সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গল্প-‘ প্রিয় ক্যাম্পাস ‘

তখন আমি বেশ ছোট। যখন মা-বাবা আর বড় আপুসহ ঢাকায় আসি। ঢাকাতে বেড়ে উঠলেও বাড়ির পাশে স্কুল হওয়ায় খুব দূরে কখনো যাইনি। তাই বাসেও তেমন ওঠা হয়নি। তবে একদিন কাকার সাথে জাতীয় জাদুঘরে যাওয়ার সময় দোতলা বাস, মানে লাল রঙ্গের বিআরটিসি বাস দেখি। দোতলা বাসা আর দোতলা বাসে ওঠা আমার ছোটবেলার একটা স্বপ্নই বলা যায়। কিন্তু ঐদিন আর দোতলা বাসে ওঠা না হলেও ইচ্ছেটা কিন্তু মরে যায়নি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য স্কুল জীবনে তো দূরের কথা কলেজ জীবনেও আমি কখনো দোতলা বাসে উঠিনি। সত্যি বলতে প্রয়োজনও হয়নি।
আমার কলেজের পাশ দিয়েই বিআরটিসির দোতলা বাস যেত। আর তাতে বড় করে লেখা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেটি বর্তমানে আমার প্রাণের ক্যাম্পাস। আর সেদিন থেকেই ঠিক করেছিলাম আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়বো। লক্ষ্যটা আমার শৈশবের সেই লালিত স্বপ্ন থেকে স্থির হলেও একে খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছিলাম।
মা-বাবাকে বললেই হয়তো আমাকে দোতলা বাসে উঠাতো কিন্তু রোজ দোতলা বাসে ওঠার লোভ সামলাতে পারিনি আমি। তাই সর্বাত্মক চেষ্টা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাই।
আর সেদিন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর লাল বাস আমার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়ে। সকালে প্রতিদিন লাইব্রেরির জন্য লাইন ধরা, ক্লাস করা, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া, টিএসসিতে সিঙ্গারা, সমুচা আর চা খাওয়া, ডাকসু বা টিএসসির ক্যাফেটেরিয়াতে দুপুরের খাবার খাওয়া আবার বিকেলে কাচাঁকলার ভর্তা খাওয়া – ইশ কী দিন ছিল! ছিল বলতে খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। কারণ করোনা মহামারীর কারণে সেই ১২ মার্চ শেষ ক্যাম্পাসটাকে দেখেছি আমি। আগে যদি বুঝতাম তাহলে সেদিন আরো বেশি সময় কাটিয়ে আসতাম আর স্মৃতিটা আরেকটু ভারী করতে পারতাম। মিডটার্ম পরীক্ষার তারিখ পড়ায় তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে আসি। তবে তার জন্য আজ আফসোস হচ্ছে আমার।
এখন আমি মাস্টার্সে পড়ছি। মানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একেবারে শেষ ধাপে। আর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের মেয়াদ যতই কমে আসছে ততই ক্যাম্পাসের প্রতি আমার ভালবাসা গাঢ় হচ্ছে। কারণ সব ঠিক থাকলে এই বছরের শেষেই নিজেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী বলতে হতো। তবে করোনার এই সময়ের একটা শাপেবর হচ্ছে এর কারণে ক্যাম্পাসটাকে আরো বেশি করে ভালবাসছি আমি। লোকে বলে “আউট অফ সাইট আউট অফ মাইন্ড”। কিন্তু ক্যাম্পাসকে এত দীর্ঘ সময় না দেখেও আমার মনে হচ্ছে ” আউট অফ সাইট মোস্টলি গেটিং ইন্টু মাই মাইন্ড”।
গত চারটি বছর যতটা সময় না বাসায় কাটিয়েছি তার চেয়ে বেশি সময় আমি ক্যাম্পাসে কাটিয়েছি। বাসায় এখন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে অনেক সময়। বটতলা, আমতলা, টিএসসির করিডোর, কমনরুম, কার্জন হল, পিজে হার্টগ হলের সেই নির্জন জায়গাটায় নিশ্চিন্তে হেটে যাওয়া অনেক মিস করি।
আর বন্ধু বান্ধব আর শিক্ষকদের কথা না বললেই নয়। কোন সমস্যায় পড়লে ইমরান; ঘুরতে গেলে মিলি; কমনরুমে রিতু, মুক্তা,শুচি; আর ট্যুরে গেলে মামুন, লিরা, তাজওয়ার, নাসিম,ফারিয়া, মমো সবাইকে পাশে পেতাম। বিভাগীয় সেমিনারে বসে ক্লাস শেষে কতো কথা! কত আনন্দ। সব এখন ভিড় করছে মনে সর্বস্তরে।
মনে পড়ে ১৩ জন মেয়ে মিলে সাজেক গিয়েছিলাম আমরা। জীবনের সেরা মুহূর্তগুলোর একটি। পড়াশুনা, পরীক্ষা, টিউশন সবকিছুর চিন্তাকে পেছনে ফেলে অবিরাম আনন্দে ঘুরে বেড়িয়েছি। গিয়েছি নিঝুম দ্বীপে-কুড়িয়েছি ঝিনুক, সমুদ্রের পানিতে পা ভিজিয়েছি।
কত্তোসব স্মৃতি! সেগুলোকে তাজা করতে মাঝে মাঝে সেসময়ের ক্যামেরাবন্দী মুহূর্তগুলো দেখি আর ভাবি।
শিক্ষকের ক্লাস মাঝে মাঝে একঘেয়েমি লাগলেও এখন সেটা কাঙ্ক্ষিত। একদিন ক্লাসের কথা খুব মনে পড়ে আর হাসি পায় আমার। রাজ্জাক স্যার দুপুরে ক্লাস নিতেন। খাবার পরে খুব ঘুম আসতো আমাদের। একদিন স্যার ক্লাস নিচ্ছিলেন। হঠাৎ করে ইলেক্ট্রিসিটি চলে যায়। তখন আমি আস্তে বলে উঠি ” সবাই এই সুযোগে ৫ মিনিট ঘুমিয়ে নাও”- সবাই ঘুমাবে কী একসাথে হেসে ওঠে। আর স্যার জিজ্ঞেস করে “এই কে বললো?” কিন্তু কেউ স্বীকার করেনি। আরেকদিন আমিনা ম্যাম বলছিলেন “তোমরা কিছু মনে রাখতে কেন পারো না? পড় না তোমরা”। আমি সেই আস্তে করেই বলে উঠি ” ম্যাম বয়স বেড়ে গেছে তো তাই?” ম্যাম আমাকে খুঁজে পাননি। তবে বলেছিলেন, “তাহলে বাড়িতে বলো, বিয়ে দিয়ে দেবে”।
নাদির স্যারের সেই প্রথম ক্লাসের কথা মনে পড়ে যেদিন তিনি সবাইকে বেঞ্চের উপর দাড়ঁ করিয়ে বুকে বই নিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন যে আমরা যতদিন বেচেঁ থাকবো বইয়ের সাথে থাকবো, জ্ঞানের সাথে থাকবো। সেদিনের সে প্রতিজ্ঞার কারণেই হয়তো আমি এখন বিভিন্ন বই পড়ার চেষ্টা করি।
মাঝে মাঝে শুধু মনে হয় আমার যদি যাদুকরী শক্তি থাকতো তাহলে ক্যাম্পাসটাকে ছোট্ট করে বুকে জড়িয়ে ধরতাম, অনুভব করতাম। সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করি সব ঠিক হোক। তাহলে স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবো আমরা। ক্যাম্পাসে আবার পদচারণা করতে পারবো, পারবো বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে।