সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘আসলে ছোটলোক কারা?’

আজ মিমি তার অফিস কলিগদের সাথে একটি পাঁচতারা হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে এসেছে। বাহারি রকমের বিদেশি খাবার অর্ডার করলো। খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে তারা দেশের দুরঃবস্থার জন্য শোক প্রকাশ করলো। খাবার টেবিলে আসতেই খাবারের সুঘ্রাণেই তাদের পেট অর্ধেক ভরে গেলো। এজন্যই বোধহয় সবাই পুরোটুকু খেতে পারলো নাহ, নষ্ট করলো। বিল আসলো প্রায় ৪ হাজার টাকা।মিমি বললো, আজ পুরো বিল আমি দেবো, এটা আমার তরফ থেকে ট্রিট। বিল দিলো সাথে বেয়ারাকে মোটা টিপস ও দিলো।
গাড়ি করে বাসায় ফেরার পথে মিমির চোখে পড়লো তাদের বাসার গলির মোড়ে সবজি বিক্রি হচ্ছে, সে ভাবলো বাসার জন্য কিছু সবজি কিনে নেওয়া যাক। গাড়ি থামিয়ে,জানালা থেকে মুখ বের করে বয়স্ক এক সবজিওয়ালাকে ডাকলো, এই শোনো, কুমড়া এক ফালি কততে দিবা?
সবজিওয়ালা বললো, ২৫ টাকা রাখা যাবে আপা।
কি! ২৫ টাকা? এক ফালি কুমড়া! মগের মুল্লুক নাকি এটা? যতসব ঠকবাজের দল।বাসি তরকারি বিক্রি করে আবার দাম বেশি চাই। এজন্যই দেশের সবকিছুর দাম দিন দিন বাড়ছে। সবজিওয়ালা শুধু বললো নেওয়ার দরকার নাই আপা, সুপার শপ আছে আপনাদের জন্য।
রাগে মিমির গা জ্বলে গেলো।

মিমির স্বামী একজন সরকারি কর্মকর্তা। আজ মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ পাবে, সেই টাকা নিতে গোপন জায়গায় যেতে হবে, গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে নাহ কোনোভাবেই।
তাই রিকশা ডাক দিল,
এই যাবি?
কোথায় যাবেন?
জিগাতলা।
উঠেন,
কত নিবি?
আপনার যা ইচ্ছা দিয়েন,৫০ টাকা করেই তো হয় আপনিও তাই দিয়েন।
কি এখান থেকে এইটুকু ৫০ টাকা, তোরা মানুষ হবি নাহ, লুটেপুটে খাচ্ছিস দেশ টারে। ৩০ টাকায় যাবি?
নাহ মামা যাব নাহ।
আচ্ছা যাহ, ৪০ টাকা দিবনে, আজ মন ভালো।
আচ্ছা উঠেন।
রিকশায় উঠে হাওয়া খেতে খেতে ভাবতে লাগলো, এই টাকা দিয়ে কি কি করবে। হঠাৎ কিছু বুঝে উঠার আগেই রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে গেলো রাস্তায়। বাম হাতের কনুইয়ে একটু ছুলে গেছে বাকি সব ঠিকঠাক। সে দেখলো রিকশার একটি চাকা খুলে গেছে,রিকশাওয়ালার মাথা কেটে রক্ত পড়ছে। উঠে গিয়ে রিকশা ওয়ালার কলার ধরে বললো, ছোটলোকের বাচ্চা,রিকশা বের করার আগে চেক করবি নাহ চাকা? অশিক্ষিত, মুর্খ তোর জীবনের দাম নেই বলে কি আমার জীবনের দাম নেই?ছোটলোকের বাচ্চা।এই বলে একটা চড় মারলো রিকশাওয়ালার গালে।রিকশা ওয়ালা কোনো প্রতিবাদ করলো নাহ শুধু তাকিয়ে নিজের ভাঙ্গা রিকশাটি দেখলো,ওটিই ছিলো তার রোজগারের একমাত্র পথ,তার পরিবার তার রোজগারেই চলে।

মিমির বড় ছেলে বন্ধুদের সাথে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় লক্ষ করলো, টিশার্ট জিন্স পরা এক সুন্দরী রমণী দাড়িয়ে আছে।চোখ যেন তার আটকে গেলো। মনে মনে বললো, ইসস একদিন যদি একে পাইতাম।যদিও সে তার বন্ধুদের কাছে নিজের এই গোপন ইচ্ছাটি প্রকাশ করলো নাহ। বরং বললো আজকালকার মেয়েরা আদব পর্দা কিছুই মানে নাহ,সব জাহান্নামি। রাস্তার ঠিক অপর পাশে ক্ষুধার জ্বালায় কাতর, দুটি শিশু কাঁদছিল,ভিক্ষা চাচ্ছিল। এই কান্না না তাদের কানে গেলো না চোখে পড়লো।

মিমির ননদ বেশ সুন্দরী, স্মাট, মর্ডাণ মেয়ে।দামি দামি ব্রান্ড এর পোশাক, মেকাপ এর কালেকশন তার। অনলাইনে তিন হাজার টাকার মেকাপ কিট অর্ডার করলো। বান্ধুবিদের জানাবে এইজন্য অনলাইন ঢুকতেই দেখলো, তার এক বন্ধু একজনের সাহায্য লাগবে এমন একটা মেসেজ দিয়ে সাহায্য পাঠাতে বললো। খুব বিরক্ত হলো কিন্তু প্রকাশ করলো নাহ, মেসেজ টা সিন করে রেখে দিলো। তার বিরক্তি ভাবটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো নাহ। সে তার বান্ধুবিদের খুব গর্বের সাথে তিনহাজার টাকার মেকাপ কিট কিনেছে সেটা জানালো। কিচ্ছুক্ষণ পরেই ফেসবুকে সে প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয বিষয়ক একটি পোস্ট দিলো।

মিমির শশুড় মিমির ছোট ছেলেকে নিয়ে বিকেলে পার্কে বেড়াতে গেলো। মিমির ছোটছেলের হাতে দামি চকলেট। পার্কের এক কোণে ঠিক মিমির ছেলের বয়সী একটি মেয়ে লোলুভ দৃষ্টিতে হাতের চকলেটটির দিক তাকিয়ে ছিল কারণ গতকাল থেকে সে থেকে কিছুই খায়নি। বাচ্চার মা মিমির শশুড়ের কাছে গিয়ে বললো, কাইল থেকে মাইয়াডা না খাওয়া, কিছু টাহা দেন, মাইয়াডারে খাওয়ামু কিছু। মিমির শশুড় বললো, এই ভিখিরির বাচ্চা দূরে সর, খবরদার তোর বাচ্চা যেন আমার নাতিকে না ছোঁয়। বাচ্চাকে খাওয়াতে পারিস নাহ তো জন্ম দিস কেন? এতো তোর পাপের ফসল। দশটাকার একটা নোট বাচ্চা টার দিক ছুড়ে দিয়ে বলে যাহ এখন ভাগ।
মাটি থেকে টাকা তুলে নিয়ে একটা হাসি দিলো ভিখিরির বাচ্চাটা।

রাতের খাবার খেতে খেতে পুরো পরিবার মিলে দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করলো। খাওয়া শেষে মিমির স্বামী দেশের অবস্থা, দুর্নীতি এসব নিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিলো, সেইখানে মিমিও কমেন্ট করে নিজের মতামত জানালো, তাদের ছেলে তা শেয়ার করলো। সবাই স্ট্যাটাস এ লাইক কমেন্ট করে সহমত জানালো। এতো ভালো লিখার জন্য অনেক প্রশংসাও পেলো।

দামি দামি রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্য আমাদের সবার টাকা আছে,কিন্তু খাবার না পেয়ে যারা আমাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে তাদের কিছু দিতে গেলে আমাদের কলিজা ফেটে যায়। খাবার নষ্ট করবো তাও কোনো ক্ষুর্ধাতকে দিবো নাহ। ডাটা প্যাক কিনে বাসায় বসে টিকটক দেখতে পারি কিন্তু কেউ সাহায্যে চাইলে আমরা এড়িয়ে যায়। তারাও যে মানুষ তা আমরা ভুলেই যায়, তাদেরকে অসম্মান, অবহেলা করি। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করি। তথাকথিত ছোটলোকগুলো তাও হাত পেতে সাহায্য চাইতে পারে কিন্তু অনেক মধ্যবিত্তরা সম্মানের জন্য অনেক অভাবে থাকা সত্ত্বেও হাত পেতে চাইতে পারে নাহ। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর যখন সাহায্যর আবেদন করে সমাজের মানুষের কাছে শুনতে হয় নানা কথা। বলা হয় এতদিন তো রাজার হালে থাকতো, এখন তাহলে কি হলো?আরে সব টাকা কামানোর ফন্দি।

আমরা এতই ভদ্রলোক যে, বাইরে কোথাও খেতে গেলে মাংসের হাড্ডি তো কি মাঝে মাঝে মাংসও ফেলে আসি ভদ্রতা দেখাতে গিয়ে কিন্তু আমাদের এই এটো খাবার খাওয়ার জন্য কত কুকুর -বিড়াল চারপাশে ঘুরে বেড়ায়, দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। খাবার চাওয়ার শাস্তি স্বরূপ তাদের গায়ে গরম পানি, লাঠির বাড়ি দেওয়া হয়।

আমরা সবাই-ই মানুষ। পার্থক্য কিছু কিছু মানুষ কে আল্লাহ তা’লা দুহাত ভরে অর্থ উর্পাজনের তৌফিক দান করেছেন, আর কিছু কিছু দের অভাব, দুঃখ দিয়ে পরিক্ষা করছেন।
তাহলে এই বৈষম্য গুলো আমরা কেন করি?কেন এই কৃপণতা? আল্লাহ তা’লা আমাদের উদ্দেশ্যে বার বার বলেছেন তোমরা একে অপরকে সাহায্য করো, প্রতিটি জীবকে ভালোবাসো। কাউকে অবহেলা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, দুর্ব্যবহার করতে কোনো ধর্মই শেখায়নি। আমরা সাহায্যে করা তো দূরে থাকুক, এদেরকে সম্মানটুকু পর্যন্ত দেই নাহ। দরদাম শুধু এই গরিবদের বেলায়-ই কেন?

আসলে মানুষ-ই মহামানব আবার মানুষ-ই অমানুষ।