সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘স্মৃতির পাতায় ক্যাম্পাস’

কফিল উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ । নামটি হয়তোবা খুব একটা পরিচিত নয় সবার। খুব পরিচিত হওয়ার কথাও নয়.কারণ দেশের অগনিত নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝে এটি তো সেরাদের তালিকার বাইরে। আমার অনার্স জীবন। তথা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সাথে কফিলউদ্দীন কলেজই জড়িত। কারণ আমার যে ভাগ্য রেখায় এ কলেজ এ ক্যাম্পাসই লেখা ছিলো। আমার জীবনের সোনালী তারুণ্যের দীপ্ত প্রায় চারটি বছর কেটেছে কফিলউদ্দীন কলেজে।

মনে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সে প্রথম দিনের কথা যেদিন একঝুড়ি স্বপ্ন নিয়ে প্রথম পাঁ রাখি অপরিচিত অচেনা একটি অঙ্গনে। ভয়ে গলা কাঁপছিলো না জানি অচেনা কারো কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হই কিনা।বুক টান টান করে, বর্ষারকালে কাদাঁমাটির জল মাড়িয়ে দৃঢ় পায়ে হাঁটছি ভবনের দিকে৷ সেদিন প্রথম আমি কলেজের রাস্তার প্রেমে পড়েছিলাম যা এখনো বর্তমান৷ প্রথমে সুদর্শন তোরণ অতিক্রম করে ৷ রাস্তার ধারে সারিবদ্ধভাবে পরস্পর গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বৃক্ষরাজি , কিছদূর যেতেই চির সবুজ ঘাসের বুক চিরে রাস্তা শহীদ মিনারের পদচুম্বন করেছে, তারপর মাঠ অতিক্রম করে প্রশাসনিক ভবন। ক্যান্টিনের বাম পাশে বয়ে গেছে খাল। খালের পাশ দিয়েই বয়ে চলা সবুজ ঘাসের মাঝে সরু রাস্তা ৷ কোনো বিলাসিনীর শরীরে অঙ্কিত ট্যাটোর মত আল্পনা আঁকা এই রাস্তাটা অতিক্রম কালে আমার বোধ হয়েছিল আমি যেন আমন্ত্রিত অতিথি, এসব আমাকে বরণের মহীরুহ আয়োজন৷ পুকুর জলে মৃদু ঢেউর নৃত্য, নবপল্লবে সজ্জিত গাছগুলো ফোঁটা ফোঁটা পানি ফেলছে। যেন অতিথিকে ফুলের পাঁপড়ি ছিটিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হচ্ছে৷ তৃণের সবুজ চাদরপাতা সবখানে৷

নবীনদের বরণের পালা শেষ, সবার হাতে একটা একটা গোলাপ বাঁধা রজনীগন্ধার স্টিকে ৷ তাতে কী? আমাকে তো দশ হাতে বরণ করে নিয়েছে কলেজ প্রাঙ্গণ৷অসংখ্য অপরিচিতের ভিতরে ঢুকে বসলাম৷ একে একে বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক বড় ভাইয়েরা আসলেন, ভাইবাদী স্লোগানে ভবন কিছুক্ষণ প্রকম্পিত হয়েছে৷
আমার পাশে দু’জন গম্ভীর চেহারাধারী নবীন ছাত্র বসলেন, ‘আপনি’ সম্বোধন করে কৌশল বিনিময় করেছি৷ অবশ্য পরবর্তীতে চেহারার গাম্ভীর্য দূর হয়ে আজকের মাহবুব আর কামরুল হয়েছে৷ প্রথম ক্লাস শেষ৷ ক্লাসে নিয়মিত থেকে মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হওয়ার পর একদিন ইতিহাস ঘন্টায় স্যার আসছিলো ক্লাসে। স্যার লেকছার দেওয়ার এক পর্যায়ে কিছু একটা বোর্ডে লেখার জন্য চকের প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু স্যার ক্লাসে আসার সময় ভুলক্রমে চক ডাষ্টার আনে নি।তো এখন কি করার!কি করবে? স্যার আমাকে পাঠালো চক ডাষ্টার আনার জন্য।তখন ছিলো শীতকাল আর তাই আমার গায়ে ছিলো কালো কোট এবং পায়ে কালো সু। চক আর ডাষ্টার হাতে নিয়ে যখন দ্বিতীয় তলার বারান্দা দিয়ে হেটেঁ আসছিলাম তখন বারান্দায় থাকা ছাএছাএীরা আমায় দেখে সে কি সম্মান। একেক জনকে বলাবলি করছে দেখো দেখো স্যার যাচ্ছে। সবাই সালাম দিচ্ছে আর আমার সামনের পথ ছেড়ে সম্মানের সাথে সালাম দিচ্ছে। দেখে বেশ অবাক হলাম।পরে বুঝতে পারলাম এরাতো আমার হাতে চক ডাষ্টার দেখে আমাকে কলেজের স্যার ভেবে বসছে।পরে কি আর করার ছোটখাটো হিরো ভাব নিয়ে চক ডাষ্টার হাতে করে কলেজের বিজ্ঞান ভবনের পুরো চারতলার বারান্দা সহ।কলেজ ক্যাম্পাস এর মেইন ভবনের তিনতলার পুরোটাই ঘুরালাম। এরপর ভাবলাম বারান্দায় ছোটদের হট্টগোলের মাঝে নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য ।সবসময় শিক্ষক বেশে হাতে চক ডাষ্টার নিয়ে থাকতে হবে। যথারীতি পরের দিন লাইব্রেরী থেকে একটি ডাষ্টারও কিনলাম এবং এর পরবর্তীতে এভাবেই চলতে লাগলো।কয়েকজন বন্ধু আমার এই বিষয়টি শুনে বেশ মজা পেল।

কলেজ গেইটের সামনের রাস্তায় একটা ফুসকার দোকান ছিলো, একদিন কার যেন আমন্ত্রণ পেয়ে দলবেধে হানা দিলাম সেখানে৷ খেতে খেতে পরিচয় হয় সাব্বির,শারমিন, তামান্না, রাব্বির সাথে৷ আমাদের মধ্যে একটা সার্কেল গড়ে ওঠে৷নিয়মিত যোগাযোগ হয়, ফেইসবুক একাউন্ট, ফোন নাম্বার বিনিময় এর মধ্যে হয়েগেছে।ফেসবুকে গ্রুপ মেসেজ এবং ইভেন্ট মেসেজ ইত্যাদি শুরু হয়।

দ্বিতীয় বর্ষের শেষের দিকে আমরা ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের কয়েকজন বন্ধু আসিফ, হারুন, মাহবুবু,হাবিব,কামরুল,সোহান,সোহাগ, নাইমুল,রাসেল,পলাশ সহ আমরা সবাই মিলে একটা খাওয়া দাওয়ার পিকনিকের আয়োজন করলাম । পিকনিক এর মূল পরিকল্পনা ছিলো আমার । সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম জনপ্রতি ২০০ টাকা করে। এবং খাওয়ার আইটেম থাকবে সাদা ভাত,গরুর মাংস,মুরগী মাংস,চিংড়ি,ডিম,এবং খাওয়ার শেষে লালপানি(কোকাকোলা)।তো পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ ।স্থান নির্ধারণ করলাম কলেজ হোস্টেল । তখন কলেজ হোষ্টেলে থাকতো আমাদের ডিপার্টমেন্ট এর আসিফ এবং হারুন তাদের হাড়িপাতিলে রান্না হবে । রান্না করবে আসিফ কারণ সে বেশ ভালো রান্না পারে।আর বাকিরা সবাই তাকে রান্নায় সহায়তা করবে। পরের দিন সবাই মিলে কলেজের পাশ্ববর্তী চন্দ্রগন্জ বাজার থেকে প্রয়োজনীয় সব কিনে আনলাম। সোমবার বিকাল চারটা থেকে আমাদের পিকনিক তথা রান্নার কাজ শুরু হবে এমনকি কে কি কাজ করবে সবার কাজ ভাগ করা হলো। ভাগ্যক্রমে আমার ভাগে কাজ পড়ল সালাদ তৈরী! যাক কি আর করার এ যাএায় আবার ধরা খেলাম আবার পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে কাঁদতে হবে । কিছু করার নাই। পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে বড় একটা পলিথিন দিয়ে পুরো মাথা থেকে গলা পর্যন্ত বেধেঁ পেললাম। এ যাএায় কাদাঁ আর চোখের জল থেকে কিছুটা রক্ষা পেলাম!!! সবার চেষ্টায় যথাযথ ইউটিউব এর বিভিন্ন ভি‌ডিও রেসিপি দেখে রাত আটটার আগেই আমাদের রান্না সব কমপ্লিট।

কিছুক্ষণ পর খাবার এর পরিবেশন শুরু।কিন্তু সমস্যা হলো সেখানে। আমরা মানুষ হলাম মোট ১২জন কিন্তু প্লেট আছে মাএ আটটা এদিকে সবাই একসাথে খেতে হবে। কেউ আগে পরে খেতে রাজি নই। কি করার এখন হুট করে প্লেট কই পাই।শুভ বুদ্ধির উদয়!! একটা বড় বাটি খুঁজে পেলাম ।এবং ভাতের পাতিলে করে একজন খাবে, বাকি দুজন গরুর মাংস এবং মুরগীর মাংসের পাতিলে ।বাহ দারুণ সমস্যা সমাধান এ মুহুর্তে এর চেয়ে বড় সমাধান আর কি হতে পারে। আমি ভাতের বিশাল পাতিলে করে খাচ্ছি।সাথে মাহবুব, আর কামরুল মাংসের বড় বড় পাতিলে করে। আহ, কি চমৎকার ! ঠিক সেই মুহুর্তের খাবারের দৃশ্য জীবনে কোনো চিএে অথবা কোন নাটক চলচ্চিত্রের দৃশ্যেও দেখিনি।

দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষার পর ঠিক তখন মনে হচ্ছিলো পুরো কলেজ ।কলেজের প্রতিটি ইন্ঞি ইন্ঞি আমাদের হাজার বছরের পরিচিত।চারদিকের চেহারা গুলো কখন যেন আপন হয়ে গেছে।বন্ধু বান্ধবী অনেকের মধ্যে প্রেম ভালোবাসা। ডুবে ডুবে জল খাওয়া।প্রেমে পড়া। ক্রাশ খাওয়া এগুলোতে ইতিমধ্যে ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণ বেশ জমজমাট হয়ে পড়ছে ।আমারও ভালো লাগার একজন ছিলোনা যে এমন নয়! মাঝারি আকৃতির গড়ন, আরবীয় মডেলের মত টানা টানা দুইটি চোঁখ, হাঁসলে গোলাপী ঠোঁটের নিচে উপরের পাটির একটা অতিরিক্ত দাঁতের প্রকাশ, আপেল-ফর্সা রং (রিমঝিম)কে অনন্যা দেখাত৷ আমি তাঁকে আমার ভাল লাগার কথা প্রকাশের আগেই তাঁর বিয়ে হয়েগেছে৷

তৃতীয় বর্ষে আমাদের মধ্যে অনার্সের ছাত্র হিসেবে একটা পরিপক্বতা আসে৷ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন, পরিচালনার দায়িত্ব আমাদের কাঁধে আসে৷ পিঠা উৎসব, বসন্ত বরণ, নববর্ষ বরণ, বার্ষিক শিক্ষা সফর বিভাগের অভ্যন্তরীণ অনুষ্ঠান আমরা সকল বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীরা একাত্মভাবে পালন করতাম৷ জুবায়ের স্যার এতটাই স্নেহ বৎসল ছিলেন, স্যারের আদর মাখা শাসনে কেউ আঘাত পেত না বরং হৃদয়ে ভালবাসার মৃদু অনুকম্প হতো৷ ৪র্থ বর্ষে আমি তেমন ক্লাস করতে পারিনি৷ পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে একটা স্কুলে চাকরি নিলাম৷ একটু একটু করে কলেজে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমনকি বন্ধুদের আড্ডায় আমার উপস্থিতি কমে যায়৷ আমি একটা অপূরণীয় শূন্যতা অনুভব করি৷ জানালার পাশে বসে ওপাশের দিকচিহ্নহীন আন্দোলিত সমুদ্রে সেই শূন্যতা সমার্থক হয়ে ভাসছে৷ চার বছর সময় আমার কাছে নিছক সিনেমার মতো ঠেকল৷ ৪র্থ বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা চলছে, আমি আর সেইসব চরিত্রে ফিরে যেতে পারবো না৷ চার বছরের অতীত যেভাবে আমাকে স্মৃতি বিজড়িত করে তুলে, অনাগত ভবিষ্যতও আমাকে ভাবায় এই বলে যে, ইচ্ছে হলেই আর সবাইকে ক্যাম্পাসের পুকুর ঘাটে , ক্যান্টিনে জড়ো করে আড্ডা জমাতে পারবো না৷ আমরা সবাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো৷ তবুও স্মৃতিতে জেগে ওঠবে প্রাণের ক্যাম্পাস, ক্যাম্পাসের দিনগুলো৷ প্রাণের বন্ধুগুলো ছেড়ে দূরে থাকা যায়, কখনো ভুলা যায় না৷

কত কোলাহলে কত সময়
কাটিয়েছি মোরা এই আঙ্গিনায়
প্রান্তে প্রান্তে কিনারায় স্মৃতির মেলা
ক্ষনে ক্ষনে মনে পড়ে।
আজি এ বেলায় স্মৃতির সমহার
আহা মনে পড়ে যায়
কখনও কি ভুলা যায়?

বিদায়ের ঘন্টা বেজে গেছে আমাদের। আমরা ইতিমধ্যে পার করে পেলছি জীবনের অতীব আনন্দঘন চারটি বছর। আমার মতে শুধু আনন্দঘনই নয় জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় বলা চলে। কবুও আর ফিরে পাবো না তারুণ্যের কোলাহল সমৃদ্ধ এই সময়টাকে। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভাংলেই মনে হয় আহা কখন বুঝি শেষ হয়ে গেলো,কখন বুঝি কেঁটে গেলো আমার স্বপ্ন আমার ক্যাম্পাস জীবন। বিষন্নতায় হতাশার রুপ নেয় যখনই ভাবি আর কখনো এমন হ্রদয়নিংড়ানো প্রিয় বন্ধু গুলোকে, প্রিয় শিক্ষকদেরকে, প্রিয় ক্যাম্পাসকে,হারিয়ে ফেলছি। এখন থেকে শুধুই স্মৃতি।