক জায়গায় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সম্মান পেয়েছি।
এই ক্যাম্পাসেই ২০ টাকার সেই ক্যাফেটেরিয়ার মাংস ভাতের লাঞ্চ। সেই লাল রঙ এর বাস গুলো কতই যে আমাদের কে কাছে টেনেছিল সেটা এখন বুঝতে পারা যায়।

সোশাল সায়েন্স বিল্ডিং এর গোল চত্বরে বসেও অনেক আড্ডা দেয়া হতো। কেউ আড্ডা দেয়না এখন। মধুর ক্যান্টিনে ও নেই কোন ব্যস্ততা কিংবা রাজনীতির গল্প। কার্জন হলটা আমরা না থাকাতে হাহাকার করে তাকায় আছে। হল গুলো যেখানে সারাদিন সরব ছিলো সেটাও একদম ফাকা হয়ে গেছে। লকডাউনের আগে যতদিন ক্যাম্পাসে ছিলাম সে যে সকালে যাওয়া হতো ফিরে আসতাম সেই সন্ধ্যায়। ক্লাসে শিক্ষক গণ কে অনেক মিস করতে হচ্ছে। তাদের প্রতিটা লেকচার এখনো কানে ভাসে কিন্ত এখন আর করার সু্যোগ হচ্ছেনা। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলেই এক ক্লাসের পরের সময় টুকু চলে যেতাম লালবাগ কেল্লা কিংবা আশেপাশের সুন্দর জায়গায়। পরীক্ষার সময় হলে সেই টিএসসি তে বসেই ক্যাফেটেরিয়ায় একসাথে অনেক পড়াশুনা দিতাম।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মচারী, স্টাফ, দোকানের ছেলেপেলে, চায়ের দোকানি এমনকি বহু বছর ধরে এই এলাকায় রিকশা চালায় এরকম মানুষেরাও অত্যন্ত স্বতন্ত্র স্বত্তার অধিকারী। এরা কেউ খুব ভাল কি খুব খারাপ সেই বিচারে যাব না, এদের যা ভাল লেগেছে তা হলো এখানে সবাই আলাদা ব্যাক্তিত্ব ধরে রেখেছে। টাকা দিয়ে সব কিছু এখানে হয় না, আবার শুধু ভালবাসায় আন্তরিকতায় অনেক কিছু সম্ভব হয় এখানে। পরিবেশের প্রভাব বলে একটা কথা আছে যে।

সব কিছুই এখন ভাবলেই খারাপ লাগে। হয়তোবা আবার আমাদের সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। ফিরে পাবো সুন্দর পৃথিবী, সুন্দর বাংলাদেশ। আবার সকল শিক্ষাথীদের পায়ের আওয়াজে মুখরিত হবে আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাস।