সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘সত্যি হলেও পারতো’

এই খালিদ কি বকছিস!

মায়ের ধমকে হন্তদন্ত হয়ে ঘুম থেকে উঠে বসল খালিদ। কিছুক্ষণ নিঃস্তব্ধ হয়ে বসে থাকলো সে। প্রথমে তার কাছে সবকিছু অস্পষ্ট মনে হলেও আস্তে আস্তে সব পরিষ্কার হতে লাগলো।
ঘুমের ঘোরে কিসব আবোল-তাবোল বকছিলি তুই?

মায়ের ধমকানিতে মায়ের দিকে তাকালেও কোন উত্তর দিলো না খালিদ। সে বিছানার উপর বসে থাকলো। সকাল হয়ে গেছে কিন্তু সকালের রৌদ্রজ্জ্বল দিনের বদলে আজ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি দিয়ে সকালটা শুরু হয়েছে। আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা। খালিদ এখন বসে বসে তার স্বপ্নের কথাই ভাবছে —

সে স্বপ্নে দেখেছে দেশের করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে।ভার্সিটিও খুলে দিয়েছে।ভার্সিটি খোলার আগের দিন বিকালে সে তার এক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারে আগামীকাল ভার্সিটি-হল সব একসাথে খুলে দিবে।খবরটা শোনার সাথে সাথে সে বাস কাউন্টারে টিকেট কাটতে যায়। কিন্তু বাসের টিকিট কাটতে গিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া তার কাছে কেমন যেন অদ্ভূত ঠেকে। তারাতারি গুছিয়ে নিয়ে সে রাতে রওনা দেয়। বাসে উঠার পরপরই খালিদের মনে হলো যেন এক পলকে ঢাকা পৌঁছে গেল।কিন্তু ক্যান্পাসে পৌছে সে লক্ষ্য করে ক্যাম্পাসে প্রচুর মানুষের সমাগম।হাঁটার জায়গা পর্যন্ত নেই। রুমে ঢুকে কয়েকজন রুমমেটের সাথে দেখা হলেও তেমন কোন কথা না বলে সে একটা খাতা আর একটা কলম নিয়ে ক্লাসের উদ্দ্যেশ্যে রওনা দেয়। হলের গেট দিয়ে ঢুকার সময় একজন তাকে ভালো- মন্দ জিজ্ঞাসা করলেও সে কোন উত্তর না দিয়ে সরাসরি তার রুমে চলে আসে।সাথে দেখা হয়। তাদের সাথে কথা বলতে বলতে ক্লাসের দিকে যাচ্ছিল সে। এত ভীড়ের ভেতর কোথায় যেন তারা হারিয়ে যায়। এদিকে ভীড় ঠেলে ঠেলে সে সামনে এগুতে থাকে। কিন্তু কিছুতেই সে তার ক্লাসে পৌছাতে পারে না,পথ যেন শেষই হচ্ছে না। বেশ অস্বস্তি লাগছিল তার।
এই! কি হলো তোর আবার? কি এতো ভাবছিস বসে বসে?

মায়ের কথায় ঘুমের ভেতর স্বপ্ন আর দেখা স্বপ্নের ভাবনা দুটোই মাঝপথে থেমে গেলো।বেশ রাগ হলেও সে চুপ করে রইলো।এই আবহাওয়ায় বেশ ভালো লাগছিল দেখা স্বপ্নটাকে আবার ভাবতে।স্বপ্নটা যদি সত্যি হতো! কাঁথা সেলাই করতে করতে মা খালিদকে বললো, কি ভাবিস এতো? যা হাতমুখ ধুয়ে নে।
ধুর! কিছু ভালো লাগে না। থাকি আরো কিছুক্ষণ বসে—

কথাগুলো বলেই খালিদ আবার ভাবনার জগতে চলে গেলো। তবে এবার আর স্বপ্ন নয় বাস্তবে তার ক্যাম্পাসে কাটানো দিনগুলির কথা সে ভাবতে লাগলো। মাত্র আড়াই মাস কাটানো ক্যাম্পাসের দিনগুলি আজ শুধুই স্মৃতি।এইতো কিছুদিন আগের কথা সে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলো তখন থেকেই সে ক্যাম্পাসে যাওয়ার দিনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ভর্তি পরীক্ষা কিংবা ভর্তির সময়, দুইবারই ব্যাস্ততার কারণে ক্যাম্পাস ঘোরার খুব একটা সুযোগ হয়নি। তাই সে অপেক্ষা করতে থাকে কবে ক্লাস শুরু হবে। হঠাৎ একদিন ফোনে ম্যাসেজ আসে দুইদিন পর তার ক্লাস শুরু হবে।ক্লাস শুরু হওয়ার আগের দিন সে ক্যাম্পাসে যায় এবং তার হলেও উঠে পড়ে। যদিও সেটা ছিলো গণরুম, যার নাম সে আগে অনেক শুনেছে। এই প্রথম তার এখানে আসা আবার থাকাও।আচ্ছা রুমের কার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল? সুমন নাকি ফরিদ? ঠিক মনে করতে পারে না খালিদ। তবে তাদের সাথে তার ক্যাম্পাসের প্রথম দিনই রাত্রে ঘুরে বেরানোর স্মৃতি আজও তার চোখে ভেসে বেরায়। এরপর তো রুমে তার অনেক সহপাঠীই এলো। সবাই মিলে অনেকবার গভীর রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাস ঘুরেছে খালিদ। একসাথে রাত্রে অপরাজেয় বাংলার সামনে ক্রিকেট খেলা, বটতলায় কিংবা সিনেট ভবনে বসে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দেওয়া, টিএসসিতে বসে চা খাওয়া, রাতের ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য অবলোকন করা, টিএসসির ফুটপাথে বাস্তুহীন মানুষের জড়োসড়ো হয়ে ঘুমিয়ে থাকার দৃশ্য দেখতে দেখতে ঘুরে বেরানো সবই কেবল আজ অতীত স্মৃতি।

কিরে ভাইয়া আজকে আর উঠবি না?

ছোট বোন নাজমার কথায় খলিদের ভাবনার ঘোরটা কেটে গেলো। না আজকে আর উঠবো না যা ভাগ, বলেই খালিদ আবার চুপ করে যায়। ক্যাম্পাসের কথা ভাবতে ভাবতে কখন আবার শুয়ে পরেছে তা সে নিজেই টের পাইনি। আলসেমির কারণে বিছানা ছেড়ে তার আর উঠতে ইচ্ছে করছে না—

অরিয়েন্টেশন ক্লাসে খালিদের আসতে দেরি হওয়ায় ক্লাসের সবাই তার দিকে তাকিয়ে ছিল। প্রথমদিন তার পাশে বসা আখতারের সাথেই ভালোকরে কথা হয়। তারপর আস্তে আস্তে ক্লাসের প্রায় সবার সাথেই তার পরিচয় আর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।এরপর থেকে বন্ধুদের সাথে নিয়মিত আড্ডা দেওয়া, ক্লাসের ফাঁকে সারা ক্যাম্পাস ঘুরে বেরানো, ডাকসুতে দুপুরে খাওয়া, টিএসসিতে গোল হয়ে বসে আড্ডা-গান কিংবা আখতারের সাথে ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন জায়গার অদ্ভূত নামের বিশ্লেষণ সবই যেন সোনালী স্মৃতি।খালিদের প্রথম অপরাজেয় বাংলা দেখার অনুভূতি কিংবা টিএসসিতে বসে একসাথে বন্ধু-বান্ধব মিলে আড্ডা দেওয়ার স্মৃতিগুলো আজও তার মনে নাড়া দেয়। এছাড়া জরুরি কিছু কাগজ সত্যায়িত করতে গিয়ে এক স্যারের সাথে পরিচয় তারপর থেকে নিয়মিত কথাবার্তা। আচ্ছা তার কথা কি স্যারের মনে আছে!
কিরে তুইকি আজকে আর বিছানা ছেড়ে উঠবিই না?

ক্যাম্পাসে কাটানো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে খালিদ কখন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে তা সে নিজেও টের পায়নি। চেয়ে দেখে বাইরে বৃষ্টি শেষ হয়ে রোদ উঠেছে। আবার কবে ক্যাম্পাসে ফিরবো? ইস্ স্বপ্নটা যদি সত্যি হতো! এসব ভাবতে ভাবতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ে খালিদ।