সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘মেঘপাহাড়ের সেই ছেলেটি’

পূজার প্যান্ডেলে তোড়জোড় কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। অনেকেই ফিরে গেছে হোস্টেলে। আলপনায় তুলির শেষ আঁচড় বুলিয়ে দিচ্ছে কেউ। কলেজের সরস্বতী পূজায় এবার রবিঠাকুরের ‘চিত্রাঙ্গদা’ মঞ্চায়িত হচ্ছে। একটা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য মেঘলাকে খুব জোর করেছিলো বন্ধুরা। কিন্তু, তেমন আগ্রহ দেখায়নি ও। বন্ধুদের কোনো আয়োজনে সবসময়ই নিজেকে আড়াল করে রাখে মেয়েটা। এজন্যে বন্ধুমহলে কিছুটা দুর্নামও আছে ওর।

পূজার বাদ্যবাজনা, ধূপধুনোর গন্ধ আজকাল ওর একেবারেই সহ্য হয় না। দুর্গাপূজার ছুটিতেও বাড়ি ফেরে না। কোনো-না-কোনো একটা অজুহাত দেখিয়ে ও হোস্টেলেই রয়ে যায়। এমন উৎসবের দিনগুলোতে যখন মেঘলার খুব মন খারাপ হয়; তখন সে একা একা মেঘপাহাড়ের কথা ভাবে। ভাবে সেই ছেলেটির কথা।

পাহাড়ের গায়ে হরেকরঙা অলংকারের মতো ছোট ছোট ঘরে বাস করতো ওরা। ওদের পাহাড়ের ঠিক উল্টোদিকে ছিলো ভারতের পাহাড়। দু’দিকের দুই পাহাড়ের সারির মাঝের উপত্যকায় সারাক্ষণই লেগে থাকতো দর্শনার্থীদের ভিড়।

মেঘলাদের ছিলো একটা বড় দল। পাহাড়বাসী সব ছেলেমেয়েই ছিলো সে দলে। দিনভর ছোট্ট একটি কলস আর একটি গ্লাস হাতে নিয়ে ওরা ঘুরে বেড়াতো। যখনই পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে দর্শনার্থীরা নেমে আসতেন, ওরা বলতো, ‘এত উপর থেইকা নামসেন। পিয়াস পাইসে বুঝি? খাইয়া যান না একটু পানি। পিয়াসডা মিটায়া যান।’ বড্ড আপনভাবে ওরা কথাটা বলতো। তাই সহজে কেউ ‘না’ বলতে পারতেন না। প্রতি গ্লাস পানির বিনিময়ে ওরা নিতো দু’টাকা।

সেই ছেলেটাও ছিলো ওদের দলে। কেন যেন বাকি সবার চেয়ে দুষ্টুমি, খুনসুটিটা ওর সঙ্গেই বেশি হতো মেঘলার। বর্ষা আর শীতে সবুজ পাহাড়টার ওপর জমে থাকতো পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। বিকেলবেলা পাহাড়ের ওপর দলবেঁধে বসে ওরা মেঘের খেলা দেখতো।

ছেলেটা একদিন বললো, ‘ইন্ডিয়া যাবি, মেঘলা?’
-ইন্ডিয়া? ঐ তো ইন্ডিয়া দেহা যায়। হেইখানে আবার যাওনের কী আছে?
-আরে গাধী! ঘুরবার যামু। চউক্ষে দেহা আর বেড়ান কি এক জিনিস হইলো?
-ও! কিন্তু, হেইখানে গ্যালে তো পুলিশ ধরবো।
-হুম, সেইডাও একটা প্রব্লেম! আইচ্ছা, এহন না। তুই আর আমি যহন বড় হমু তহন যামু।

ঈদ হোক কিংবা পূজা- মেঘপাহাড়ের বাসিন্দারা যেকোনো উৎসবই পালন করতো সকলে মিলে। দুর্গাপূজার সেই বিকেলটাতেও ওরা সবাই পাহাড়ের ওপর বসে ছিলো। হঠাৎ কে যেন বললো, ‘ওই! আর ভাল্লাগে না। চল না! বাজি পোড়াই…’। যে-ই ভাবা, সে-ই কাজ। মুহূর্তেই সবুজ পাহাড়ের ওপর শুরু হলো আলোর উৎসব। আনন্দ উদযাপনটা বোধ হয় রাতভর চলতেই থাকতো; যদি অতগুলো মানুষের কলরোলের মাঝে ভেসে না আসতো এক গগনবিদারী চিৎকার।

চিৎকারটা ছিলো অসাবধানতায় পা ফসকে পড়ে যাওয়া সেই ছেলেটার। যতক্ষণে ওকে নিয়ে সবাই হাসপাতালে পৌঁছালো, ততক্ষণে অনেকটাই দেরি হয়ে গেছে। মাথায় আঘাত লেগে ঝরে গেছিলো অনেকটা রক্ত। ঐ মুহূর্তেই শরীরে রক্ত দেবার খুব প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু, ছেলেটার রক্তের গ্রুপ এতটাই দুর্লভ ছিলো যে হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকেও সে রক্ত পাওয়া যায়নি। মেঘলা সেদিন রাতভর প্রতীক্ষা করেছিলো ওর জন্য। ভেবেছিলো, ভোর হলেই ফিরে আসবে ছেলেটা। কিন্তু, সে ফেরেনি।

বাবা যখন বাড়ি ফিরে হাসপাতালের ঘটনাগুলো ওদের বলছিলেন, তখন একবিন্দুও জল আসেনি মেঘলার চোখে৷ জল এলো তখন, যখন জানতে পারলো- যে এক ব্যাগ রক্তের অভাবে হারিয়ে গেছে ছেলেটা, সে রক্ত ছিলো তাদের হাতের কাছেই। মেঘলার কাকাই যে ছিলেন সে একই রক্তধারী! অবাক হয়ে মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো, ‘বাবা, তাইলে কাকা ক্যান রক্ত দিলো না? রক্ত দিলেই তো পরাণডা বাঁইচা যাইতো।’ বাবা হেসে বললেন, ‘রক্ত কেমনে দিবো, মা? হেই তো মুসলিম! হিন্দু হইয়া মুসলিমরে রক্ত দিলে জাত থাকবো?’

মেঘপাহাড়ের সহজ-সরল মানুষগুলোর একত্রে গড়া জীবনের প্রতি যে প্রগাঢ় ভালোবাসা ছিলো মেঘলার, সেদিন তা মিথ্যে হয়ে যেতে এতটুকুও সময় লাগেনি। সেদিনের পর থেকে কলস আর গ্লাস হাতে আর দেখা যায়নি ওকে। পাহাড়ি ছেলেমেয়েদের জন্য নির্মিত একটি ছোট্ট স্কুলে মাঝেমধ্যে যাওয়া-আসা করতো সে। সেদিন থেকে পড়ালেখাকেই আঁকড়ে ধরলো মেঘলা। পরিবারও তেমন অমত করেনি। বরং খুশিই হয়েছিলো।

স্কুল পেরিয়ে একদিন জেলা সদরের একটি কলেজে ভর্তি হলো সে। সেখান থেকে এই মেডিকেল কলেজ। ওর কাছে এখন এই কলেজ আর হাসপাতালটাই সবচে’ আপন ঠিকানা। এই তো সেই হাসপাতাল, যেখানে এক ব্যাগ রক্ত না পাওয়ার অভিমানে হারিয়ে গেছে ছেলেটা। মেঘলার কেন যেন মনে হয়, ও হারিয়ে যায়নি। হয়তো ওকে অবাক করে দিয়ে টুপ করে একদিন ছেলেটা এসে ওর সামনে দাঁড়াবে। স্বভাবসুলভ দুষ্টুমিতে বলে উঠবে, ‘ইন্ডিয়া যাবি, মেঘলা?’

ঈদ-পূজাতে মেঘপাহাড়ের বাসিন্দারা আজও একসঙ্গে আনন্দে মাতে। কিন্তু, মেঘলা জানে, সে সম্প্রীতি নির্ভেজাল নয়, কোথাও একটু খাদ রয়ে গেছে। তাই সে দিনগুলোতে বাড়ি না ফিরে হাসপাতালের ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পে দিনভর বসে থাকে ও। যদি কোনো মৃত্যুপথযাত্রীর জন্যে রক্তের প্রয়োজন হয়, এগিয়ে যায় সবার আগে। আজকাল ওর কাছে এই ক্যাম্পাসটাই সবকিছু; যেখানে ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের ঊর্ধ্বে মানুষের জীবনটাই মুখ্য।

শরতের শেষে যখন দুর্গাপূজার ঢাকের শব্দ মিলিয়ে যায়, ঈদের এক ফালি চাঁদ যখন রূপান্তরিত হয় পূর্ণচন্দ্রে; তখন মেঘলা চুপিচুপি মেঘপাহাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। মাথার ওপরে সাদা-ধূসর মেঘেরা লুকোচুরি খেলে। সে মেঘের খেলা দেখে মেঘলার চোখেও মেঘ জমতে থাকে। জমাট বাঁধা মেঘ একসময় বৃষ্টি হয়ে ঝরে। ঝাপসা চোখে মেঘলা সেই ছেলেকে খোঁজে। পাহাড়ি সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে নিচের উপত্যকায়। অপেক্ষা করে মেঘলা। অপেক্ষা করে সেই কণ্ঠের সেই কথাটির জন্য-
‘পিয়াস পাইসে বুঝি? খাইয়া যান না একটু পানি। পিয়াসডা মিটায়া যান…’