সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প- ‘স্মৃতির পাতায় এক টুকরো ইবি’

সবকিছু হারিয়ে যেতে পারে কিন্তু স্মৃতি কখনো হারায় না। স্মৃতি থাকে মনের মণিকোঠায় এক টুকরো তুলোর মত নরম মেঘ হয়ে। যখন রোমন্থন করতে ইচ্ছে হয়, খুব আলতোভাবে মনের গহীন থেকে খুজে বের করি আর স্মৃতিগুলো মনের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা হয়ে উড়তে থাকে দিকবিদিক। । তেমনি আমার ক্যাম্পাস জীবনের স্মৃতিগুলো খুব সযতনে জমিয়ে রাখা মনের ঠিক মাঝখানটায় যেখানে কেউ প্রবেশ করেনা কখনো। কেননা প্রবেশের অধিকারতো শুধু আমারই আছে। সারাবিশ্ব যখন করোনাভাইরাসের ধ্বংসাত্বক লীলায় মৃত্যুপুরীতে পরিনত হয়েছে ঠিক তখনি লকডাউনে ঘরে বসে মনে পড়ছে প্রিয় ক্যাম্পাসকে। হে প্রিয় অঙ্গন কেমন আছ তুমি? বড় জানতে ইচ্ছে করে। কেমন আছে তোমার বুক আগলে রাখা সবুজ দুর্বাঘাসগুলো? ওরা কি আগের মতোই সবুজ আছে?। কেমন আছে আমার আড্ডার প্রিয় জায়গা ডায়না চত্বরটি? এখনও কি কৃষ্ণচূড়া আর সোনালু ফুলে ছেঁয়ে আছে ডায়না চত্বর ? বড্ড বেশি জানতে ইচ্ছে করে। খুব মিস করি ডায়না চত্বরে দলবেধে গোল হয়ে বসে একসাথে বাদাম খাওয়া আর খুনসুটিতে মেতে ওঠা। আচ্ছা প্রিয়তমা বলতে পারো মেইনগেটের কৃষ্ণচূড়া গাছটি কী লাল লাল ফুলে সুশোভিত আছে এখনও ? খুব বসতে ইচ্ছে করে এই কৃষ্ণচূড়া গাছটির তলার বেঞ্চিতে।

মনে পড়ে ক্যাম্পাসের সব থেকে সুন্দরতম জায়গা ’মৃত্যুন্জয়ী মুজিব’ ম্যুরালের পাদদেশে বসে বাদাম আর ছোলাবুট খাওয়ার কথা। বিরামহীন কথা চলতো বাদাম খেতে খেতে যেন হারিয়ে যেতাম কোথায়। এখনও কি ‘সততা’ ঝরণাটি লাল, নীল, সবুজ আলোতে নিজেকে রাঙায়? বড্ড দেখতে ইচ্ছে করে।

আচ্ছা প্রিয়তমা রাতের ক্যাম্পাসে কি দলে দলে আড্ডা হয় ? গীটারের টুং টাং শব্দ কি আজও ধ্বনিত হয় টিএসসিসির করিডোরে? কিংবা ক্রিকেট এবং ফুটবলের মাঠে গানের আসর বসে কি? খুব গান শুনতে ইচ্ছে করে হে ভালবাসার ক্যাম্পাস।

ক্যাম্পাসের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমার মিলনায়তন এখন নিশ্চুপ নিরালায় থাকে তাইনা। হয়না কোনো সভা, সেমিনার বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বেচারার খুব মন খারাপ হয়ে আছে তাইনা ? বেচারার দুঃখ দেখে খুব কষ্ট হয় তাইতো ফিরতে চাই প্রিয় ক্যাম্পাসে। গাইতে চাই, নাচতে চাই মিলনায়তনের মঞ্চে যেখানে একাকার হয় ছাত্র শিক্ষক মনের আনন্দে গেয়ে ওঠে কোনো গান।

স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে থাকা জায়গাটা হলো ফলিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের ২য় তলার কক্ষগুলো। যেখানে আমার স্বপ্ন প্রতিদিন একটু একটু করে বেড়ে ওঠে পূর্ণতা প্রাপ্তির আশায়। ঠিক ২০১৫ সালের ২’রা মে যেখানে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু করেছিলাম, সেই প্রিয় বিভাগ ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি। আচ্ছা প্রিয়, বলতে পারো কেমন আছে আমার বিভাগের করিডোরে লাগানো সেই ফুলগাছ গুলো ? কেউ কি পানি দেয় তাতে ? বড্ড জানতে ইচ্ছে করে। মনেপড়ে বিভাগের সকল স্যারদের আদরমাখা বকুনি আর পরম স্নেহমাখা কথাগুলো। ওগুলো যেনো কানে বাজে সময় অসময়। মনে পড়ে প্রফেসর ড. মিজানুর রহমান স্যারের সেই চিরাচরিত উক্তি “হ্যাশশ বোকা, মেরে হাত পা ভেঙে দেব” । খুব বেশি মিস করি স্যারের হাসিমাখা এই উক্তিটি। এই উক্তিতেই মিশে আছে এক অজানা শক্তি যা আমার কর্মস্পৃহা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।

ক্লাসের ফাকে একটু খিদে পেলেই দৌড়ে যেতাম নাজমুল মামার ক্যান্টিনে সিঙ্গারা, ডালপুরী কিংবা এককাপ কফি খেতে। এটা যেন ছিলো নিত্যদিনের রুটিন। ভালবাসার ইবি, কেমন আছে তোমার আমতলায় সেই ছোট্ট দোকানগুলো যেখানে প্রতিদিন ঝালমুড়ি, বাদাম, আমড়া মাখা কিংবা মিনি চাইনিজ খেতাম আমরা। খুব খেতে ইচ্ছে করে আমতলায় দাঁড়িয়ে।

ইবিয়ানদের হাতিরঝিল (মফিজ লেক) আগের মতোই ফুলে ফুলে সুশোভিত আছে কি ? লেকের ‍দুইধারের পথ বেয়ে হেঁটে চলে কি পথিকেরা। যেখানে সন্ধে বেলায় হাটতে যেতাম কয়েক বন্ধু মিলে।

এখন কি জমজমাট আছে জিয়া হল মোড়? সন্ধে হলেই যেখানে ভিড় করত সবাই বশির মামা, আবজাল মামা কিংবা রাকিবের দোকানে রাতের খাবার খেতে।

আজ বড্ড মনে পড়ছে হলের টিভি রুমে ক্রিকেট খেলা দেখার স্মৃতি। আমার খেলা দেখার সঙ্গী ছিল বন্ধু জহিরুল আর শাহাদাত। খেলা দেখা মানেই ছিল অন্যরকম আনন্দ আর যদি বাংলাদেশ জিতে যেতো তাহলেতো সীমাহীন আনন্দের জোয়ারে ভেসে যেতাম আমরা। সবাই মিলে বিজয় মিছিল করে পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করতাম এ যেনো অন্যরকম এক অনুভূতির নাম।

এই সবকিছুই এখন শুধুই স্মৃতি, মনের কোনে ভাস্বর হয়ে জ্বলজ্বল করছে এখনো। ক্যাম্পাসের প্রতিটি মূহুর্ত চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে চোখের সামনে। মনটা বার বার কেঁদে ওঠে প্রিয় ক্যাম্পাসের ব্যাথায়। অজানা এক শঙ্কা ভর করে আছে আমার মনে। সত্যিই কি আবার আমি ফিরবো আমার রঙিন ক্যাম্পাসে? তাইতো মনের জানালায় উঁকি দেওয়া ক্যাম্পাসের মধুর স্মৃতিগুলো মনে করে করেই অতিবাহিত হচ্ছে জীবন। তবে সত্যি বলতে, ফিরতে চাই প্রিয় প্রাঙ্গনে প্রিয় মুখগুলোর সাথে আবার মিলিত হতে। তাইতো সবসময় প্রার্থনা করি পৃথিবী সেরে উঠুক করোনার এই ভয়াল থাবা হতে।