সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজ পর্যায়ের গল্প- ‘ সমাপ্তি ‘

“…..আজ আমার আর কিছুই বলার নেই। ধন্যবাদ সকলকে। “ এস এস সি পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠানের দিনে শিক্ষার্থীদের পক্ষে ভাষণ দিতে গিয়ে আমার শেষ কথা ছিল এগুলোই। কথাগুলো শেষ হতেই কোনো এক অজানা বেদনা আমাকে ছুঁয়ে গেলো। এ বেদনা প্রিয় মঞ্চ, প্রিয় প্রাঙ্গণ ছেড়ে চলে যাওয়ার। এ বেদনা মায়ার বাঁধন ছিন্ন করার।

আজও স্কুলের সেই স্মৃতিগুলো প্রতিনিয়তই মনের ভিতরে রঙ্গিন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায়।  দূর অতীতকে জীবন্ত করে বর্তমানকে ভুলিয়ে দিতে চায় স্মৃতি। গতিময় এই জীবনে বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে ক্রমাগত সামনে এগিয়ে চলার পথে হঠাৎই পিছনে ফিরে তাকাতে ভালো লাগে। ভালো লাগে অতীতের স্মৃতিচারণ করতে। আর তাইতো স্কুল জীবনের স্মৃতিটুকু আমার কাছে হয়ে আছে চির রঙিন।

মায়ের হাত ধরে প্রথম যেদিন স্কুল গেটে পা দিলাম, ঠিক সেদিন থেকেই স্মৃতির ডায়েরিটি রঙ বেরঙের গল্পে পূর্ণ হতে থাকল। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া, ক্লাসের বিরতিতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ক্লাস ফাঁকি দেওয়া, স্যারদের ফাঁকি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লাব এর নাম করে ঘুরে বেড়ানো কিংবা স্যারদের সাথে মজা করার স্মৃতি ভুলে থাকা কখনোই সম্ভব নয়।

সেদিনের সেই ক্লান্ত বিকেলের গল্প আমার আজও মনে পড়ে। সেদিন ছিল আমাদের র‌্যাগ ডে।   চারিদিকে যেদিকেই তাকাই যেন মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে রংধনু এসে আমাদের ছুঁয়ে গেছে। সাদা শার্টকে রঙের চাদরে মুড়িয়ে উঁকি দিচ্ছিল লাল, নীল, সবুজ, বেগুনি সহ হরেক রকমের রঙ। আমি কোনো এক অচেনা জগতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। শত আনন্দের মাঝে কোনো এক অজানা বেদনা আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

বারবার মনে হচ্ছিল আজই এ বিদ্যালয়ে আমার শেষ দিন। এতদিনের সম্পর্কের আজ ইতি টানার পালা। কিন্তু, চলে যাচ্ছি বলেই কি বিদ্যালয়ের সাথে আমার সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে?

তাহলে দীর্ঘ ১০ বছরের সোনালি অতীত কি পুরোটাই মিথ্যে? এই বিদ্যালয়ের উপর কি আমার সত্যিই আমার আর কোনো অধিকার নেই?  কিন্তু এই বিদ্যালয়ের প্রতিটি আনাচে কানাচের সাথে যে আমার স্মৃতি শক্ত করে বাঁধা। এর সবই যে আমার অস্তিত্বের সাথে এক সুতোয় গাঁথা। এই যে থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়া, মেহগনি গাছের ডালে বসে থাকা ছোট্ট মাছরাঙ্গা, মাঠের মাঝে নিস্তব্ধ পড়ে থাকা সাদা কালো গোলপোস্ট কিংবা শহিদ মিনারের সাথে লেগে থাকা কর্কশিটের অ আ ক খ – সবকিছুকেই তো সেই কবেই নিজের মনে ঠাই দিয়ে ফেলেছি। এই বন্ধন ছিন্ন করার দুঃসাহস কারো নেই।

তবে কেন আমাকে এই প্রিয় প্রাঙ্গণকে বিদায় বলতে হবে? কেন এই মায়ার বাঁধন ছেড়ে চলে যেতে হবে?

বিদ্যালয়ের প্রথম দিনের কথা কেন জানি বেশ মনে পড়ছিল। তখন কি ভাবতে পেরেছিলাম যে একদিন এই প্রাঙ্গণকে এতো বেশি ভালোবেসে ফেলব? প্রিয় প্রাঙ্গণে এক মুহূর্ত সময় বেশি থাকার জন্য নিজের মনে এতো ছটফট করবে?

কেন জানি না বারবার মনে হচ্ছিল পাঁচতলার ঐ লাইব্রেরি থেকে কেউ আমাকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে। কত যে স্মৃতি মিশে আছে লাইব্রেরির প্রতিটি বইয়ের পাতার ভাঁজে ভাঁজে। বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল। আরো কিছু সময় কি ঐ প্রিয় লাইব্রেরির জানালার পাশে বসে কাটিয়ে দেওয়া যাবে না?

মাঠের দিকে তাকিয়ে হঠাৎই মনটা আবারও খারাপ হয়ে গেল। এই মাঠে যে কত স্মৃতি তা নিজের ধারণারও বাইরে। সেই ছোটবেলায় স্কুল ছুটি হলেই কাগজের বল আর খাতা দিয়ে ক্রিকেট খেলার কথা এখনো স্মৃতিতে জাগ্রত। আস্তে আস্তে মাঠের মাঝের ঐ সাদাকালো গোলপোস্ট টা হয়ে গেছিলো আমার প্রিয় ঠিকানা। কতবার যে খেলতে গিয়ে হাত-পা কেটে গিয়েছে, নিজের দিকে তাকালে সেই ক্ষতগুলো এখনও স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। আর কি কখনো স্কুলের হয়ে খেলা হবে না? প্রাণপণে খেলে প্রিয় বিদ্যালয়ের জন্য বিজয় উপহার দিতে পারবো না? শূন্যে দু হাত তুলে আর কি কখনো বলা হবে না – হ্যাঁ, আইডিয়াল আমরা জিতেছি।

“কি রে, বাসায় যাবি না?” এক বন্ধুর ডাকে আমি আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলাম।  এতক্ষণ কোনো এক অবচেতন মন আমাকে কল্পনায় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

“ হ্যাঁ, চল। এবার তো আমাদের বিদায় নিতেই হবে।“

বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ ততক্ষণে অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। চোখের জলে ভেসে শেষবারের মতো প্রিয় প্রাঙ্গণের দিকে একবার ফিরে তাকালাম। বিদায় আইডিয়াল, বিদায়। হয়তো এখনের মতো বিদায় নিচ্ছি। কিন্তু প্রিয় এই ঠিকানায় ফিরে আসবো বারবার, বহুবার।

হঠাৎ করে সোনালি সূর্যকে আড়াল করে কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি শুরু হল। কেন জানি মনে হলো এ কোনো সাধারণ বৃষ্টি নয়।  এ যেনো প্রিয় প্রাঙ্গণের কান্না। প্রিয় বন্ধুকে বিদায় বলার জন্য শেষবারের মতো অশ্রু ঝড়িয়ে নিচ্ছে। হয়তোবা বিদায় দিতে ইচ্ছে করছে না।

“ আইডিয়াল আমার প্রিয় ঠিকানা, আমার আনন্দের উৎস। “ প্রিয় প্রাঙ্গণে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে বারবার। কতদিন হলো সেই চিরচেনা ধূসর মাঠে আমার পা পড়ে না। জানি না কেমন আছে প্রিয় আইডিয়াল। হয়তো ভালো নেই। এতোদিন কি তার প্রিয় বন্ধুদের ছেড়ে একা থাকতে পারে? নিশ্চয়ই পারে না।

কবে পৃথিবী স্বাভাবিক হবে? আমি আবার তোমার কাছে ছুটে যাবো। সত্যিই তোমাকে আজ বড্ড  মনে পড়ছে। ধূসর মাঠে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে আবারো তোমাকে বলতে চাই – “ ভালোবাসি তোমাকে, প্রিয় আইডিয়াল।”